November 1, 2026

পড়া বই, দেখা সিনেমা

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

দেবার্ক মণ্ডল

অতিথি অধ্যাপক, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়

সারসংক্ষেপ : আমাদের পরিচিত উল্লেখযোগ্য সাহিত্যের টেক্সট থেকে অনেক সময় শিল্প মাধ্যম বা অভিনয়-শিল্প উপাদান সংগ্রহ করে। শিল্প মাধ্যমের এই উপাদান বা কন্টেন্টে পরিবেশিত শিল্পগুন, কখন সার্থক হয় কখনোবা মুদ্রিত বা লিখিত সাহিত্যের মতো পাঠক বা শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় হয়না। আমাদের পড়া বহু বই Performing Art বা সৃজনশীল শিল্প মাধ্যমে এসে পাঠকের মনে অনেক সময় ভিন্ন অনুভবগম্যতা তৈরি করে।  সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিবিড় হলেও দুই শিল্পমাধ্যমের প্রকাশভঙ্গি আলাদা। সাহিত্যে শব্দের মাধ্যমে যে কল্পজগৎ তৈরি হয়, চলচ্চিত্রে তা দৃশ্য, শব্দ, অভিনয়, সংগীত ও সম্পাদনার সাহায্যে নতুন রূপ পায়। এই প্রবন্ধে হ্যারি পটার, অবতার, পিটার ব্রুকের মহাভারত, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী এবং গৌতম ঘোষের পদ্মানদীর মাঝি–র প্রসঙ্গে সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। জনপ্রিয়তা ও শিল্পমূল্যের পার্থক্য, দর্শকের গ্রহণবোধ এবং চলচ্চিত্রের মানবিক আবেদন এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য, লোককথা ও মহাকাব্যের বিপুল সম্ভাবনাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুনভাবে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য হল, একটি সাহিত্যকর্মের চলচ্চিত্রায়ণ কেবল কাহিনির পুনরাবৃত্তি নয়; এটি এক শিল্পমাধ্যম থেকে অন্য শিল্পমাধ্যমে সৃষ্টিশীল পুনর্নির্মাণ।

সূচক শব্দ : জে.কে.রাউলিং, জেমস, ক্যামেরুন, পিটার ব্রুক, পথের পাঁচালি, পদ্মানদীর মাঝি, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রায়ণ, চলচ্চিত্র-রূপান্তর, জনপ্রিয়তা ও শিল্পমূল্য, দর্শক-গ্রহণবোধ, হ্যারি পটার, অবতার, মহাভারত, পথের পাঁচালী, পদ্মানদীর মাঝি, বাংলা সাহিত্য, চলচ্চিত্রভাষা।

মূল আলোচনা

চেনা গল্প:

 বাবা, মা মারা যাওয়া সাধারণ চেহারার একটা ছেলে। অবাঞ্ছিত পরগাছার মতোই মেসো-মাসির সংসারে জুড়ে আছে। চোখে সেলোটেপ লাগানো ভাঙা চশমা আর মাথায় বড়ো, বড়ো চুল। একহারা রোগাটে গড়ন। বাতিল হওয়া বেঢপ জামা কাপড় পরার জন্যই রোগা পাতলা চেহারাটা বেশি করে চোখে পড়ে। এ পর্যন্ত গল্পটা আমাদের চেনা। এরকম সহায় সম্বলহীন আশ্রিত, অনাথ একটা চরিত্রকে তার কাছেপিঠে কিম্বা দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়ের বাড়িতে ন্যূনতম ভরণ পোষণের জন্য নিত্যনতুন অত্যাচারিত জীবনের রোজনামচার ইতিহাস পৃথিবীর যে কোন সাহিত্যে আনকোরা কোন বিষয় নয়।

  • অচেনা ম্যাজিক :

 এতক্ষণ একটা চেনা জানা গল্পের কথা বলছিলাম। বর্তমানে হ্যারি পটার নামের অতিপরিচিত এই চরিত্রটির জীবনের একেবারে শুরুতে আমরা এরকম চেনা গল্পের কথাই পাই। এরপর এই চরিত্রটির সৃষ্টি ও নির্মাণ যার হাতে ঘটেছে সেই জে. কে. রাউলিং বারো বছরের কিশোরটির জীবন হঠাৎ করেই পালটে দিলেন ম্যাজিক-এর ছোঁয়ায়। এইটুকু মাত্র চমকের পর লেখিকাকে আমরা আবার সেই পুরনো বাঁধাধরা গতেই ফিরে আসতে দেখি। শুভ-শক্তি আর অন্ধকারের অশুভ-শক্তির লড়াইয়ের দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের মতো সনাতন একটা দায়ভার নিতে হয় গল্পের নায়ক হ্যারি পটারকে। কম বয়সি এই নায়ক একই সাথে সমান তালে এই দায়িত্ব নিয়ে গল্পের পাতা থেকে সিনেমার পর্দা সর্বত্রই সফল। আর ঠিক এখানেই অচেনা ম্যাজিকের সূত্রপাত।

আমরা সিনেমার পর্দায় শুধুমাত্র যে বাস্তব জীবনের নির্ভেজাল, কংক্রিট ছবি দেখতে পছন্দ করি তা নয়। জীবনের না পাওয়া কিছু চাহিদা পূরণের জন্য আমরা মনের ভেতরে আকাশ কুসুম কল্পনাকেই প্রশ্রয় দিই। মূলত প্রথম বিশ্বের দেশগুলির একের পর এক তৈরি করা Science fiction story গুলির সাফল্যের পিছনে হয়ত কাজ করে আমাদের এই মনোবৃত্তি। আমাদের মনের এই যাদুবিদ্যা, রূপকথার জগতের প্রতি ক্রমবর্ধমান চাহিদার স্বাভাবিক প্রবণতা আছে। হ্যারির মতো (এখানে একটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন, আসলে হ্যারি প্রথম বিশ্বের রূপকথার একজন নায়ক) ছোট্ট একটা চরিত্র গোটা দুনিয়ায় তার যাদুকাঠি নিয়ে মানুষের রূপকথার চাহিদা পূরণ করে চলেছে তা খুবই আশ্চর্যের। সন্দেহ হয় শুধুমাত্র যাদুবিদ্যা আর রূপকথার গল্প কাহিনীই কি হ্যারির সাফল্যের বুনিয়াদ ? সন্দেহটা যে একেবারেই অমূলক একথা জোর দিয়ে বলা যায় না।

  • রাম, শ্যাম, যদু, মধু টম, ডিক, হ্যারি (পটার) :

 আমাদের রোজকার কথায় বহু প্রসঙ্গে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ ‘রাম, শ্যাম, যদু, মধু’ ইংরেজিতেও তেমনি বলা হয় ‘টম, ডিক, হ্যারি’। না, এটা কোন যে অভিনব তথ্য এমনটা বলতে চাইছি না। তবে একটু সহজভাবে ভাবলে টম, ডিক আর হ্যারি’র সাথে পটার হ্যারির বিশেষ কোন পার্থক্য নেই বলেই বোধ হয়। একটা উদাহরণ দিয়ে দেখা যাক সহজ ব্যাপারটা সহজে বোঝা যায় কিনা। এখানে কয়েকটা বইয়ের নাম করা হল। নামগুলো একে একে ‘হ্যারি পটার’, ‘সিন্ডেরেলা’, ‘ঠাকুমার ঝুলি’। অনেকে হয়ত এবার অবজ্ঞায় নাক সিটকোবেন কিম্বা বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকাবেন। হ্যারি পটারের জনপ্রিয়তার সঙ্গে কোন তুলনা করতে না চাইলেও হয়ত বিদেশি কাহিনী হিসেবে সিন্ডেরেলার মতো আকাশ কুসুম গল্পকে মেনে নিতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু এদের পাশে ‘ঠাকুমার ঝুলি’ নামটা একসঙ্গে একই লাইনে বসানোর মতো ব্যাপারটা অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হবে। ভাবছিলাম মঙ্গল কাব্যের নামগুলোও এই প্রসঙ্গে পর পর উল্লেখ করে যাব এমনটা করা হয়ত একটু বাড়াবাড়ি হবে। অন্তত পক্ষে আগের ভাবনাটি যাদের কাছে অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়েছিল তাদের কাছে তো বটেই।

কিন্তু হ্যারি পটারের পাশ থেকে ঠাকুমার ঝুলিকে এনে মনে হয় না এটিকে নির্বাসনে পাঠানো উচিত। হ্যারি পটারের গোটা গল্পটাতে মোট একখানা নায়ক। সেখানে ঠাকুমার ঝুলির যদি দশখানা গল্প পড়ি তবে কোন একজনের বদলে দশজন নায়ক সুলভেই পাওয়া যায় (গোটা দুনিয়ায় যখন হ্যারির রাজত্ব তখন এরকম ছোটখাটো মজা করাই যায়)। হ্যারির যাদুকাঠি আছে, সে নানারকম ম্যাজিক জানে। তা বলে আমাদের ‘লাল কমল’, ‘নীল কমল’ও কিছু কম যায় না। সোনার কাঠি রুপোর কাঠির গল্প শুনেই আমাদের জীবনের একটা সময় কেটেছে একথা কোন ভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই হ্যারির জন্মের আগে থেকে আমাদের ঝুলিতে যে রূপকথার অফুরন্ত সঞ্চয় আছে তাকে অবাঞ্ছিত মনে করার কোন কারণ নেই। ঠিক একই কারণে ‘মাগল’ অর্থাৎ যাদু না জানা সাধারণ মানুষের জগতে রূপকথার একমাত্র নায়ক হিসেবে শুধুমাত্র হ্যারিকেই জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

  • কান টানলে মাথা আসে :

কান টানলে যেমন মাথা আসে, ঠিক সেরকম পড়া বইয়ের প্রসঙ্গে আরও কিছু পড়া বই বা দেখা সিনেমার প্রসঙ্গে আর কিছু সিনেমার প্রসঙ্গ আসে। সাম্প্রতিক কালে আমরা জেমস ক্যামেরুনের ‘অবতার’ এই নামটার কারণে আমাদের অতি পরিচিত মহাকাব্যিক নায়কের সাথে (রামায়ণের রামচন্দ্রের কথাই বলছি) তুলনা করতে গিয়েছিলাম কেউ কেউ। খুব সহজ ভাবে আপাত-অর্থে অদূরদর্শীভাবে এরকম একটা জনপ্রিয় সিনেমা সম্পর্কে বলা যায় সিনেমাটির নায়ক ভাগ্যক্রমে ‘অবতার’ এর দায়িত্ব পেয়ে যান এবং গল্পের সমস্ত সমস্যা সমাধানের ভার তার উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আর এই গল্পের নায়কের উপর চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত দায়িত্ব, গল্পের নায়ক আমাদের চেনাজানা নায়কোচিত ভঙ্গিতেই শেষ করেছেন।

এই পরিচিত ছকটাই হয়তো আমাদেরকে আমাদের মহাকাব্যিক নায়ক রামচন্দ্রের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ক্যামেরুণের অবতারের পাশে কেন রামায়ণের রামচন্দ্র, এ-সম্পর্কে আরও কিছু বলতে গেলে হয়ত একটা আক্ষেপ, কোথাও গিয়ে একটা হতাশার প্রসঙ্গ আসে। ‘অবতার’ সিনেমাটি কেমন এরকম কোন মূল্যায়ন করতে গেলে ‘জেমস ক্যামেরুণ’-এর নামটা একটা বিশেষণের মতোই ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে আমরা যদি আমাদের আলোচ্য দেশীয় নায়কের (রামচন্দ্রের) মূল্যায়ন করতে চাই তাহলে বলা যেতে পারে তার নামের আগে ‘মহাকাব্যিক নায়কের’ মতো শক্তিশালী একটা বিশেষণ আছে। যেটা দিয়ে ওজন করলে দেশ, কাল, সময়ের মাত্রা ছাড়িয়ে এই তীর ধনুক কাঁধে নেওয়া নায়কের দিকেই পাল্লা ভারি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোন এক ক্রম অনুযায়ী আমাদের এই মহাকাব্যিক নায়ক প্রচারের আলো থেকে (অবতারের তুলনায় তো বটেই) বঞ্চিত।

এদেশের তুলনায় বিদেশে বা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় উন্নত দেশে, পুরনো বা অ্যান্টিক জিনিসের সমঝদার একটু বেশি। অন্তত আক্ষেপের সুরে একথা বলাই যায়। রামায়ণ নিয়ে টেলিভিশনের সাদাকালো যুগ থেকে রিমোট হাতে টিভির রঙিন পর্দায় আমরা লক্ষ কোটি সিরিয়াল দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এহেন জনপ্রিয় বিষয়টিকে সিনেমার রুপোলি পর্দায় নিয়ে এসে তার শৈল্পিক মান বাড়ানোর কথা কতজন ভেবেছি একথা হাতে গুণে বলে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। রুপোলি পর্দার সাথে শৈল্পিক মানের কোন সম্পর্ক আছে কিনা এরকম কোন সম্ভাব্য উত্তরে বলে রাখা ভালো যে প্রতিবছর আমরা গুটি কয়েক দেশীয় সিনেমা আর বাইরের দেশের বিভিন্ন সিনেমা নিয়ে যে চলচ্চিত্র উৎসব করি সেখানে সিনেমাকে শিল্প হিসেবেও ধরা হয়। একটু আগে অ্যান্টিক জিনিসের চাহিদার কথা বলছিলাম সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এরকমটা শোনা যায় যে ‘পিটার ব্রুক’ নামের একজন বিদেশি ভদ্রলোক মহাভারত নিয়ে টানা ছয় ঘন্টার সিনেমা তৈরি করে ফেলেছেন। যার জন্য আমরাও আফশোস করার আরেকটা সুযোগ পেয়েছি। কারণ আমাদের প্রায় প্রত্যেকের

বাড়িতেই গুছিয়ে রাখা হলদে পাতার অতি পুরাতন এই মহাকাব্যটির কথা এভাবে আগে ভাবা হয়নি।

আলাদা করে পড়া বই বা দেখা সিনেমার কোন প্রসঙ্গে নিদেন পক্ষে যে কোন বাঙালিই যে একবার করে পথের পাঁচালীর কথা বলবেন একথা বলার জন্য কোন সান্ত্বনা পুরস্কারের ব্যবস্থাও নেই। ‘পথের পাঁচালী’তে কোন মহাকাব্যিক নায়ক বা ক্যামেরুণের মতো কোন বিদেশি নামের বিশেষণ নেই। একবারে সাধারণ সহজ সরল মানুষের জীবনের সেই সত্তরের দশকের সাদাকালো যুগ থেকে ২০১০-এর রঙিন পর্দার যুগ পর্যন্ত এখনো আমাদের মনে কোথাও গিয়ে একটা আলাদা অনুভূতি তৈরি করে। প্রকৃতি প্রেম, বিভূতিভূষণ, তাঁর পথের পাঁচালী এগুলো নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই কিন্তু সিনেমাটির প্রস্তুতি পর্বের দিকে নজর করলে হয়ত কিছু নতুন তথ্য উঠে আসতে পারে।

আগেই বলেছি চলচ্চিত্র উৎসব এখন একটা সংস্কৃতির অঙ্গ। সেহেতু এই সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে পথের পাঁচালী সিনেমাটির প্রস্তুতি পর্ব খুব একটা মসৃণ ছিল না। বলা যেতে পারে সিনেমাটির সৃষ্টি ও নির্মাণ প্রায় পুরোটাই সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব প্রচেষ্টা। সিনেমাটির World Premiere হয় ৩ মে ১৯৫৫, Museum of Modern Art, New York. এরপর সিনেমাটি ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট ভারতে মুক্তি পায়। আর ঠিক এখানেই একটা সন্দেহ হয়। সিনেমাটির সাফল্যের বুনিয়াদ (এখানেই গুণগত মানের দিক থেকে বলছি না) কোথাও গিয়ে কি নিউ ইয়র্ক বা মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট ? এখানে বলা বাহুল্য যে সিনেমাটি ভারতে মুক্তি পাওয়ার পর তা প্রত্যাশা অনুযায়ী যথেষ্ট সম্মান পায়। একথা প্রশ্নাতীত সিনেমাটি প্রশংসা করার মতো কিনা, কিন্তু দেশের মাটিতে মুক্তি পাওয়ার আগেই বিদেশিদের হাততালি নিয়ে সিনেমাটি এদেশে মুক্তি পাওয়ার দরুন অন্তত পক্ষে তখনকার সময়ে অনেকেই চোখ বন্ধ করে প্রশংসা করার মতো বাহাদুরি একেবারেই যে দেখাননি একথা বলা যায় না। জনপ্রিয় সরকারি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত একটি প্রেক্ষাগৃহে পদ্মানদীর মাঝি সিনেমাটি দেখানো হয় (ডায়মন্ড হারবারের রবীন্দ্র ভবন প্রেক্ষাগৃহটি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কপাট হাট, নিউ টাউন এলাকায় অবস্থিত)। বিরতির সময় হলটি অর্ধেকের বেশি ফাঁকা হয়ে যায়। বাংলা ভাষা জানে অথচ ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেনি এরকম দৃষ্টান্ত অবাঙালি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৌলতে বর্তমান সময়ে থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু যে বিশেষ সিনেমা হলটির কথা বলছিলাম সেসময়ে সেখানে যারা সিনেমা দেখতে এসেছিলেন তাঁরা যে মানিক বা পদ্মানদীর মাঝি সম্পর্কে উদাসীন এমনটা নয়। খুব সোজা করে বললে মানিকের এই উপন্যাসটির পাতায় ছাপা কাহিনী পরম্পরা তাদেরকে যতটা আকর্ষণ করেছিল সিনেমার পর্দায় জীবন্ত চরিত্রগুলি তাদেরকে ততটা আকর্ষণ করতে পারেনি। আগে বলা কথাটির উল্লেখ করে বলছি চলচ্চিত্র যদি একটা শিল্প হয় আর বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনোটা যদি এই শিল্পে একটা সাফল্যের মাপকাঠি হয় তাহলে হ্যারি পটারের পাশে আলোচ্য এই সিনেমাটির সাফল্যকে দেখার জন্য দূরবীনে চোখ রাখতে হয়। উলটো দিক দিয়ে যদি আমরা আলোচ্য উপন্যাসটির গুণগত সাহিত্যিক মানের সাথে তর্কের খাতিরে হ্যারি পটারের তুলনা করতে যাই তাহলে যিনি চশমা ছাড়া খালি চোখে ঝাপসা দেখেন তিনিও পার্থক্যটা সহজে বুঝতে পারবেন যে- পদ্মানদীর মাছি তার নৌকায় পাল তুলে কতটা এগিয়ে গেছেন।

  • মজার বিষয় :

এ পর্যন্ত যেসমস্ত পড়া বই বা দেখা সিনেমার কথা আলোচনা করা হল তা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে গুণগতমানকে বহুদূরে সরিয়ে রেখে হ্যারি পটারের মতো বই বা সিনেমার মধ্যে এমন কিছু আছে যা আমাদের পড়া বই বা দেখা সিনেমার মধ্যে হয়ত নেই কিম্বা আমরা সে সম্পর্কে সচেতন নই।

প্রথমে খুব আলগোছে মধ্যবয়সিনী J.K. Rowling পথচলতি এক পাবে বসে হ্যারির কাহিনী লিখতে শুরু করলেও পরে যখন তিনি একের পর এক অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী লিখছেন তখন সেই লেখার মান যাই থাকুক না কেন তা যে তাঁর সচেতন প্রয়াস তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর হ্যারির এই সবকটা গল্পের মধ্যেই লেখিকা খুব স্পষ্ট করেই মাগল নয় অর্থাৎ যাদু জানা এবং না জানা এই দুটো শ্রেণি বিভাগ করেছেন। আর এই যাদু না জানা সাধারণ মানুষ অর্থাৎ মাগল বলতে লেখিকা আসলে পরোক্ষভাবে আমাদের উন্নয়নশীল দেশের সাহিত্য তথা সাহিত্যিকদের দিকে আঙুল তুলছেন না তো। কেউ যদি এমন সন্দেহ করে থাকেন তবে আমি তাদের সমর্থনই করব। হ্যারির ম্যাজিক দুনিয়ার পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের মহাকাব্য, মঙ্গলকাব্য, ঠাকুমার ঝুলি এই সবকিছুকে একটা বড়ো ঝোলার ভেতর পুরে রেখে দিই, তবে তা থেকে মাঝে মাঝে বেড়াল বেরিয়ে যে আমাদেরকেই আঁচড়ে দেবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

 শেষ কথা :

হ্যারিকে বিশ্ব জয়ের জন্য লেখিকা ‘নয় পূর্ণ তিনের চার’ বা প্ল্যাটফর্ম ৯¾ (Platform 9 ¾) -এর মতো অদ্ভুত একটা প্ল্যাটফর্মে হগওয়ার্সের (যাদুবিদ্যার স্কুল) ট্রেন ধরিয়ে দিয়েছেন। আমরা হয়ত আমাদের চেনাজানা রাজকন্যা-রাজপুত্তুরদের জন্য এরকম কোন প্ল্যাটফর্মের সন্ধান করতে পারিনি। তাই প্রথম বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর নিচে স্বাধীনতার এতদিন পরও উন্নয়নশীল তকমা পাওয়া দেশ হিসেবে আফশোস করার সুযোগ নষ্ট করা হয়ে ওঠেনি।

রচনাসূত্র :

১. পৃথ্বীরাজ সেন (সম্পা.), হ্যারি পটার সমগ্র, প্রথম সংস্করণ, কলকাতা, জুপিটার পাবলিশার্স, কলকাতা, বইমেলা ২০০৪

২. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ৪৪তম মুদ্রণ, কলকাতা, বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রা.) লিমিটেড, জানুয়ারি ২০১০ ৩. সুব্রত রুদ্র (সম্পা.), ‘সত্যজিৎ জীবন আর শিল্প’, ২য় সংস্করণ, কলকাতা, প্রতিভাস, ১ সেপ্টেম্বর ২০১১

  1. Mukhopadhyay, Parimal, PATHER PANCHALI A FILM BY SATYAJIT RAY WITH OVER 200 ILLUSTRATIONS Kolkata, : CINE CENTRAL, First Edition, January 1989
  2. Peter Brook’s ‘The Mahabharata’ Wikipedia, 29th May 2016, at 4:30 pm

লেখক পরিচিতি :

দেবার্ক মণ্ডল। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে পিএইচডি করেছেন। লেখকের দুটি বই ও গবেষণামূলক বিবিধ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বই ২০২০ সালে অক্ষর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত – ‘তুষার রায় : আত্মসংগ্রামের বিপন্ন বিস্ময়’। দ্বিতীয় বই ২০২৫ সালে তবুও প্রয়াস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত – ‘মেট্রোপলিটন ইতিকথা বাংলা কবিতার পঞ্চাশ বছর’।