September 1, 2026

শ্রীরামকৃষ্ণ : ধুলো থেকে সমুদ্র – একজন বাঙালি সাধকের ফিরে দেখা

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

‘খণ্ডন ভববন্ধন, জগবন্দন বন্দি তোমায়’—গানটি যে ইমন রাগে, তা বোঝার অনেক আগেই গানটি আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তখন সুরের ব্যাকরণ জানতাম না, রাগের স্বরূপও নয়। তবু গানটির মধ্যে এমন একটি টান ছিল, যা কেবল সুরের মাধুর্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পরে সংগীতের সঙ্গে যত পরিচয় বেড়েছে, তত বুঝেছি—একটি গানকে তার রাগ, তাল, বাণী ও পরিবেশনার কাঠামো দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়; কিন্তু তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি অনেক গভীরে প্রোথিত থাকে। ‘খণ্ডন ভববন্ধন’ আমার কাছে তেমনই একটি গান। তার সুরের মধ্যে যেমন ইমনের পরিচিতি, তেমনি তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশব, মন্দির, মহারাজ, উৎসব, মানুষের ভিড় এবং এক ধরনের অন্তর্ভেদী মানবিকতার স্মৃতি।

বাড়ির কাছেই ছিল শ্যামপুকুর বাটি, বলরাম মন্দির। ছোটবেলায় মহারাজরা এলে লজেন্স, বিস্কুট, সন্দেশ পাওয়ার আনন্দও ছিল। শিশুমনে ধর্মের প্রথম পাঠ অনেক সময় দর্শন দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় মানুষ দিয়ে, আচরণ দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, কোনও একটি গান দিয়ে, কিংবা কোনও উৎসবের গন্ধ দিয়ে।

বলরাম বসুর বাড়ির পাশেই গিরিশ ঘোষের বাড়ি। রাস্তার একেবারে মাঝখানে যেন সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাড়িটি আমাকে সবসময় সেই দুর্দম মানুষটির কথা মনে করিয়ে দিত। বলরাম মন্দিরে নানা উৎসব হত, বিশেষ করে রথের সময়। ছোটবেলায় ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সেখানে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে যেতাম। সাড়ে ছটার মধ্যে পৌঁছতে হত। পৌঁছেই প্রথম নির্দেশ—আগে খেয়ে নাও। না খেয়ে কোনও কাজ করা যাবে না। মুড়ি, সেখানেই তৈরি চপ, ঘুগনি, লুচি, মাখন-মিছরির দলা—কী না থাকত! বড় পাত্রে চা তৈরি থাকত। কাজের ফাঁকে টুকটাক খাওয়া চলতই। উপোসের কোনও বালাই দেখিনি।

আজ পিছন ফিরে তাকালে ঘটনাটি তুচ্ছ মনে হয় না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আমরা প্রায়ই উপবাস, সংযম, আচার ও নিষেধের সঙ্গে যুক্ত করি। অথচ আমার প্রথম পরিচয়ে সেখানে ছিল খাওয়া, কাজ করা এবং মানুষের সেবা করা। যেন বলা হচ্ছিল—শরীরকে অস্বীকার করে ধর্ম হয় না; মানুষকে নিয়ে ধর্মের যে পথ, সেখানে শরীরও তার অংশ। আমি জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ। কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশনে সেই পরিচয়ের জন্য কোনওদিন কোথাও কণামাত্র সুবিধা পাইনি। আজ সেই অভিজ্ঞতার জন্যই প্রতিষ্ঠানটির কাছে আমার কৃতজ্ঞতা আরও বেশি।

আমার কাজ ছিল জুতো রাখা।

প্রথম দিকে টানা চার-পাঁচ বছর আগত মানুষের জুতো হাতে নিয়ে ব্যাগে ভরতাম, কুপন দিতাম। তাঁরা ফিরে এলে কুপন মিলিয়ে জুতো খুঁজে দিতাম। সকাল থেকে রাত। একবারও মনে হয়নি—আমি এটা করছি কেন? আমি তো ঠাকুরঘরে ফুল সাজাতে পারতাম! তখন এত জ্ঞানবুদ্ধি ছিল না। আজ মনে হয়, সেই কাজটিই হয়তো আমার জীবনের এক অদৃশ্য শিক্ষার শুরু। ধনী মানুষের জুতো, দরিদ্র মানুষের জুতো, ব্রাহ্মণের জুতো, অব্রাহ্মণের জুতো, শিক্ষিতের জুতো, অশিক্ষিতের জুতো—সব আমার হাতে আসত। মানুষের সামাজিক পরিচয় জুতোর সঙ্গে বাইরে খুলে থাকত। কুপন ছিল, জুতো ছিল, ধুলো ছিল; কিন্তু জাতপাতের কোনও আলাদা চিহ্ন ছিল না। সকলের পায়ের ধুলো এসে মিশত আমার দুহাতে। তখন বুঝিনি। এখন বুঝি—সর্বধর্মসমন্বয় শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়; মানুষের পায়ের ধুলোয় তার প্রথম পাঠ। তীর্থে যেতে হয় ধুলো কুড়োতে। ঈশ্বর বোধহয় সেখানেই থাকেন।

গল্পের ভিতরে যে মানুষটি

ছোটবেলায় শ্রীরামকৃষ্ণকে আমার ভালো লাগত মূলত তাঁর গল্পগুলির জন্য। বড় হয়ে বুঝেছি, সেই গল্পগুলিই আসলে তাঁর দর্শনের দরজা খুলে দিয়েছিল। আট-নয় বছরের বালক গদাধরের উপনয়নের কথা মনে পড়ে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ বালকের প্রথম ভিক্ষা একটি ব্রাহ্মণ পরিবারের কাছ থেকেই গ্রহণ করার কথা। কিন্তু গদাধর কথা দিয়েছিলেন গ্রামের কামার পরিবারের ধনী কামারনীকে—তাঁর কাছ থেকেই প্রথম ভিক্ষা নেবেন। পরিবার আপত্তি করল। সামাজিক বিধি ও ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির মধ্যে সংঘাত তৈরি হল। কিন্তু বালক গদাধর নাছোড়। শেষ পর্যন্ত ধনী কামারনীর হাত থেকেই তিনি প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করেন।

ঘটনাটি যত ছোট, তার তাৎপর্য তত বড়। মানুষের মর্যাদা কি জন্মে নির্ধারিত হয়, নাকি তার হৃদয় ও চরিত্রে? শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন যেন বারবার দ্বিতীয় উত্তরটিই দিয়েছে। আজকের সামাজিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আমরা এখনও মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করতে চাই তার পদবি, জাত, ধর্ম, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে। অথচ ঊনবিংশ শতকের এক গ্রামীণ ব্রাহ্মণ বালকের আচরণ আমাদের অন্য একটি সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের প্রথম ভিত্তি হতে পারে বিশ্বাস এবং স্নেহ।

 ‘তুই সাক্ষাৎ নারায়ণ’

দক্ষিণেশ্বরের ঝাড়ুদার রসিকের প্রসঙ্গও এই ধারারই অংশ। সমাজ যাঁকে ‘নিচু’ কাজের মানুষ বলে দূরে সরিয়ে রাখত, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মধ্যে নারায়ণকে দেখতে চেয়েছিলেন। ‘তুই সাক্ষাৎ নারায়ণ’—এই ভাবটি কেবল আবেগের কথা নয়। এর মধ্যে ভারতীয় ধর্মদর্শনের একটি গভীর পুনর্ব্যাখ্যা আছে। জীবে দয়া করার মধ্যে এখনও দাতা ও গ্রহীতার দূরত্ব থেকে যায়। কিন্তু জীবে ঈশ্বরকে দেখলে সেই দূরত্ব ভেঙে যায়। তখন অন্যকে দয়া করা নয়, অন্যের মধ্যে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়ে ওঠে মূল কথা। এই ভাবনাই পরে স্বামী বিবেকানন্দের কর্মধর্মে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ হিসেবে নতুন ভাষা পায়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শিক্ষা, চিকিৎসা, ত্রাণ ও সমাজসেবার ভিতরে এই ভাবের একটি প্রতিষ্ঠানগত রূপ দেখা যায়। ধর্ম তখন কেবল পূজার ঘরে থাকে না। হাসপাতালের শয্যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, ত্রাণশিবিরে, দরিদ্রের ঘরে তার পরীক্ষা হয়।

লাটু মহারাজ: শিক্ষার বাইরেও মানুষের সম্ভাবনা

রামকৃষ্ণের জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর চরিত্র রাখতুরাম—পরবর্তীকালে স্বামী অদ্ভুতানন্দ বা লাটু মহারাজ। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারানো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ প্রায় ছিল না। রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে কাজ করতেন। প্রচলিত অর্থে তিনি শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মধ্যে যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তা কোনও পরীক্ষার নম্বর বা সার্টিফিকেট দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। এখানেও একটি প্রশ্ন ফিরে আসে—মানুষকে আমরা কী দিয়ে মাপি? ডিগ্রি দিয়ে? পদ দিয়ে? অর্থ দিয়ে? জাত দিয়ে? ভাষাজ্ঞান দিয়ে? নাকি তার অন্তর্গত সম্ভাবনা দিয়ে?

আজকের দিনে প্রশ্নটি আরও জরুরি। শিক্ষাকে যখন ক্রমশ সনদ, র‍্যাঙ্ক, চাকরি এবং বাজারমূল্যের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে, তখন লাটু মহারাজের জীবন মনে করিয়ে দেয়—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ ও মানবিক বা আধ্যাত্মিক শিক্ষা এক জিনিস নয়। শিক্ষা মানুষের ভিতরকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু মানুষের সম্ভাবনার শেষ সীমা কোনও সার্টিফিকেট নির্ধারণ করে না।

ধর্মকে তিনি শুধু পড়েননি, সাধনায় পরীক্ষা করেছিলেন

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তাঁর সাধনার পরীক্ষামূলক চরিত্র। তিনি বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে শুধু শুনে বা বই পড়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছননি। নিজের জীবনে বিভিন্ন সাধনাপথ অনুসরণ করেছেন। শাক্ত সাধনা তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় পর্ব। ভৈরবী ব্রাহ্মণী তাঁর তন্ত্রসাধনার গুরু। একজন নারী তাঁর গুরু—ঊনবিংশ শতকের বাংলার সামাজিক বাস্তবতায় ঘটনাটির তাৎপর্য কম নয়। এরপর তোতাপুরীর কাছে অদ্বৈত বেদান্তের সাধনা। শাক্ত ভক্তি ও অদ্বৈত জ্ঞানের মধ্যে যে আপাত দূরত্ব, তাঁর সাধনায় সেই দুই ধারাই বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্যে এসে মিলেছিল। এই বৈচিত্র্যই তাঁর ধর্মভাবনাকে অন্যরকম করে তোলে। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন—ধর্ম কেবল মতবাদ নয়; ধর্মকে সত্য করে তুলতে হলে তাকে জীবনের মধ্যে পরীক্ষা করতে হয়।

গোবিন্দ রায় ও ইসলামের সাধনা

দক্ষিণেশ্বরে গোবিন্দ রায় নামে এক সাধকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গোবিন্দ রায় ইসলামি সুফি ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে রামকৃষ্ণ-জীবনীতে উল্লেখ আছে। তাঁর প্রভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণ ইসলামি সাধনাপদ্ধতি গ্রহণ করেন। তিনি আল্লাহর নাম জপ করেন, মুসলমানের পোশাক গ্রহণ করেন, নামাজ পড়েন এবং সেই সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ নিমগ্ন করেন। তাঁর জীবনীমূলক বিবরণে এই সাধনার মধ্য দিয়ে আল্লাহ-ভাবের এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যায়। এই ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে একজন হিন্দু সাধক ইসলামি সাধনা করেছিলেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল তাঁর পদ্ধতি। তিনি দূর থেকে ইসলামকে বিচার করেননি। তিনি তার ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন। আজকের পৃথিবীতে যেখানে মানুষ অন্য ধর্ম সম্পর্কে না জেনেই মতামত তৈরি করে, সেখানে এই পদ্ধতি বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। আগে জানো। আগে বোঝো। আগে অন্যের বিশ্বাসের ভিতরের মানুষটিকে দেখার চেষ্টা করো। তারপর মত দাও। এটি শুধু ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শিক্ষা নয়; এটি জ্ঞানচর্চারও একটি নৈতিক পদ্ধতি।

যিশুর কাছে যাওয়া

খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রেও তাঁর পথ ছিল একই। শম্ভুচরণ মল্লিকের কাছ থেকে তিনি বাইবেল ও যিশুর জীবন সম্পর্কে শুনেছিলেন। যদু মল্লিকের বাগানবাড়িতে মাতা মেরি ও যিশুর ছবি দেখে তাঁর মধ্যে গভীর ভাবাবেশ সৃষ্টি হয়েছিল বলে রামকৃষ্ণ-জীবনীতে বর্ণনা আছে। কয়েক দিন তিনি কালীমন্দিরে যাননি এবং খ্রিস্টভাবনায় নিমগ্ন ছিলেন। পরবর্তী বর্ণনায় পঞ্চবটীতে যিশুর দর্শনের কথাও এসেছে। ঐতিহাসিক গবেষক এখানে নানা প্রশ্ন তুলতে পারেন—অভিজ্ঞতার ভাষা কী, স্মৃতির প্রকৃতি কী, পরবর্তী জীবনীকাররা ঘটনাটিকে কীভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। সেই প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংস্কৃতিক অর্থের দিক থেকে ঘটনাটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। একজন কালীসাধক যিশুকে নিজের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বাইরে রাখেননি।এই গ্রহণক্ষমতা তাঁর ধর্মচিন্তার অন্যতম স্বাতন্ত্র্য।

‘যত মত তত পথ’: কথাটির গভীরতা

শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বাণীগুলির একটি—‘যত মত, তত পথ।’ কথাটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে কখনও কখনও তার গভীরতাই হারিয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে সব ধর্ম একই কথা বলে, কিংবা ধর্মগুলির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। বরং বিভিন্ন ধর্মীয় সাধনাপথের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও সত্যসন্ধানের সম্ভাবনাকে স্বীকার করা—এই ছিল তাঁর অভিজ্ঞতার মর্ম। এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ধর্মসমন্বয় মানে ধর্মগুলিকে এক করে ফেলা নয়। ধর্মসমন্বয় মানে পার্থক্যের ভিতরেও সত্যের সন্ধানের অধিকারকে স্বীকার করা। এই কারণে তাঁর ধর্মভাবনা একাধারে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গভীরভাবে আধ্যাত্মিক। তাঁর আরেকটি বহুল পরিচিত উক্তি—

‘ঈশ্বরই সত্য, আর সব অনিত্য।’ মানুষের জাত, পদ, সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক পরিচয়—সব পরিবর্তনশীল। সত্যের সন্ধান তাই বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের দিকে নিয়ে যায়।

কবীর, লালন এবং বৃহত্তর ভারতীয় লোকধর্মের স্রোত

শ্রীরামকৃষ্ণকে বোঝার সময় বাংলার বাউল-ফকির এবং বৃহত্তর ভারতীয় সাধক-পরম্পরার কথাও মনে পড়ে। কবীরের সেই বহুল প্রচলিত কাহিনি—তিনি নাকি মসজিদের দিকে পা করে শুয়েছিলেন। ধর্মান্ধ কয়েকজন তাঁকে প্রশ্ন করল, মসজিদের দিকে পা করে তিনি কেন শুয়ে আছেন। কবীর উত্তর দিলেন—এমন একটি জায়গা দেখিয়ে দাও, যেদিকে পা করলে কোনও ধর্মস্থান পড়বে না। কাহিনিটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু এর সাংস্কৃতিক সত্য অসাধারণ।

লালনের গানও সেই প্রশ্নকে অন্য ভাষায় তোলে—‘আসা কিংবা যাওয়ার কালে/ জাতের চিহ্ন রয় কাররে?’

মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী জীবনে আমরা যত পরিচয় তৈরি করি, সেগুলি কতটা স্থায়ী? এই প্রশ্ন শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেও ফিরে আসে। তাঁর কাছে মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা কোনও জাতপাতের সনদে নির্ধারিত হয়নি। এই কারণে শ্রীরামকৃষ্ণকে শুধু মন্দিরের সাধক হিসেবে দেখলে তাঁর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের বড় অংশই অদৃশ্য হয়ে যায়।

কেশবচন্দ্র সেন: নবজাগরণের সঙ্গে এক সাধকের সংলাপ

১৮৭৫ সালে কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেশবচন্দ্র ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট নেতা এবং প্রচলিত হিন্দু সামাজিক রীতির অনেকগুলির সমালোচক। তিনি উপবীত ও বহু প্রথাগত আচারের বিরোধিতা করতেন। অথচ তিনিই শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র নিজ উদ্যোগে শ্রীরামকৃষ্ণের উক্তি সংকলন করে ‘পরমহংসের উক্তি’ নামে প্রকাশ করেন। এর ফলে শিক্ষিত সমাজে শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচিতি বাড়তে থাকে। এর পর প্রতাপচন্দ্র মজুমদার শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে ইংরেজিতে ‘The Hindu Saint’ শীর্ষক লেখা প্রকাশ করেন। এই লেখার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষিত সমাজে তাঁর পরিচয় পৌঁছতে শুরু করে এবং পরবর্তীকালে জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারও তাঁর প্রতি আগ্রহী হন। শিবনাথ শাস্ত্রী, ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখ ব্রাহ্ম নেতারও দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত ছিল। অর্থাৎ দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরের সেই সাধক একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনও ধর্মীয় জগতের মধ্যে ছিলেন না। তাঁর চারপাশে তখনকার বাংলার ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক জীবনের নানা প্রবাহ এসে মিলিত হচ্ছিল।

বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ

১৮৮২ সালের ৫ আগস্ট। শ্রীরামকৃষ্ণ মহেন্দ্রনাথ গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাদুড়বাগানের বাড়িতে গেলেন। বিদ্যাসাগর ছিলেন যুক্তিবাদী শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, নারীশিক্ষার অন্যতম প্রবক্তা এবং অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল। তাঁর সমাজকর্ম, শিক্ষাবিস্তার ও মানবিকতার কথা রামকৃষ্ণ জানতেন। বিদ্যাসাগরকে দেখেই রামকৃষ্ণ বলেছিলেন—‘তুমি সিদ্ধ গো।’ বিদ্যাসাগর বিস্মিত। তিনি তো সাধনা করেন না! রামকৃষ্ণ তখন আলু-পটলের উদাহরণ দিলেন। আলু বা পটল সিদ্ধ হলে নরম হয়। বিদ্যাসাগরের হৃদয়ও মানুষের দুঃখে নরম হয়েছে—এই অর্থে তিনিও ‘সিদ্ধ’। এখানে সাধনার একটি বিস্ময়কর পুনর্নির্মাণ ঘটে। সাধনা শুধু জপ, তপ, ধ্যান, উপবাস কিংবা মন্দিরে বসে থাকা নয়। পরের দুঃখে যার হৃদয় দ্রবীভূত হয়, তার মধ্যেও সাধনা আছে। তারপর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন— ‘এতদিন খাল-বিল-নদী দেখেছি, আজ সমুদ্র দেখলাম।’ বিদ্যাসাগরের রসিক উত্তর—সমুদ্রে তো নোনা জল!

রামকৃষ্ণের উত্তর—

‘না, তুমি ক্ষীরসমুদ্র।’ এই সংলাপকে শুধু একটি সুন্দর উপাখ্যান হিসেবে পড়লে তার গভীরতা কমে যায়। এখানে উনিশ শতকের বাংলার দুই ভিন্ন ধারার মানুষের সাক্ষাৎ ঘটছে—একজন আধ্যাত্মিক সাধক, অন্যজন যুক্তিবাদী মানবতাবাদী সমাজসংস্কারক। কিন্তু মানুষের দুঃখে হৃদয় নরম হওয়ার জায়গায় তাঁরা পরস্পরকে চিনতে পেরেছিলেন। এটাই বাংলার নবজাগরণের একটি বড় শিক্ষা।

বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল ও এক পরিবর্তনশীল বাঙালি সমাজ

শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাতের কথাও রামকৃষ্ণ-পরম্পরার স্মৃতিতে রয়েছে। অধর সেনের বাড়িতে তাঁদের দেখা হয়েছিল। অধর সেন ছিলেন অব্রাহ্মণ; তাঁর বাড়িতে আহার নিয়ে সমাজের কিছু অংশের আপত্তি থাকলেও শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর বাড়িতে যেতেন। এইসব ছোট ছোট ঘটনার মধ্যেই তাঁর সামাজিক অবস্থানের একটি দিক স্পষ্ট হয়। তিনি সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করেননি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ বহু প্রথার ভিতরের অচলতা প্রকাশ করে দিয়েছিল।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। বিদ্যাসাগর যে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করতেন, মানুষের দুঃখে সাড়া দিতেন—রামকৃষ্ণ সেই মানবিকতার মূল্য বুঝেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনেও বিদ্যাসাগরের সহায়তা ও মানবিকতার ঘটনা সুপরিচিত। এই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরটি মনে রাখলে বোঝা যায়, রামকৃষ্ণের সময়ের বাংলা ছিল তীব্র পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলা এক সমাজ—যেখানে ধর্ম, যুক্তি, সাহিত্য, সমাজসংস্কার ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে নতুন ধরনের সংলাপ তৈরি হচ্ছিল।

 ‘কথামৃত’: একজন মানুষের কণ্ঠকে সময়ের কাছে রেখে যাওয়া

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও কথাকে আমাদের কাছে এত জীবন্ত করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত—‘ম’—এর কাছে বাঙালির ঋণ অপরিসীম। ১৮৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। এরপর তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কথোপকথন, আচরণ, স্থান, সময় ও উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেক কিছুই নথিবদ্ধ করতে থাকেন। এই নোটের ভিত্তিতেই পরে প্রকাশিত হয় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত। এটি শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়। উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক অসামান্য দলিল। এখানে ধর্ম আছে, গান আছে, হাসি আছে, কৌতুক আছে, তর্ক আছে, ভাবসমাধি আছে, সংসারের কথা আছে। আছে ব্রাহ্মসমাজ, কেশবচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, যুবক নরেন্দ্রনাথ এবং নানা শ্রেণির মানুষ।

বিশেষত সংগীতের দৃষ্টিকোণ থেকেও কথামৃত গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে গান কীভাবে ভাবপ্রকাশের মাধ্যম ছিল, কীভাবে বাউল, কীর্তন, শাক্ত পদ, ব্রাহ্মসংগীত ও অন্যান্য ধারার গান আধ্যাত্মিক কথোপকথনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠত—তার বহু বিচ্ছিন্ন চিহ্ন সেখানে ছড়িয়ে আছে। সাধকের কাছে গান কেবল সংগীত নয়; কখনও তা সাধনার ভাষা। এইখানেই ‘খণ্ডন ভববন্ধন’-এর মতো একটি গানকে কেবল সুর-তাল-রাগের কাঠামোয় আটকে রাখা যায় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি সাধক-পরম্পরা, একটি মঠ, একটি স্মৃতি এবং এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

ধর্ম কি শুধু খাদ্যাভ্যাস?

আজকের সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনায় কখনও কখনও তাঁর বিশাল ধর্মদর্শনকে সরিয়ে এনে খাদ্যাভ্যাস, পোশাক বা বিচ্ছিন্ন কোনও উক্তিকে সামনে আনা হয়। এতে শুধু শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি অবিচার হয় না; ভারতীয় ধর্মচিন্তার প্রতিও অবিচার হয়। কোনও সাধকের একটি খাদ্যসংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু একটি বিচ্ছিন্ন উক্তিকে তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের মাপকাঠি করে তোলা ইতিহাসের পদ্ধতি নয়। শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষার কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বরসন্ধান, সত্য, প্রেম, ভক্তি, মনশুদ্ধি, ত্যাগ, আত্মসমর্পণ, ধর্মসমন্বয় এবং জীবে ঈশ্বরদর্শন।

প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত—একজন মানুষ কী খেলেন?

তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—

তিনি মানুষকে কীভাবে দেখলেন?

 ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’

শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনা স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে এক নতুন সামাজিক ভাষা পেল।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মূলমন্ত্র—

‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ।’

নিজের মুক্তির জন্য এবং জগতের কল্যাণের জন্য। এই দুইয়ের সমন্বয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু নিজের মুক্তি নয়।
শুধু সমাজসেবাও নয়। আত্মোন্নতি এবং জগতের কল্যাণ—দুই একসঙ্গে। আধুনিক ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে এই ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম। ধর্মকে সমাজসেবা থেকে আলাদা না রেখে সেবাকেই আধ্যাত্মিক অনুশীলনের অংশ করে তোলার যে প্রয়াস পরে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শিক্ষা, চিকিৎসা, ত্রাণ ও উন্নয়নমূলক কাজে দেখা যায়, তার বীজ এই ভাবনার মধ্যেই।

বেলুড় মঠ: স্থাপত্যে একটি সাংস্কৃতিক বক্তব্য

বেলুড় মঠের মূল মন্দিরের স্থাপত্য নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। ভারতীয় বিভিন্ন ধর্মীয় ও স্থাপত্য-ঐতিহ্যের প্রতীকী সমন্বয়ের চেষ্টা সেখানে স্পষ্ট।এই স্থাপত্যকে কেবল সৌন্দর্যের দিক থেকে দেখলে তার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। এখানে একটি সাংস্কৃতিক বক্তব্যও আছে—বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে সংলাপ সম্ভব। বেলুড় মঠের স্থাপত্য যেন সেই সংলাপকে পাথর, ইট, গম্বুজ, খিলান ও রেখার মধ্যে দৃশ্যমান করে। যে ধর্মভাবনা শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের জীবনে সাধনার মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দ এবং পরবর্তী রামকৃষ্ণ-পরম্পরা তাকে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, সেবা ও স্থাপত্যের মাধ্যমে সামাজিক পরিসরে নিয়ে আসে।

মন্দির থেকে হাসপাতাল: ধর্মের সামাজিক অনুবাদ

এই জায়গাটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্ম যদি কেবল দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে সীমাবদ্ধ থাকত, তবে তার প্রভাব হয়তো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিসরেই সীমিত থাকত। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে যখন সেই ভাবনা শিক্ষা, চিকিৎসা, ত্রাণ, গ্রামীণ উন্নয়ন ও জনসেবায় রূপ পেল, তখন ধর্মের একটি নতুন সামাজিক ভাষা তৈরি হল। মন্দিরে প্রণাম এবং হাসপাতালে রোগীর সেবা—দুটিই একই আধ্যাত্মিক ধারার অংশ হতে পারে। এই ধারণা আধুনিক ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম তখন শুধু ব্যক্তির মুক্তির বিষয় নয়; সামাজিক দায়িত্বেরও বিষয়।

‘যত মত তত পথ’ এবং আজকের পৃথিবী

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ধর্মীয় পরিচয় বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষকে ধর্ম দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে; তারপর সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাকে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’-য় ভাগ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ‘যত মত তত পথ’ কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি একটি গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্ন।

আমি কি সত্যিই অন্যের বিশ্বাসকে বুঝতে চেষ্টা করি?

আমি কি নিজের ধর্মকে ভালোবাসতে পারি অন্যের ধর্মকে ঘৃণা না করে?

আমি কি ভিন্ন মতের মানুষের মধ্যে মানুষটিকে দেখতে পারি?

ধর্মসমন্বয় মানে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়। আবার নিজের বিশ্বাসকে সত্য বলে মনে করার অধিকারও অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করার অধিকার দেয় না।

এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যটিই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন।

আমরা কি শ্রীরামকৃষ্ণকে হারিয়ে ফেলছি?

প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। তবু করা দরকার।

আমরা কি শ্রীরামকৃষ্ণকে কেবল একটি পূজার প্রতিমায় পরিণত করছি?

তাঁর ছবি রাখছি, ফুল দিচ্ছি, প্রণাম করছি—কিন্তু তাঁর শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি?

‘যত মত তত পথ’ বলছি, অথচ অন্য মতের মানুষকে ঘৃণা করছি?

‘জীবে ঈশ্বর’ বলছি, অথচ দরিদ্র মানুষকে অবজ্ঞা করছি?

‘সর্বধর্মসমন্বয়’ বলছি, অথচ অন্য ধর্মের প্রতীক, উৎসব বা উপাসনার প্রতি সন্দেহ পোষণ করছি?

যদি তাই হয়, তবে আমরা শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি রেখেছি; শ্রীরামকৃষ্ণকে রাখিনি।

এই পার্থক্যটি খুব সহজ, কিন্তু খুব কঠিন।

কারণ ছবি রাখা সহজ।

শিক্ষা ধারণ করা কঠিন।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন

বাঙালির সংস্কৃতির একটি বড় শক্তি ছিল তার গ্রহণক্ষমতা। এই গ্রহণক্ষমতা কখনও নিখুঁত ছিল না, বিরোধহীনও নয়। কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস এবং অন্যের সঙ্গে সংলাপের ক্ষমতা ছিল।

রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ—এই ধারার মানুষদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল প্রবল। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকে কোনও না কোনওভাবে প্রচলিত চিন্তার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বাংলার আধুনিকতা তাই শুধু পাশ্চাত্য অনুকরণ নয়। এর মধ্যে আছে নিজের ঐতিহ্যকে পুনরায় পড়ার সাহস, অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপ এবং মানুষের স্বাধীন চিন্তার অধিকার।

শ্রীরামকৃষ্ণ এই ধারায় একটি অনন্য স্থান অধিকার করেন।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না। পাশ্চাত্য দর্শনে শিক্ষিত ছিলেন না। কোনও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না।

কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের তাঁর ছোট্ট পরিসরটি এমন এক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল যেখানে নানা মত, নানা সামাজিক অবস্থান এবং নানা ধর্মীয় পটভূমির মানুষ এসে বসত।

এই অর্থে তাঁর পরিবেশকে এক ধরনের জীবন্ত ‘ধর্ম-সংলাপের সভা’ বলা যায়।

ধর্ম যখন ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে

ধর্ম মানুষের অন্তর্গত মুক্তির পথ হতে পারে। কিন্তু ধর্ম যখন ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তার ভাষা বদলে যায়।

তখন প্রশ্ন হয়—

কে শুদ্ধ?
কে অশুদ্ধ?
কার ধর্ম সত্য?
কার খাবার গ্রহণযোগ্য?
কার উৎসব বৈধ?
কার প্রতীক গ্রহণযোগ্য?
কে ‘আমাদের’, আর কে ‘ওদের’?

এই প্রশ্নগুলি যত বাড়ে, ঈশ্বরের প্রশ্নটি তত পিছিয়ে যায়।

শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা ছিল অন্যরকম। তিনি মানুষের অন্তরের দিকে ফিরতে বলেছিলেন।

ধর্মের বাহ্যিক পরিচয় নয়, আন্তরিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের পথকে ভালোবাসো, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে অন্যের প্রতি ঘৃণায় পরিণত কোরো না।

আজকের পৃথিবীতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা

প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে আমরা বাস করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, মহাকাশ গবেষণা নতুন সীমা খুলছে, জিন-প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয়, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতের কারণে ঘৃণা এখনও আমাদের সমাজকে বিভক্ত করে।

এই বৈপরীত্যের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা পুরোনো বলে মনে হয় না।

বরং নতুন করে পড়ার মতো মনে হয়।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—

মানুষকে পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি কোরো না।

নিজের ধর্মকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করার জন্য নয়।

সত্যকে নিজের একচেটিয়া সম্পত্তি মনে কোরো না।

মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে শেখো।

আর নিজের মুক্তির সঙ্গে অন্যের কল্যাণকে যুক্ত করো।

আজকের পৃথিবীতে এই কথাগুলি ধর্মীয় বাণীর পাশাপাশি একটি সামাজিক নীতিও হতে পারে।

আর সেই ধুলো…

শেষে আবার ফিরে আসি সেই জুতোর ব্যাগের কাছে।

শৈশবে আমি জানতাম না আমি কী করছি।

আমি শুধু কুপন দিতাম। জুতো রাখতাম। মানুষ ফিরে এলে জুতো খুঁজে দিতাম।

আজ মনে হয়, সেই কাজের ভিতরে হয়তো একটি অদৃশ্য পাঠ ছিল।

জুতো হাতে নিলে অহংকার করার খুব বেশি জায়গা থাকে না। মানুষকে একটু মাথা নিচু করেই দেখতে হয়।

হয়তো মাথা নিচু করেই মানুষকে সত্যি দেখা যায়।

ব্রাহ্মণের জুতো, কায়স্থের জুতো, ব্যবসায়ীর জুতো, শ্রমিকের জুতো, ধনী মানুষের জুতো, দরিদ্র মানুষের জুতো—সব এক ব্যাগে ঢুকে যায়।

সেখানে জাত থাকে না।

পদ থাকে না।

ক্ষমতা থাকে না।

থাকে শুধু ধুলো।

আর সেই ধুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার।

২৩. শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করার অর্থ

তাই শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর জন্মতিথিতে ফুল দেওয়া নয়।

তাঁকে স্মরণ করার অর্থ—

ঘৃণার বদলে সংলাপ বেছে নেওয়া।

অহংকারের বদলে বিনয় বেছে নেওয়া।

জাতপাতের বদলে মানবিকতা বেছে নেওয়া।

ধর্মীয় বিদ্বেষের বদলে ধর্মসম্মান বেছে নেওয়া।

নিজের মুক্তির সঙ্গে অন্যের কল্যাণকে যুক্ত করা।

আর মানুষের পায়ের ধুলোকে তুচ্ছ না করা।

বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে শ্রীরামকৃষ্ণের গুরুত্ব এখানেই। তিনি কোনও একমাত্রিক ‘ধর্মীয় প্রতীক’ নন। তিনি একদিকে দক্ষিণেশ্বরের কালীসাধক, অন্যদিকে বহুধর্মসাধনার পরীক্ষক; একদিকে ভক্তির মানুষ, অন্যদিকে অদ্বৈত অভিজ্ঞতার সাধক; একদিকে গ্রামীণ বাংলার সহজ মানুষ, অন্যদিকে কেশবচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম ও নরেন্দ্রনাথের মতো আধুনিক মননের মানুষের সঙ্গে সংলাপকারী।

তাঁকে বোঝার জন্য তাই শুধু ভক্তির চোখ যথেষ্ট নয়। ইতিহাসের চোখ দরকার, সংস্কৃতির চোখ দরকার, সমাজের চোখ দরকার; এমনকি সংগীতের কানও দরকার—কারণ তাঁর পরিসরে গান কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল ভাবের বাহন, সাধনার ভাষা, মানুষের অন্তর্জগতের প্রকাশ।

আর এইখানেই আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে তাঁর বৃহত্তর ইতিহাস এসে মিশে যায়।

‘খণ্ডন ভববন্ধন’ গানটি যে ইমন রাগে, তা পরে জেনেছি। কিন্তু তার আগেই গানটি আমার ভিতরে ছিল। যেমন পরে জেনেছি রামকৃষ্ণ-পরম্পরার ইতিহাস, তাঁর সাধনা, তাঁর শিষ্য, তাঁর সঙ্গে বিদ্যাসাগর-কেশব-বঙ্কিমদের সম্পর্ক; কিন্তু তার আগেই তাঁর একটি সহজ শিক্ষা আমার শৈশবের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল—মানুষকে ছোট করে ঈশ্বরকে বড় করা যায় না।

আজ মনে হয়, ধনী কামারনীর হাতে ভিক্ষা নেওয়া সেই বালক গদাধর থেকে দক্ষিণেশ্বরের সাধক, সেখান থেকে বিবেকানন্দের কর্মধর্ম, বেলুড় মঠের সেবাদর্শ—সবকিছুর ভিতরে একটি সুতো আছে।

মানুষকে তার আবরণ ছাড়িয়ে দেখা।

ধর্মের বাহ্যিক চিহ্নের বাইরে গিয়ে অন্তরের সত্য খোঁজা।

আর নিজের মুক্তিকে অন্যের কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা।

তীর্থে গিয়ে ঈশ্বরের ধুলো কুড়োনোর আগে তাই হয়তো মানুষের পায়ের ধুলো কুড়োতে শেখা দরকার।

কারণ শেষ পর্যন্ত সেই ধুলোতেই আমাদের সকলের মিলন।

আমরা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, মৃত্যুর পরে সেই মাটিতেই ফিরে যাব।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা আজ এই—

ঈশ্বরকে খুঁজতে সবসময় খুব দূরে যেতে হয় না।

মানুষকে সত্যিই দেখতে শিখলেই হয়।

আর মানুষকে সত্যিই দেখতে গেলে একদিন নিজের অহংকারটাকেও নামিয়ে রাখতে হয়।

ঠিক যেমন ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনের দরজায় বসে আমি মানুষের জুতো হাতে নিতাম।

তখন বুঝিনি।

আজ বুঝি—

সেই জুতোর ধুলোই হয়তো আমার প্রথম তীর্থ।