September 1, 2025

বাংলা কীর্তন গান : ঐতিহ্য, সংগীততত্ত্ব ও আধুনিকতার সংলাপ

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

দেবাশিস মণ্ডল 

সারসংক্ষেপ

বাংলা কীর্তন বাংলার সংগীত-সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক ধারা। তাকে কেবল বৈষ্ণব ধর্মীয় সংগীত বলে চিহ্নিত করলে তার প্রকৃত পরিসর ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী, চৈতন্যীয় সংকীর্তন, রাধাকৃষ্ণের লীলাভিত্তিক কাব্য, লোকায়ত সুর ও ছন্দ, রাগসংগীতের নানা উপাদান, খোল-করতালের বাদন, আখর, কথকতা এবং সমবেত পরিবেশনের দীর্ঘ ঐতিহ্য। বাংলা কীর্তনের বিশেষত্ব এই যে, এখানে কাব্য ও সুর, ভক্তি ও নন্দন, ব্যক্তিগত সাধনা ও সামাজিক অংশগ্রহণ—পরস্পরকে অতিক্রম না করেও পাশাপাশি চলেছে।

সময়ের সঙ্গে বাংলা কীর্তনে বিভিন্ন আঞ্চলিক রীতি গড়ে ওঠে। গড়ানহাটি, মনোহরশাহী, রেনেটি ও মন্দারিণী প্রভৃতি রীতির উল্লেখ কীর্তনের সেই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য বহন করে। পদাবলী কীর্তনের গায়কীতে রাগের ব্যবহার থাকলেও তা উত্তর ভারতীয় রাগসংগীতের কঠোর কাঠামোর অনুবর্তী নয়; বরং পদটির ভাব ও বাণীকে প্রকাশ করার প্রয়োজনেই রাগ ও সুরের ব্যবহার। আখর কীর্তনীয়ার তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তেমনি তাল ও লয় কেবল ছন্দের কাঠামো নয়, কীর্তনের আবেগ-নির্মাণেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে কীর্তনের সামাজিক অবস্থানেও পরিবর্তন ঘটে। নগরায়ণ, মুদ্রণ, রেকর্ডিং, রেডিও এবং পরবর্তী সময়ে মঞ্চ ও ডিজিটাল মাধ্যম কীর্তনের পরিবেশন-পরিসর বদলে দেয়। একই সঙ্গে ‘সাধক কীর্তনীয়া’-র একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক আদর্শ গড়ে ওঠে, যার সঙ্গে পুরুষ কীর্তনীয়ার মর্যাদা, ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং একটি নির্দিষ্ট গায়কী জড়িয়ে ছিল। নারী ও পেশাদার কীর্তনশিল্পীদের অবস্থান এই সাংস্কৃতিক নির্মাণের মধ্যেই নতুনভাবে নির্ধারিত হয়।

বর্তমান সময়ে কীর্তনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সম্পর্ক। মঞ্চ, মাইক্রোফোন, রেকর্ডিং এবং ডিজিটাল মাধ্যমে কীর্তনের বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি সংক্ষিপ্ত সময়, বাজারের চাহিদা এবং দ্রুত উপস্থাপনার প্রবণতা তার দীর্ঘায়ত গায়কী, আখর ও তাল-লয়ের ঐতিহ্যকে সংকুচিত করছে। তাই কীর্তনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অন্ধভাবে অতীত আঁকড়ে থাকার উপর নয়, আবার নির্বিচারে আধুনিকীকরণের উপরও নয়; বরং ঐতিহ্যের অন্তর্গত সংগীত-ব্যাকরণকে বুঝে নতুন পরিবেশে তার সৃষ্টিশীল প্রয়োগের উপর।

সূচক শব্দ: বাংলা কীর্তন, পদাবলী কীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, গড়ানহাটি, মনোহরশাহী, আখর, খোল, তাল, কীর্তনীয়া, আধুনিকতা

 

ভূমিকা

বাংলা কীর্তনের ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হল এর বহুমুখী চরিত্র। একদিকে এটি বৈষ্ণব ভক্তির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত; অন্যদিকে এর সুর, ছন্দ, পরিবেশনপদ্ধতি এবং সামাজিক বিস্তারের মধ্যে বাংলার লোকসংগীত ও আঞ্চলিক সংগীতচর্চার নানা চিহ্ন রয়েছে। রাগসংগীতের সঙ্গে এর সম্পর্কও অস্বীকার করা যায় না। আবার কীর্তন শুধু গান নয়—এটি অনেক সময় কথকতা, সমবেত গান, তালবাদন, নৃত্য ও শ্রোতার অংশগ্রহণকে একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনরূপ গ্রহণ করে।

এই কারণেই কীর্তনকে একটি নির্দিষ্ট সংগীতশ্রেণির মধ্যে আটকে দেখা সমস্যাজনক। তাকে শুধু ধর্মীয় গান বললে তার সংগীততাত্ত্বিক দিকটি আড়ালে পড়ে; আবার কেবল রাগসংগীতের দৃষ্টিতে বিচার করলে তার কাব্যিক, সামাজিক ও ভক্তিমূলক চরিত্রের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।

বাংলায় ঈশ্বরের নাম, গুণ ও লীলাকে গান ও সমবেত উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ করার ঐতিহ্য চৈতন্য-পূর্বকালেও ছিল। বাংলার প্রাচীন ধর্মীয় গীতিকবিতার সঙ্গে পরবর্তী বৈষ্ণব কীর্তনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। চর্যাগীতির মতো প্রাচীন সাধনামূলক গানের মধ্যে যে সংগীত-ভাবনা ও সমবেত সাধনার সূত্র পাওয়া যায়, তার সঙ্গে পরবর্তী কীর্তনের কিছু দূরবর্তী সম্পর্কের কথাও আলোচিত হয়েছে। তবে এই সম্পর্ককে সরাসরি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

চৈতন্যদেবের সময় কীর্তন একটি বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় শক্তি লাভ করে। নামসংকীর্তনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভক্তি সমবেত সাধনায় রূপ নেয়। ঈশ্বরের নাম এবং ঈশ্বরের লীলাবর্ণনা—এই দুই প্রবণতা পরবর্তীকালে কীর্তনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নির্মাণ করে।

এই প্রবন্ধে বাংলা কীর্তনকে সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে দেখা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার সংগীততাত্ত্বিক কাঠামো, আঞ্চলিক রীতি, তাল-লয়, আখর, বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশনপদ্ধতিকে। পাশাপাশি আধুনিক সমাজে কীর্তনের অবস্থান, নারীশিল্পীর ভূমিকা, নগর সংস্কৃতির প্রভাব এবং বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশের সমস্যাগুলিও আলোচনায় এসেছে।

বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্তনের ঐতিহাসিক ভিত্তি

বাংলা কীর্তনের প্রাণভিত্তি বৈষ্ণব পদাবলী। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ কবির পদে রাধাকৃষ্ণের প্রেম যে কাব্যিক ভাষা পেয়েছে, পরবর্তী পদাবলী কীর্তন তার উপরই অনেকখানি দাঁড়িয়ে আছে। এই পদগুলির বিষয়বস্তু মূলত রাধা ও কৃষ্ণের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এর আবেগ নিছক পৌরাণিক কাহিনির পুনর্কথন নয়। প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা, মান, অভিসার, আকাঙ্ক্ষা, মিলন এবং বিচ্ছেদের মতো মানবিক অনুভূতিগুলি এখানে ভক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। ফলে পদাবলী কীর্তনে মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের সীমারেখা অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। সংগীতের দিক থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি পদ যখন কীর্তনীয়ার কণ্ঠে আসে, তখন তার সাহিত্যিক অর্থের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনি, স্বর, উচ্চারণ, বিরতি এবং পুনরাবৃত্তিরও নতুন তাৎপর্য তৈরি হয়। একটি বিশেষ শব্দ দীর্ঘ করে গাওয়া, কোনো পংক্তি বারবার ফিরিয়ে আনা কিংবা একটি আবেগময় শব্দকে আখরের মাধ্যমে বিস্তার করা—এসবই পদের অর্থকে সংগীতের মধ্যে গভীর করে। এই কারণে কীর্তনের পদকে নিছক গীতিকবিতা হিসেবে দেখলে তার পূর্ণতা বোঝা যায় না। পদ তার কীর্তনরূপ লাভ করে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।

চৈতন্যদেব ও সংকীর্তনের সামাজিক তাৎপর্য

শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব বাংলা কীর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তাঁর ভক্তি আন্দোলনে নামসংকীর্তন ব্যক্তিগত সাধনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমবেত ধর্মীয় অভিজ্ঞতার রূপ নেয়। এই সমবেত চরিত্র কীর্তনের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কীর্তনীয়ার সঙ্গে শ্রোতার দূরত্ব এখানে স্বভাবতই কম। প্রধান গায়ক পদ বা নামের একটি অংশ গাইলে সমবেত দল তা ফিরিয়ে আনতে পারে। করতালের ছন্দে শ্রোতারা অংশ নেন, অনেক ক্ষেত্রে নৃত্যও যুক্ত হয়। ফলে কীর্তন একটি অংশগ্রহণমূলক সংগীতরূপে পরিণত হয়। বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে নগরজীবন—বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে কীর্তনের গ্রহণযোগ্যতার পেছনে এই অংশগ্রহণমূলক চরিত্রের ভূমিকা যথেষ্ট। কীর্তনের আসরে শ্রোতা কেবল শ্রোতা নন; পরিবেশনের একটি সক্রিয় অংশ। চৈতন্যীয় সংকীর্তনের এই সামাজিক শক্তিই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে কীর্তনের বিস্তারের ভিত তৈরি করে।

খেতুরী মহোৎসব ও কীর্তনের সংগঠিত রূপ

বৈষ্ণব কীর্তনের ইতিহাসে খেতুরী মহোৎসব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শাখা ও সংগীতরীতির মধ্যে যোগাযোগ এবং পদগানের একটি সুসংবদ্ধ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এই উৎসবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে কীর্তনের সমস্ত সংগীতরূপকে খেতুরী মহোৎসব থেকেই একবারে নির্ধারিত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কীর্তনের বিকাশ ছিল দীর্ঘ এবং বহুকেন্দ্রিক। বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সংগীতরীতি, পদকর্তার কাব্য এবং ভক্তিসাধনার পৃথক পরিবেশ একে নানা পথে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তী সময়ে কীর্তনের নিজস্ব গায়কী, পদবিন্যাস, তাল, আখর এবং পরিবেশনরীতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে বাংলা কীর্তনের মধ্যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য দেখা দেয়।

কীর্তনের আঞ্চলিক রীতি ও ঘরানা

বাংলা কীর্তনের ক্ষেত্রে গড়ানহাটি, মনোহরশাহী, রেনেটি ও মন্দারিণী—এই নামগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলিকে উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদ বা খেয়ালের ঘরানার মতো কঠোর, বংশপরম্পরায় সম্পূর্ণ নির্ধারিত সংগীতঘরানা হিসেবে দেখা সবসময় যথার্থ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলি আঞ্চলিক গায়কী, পরিবেশনরীতি এবং ঐতিহাসিক পরম্পরার নাম।

গরাণহাটি

গড়ানহাটি রীতির সঙ্গে নরোত্তম দাসের নাম ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত। এই রীতির গায়কীতে ধীর লয়ের গুরুত্ব এবং দীর্ঘতাল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়। গানের বিস্তার এখানে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ; ফলে কীর্তনীয়া পদটির প্রতিটি শব্দ ও ভাব নিয়ে কাজ করার অবকাশ পান।

ধীর লয়ের এই প্রবণতার ফলে গায়কী অনেক সময় ধ্যানমগ্ন আবহ তৈরি করে। শ্রোতাকে দ্রুত আবেগের চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে একটি ভাবের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়।

মনোহরশাহী

মনোহরশাহী রীতির সঙ্গে বর্ধমান অঞ্চলের মনোহরশাহী পরগণার নাম যুক্ত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রীতিকে অনেক সময় পূর্ববর্তী বিভিন্ন কীর্তনরীতির উপাদানের সমন্বয়জাত বিকাশ হিসেবেও দেখা হয়েছে।

মনোহরশাহীর বিশেষত্ব কেবল সুরে নয়। পদব্যাখ্যা, আখর, লয়ের ব্যবহার এবং কণ্ঠের তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতা এই রীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক।

রেনেটি

রেনেটি বাংলা কীর্তনের একটি আঞ্চলিক রীতি। পশ্চিম বাংলার কিছু অঞ্চলের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। বর্তমানে এর স্বতন্ত্র রূপ আগের মতো জীবন্ত না থাকলেও কীর্তনের আঞ্চলিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব রয়েছে।

মন্দারিণী

মন্দারিণীও একটি আঞ্চলিক কীর্তনরীতি। এই ধরনের রীতির অস্তিত্ব থেকেই বোঝা যায় যে কীর্তন কোনো একক কেন্দ্র থেকে অপরিবর্তিত অবস্থায় বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি। স্থানীয় ভাষা, সুর, ছন্দ ও পরিবেশনের সঙ্গে ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার বিস্তার ঘটেছে।

কীর্তনের ইতিহাসে ধাপ কীর্তনের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে কীর্তনের সংগীতরূপের পাশাপাশি তার সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণিগত অবস্থানও বোঝা যায়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতার শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজে কীর্তনের একটি বিশেষ আদর্শ গড়ে ওঠে। ‘সাধক কীর্তনীয়া’ নামে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি হয়, যেখানে ধর্মীয় নিষ্ঠা, সংগীতের গভীরতা এবং পুরুষ কীর্তনীয়ার একটি বিশেষ ভাবমূর্তি গুরুত্ব পায়। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে ধীর লয়ে বৃহৎ তাল পরিবেশনকারী পুরুষ কীর্তনীয়ার গায়কীকে বিশেষ সাংস্কৃতিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে নারী এবং পেশাদার পরিবেশকদের সঙ্গে যুক্ত ঢপ কীর্তনকে তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় ও নিম্নতর রীতি হিসেবে দেখা হতো। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। কোনো একটি গায়কী ‘উচ্চ’ আর অন্যটি ‘জনপ্রিয়’—এই বিচার কি শুধু সংগীতের গুণের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল? নাকি তার সঙ্গে শ্রেণি, লিঙ্গ ও সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কও ছিল? কীর্তনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে উপেক্ষা করা যায় না।

পদাবলী কীর্তনের বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে রাধাকৃষ্ণের লীলাকাহিনি। কিন্তু এই কাহিনি কীর্তনে কখনও নিছক আখ্যান হয়ে থাকে না। তার ভিতর দিয়ে মানুষের গভীরতম আবেগের নানা স্তর প্রকাশ পায়। পূর্বরাগ, অভিসার, মান, বিরহ, মিলন, অপেক্ষা, কৃষ্ণের বাঁশির আহ্বান, রাধার অভিমান কিংবা সখীর মধ্যস্থতা—প্রতিটি পর্বের নিজস্ব আবেগগত পরিবেশ রয়েছে। বিশেষ করে বিরহ কীর্তনের গায়কীতে দীর্ঘ বিস্তারের সুযোগ দেয়। অপেক্ষা, অনুপস্থিতি, স্মৃতি এবং আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি ধীর লয়ের মধ্যে দীর্ঘায়িত করা যায়। একটি শব্দের উপর দীর্ঘক্ষণ অবস্থান, পংক্তির পুনরাবৃত্তি এবং আখরের সাহায্যে তার আবেগকে আরও ঘনীভূত করা সম্ভব হয়। এই কারণেই কীর্তনের সময়বোধকে সাধারণ গানের সময়বোধ দিয়ে বিচার করলে তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য অদৃশ্য হয়ে যায়।

কীর্তনের পরিবেশন একটিমাত্র গানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও তার অভ্যন্তরীণ গঠন অনেক বেশি বিস্তৃত। বিভিন্ন পরম্পরায় কথা, দোঁহা, আখর, টুক, ছুট প্রভৃতি অংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব অংশের ভূমিকা এক নয়। কোথাও কাহিনি বা ভাব ব্যাখ্যা করা হয়, কোথাও মূল পদকে বিস্তৃত করা হয়, কোথাও গায়ক নিজের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের সুযোগ পান। আবার পরিবেশনের শেষ পর্যায়ে লয়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি দ্রুততর আবহ তৈরি হতে পারে। এই দিক থেকে পদাবলী কীর্তনকে একটি ধারাবাহিক সংগীত-পরিবেশন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। এর শুরু, বিস্তার, আবেগের ঘনীভবন এবং পরিণতি—সব মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ রূপ তৈরি হয়।

 

আখর : কীর্তনীয়ার সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা

বাংলা কীর্তনের সংগীতভাষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল আখর।  আখরকে শুধু মূল পদের পুনরাবৃত্তি বলা চলে না। মূল পদকে ধরে গায়ক যখন শব্দ, স্বর, ছন্দ ও লয়ের নানা সম্ভাবনা খুলে দেন, তখনই আখরের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। একটি শব্দকে ভেঙে নেওয়া যায়। তার শেষ ধ্বনিকে দীর্ঘ করা যায়। একই পংক্তি ভিন্ন স্বরে পুনরায় গাওয়া যায়। কখনও অর্থকে সামনে রেখে, কখনও ধ্বনিকে কেন্দ্র করে, কখনও আবার তাল-লয়ের সঙ্গে মিলিয়ে গায়ক একটি নতুন সংগীত-পরিসর তৈরি করেন। এখানেই কীর্তনের মৌখিক পরম্পরার শক্তি। একই পদ বিভিন্ন কীর্তনীয়ার কণ্ঠে একেবারে একইভাবে শোনা যায় না। পদের মূল পরিচয় অক্ষুণ্ণ থেকেও পরিবেশনে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়। অর্থাৎ আখর কীর্তনের ঐতিহ্যকে ভাঙে না; বরং ঐতিহ্যের ভিতর থেকেই ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার পথ খুলে দেয়।

 

রাগ ও সুরের ব্যবহার

কীর্তনের সঙ্গে রাগসংগীতের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও কীর্তনের রাগব্যবহারকে খেয়াল বা ধ্রুপদের কঠোর রাগব্যাকরণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। পদটির ভাব এবং বাণী এখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কোন রাগ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল সেই রাগের কোন স্বরচলন, কোন অলংকার এবং কোন আবহ পদটির ভাবকে প্রকাশ করতে সাহায্য করছে। কীর্তনের গায়কীতে মীড়, কানস্বর, গমক, স্বরবক্রতা, দীর্ঘ টান এবং পুনরাবৃত্তির ব্যবহার দেখা যায়। তবে এসব অলংকারের প্রয়োগ কখনও কেবল কণ্ঠপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়। পদটির অর্থের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকা জরুরি। এই কারণে কীর্তনের রাগধর্মিতা বিচার করার সময় শুধু রাগের নাম উল্লেখ করলেই গবেষণা সম্পূর্ণ হয় না। দেখতে হবে, রাগটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং পদটির ভাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায়।

তাল ও লয় : কীর্তনের অন্তর্গত ছন্দবোধ

বাংলা কীর্তনের সংগীতরূপ বোঝার জন্য তাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কীর্তন-পরম্পরায় দশকোষী, আড়, লোফা প্রভৃতি তালনামের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলির মাত্রা, বিভাগ, প্রয়োগ ও বাদনরীতিতে অঞ্চল ও পরম্পরাভেদে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই আধুনিক তালতত্ত্বের একক কাঠামো দিয়ে কীর্তনের সমস্ত রূপকে বিচার করা সমীচীন নয়। কীর্তনের তাল গানের ছন্দকে ধরে রাখে, কিন্তু তার ভূমিকা শুধু এতটুকু নয়। ধীর লয়ের দীর্ঘতাল গায়ককে পদ বিস্তারের অবকাশ দেয়। লয় দ্রুত হলে পরিবেশনের মধ্যে অন্য ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সমবেত অংশগ্রহণ বাড়ে। বিশ শতকের গোড়ার কলকাতার কীর্তনচর্চা নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, ‘সাধক কীর্তনীয়া’-র সঙ্গে বৃহৎ মাত্রার তালকে ধীর লয়ে পরিবেশনের একটি বিশেষ আদর্শ যুক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে ধাপ কীর্তনে তুলনামূলক ছোট তাল ও পাঠকেন্দ্রিক গায়কীর গুরুত্ব ছিল। অতএব তাল এখানে নিছক ছন্দের কাঠামো নয়; সামাজিক রুচি এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদার নির্মাণের সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।

লয়ের নন্দনতত্ত্ব

কীর্তনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তার সময়কে ধীরে ব্যবহার করার ক্ষমতা। একটি পংক্তি কয়েক মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কীর্তনীয়ার কাছে সেই পংক্তিই দীর্ঘ পরিবেশনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি শব্দটি পুনরাবৃত্তি করেন, তার স্বরবিন্যাস পরিবর্তন করেন, আখর দেন, তালকে ধরে রাখেন এবং ধীরে ধীরে শ্রোতাকে একটি নির্দিষ্ট আবেগের মধ্যে নিয়ে যান। এই প্রক্রিয়ায় সময়ের দৈর্ঘ্য নিজেই নন্দনগত উপাদান হয়ে ওঠে। Eben Graves-এর গবেষণায় বাংলা ভক্তিমূলক সংগীতের এই দীর্ঘ সময়বোধ এবং আধুনিক বাজারব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। আধুনিক মঞ্চ, রেকর্ডিং এবং বাণিজ্যিক পরিবেশে দীর্ঘ কীর্তনকে সংক্ষিপ্ত করার চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে কীর্তনের আধুনিক ইতিহাসকে এক অর্থে সময়ের পরিবর্তনের ইতিহাসও বলা যায়।

বাংলা কীর্তনের সঙ্গে খোলের সম্পর্ক এত গভীর যে খোলকে কেবল সহযোগী বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত ভূমিকা বোঝা যায় না। খোল মূল তালকে প্রতিষ্ঠিত করে, লয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং গায়কীর সঙ্গে এক ধরনের সংলাপ তৈরি করে। বিশেষত আখরের সময় খোলবাদকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কণ্ঠ যখন পদের কোনো অংশকে বিস্তার করছে, তখন খোল ছন্দের ভিতটিকে ধরে রাখে। আবার লয় পরিবর্তনের সঙ্গে খোলের বাদনও বদলায়। পরিবেশনের আবেগ যখন ক্রমশ ঘনীভূত হয়, খোলের সক্রিয়তা সেই পরিবর্তনকে শ্রাব্য করে তোলে। এ কারণে কীর্তনের খোলবাদন নিয়ে পৃথক সংগীততাত্ত্বিক গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। খোলের বোল, তালচক্র, গায়কের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং লয়ের পরিবর্তনে তার ভূমিকা কীর্তনের স্বরূপ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

করতাল কীর্তনের সমবেত চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে। বিশেষ করে নামসংকীর্তনে এর পুনরাবৃত্ত ছন্দ গায়ক ও শ্রোতাকে একই ছন্দের মধ্যে নিয়ে আসে। এখানে সংগীতের পরিবেশক ও গ্রহণকারী—এই দুইয়ের সীমারেখা অনেকটাই অস্পষ্ট। শ্রোতা ধুয়া ধরেন, নাম উচ্চারণ করেন, করতাল বাজান; কখনও নৃত্যেও অংশ নেন। এই অংশগ্রহণের কারণেই কীর্তনের আসরকে প্রচলিত অর্থে শুধু ‘শ্রোতার সামনে গান পরিবেশন’ বলা যায় না। এটি একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

কীর্তনের পরিবেশনশৈলী

কীর্তনের পরিবেশন কাঠামোয় সাধারণত প্রধান কীর্তনীয়া, সহগায়ক বা দোহার এবং শ্রোতৃসমাজ—এই তিন স্তরের সম্পর্ক দেখা যায়। প্রধান কীর্তনীয়া পদ নির্বাচন, সুর, আখর, ভাব এবং পরিবেশনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেন। দোহার মূল পংক্তি বা ধুয়া ধরে রাখেন এবং সমবেত পরিবেশনের ভিত শক্ত করেন। শ্রোতারা নির্দিষ্ট অংশে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এই কাঠামোর ফলে কীর্তন একক শিল্পীর প্রদর্শনী হয়ে ওঠে না। প্রধান গায়ক অবশ্যই মুখ্য, কিন্তু তাঁর গায়কী সম্পূর্ণ হয় দোহার, বাদ্যশিল্পী এবং শ্রোতাদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। কীর্তনের কিছু রূপ বসে পরিবেশিত হয়, আবার নামসংকীর্তনের কিছু ধারায় দাঁড়িয়ে বা চলমান অবস্থায় গান, বাদ্য ও নৃত্য একত্রে চলে। কোথাও পরিবেশনের শুরুতে আচারধর্মী অংশ থাকে, কোথাও গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে মূল কীর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়া হয়।

কীর্তন ও নৃত্য

কীর্তনে নৃত্যের উপস্থিতি তার পারফরম্যান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে এই নৃত্যকে শাস্ত্রীয় নৃত্যের নির্দিষ্ট ব্যাকরণে বিচার করলে তার প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়ে না। কীর্তনের নৃত্য মূলত আবেগের শরীরী প্রকাশ। খোলের ছন্দ, করতালের গতি এবং কণ্ঠের আবেগের সঙ্গে শরীরের আন্দোলন একত্র হয়। হাতের অঙ্গভঙ্গি, পদক্ষেপ, শরীরের দোল এবং ঘূর্ণন—সবই পরিবেশনের ভাবকে দৃশ্যমান করে। যখন গায়ক, বাদ্যশিল্পী এবং শ্রোতা একই সঙ্গে গান ও নৃত্যে অংশ নেন, তখন কীর্তন একটি সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশনে পরিণত হয়।

রস ও ভাব 

কীর্তনের নন্দনতত্ত্ব বুঝতে হলে তার রস-ভাবনার দিকে তাকাতে হয়। বৈষ্ণব কাব্য ও সাধনায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে কেন্দ্র করে যে মাধুর্যভাবের বিকাশ, কীর্তন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগীতায়িত রূপ। তবে কীর্তনের আবেগকে শুধু মধুর রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বিরহ, করুণতা, মান, আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, আত্মসমর্পণ—বিভিন্ন অনুভূতি এর পরিবেশনে জায়গা করে নেয়। পদের একটি শব্দ কখনও পুরো গানের আবেগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কীর্তনীয়া যখন সেই শব্দটিকে দীর্ঘ করেন বা বারবার ফিরিয়ে আনেন, তখন শব্দের আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে একটি অতিরিক্ত আবেগগত অর্থ যুক্ত হয়। এই জায়গাতেই কীর্তনের সাহিত্য ও সংগীত একে অন্যকে সম্পূর্ণ করে।

কীর্তন ও লোকসংগীতের পারস্পরিক সম্পর্ক

বাংলার লোকসংগীতের সঙ্গে কীর্তনের সম্পর্ক একমুখী নয়। লোকজ সুর, আঞ্চলিক ভাষা, ছন্দ ও পরিবেশনরীতি কীর্তনের বিভিন্ন রূপকে প্রভাবিত করেছে; আবার কীর্তনের সুর ও ভাব লোকসংগীতের নানা ধারাতেও প্রবেশ করেছে। পাঁচালি, কবিগান, যাত্রা প্রভৃতি পরিবেশনরীতির সঙ্গে কীর্তনের আদানপ্রদান ছিল। এই সাংস্কৃতিক বিনিময় থেকেই বোঝা যায়, ‘লোক’ এবং ‘উচ্চাঙ্গ’—এই দুই ভাগে বাংলা সংগীতকে ভাগ করা সবসময় সহজ নয়। কীর্তন এই দুই ক্ষেত্রের মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। তার সংগীতে রাগের ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে গ্রামীণ সুর ও সমবেত গানের স্বাভাবিকতা।

ঊনবিংশ শতকে কীর্তন গান

ঊনবিংশ শতকের বাংলা সমাজে নগরায়ণ, মুদ্রণসংস্কৃতি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে কীর্তনের সামাজিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। কবিগান, পাঁচালি, যাত্রা ও অন্যান্য জনপ্রিয় পরিবেশনার সঙ্গে কীর্তনের যোগাযোগ ছিল। কোথাও প্রতিযোগিতা, কোথাও আবার পারস্পরিক গ্রহণ-বর্জনের সম্পর্ক দেখা যায়। একদিকে কীর্তনের কিছু রূপ জনপ্রিয় বিনোদনের পরিসরে অবস্থান করছিল; অন্যদিকে আরেক ধরনের কীর্তনকে ক্রমশ ধর্মীয়, গম্ভীর এবং সাধনামূলক সংগীত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে ‘শুদ্ধ’ বা ‘উচ্চ’ কীর্তনের যে ধারণা তৈরি হয়, তার সামাজিক পটভূমি বুঝতে এই সময়ের পরিবর্তনগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

‘সাধক কীর্তনীয়া’-র ধারণা

বিশ শতকের গোড়ায় কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশে ‘সাধক কীর্তনীয়া’ একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়ে পরিণত হয়। কীর্তনীয়ার ধর্মীয় জীবন, ব্যক্তিগত সাধনা এবং সংগীতদক্ষতা—এই তিনটি বিষয়কে একত্রে দেখা হতে থাকে। ইবেন গ্রেভস-এর গবেষণায় এই সামাজিক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধীর লয়ে বৃহৎ তাল পরিবেশনকারী পুরুষ কীর্তনীয়ার গায়কীকে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। এর বিপরীতে নারী ও পেশাদার শিল্পীদের কীর্তনকে অনেক সময় জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এখানে সংগীতের মূল্যায়ন সামাজিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। কে গান করছেন, তাঁর সামাজিক পরিচয় কী, কোথায় গান করছেন এবং কোন শ্রোতৃসমাজ তাঁর গান গ্রহণ করছে—এসব প্রশ্নও কীর্তনের সাংস্কৃতিক মর্যাদা নির্ধারণ করেছে। সুতরাং কীর্তনের ইতিহাসে ‘শুদ্ধতা’ একটি সংগীততাত্ত্বিক শব্দমাত্র নয়; তার সঙ্গে সামাজিক ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।

নারী কীর্তনশিল্পীর অবস্থান

বাংলা কীর্তনের ইতিহাসে নারীশিল্পীদের অবদান দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। অথচ নারী পরিবেশকের উপস্থিতি কীর্তনের সামাজিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধাপ কীর্তনের সঙ্গে নারী ও পেশাদার পরিবেশকদের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা একদিকে তাঁদের সংগীতচর্চার সুযোগ তৈরি করেছিল, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি বিভাজনও তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা কীর্তন পরিবেশনে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। তাঁদের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক সম্মান এবং ‘সাধক’ ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনও ছিল। এই ইতিহাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সংগীতের নন্দনতত্ত্ব কখনও সম্পূর্ণ সামাজিক নিরপেক্ষ নয়।

 

রবীন্দ্রনাথ ও কীর্তনের প্রভাব

বাংলা আধুনিক গানের বিকাশে কীর্তনের প্রভাব গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীর্তনের ভাব, ভক্তি, প্রেম, পুনরাবৃত্তি এবং আবেগপ্রকাশের নানা দিক থেকে সৃষ্টিশীলভাবে গ্রহণ করেছেন। তবে রবীন্দ্রসংগীতকে কীর্তনের অনুকরণ বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ কীর্তনের সংগীতভাষাকে নিজের কাব্যদর্শন ও সংগীতচেতনার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রূপ দিয়েছেন। কীর্তনের প্রভাব রবীন্দ্রসংগীতের বাইরেও বাংলা আধুনিক গানের বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করেছে। এর ফলে মধ্যযুগীয় ভক্তিগানের আবেগ আধুনিক বাংলা গানের ভাষায় নতুনভাবে প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে।

রেকর্ডিং, রেডিও ও মঞ্চ : আধুনিকতার প্রথম পর্যায়

আধুনিক প্রযুক্তি কীর্তনের সামনে যেমন নতুন সুযোগ এনেছে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতাও তৈরি করেছে। একটি গ্রামীণ কীর্তনের আসর কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে পারে। কিন্তু রেডিওর অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গান শেষ করতে হয়। রেকর্ডের ক্ষেত্রেও সময় সীমিত। ফলে দীর্ঘ আখর, কথকতা বা ধীর লয়ের বিস্তারের জায়গা সংকুচিত হয়। মঞ্চেও একই সমস্যা। অনুষ্ঠানসূচির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কীর্তনকে শেষ করতে হয়। এর ফলে দীর্ঘ কীর্তনের পরিবর্তে নির্বাচিত পদ বা সংক্ষিপ্ত অংশ পরিবেশনের প্রবণতা বাড়ে। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু কীর্তনের প্রচারের মাধ্যম বদলায়নি; তার সংগীতগত সময়কেও বদলে দিয়েছে।

বর্তমানে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল রেকর্ডিং কীর্তনের বিস্তারের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্পীও বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজে পৌঁছতে পারেন। পুরনো শিল্পীদের রেকর্ড সংরক্ষণ করা সম্ভব। হারিয়ে যেতে বসা পদ ও সুরও নতুন করে পরিচিত হতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমের নিজস্ব সময়বোধ রয়েছে। অল্প সময়ে দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করা, জনপ্রিয় অংশকে সামনে আনা এবং দ্রুত পরিবেশন—এসবের চাপ দীর্ঘ কীর্তনের স্বাভাবিক গতি ও বিস্তারের সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কয়েক মিনিটের একটি ভিডিওতে কীর্তনের কয়েক ঘণ্টার সংগীত-অভিজ্ঞতাকে ধরা সম্ভব নয়। ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে কীর্তন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সংক্ষিপ্ত করা কতটা প্রয়োজন এবং কোথায় সংক্ষেপণ করলে সংগীতটির মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ থাকে?

আধুনিক মঞ্চে মাইক্রোফোনের ব্যবহার কীর্তনের শ্রাব্য পরিসর অনেক বাড়িয়েছে। পাশাপাশি হারমোনিয়াম, তানপুরা, বেহালা, এসরাজ প্রভৃতি সহযোগী যন্ত্রও বিভিন্ন আধুনিক পরিবেশনে যুক্ত হয়েছে। তবে এদের ব্যবহার শিল্পী ও পরম্পরাভেদে পরিবর্তিত হয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন আধুনিক মঞ্চের বাহ্যিক উপকরণ কীর্তনের নিজস্ব সংগীত-ব্যাকরণকে ঢেকে দেয়। অতিরিক্ত শব্দবর্ধন, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রের ব্যবহার অথবা দ্রুত লয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কীর্তনের সূক্ষ্ম কণ্ঠপ্রকাশ ও খোলের বাদনের বৈশিষ্ট্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মঞ্চের সুবিধা অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত; কিন্তু মঞ্চের প্রয়োজনের জন্য কীর্তনের নিজস্ব ভাষা বদলে ফেলা উচিত নয়।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সম্পর্ক

ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তি হিসেবে দেখলে বাংলা কীর্তনের ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিকে বোঝা যায় না। কীর্তনের ভিতরেই পরিবর্তনের প্রবণতা সবসময় কাজ করেছে। একটি অঞ্চলের সুর অন্য অঞ্চলে গিয়েছে। একটি রীতি অন্য রীতির উপাদান গ্রহণ করেছে। নতুন শ্রোতৃসমাজ কীর্তনকে নতুনভাবে গ্রহণ করেছে। মুদ্রণ ও রেকর্ডিং তার প্রচারের পদ্ধতি বদলেছে। রেডিও ও মঞ্চ সময়ের ধারণা পরিবর্তন করেছে। এখন ডিজিটাল মাধ্যম নতুন পরিবর্তন আনছে। অতএব ঐতিহ্য মানে স্থিরতা নয়। ঐতিহ্য একটি চলমান প্রক্রিয়া।

কিন্তু পরিবর্তনের অর্থও সবকিছু বাদ দেওয়া নয়। পদ, গায়কী, আখর, তাল-লয় এবং খোলের নিজস্ব ভাষা—এই উপাদানগুলিই কীর্তনের সংগীতপরিচয়ের ভিত্তি। আধুনিকতার সঙ্গে সংলাপ করতে গিয়ে যদি এগুলি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়, তবে নতুন রূপটি হয়তো জনপ্রিয় গান হয়ে উঠবে, কিন্তু তার কীর্তন-পরিচয় দুর্বল হবে।

কীর্তনের শিক্ষায় গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। কারণ কীর্তনের বহু সূক্ষ্ম দিক লিখিত স্বরলিপিতে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। একজন শিক্ষার্থী শুধু পদ মুখস্থ করলেই কীর্তনীয়া হয়ে ওঠেন না। তাঁকে জানতে হয় কোথায় স্বর টানতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোন শব্দে আবেগের জোর দিতে হবে, কীভাবে আখর দিতে হবে, কখন লয় পরিবর্তন করতে হবে এবং খোলের সঙ্গে কণ্ঠের সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখতে হবে। এই জ্ঞান মূলত শ্রবণ, অনুকরণ এবং দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। তবে মৌখিক পরম্পরার পাশাপাশি আধুনিক নথিকরণও প্রয়োজন। অডিও-ভিডিও রেকর্ড, স্বরলিপি, সাক্ষাৎকার এবং ক্ষেত্রসমীক্ষা—সবকিছুকে একত্র করে কাজ করলে কীর্তনের পরিবর্তনশীল রূপকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলা কীর্তনের বহু আঞ্চলিক রূপ এখনও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ হয়নি। প্রবীণ কীর্তনীয়াদের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া জরুরি। তাঁদের শেখার পদ্ধতি, গুরুশ্রেণি, পদভাণ্ডার, রাগব্যবহার, তাল, আখর এবং পরিবেশনপদ্ধতি নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। একই পদ বিভিন্ন অঞ্চলের কীর্তনীয়ারা কীভাবে গাইছেন—এই তুলনামূলক গবেষণাও অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে।

একটি পদের—

  • বাণী,
  • সুর,
  • রাগ,
  • তাল,
  • লয়,
  • আখর,
  • খোলবাদন,
  • পরিবেশনকাল

একসঙ্গে নথিবদ্ধ করা গেলে কীর্তনের সংগীততত্ত্ব নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য কাজ সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

কীর্তন গবেষণায় আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি

কীর্তনের গবেষণা শুধু সংগীততত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক অনালোচিত থেকে যায়। কীর্তনের সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি, লিঙ্গ-অধ্যয়ন এবং পারফরম্যান্স স্টাডিজের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি পদ কেন একটি বিশেষ অঞ্চলে জনপ্রিয় হল? একটি নির্দিষ্ট গায়কী কীভাবে ‘উচ্চ’ বলে স্বীকৃতি পেল? নারীশিল্পীদের অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হল? মুদ্রণ ও রেকর্ডিং কীর্তনের পদভাণ্ডারে কী প্রভাব ফেলল? বাজারের চাহিদা কীর্তনের সময়কে কীভাবে সংকুচিত করল?—এই প্রশ্নগুলির উত্তর সংগীতের বাইরে গিয়ে খুঁজতে হবে। এই আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিই কীর্তনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণে সহায়ক হতে পারে।

বর্তমান কীর্তনচর্চার সামনে কয়েকটি সমস্যা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

প্রথমত, দীর্ঘ পরিবেশনের সময় ক্রমশ কমছে। আধুনিক অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দীর্ঘ কীর্তন উপস্থাপন করা কঠিন।

দ্বিতীয়ত, তরুণ শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই পদ মুখস্থ করলেও ঐতিহ্যগত আখর, তাল ও গায়কীর গভীর প্রশিক্ষণ পান না।

তৃতীয়ত, মাইক্রোফোন ও ইলেকট্রনিক শব্দব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যবহার কখনও কণ্ঠ ও খোলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

চতুর্থত, জনপ্রিয় পংক্তি বা সুরের পুনরাবৃত্তির ফলে সম্পূর্ণ পদের পরিবর্তে খণ্ডিত পরিবেশনের প্রবণতা বাড়ছে।

পঞ্চমত, বাজারের চাহিদা অনেক সময় সংগীতের অন্তর্গত শৃঙ্খলার চেয়ে বাহ্যিক আকর্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

ষষ্ঠত, অনেক আঞ্চলিক রীতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলির যথাযথ নথিও নেই।

 

ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনা

সমস্যার মধ্যেও কীর্তন গবেষণার সম্ভাবনা যথেষ্ট বিস্তৃত।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কীর্তনকে কেন্দ্র করে গবেষণার কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন—কীর্তনের তালতত্ত্ব, খোলবাদন, পদাবলী কীর্তনের রাগপ্রয়োগ, আঞ্চলিক গায়কীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ, কীর্তন ও লোকসংগীতের সম্পর্ক, কীর্তন ও রবীন্দ্রসংগীতের পারস্পরিক প্রভাব, নারী কীর্তনশিল্পীর ইতিহাস এবং ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে কীর্তনের পরিবর্তন। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সুবিন্যস্ত কীর্তন-আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে শুধু গান নয়, শিল্পীর পরিচয়, অঞ্চল, গুরুশ্রেণি, পদ, রাগ, তাল, বাদ্যযন্ত্র এবং পরিবেশনের পূর্ণ অডিও-ভিডিও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বাংলা কীর্তনকে কেবল ধর্মীয় গান বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এটি বাংলা সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল। এর ভিতরে বৈষ্ণব পদাবলীর কাব্য, চৈতন্যীয় ভক্তি, রাধাকৃষ্ণের প্রেমভাবনা, লোকায়ত সংগীত, রাগের ব্যবহার, তাল-লয়ের নিজস্বতা, খোল-করতালের ছন্দ এবং সমবেত পরিবেশনের ঐতিহ্য একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কীর্তনের ইতিহাসে পরিবর্তন কোনো বিচ্যুতি নয়। বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই এই সংগীতধারা টিকে আছে। গড়ানহাটি, মনোহরশাহী, রেনেটি কিংবা মন্দারিণীর মতো আঞ্চলিক রীতির বিকাশ থেকে শুরু করে নগর মঞ্চ, রেডিও, রেকর্ডিং এবং বর্তমান ডিজিটাল মাধ্যম—প্রতিটি পর্যায়ে কীর্তন নতুন পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে।

তবে পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করা জরুরি। পদের সঙ্গে সুরের সম্পর্ক, আখরের সৃষ্টিশীলতা, তাল ও লয়ের গভীরতা, খোলের ছন্দভাষা, কণ্ঠের ভাবপ্রকাশ এবং সমবেত অংশগ্রহণ—এসব কীর্তনের অন্তর্গত পরিচয়ের অংশ। এগুলি হারিয়ে গেলে কীর্তনের বাহ্যিক কাঠামো হয়তো থাকবে, কিন্তু তার ঐতিহ্যগত সংগীত-চরিত্র অনেকটাই বদলে যাবে। অতএব আধুনিকতার প্রশ্নে কীর্তনের সামনে পথ একটিই—না অন্ধ অনুকরণ, না অন্ধ সংরক্ষণ। প্রয়োজন ঐতিহ্যের ভিতরকার সংগীতবোধকে বুঝে তার সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ ঘটানো। ঐতিহ্যকে কাচের বাক্সে তুলে রাখলে তা বাঁচে না। আবার বাজারের চাপে তার সমস্ত স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিলেও তাকে রক্ষা করা যায় না। কীর্তনের জীবনশক্তি তার পরিবর্তনক্ষমতার মধ্যে, কিন্তু সেই পরিবর্তন তখনই সার্থক, যখন তার মূল সংগীতসত্তা সম্পর্কে শিল্পী ও সমাজ সচেতন থাকে। এই অর্থে বাংলা কীর্তন অতীতের একটি স্মারক নয়। এটি এমন এক চলমান সংগীত-পরম্পরা, যার মধ্যে বাংলার ভক্তি, প্রেম, লোকজ জীবন, কাব্যচেতনা এবং পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার দীর্ঘ ইতিহাস আজও শ্রুতিমান।

 

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

  1. চট্টোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গীয় ভাষা ও সাহিত্য। কলকাতা।
  2. কবিরাজ, কৃষ্ণদাস। চৈতন্যচরিতামৃত
  3. ঠাকুর, বৃন্দাবন দাস। চৈতন্যভাগবত
  4. বিদ্যাপতি। পদাবলী
  5. চণ্ডীদাস। পদাবলী
  6. জ্ঞানদাস। পদাবলী
  7. গোবিন্দদাস। পদাবলী
  8. নরোত্তম দাস ঠাকুর। পদাবলী
  9. মুখোপাধ্যায়, হরেকৃষ্ণ। বাংলার কীর্তন ও কীর্তনীয়া। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
  10. Graves, Eben. “‘Kīrtan’s Downfall’: The Sādhaka Kīrtanīyā, Cultural Nationalism and Gender in Early Twentieth-Century Bengal.” The Journal of Hindu Studies 10, no. 3 (2017): 328–357.
  11. Graves, Eben. The Politics of Musical Time: Expanding Songs and Shrinking Markets in Bengali Devotional Performance. Bloomington: Indiana University Press, 2022.
  12. Banglapedia. “Music.” National Encyclopaedia of Bangladesh.
  13. History of Bengali Language and Literature. বাংলা কীর্তনের বিভিন্ন আঞ্চলিক রীতি ও মনোহরশাহী, গড়ানহাটি, রেনেটি প্রভৃতি ধারার ঐতিহাসিক আলোচনার সূত্র।