January 1, 2025

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীত: মার্গ, দেশী ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ধারার বিবর্তন

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

দেবাশিস মণ্ডল

সারসংক্ষেপ

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসকে যদি কেবল আধুনিক হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পূর্বপর্ব হিসেবে দেখা হয়, তবে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক চরিত্রটি ধরা পড়ে না। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় সঙ্গীত ছিল বহুমাত্রিক। বৈদিক সামগান, গান্ধর্ব সঙ্গীত, নাট্যসংগীত, মার্গ ও দেশী সঙ্গীত, গ্রাম, মূর্চ্ছনা ও জাতির নানা বিন্যাস, রাগের ক্রমবিকাশ, গীত ও প্রবন্ধ এবং জটিল তাল-লয়ব্যবস্থা—সব মিলিয়েই এই দীর্ঘ সংগীত-পরম্পরা গড়ে উঠেছিল। এই ইতিহাসের প্রধান সাক্ষ্য পাওয়া যায় নাট্যশাস্ত্র, দত্তিলম্, বৃহদ্দেশী এবং পরবর্তীকালে শার্ঙ্গদেবের সঙ্গীতরত্নাকর-এর মতো গ্রন্থে। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্রের আলোচনায় দত্তিলম্-কে প্রাচীন সংগীততাত্ত্বিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র গ্রন্থ এবং বৃহদ্দেশী-কে নাট্যশাস্ত্রসঙ্গীতরত্নাকর-এর মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃহদ্দেশী-র বিশেষ গুরুত্ব এই কারণে যে সেখানে রাগের সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক আলোচনা, দেশী ও মার্গের পার্থক্য এবং প্রবন্ধের মতো নাট্যনিরপেক্ষ গীতরূপের বিকাশের পরিচয় পাওয়া যায়।

আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সঙ্গে প্রাচীন সঙ্গীতের সম্পর্ক তাই মূলত ধারণাগত ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার; সর্বাংশে রূপগত অভিন্নতার নয়। শ্রুতি, স্বর, লয়, তাল, অলংকার, সঙ্গীতসাধনা, রাগাত্মক সংগঠন এবং গুরু-শিষ্যভিত্তিক শিক্ষার কিছু মৌল নীতি দীর্ঘকাল টিকে থাকলেও তাদের ব্যবহার, পরিভাষা, সংগীতরূপ এবং পরিবেশন-পদ্ধতিতে সময়ের সঙ্গে যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে। এই প্রবন্ধে সেই ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনকে পাশাপাশি রেখে প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের একটি সামগ্রিক চিত্র বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

মূলশব্দ: প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীত, সামগান, গান্ধর্ব, মার্গ, দেশী, জাতি, গ্রাম, মূর্চ্ছনা, রাগ, গীত, প্রবন্ধ, তাল, লয়, নাট্যশাস্ত্র, বৃহদ্দেশী, সঙ্গীতরত্নাকর, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত।

 

ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আধুনিক অর্থে ‘সঙ্গীত’ বলতে আমরা সাধারণত কণ্ঠসংগীত, বাদ্যসংগীত এবং কখনও নৃত্যকে পৃথক শিল্পরূপ হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় সঙ্গীতের পরিসর ছিল অনেক বিস্তৃত। বিশেষত পরবর্তী শাস্ত্রীয় পরম্পরায় গীত, বাদ্য ও নৃত্ত—এই তিনের পারস্পরিক সম্পর্ককে সঙ্গীতের বৃহত্তর পরিসরের মধ্যেই দেখা হয়েছে। সঙ্গীতরত্নাকর-এর সাতটি অধ্যায়ে স্বর, রাগ, প্রাকীর্ণক বিষয়, প্রবন্ধ, তাল, বাদ্য এবং নৃত্যের পৃথক আলোচনা তারই প্রমাণ।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের আর-একটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি কোনো একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন সংগীতরীতির ইতিহাস নয়। বৈদিক ধর্মীয় পরিবেশে সামগান যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি গান্ধর্ব সঙ্গীত, নাট্যসংগীত, আঞ্চলিক এবং লোকায়ত সংগীতরীতিও ভারতীয় সংগীতচর্চাকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করেছে। তাই ‘প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীত’ বলতে একটি একক, অপরিবর্তনীয় সংগীতব্যবস্থা বোঝা ঐতিহাসিকভাবে সঙ্গত নয়।

বরং এর ইতিহাসকে পরিবর্তনশীল সংগীত-সংস্কৃতির ইতিহাস হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। একদিকে শাস্ত্র সংগীতের নিয়ম, ধারণা ও পরিভাষাকে সংরক্ষণ করেছে; অন্যদিকে জীবন্ত সংগীতচর্চা সেই নিয়মকে বদলেছে, প্রসারিত করেছে, কখনও বা তার সীমাও অতিক্রম করেছে। ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের স্বাভাবিক গতি বুঝতে গেলে এই দুই প্রবণতাকেই পাশাপাশি দেখতে হয়।

ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম সুসংহত নিদর্শনগুলির মধ্যে বৈদিক সামগানের স্থান বিশেষ। সামবেদ-এর মন্ত্রগুলি মূলত যজ্ঞীয় পরিবেশে সুরারোপিত হয়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গাওয়া হত। এই সংগীতকে আধুনিক রাগসংগীতের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। সামগানের উদ্দেশ্য, পরিবেশনা, সুরবিন্যাস এবং ধর্মীয় কার্যকারিতা—সবই আধুনিক কনসার্টভিত্তিক সংগীত থেকে আলাদা ছিল।

পরবর্তী পর্যায়ে ‘গান্ধর্ব’ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্র দত্তিলম্-কে গান্ধর্ব সঙ্গীতের একটি প্রাচীন ও স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক সংকলন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেখানে গান্ধর্বকে বৈদিক সামগানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সংগীতচিন্তার একটি পৃথক ধারারূপে দেখা হয়েছে। এখানেই ভারতীয় সঙ্গীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ধর্মীয় সংগীত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না হয়েও সংগীত ধীরে ধীরে নিজের নান্দনিক ও তাত্ত্বিক পরিসর তৈরি করতে থাকে।

ভারতীয় সংগীততত্ত্বের ইতিহাসে নাট্যশাস্ত্র একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ। এর সংগীত-সংক্রান্ত অধ্যায়গুলিতে শ্রুতি, স্বর, গ্রাম, মূর্চ্ছনা, জাতি, লয় ও তাল প্রভৃতি ধারণার সুসংহত আলোচনা পাওয়া যায়। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। নাট্যশাস্ত্র-এ আধুনিক অর্থে ‘রাগ’কে আজকের রাগব্যবস্থার মতো কেন্দ্রীয় সংগঠনরীতি হিসেবে পাওয়া যায় না। বরং জাতি ছিল তৎকালীন সুরসংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে জাতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রাগধারণার বিকাশের দিকে নিয়ে যায়। বৃহদ্দেশী সম্পর্কিত ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্রের আলোচনাতেও এই পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই নাট্যশাস্ত্র থেকে আধুনিক রাগসংগীতের দিকে সরাসরি একটি সরল রেখা টানা ঠিক নয়। বরং বলা যায়—

গ্রাম মূর্চ্ছনা জাতি রাগ

এই ধারাটি ভারতীয় সুরচিন্তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের স্বরব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে গ্রাম ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ষড়্জগ্রাম ও মধ্যমগ্রাম ছিল সেই সময়কার তাত্ত্বিক সংগীতব্যবস্থার দুটি প্রধান ভিত্তি। প্রাচীন তত্ত্বে স্বরগুলির মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ধারণে শ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

আধুনিক সঙ্গীতে আমরা সাধারণত ‘সা রে গা মা পা ধা নি’-কে একটি পরিচিত স্বরক্রম হিসেবে গ্রহণ করি। কিন্তু প্রাচীন সংগীততত্ত্বে এই স্বরগুলির সম্পর্ক কেবল একটি সরল স্বরক্রম হিসেবে বিবেচিত হত না। স্বরগুলির পারস্পরিক শ্রুতিবিন্যাস, গ্রামে তাদের অবস্থান এবং মূর্চ্ছনার মাধ্যমে স্বরসমষ্টির বিন্যাস নিয়ে তৎকালীন তত্ত্বে সূক্ষ্ম আলোচনা ছিল। প্রাচীন গ্রামব্যবস্থাকে তাই আধুনিক ঠাট বা মেলকার্তার সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

একটি গ্রাম থেকে বিভিন্ন স্বরকে প্রারম্ভিক স্বর হিসেবে গ্রহণ করে যে নতুন স্বরবিন্যাস তৈরি হত, তাকে মূর্চ্ছনা বলা হত। আধুনিক ‘স্কেল’ বা ‘মোড’-এর সঙ্গে এর কিছু তুলনামূলক সাদৃশ্য থাকলেও মূর্চ্ছনাকে পাশ্চাত্য স্কেলের সম্পূর্ণ সমার্থক বলা ঠিক হবে না। এর নিজস্ব তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ছিল।

জাতি ছিল প্রাচীন সুরসংগঠনের আরও উন্নত পর্যায়। জাতির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে স্বরের ব্যবহার, আরোহ-অবরোহের প্রকৃতি, প্রধান ও গৌণ স্বর, স্থায়ী স্বর, ন্যাস ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করা হত। এই কারণে জাতিকে আধুনিক রাগের সরাসরি সমার্থক না বলেও রাগধারণার একটি ঐতিহাসিক পূর্বসূরি বলা যায়।

পরবর্তী সংগীততত্ত্বে রাগ যে স্বতন্ত্র নান্দনিক ও সুরাত্মক সত্তায় পরিণত হয়, তার পেছনে জাতির সংগঠনরীতির একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।

মাতঙ্গ মুনির বৃহদ্দেশী ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রন্থটির কালনির্ধারণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও সাধারণত এটিকে ষষ্ঠ শতকের আশেপাশে স্থাপন করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্রও একে সম্ভবত ষষ্ঠ শতকের গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এই গ্রন্থের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বৃহদ্দেশী-তে রাগের একটি সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক ধারণা পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, সা-রি-গা-মা ধরনের স্বরনাম ব্যবহারের ইতিহাসে গ্রন্থটির গুরুত্ব রয়েছে। তৃতীয়ত, মার্গ ও দেশী—এই দুই সংগীতধারার পার্থক্য এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চতুর্থত, প্রবন্ধকে নাট্যনির্ভরতার বাইরে একটি স্বতন্ত্র গীতরূপ হিসেবে বিবেচনা করার পথও এখানে দেখা যায়।

এখানে ‘দেশী’ শব্দটির অর্থ কেবল ‘লোকসংগীত’ নয়। দেশী বলতে বিভিন্ন অঞ্চল, জনগোষ্ঠী এবং জীবন্ত সংগীতচর্চা থেকে উদ্ভূত বা প্রচলিত সংগীতরীতির একটি বৃহত্তর পরিসর বোঝানো হত। অতএব— এই সমীকরণ ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ নয়।

মার্গ সঙ্গীত কী?

‘মার্গ’ শব্দের অর্থ পথ বা নির্দিষ্ট পথনির্দেশ। সংগীতের ক্ষেত্রে মার্গ বলতে এমন একটি শাস্ত্রনির্ভর সংগীতধারাকে বোঝানো হয়েছে, যার ভিত্তি ছিল প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধান এবং নির্দিষ্ট নান্দনিক আদর্শ। মার্গ সংগীতের সঙ্গে নাট্য, ধর্মীয়-অনুষ্ঠানিক পরিবেশ এবং শাস্ত্রনির্দিষ্ট পরিবেশনার সম্পর্ক ছিল। এর উদ্দেশ্য কেবল শ্রোতাকে আনন্দ দেওয়া নয়; সংগীতের একটি বিধিবদ্ধ নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকারিতাও ছিল। কিন্তু ‘মার্গ’-কে আধুনিক ‘উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত’-এর সম্পূর্ণ সমার্থক বলা যাবে না। আধুনিক হিন্দুস্তানি বা কর্ণাটক সঙ্গীতের যে পরিবেশনরীতি আমরা আজ দেখি, তা বহু শতাব্দীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

অর্থাৎ— প্রাচীন মার্গ আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। তবে আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কিছু মৌলিক সংগীততাত্ত্বিক ধারণার ঐতিহাসিক উৎস মার্গ ও গান্ধর্ব পরম্পরায় অনুসন্ধান করা যায়।

দেশী সঙ্গীত: শাস্ত্রের বাইরে নয়

দেশী সঙ্গীতকে দীর্ঘদিন ধরে অনেক সময় ‘লোকসংগীত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা গেছে। কিন্তু প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংগীততত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আসলে আরও জটিল। দেশী ছিল জীবন্ত সংগীতচর্চার একটি বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। বিভিন্ন অঞ্চল, ভাষা, জাতিগোষ্ঠী, সামাজিক পরিবেশ এবং নৃত্যসংস্কৃতির প্রভাবে নতুন নতুন সুর, গীতরীতি, তাল ও পরিবেশন-পদ্ধতির সৃষ্টি হত। পরবর্তী সময়ে এই দেশী উপাদানগুলির অনেক কিছুই শাস্ত্রীয় সংগীতের ভেতরে প্রবেশ করেছে। তাই ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসকে কেবল ‘শাস্ত্র → শিল্পী’—এই একমুখী পথে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং— শাস্ত্র শিল্পী সমাজ অঞ্চল এই পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সংগীতের পরিবর্তন ঘটেছে। সঙ্গীতরত্নাকর এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ত্রয়োদশ শতকের এই গ্রন্থে প্রাচীন শাস্ত্রীয় তত্ত্ব এবং মধ্যযুগীয় দেশী সংগীতচর্চা—উভয়েরই বিস্তৃত সমন্বয় দেখা যায়।

৮. ‘গান’ বা গীত: প্রাচীন সংগীতের মৌল উপাদান

প্রাচীন সংগীততত্ত্বে ‘গীত’ বা ‘গান’ বলতে কেবল আজকের অর্থে একটি গান বোঝানো হত না। এটি ছিল স্বর, শব্দ, ছন্দ, অলংকার এবং সংগীতরীতির একটি সংগঠিত রূপ। সঙ্গীতরত্নাকর-এর আলোচনায় গীতকে সঙ্গীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে এবং গীত, বাদ্য ও নৃত্যের পারস্পরিক সম্পর্কও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এখানে ‘গান’ এবং ‘গীত’-এর মধ্যে একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার। আধুনিক বাংলা ভাষায় ‘গান’ শব্দটির পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। লোকগান, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান, কীর্তন, শাস্ত্রীয় খেয়াল—সবকিছুকেই গান বলা যায়। কিন্তু প্রাচীন শাস্ত্রে ‘গীত’ একটি নির্দিষ্ট সংগীততাত্ত্বিক পরিসরের শব্দ।

প্রবন্ধ গান: আধুনিক গানের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক ধারণা

‘প্রবন্ধ’ শব্দটি আধুনিক বাংলা ভাষায় সাধারণত রচনা বা নিবন্ধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতে প্রবন্ধ ছিল একটি সুসংগঠিত গীতরূপ। এতে সুর, পাঠ, ধ্রুব অংশ, বিভিন্ন অঙ্গ এবং ছন্দোবদ্ধ সংগঠন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হত।

প্রবন্ধকে আধুনিক খেয়াল, ধ্রুপদ বা কীর্তনের সরাসরি পূর্বসূরি বলা যায় না। তবে পরবর্তী গীতরীতির বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। বৃহদ্দেশী প্রবন্ধকে নাট্যনির্ভর গীতরূপের বাইরে একটি স্বতন্ত্র সংগীতরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে সঙ্গীতরত্নাকর-এ প্রবন্ধের বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়। শার্ঙ্গদেব গীত ও প্রবন্ধের সংগঠন, গঠনগত অঙ্গ এবং দেশী সংগীতের বিভিন্ন রূপ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।

এই প্রবন্ধ-পরম্পরার দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধ্রুপদসহ পরবর্তী ভারতীয় গীতরূপগুলির গঠন বোঝার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি হয়। তবে কোনো আধুনিক গীতরূপকে সরাসরি প্রাচীন প্রবন্ধের ‘অপরিবর্তিত উত্তরাধিকার’ বলা উচিত নয়।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতে তাল

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে তাল ধারণাটি অত্যন্ত প্রাচীন। তবে প্রাচীন তালব্যবস্থাকে আধুনিক ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল, রূপক বা আদি তালের সঙ্গে সরাসরি অভিন্ন ভাবা ঠিক হবে না। প্রাচীন তালতত্ত্বে মাত্রা, কাল, লয়, ক্রিয়া, অঙ্গ, জাতি ইত্যাদি বিভিন্ন ধারণার সমন্বয়ে ছন্দের কাঠামো নির্মিত হত। নাট্যশাস্ত্র, দত্তিলম্ এবং সঙ্গীতরত্নাকর—এই গ্রন্থগুলিতে প্রাচীন ভারতীয় তাল ও ছন্দচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য পাওয়া যায়। আধুনিক তালব্যবস্থার সঙ্গে প্রাচীন ব্যবস্থার যথেষ্ট পার্থক্য ছিল বলে সংগীত-ইতিহাসবিদ D. R. Widdess-এর গবেষণাতেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর আলোচনায় বিশেষভাবে দেখানো হয়েছে যে প্রাক-মুসলিম যুগের তালব্যবস্থা আধুনিক উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় তালব্যবস্থা থেকে অনেক দিক দিয়ে পৃথক। অতএব আধুনিক তালের সঙ্গে প্রাচীন তালের সম্পর্ককে এভাবে বলা যায়—ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে, কিন্তু রূপগত অভিন্নতা নেই।

মাত্রা, লয় ও তাল: ভারতীয় ছন্দচিন্তার বৈশিষ্ট্য

ভারতীয় সংগীতে মাত্রা হল সময়ের একটি মৌল একক। কিন্তু তাকে কেবল পশ্চিমা সংগীতের ‘বিট’-এর সমার্থক ভাবলে বিষয়টি সরলীকৃত হয়ে যায়। লয় নির্দেশ করে গতির প্রকৃতি; আর তাল হল নির্দিষ্ট সময়-চক্রের সংগঠন। ফলে তাল কেবল সংখ্যার সমষ্টি নয়; পুনরাবৃত্ত সময়-চক্রের একটি সংগীতময় বিন্যাস।

এই কারণে ভারতীয় সংগীতে তালের সঙ্গে ‘চক্র’ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ত্রিতালে ১৬ মাত্রা থাকলেও তার পরিচয় কেবল ‘১৬’ সংখ্যায় শেষ হয় না। সম, খালি, বিভাগ, ঠেকা এবং তার ওপর সংগীতের স্থাপত্য—সব মিলিয়েই ত্রিতাল একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত-চক্র হয়ে ওঠে। প্রাচীন তত্ত্বে অবশ্য আধুনিক ‘ঠেকা’-কেন্দ্রিক তালচর্চা ছিল না। সেই সময়ের তালচিন্তা অধিকতর ছন্দতাত্ত্বিক ও ক্রিয়াভিত্তিক ছিল। প্রাচীন ও আধুনিক ব্যবস্থার পার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই।

তাল ও লয়ের ঐতিহাসিক পরিবর্তন

ভারতীয় তালব্যবস্থা কখনও স্থির ছিল না। সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন তাল, গীতরূপ, নৃত্যরীতি এবং বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে; তার সঙ্গে তাল-সংগঠনও পরিবর্তিত হয়েছে। মধ্যযুগে দেশী তালগুলির বিকাশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গীতরত্নাকর এই পরিবর্তনশীল সংগীতজগতের একটি বিশাল দলিল। এর তাল-অধ্যায়ে তালতত্ত্বের বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক সঙ্গীত নিজেদের স্বতন্ত্র তালব্যবস্থা গড়ে তোলে। হিন্দুস্তানি সংগীতে ঠেকা ও বোল-ভিত্তিক তালপরিচয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ; কর্ণাটক সংগীতে তালাঙ্গ, জাতি, গতি প্রভৃতির মাধ্যমে তালচিন্তা ভিন্ন কাঠামো লাভ করেছে। সুতরাং প্রাচীন তালতত্ত্বকে আধুনিক তালব্যবস্থার একটি ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত রূপ’ হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে ভুল হবে।

প্রাচীন স্বরচিন্তা ও আধুনিক স্বরব্যবস্থা

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীততত্ত্বে শ্রুতি একটি মৌল ধারণা। স্বরের সূক্ষ্ম বিভাজন, স্বরগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং স্বরের নান্দনিক ব্যবহার নিয়ে প্রাচীন আচার্যরা গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। কিন্তু এখানেও একটি সতর্কতা জরুরি। প্রাচীন শ্রুতিকে আধুনিক সমসুর ব্যবস্থার ‘মাইক্রোটোন’ হিসেবে সরাসরি অনুবাদ করা সমস্যাজনক। প্রাচীন শ্রুতির ধারণা ছিল একটি সংগীততাত্ত্বিক ও নান্দনিক ধারণা, যার সঙ্গে সুরের বাস্তব ধ্বনিগত ব্যবহারের সম্পর্ক ছিল জটিল। আজকের হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক সঙ্গীতেও সূক্ষ্ম স্বরপ্রয়োগ, অন্দোলন, গমক, মীড় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেগুলিকে প্রাচীন ২২ শ্রুতির একটি সরল পুনরাবৃত্তি বলে মনে করা উচিত নয়।

রাগ: প্রাচীন থেকে আধুনিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু

আধুনিক ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্রে রয়েছে রাগ। কিন্তু ‘রাগ’ ধারণাটি নাট্যশাস্ত্র-এর সময় থেকেই আজকের অর্থে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত ছিল—এ কথা বলা যায় না। বৃহদ্দেশী এই ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্রের আলোচনায় বৃহদ্দেশী-কে প্রথম প্রাপ্ত গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে রাগকে সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং জাতি, মূর্চ্ছনা ও রাগের পার্থক্যও আলোচিত হয়েছে। রাগের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের গুরুত্বও ধীরে ধীরে ‘স্বরসমষ্টি’ থেকে ‘স্বরের ব্যক্তিত্ব’-এর দিকে অগ্রসর হয়। অর্থাৎ কোন কোন স্বর ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়; আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—

  • কোন স্বরকে কীভাবে নেওয়া হচ্ছে;
  • কোন স্বর কোথায় ন্যাস পাচ্ছে;
  • কোন স্বর প্রধান;
  • কী ধরনের অলংকার ব্যবহৃত হচ্ছে;
  • কোন সুরবাক্য রাগটিকে চিনিয়ে দিচ্ছে।

এসবই ধীরে ধীরে রাগের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। এখানেই আধুনিক রাগসংগীতের সঙ্গে প্রাচীন সুরচিন্তার গভীর সম্পর্কটি ধরা পড়ে।

সঙ্গীতরত্নাকর: প্রাচীন ও মধ্যযুগের সেতু

শার্ঙ্গদেবের সঙ্গীতরত্নাকর ত্রয়োদশ শতকের একটি বিশাল সংগীততাত্ত্বিক গ্রন্থ। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই কারণে যে, এটি একদিকে প্রাচীন শাস্ত্রীয় ধারণাগুলিকে সংরক্ষণ করেছে, অন্যদিকে মধ্যযুগীয় সংগীতচর্চার বহু নতুন উপাদানকেও তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে স্থান দিয়েছে। গ্রন্থটির সাতটি অধ্যায়ে স্বর, রাগ, প্রাকীর্ণক বিষয়, প্রবন্ধ, তাল, বাদ্য এবং নৃত্যের আলোচনা রয়েছে। এই কারণে সঙ্গীতরত্নাকর-কে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি সেতুগ্রন্থ বলা যায়। এখানে একদিকে নাট্যশাস্ত্র-এর প্রাচীন উত্তরাধিকার, অন্যদিকে দেশী সংগীতের বিকাশ, রাগের পরিণতি, প্রবন্ধের বিস্তার এবং তালতত্ত্বের সম্প্রসারণ—সবকিছুর মিলন ঘটেছে। পরবর্তী কালে উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতে সংগীতের পৃথক ঐতিহাসিক পথ গড়ে উঠলেও সঙ্গীতরত্নাকর উভয় পরম্পরার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

প্রাচীন সঙ্গীত ও আধুনিক হিন্দুস্তানি সঙ্গীত

আধুনিক হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের রাগ, তাল, আলাপ, তান, বন্দিশ, ঘরানা ইত্যাদি কাঠামো প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাদের বর্তমান রূপ দীর্ঘ মধ্যযুগীয় ও আধুনিক বিকাশের ফল। বিশেষত মুসলিম রাজদরবার, সুফি সাংস্কৃতিক পরিবেশ, আঞ্চলিক রাজসভা, মন্দির, আখড়া, গায়ক-বাদক সম্প্রদায় এবং পরবর্তীকালের রেকর্ডিং ও গণমাধ্যম—সব মিলিয়ে উত্তর ভারতীয় সংগীতের বর্তমান রূপ গড়ে উঠেছে। তাই ‘হিন্দুস্তানি সঙ্গীত প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের অবিকৃত রূপ’—এই বক্তব্য যেমন যথার্থ নয়, তেমনি ‘আধুনিক হিন্দুস্তানি সঙ্গীত প্রাচীন পরম্পরা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন’—এটিও সঠিক নয়। বরং এর মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকতা ও রূপান্তর

প্রাচীন সঙ্গীত ও কর্ণাটক সঙ্গীত

কর্ণাটক সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আজকের মেলকার্তা, জনক-জন্য রাগ, কৃতি, বর্ণম, তিল্লানা, পল্লবি এবং তালব্যবস্থা আধুনিক ঐতিহাসিক বিকাশের ফল। তবে প্রাচীন স্বরচিন্তা, রাগভাবনা, তাল-লয়, গমক এবং সংগীতশাস্ত্রের সঙ্গে কর্ণাটক সঙ্গীতের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষত সঙ্গীতরত্নাকর উত্তর ও দক্ষিণ উভয় ভারতীয় সংগীত-পরম্পরার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ পূর্বসূরি। পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে আঞ্চলিক সংগীতরীতির বিকাশের ফলে দুই অঞ্চলের সংগীততত্ত্ব ও পরিবেশনরীতিতে পৃথক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়।

প্রাচীন ও আধুনিক সঙ্গীতের সম্পর্ক: ধারাবাহিকতা কোথায়?

প্রাচীন ও আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীতের মধ্যে কয়েকটি মৌল ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। ভারতীয় সংগীতে স্বর কেবল ধ্বনির উচ্চতা নয়; তার নান্দনিক ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবণতা প্রাচীন তত্ত্ব থেকে আধুনিক রাগসংগীত পর্যন্ত বহমান। জাতি থেকে রাগে যে রূপান্তর ঘটেছে, তার ফলে সুরের স্বতন্ত্র পরিচয় ক্রমশ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কেন্দ্রে এসেছে।  সময়ের সাংগঠনিক ধারণা ভারতীয় সংগীতের মৌল ভিত্তি। তালরূপ বদলেছে, কিন্তু তাল ও লয়ের গুরুত্ব কখনও বিলুপ্ত হয়নি। প্রাচীন অলংকার-ধারণার বিস্তার পরবর্তী গমক, মীড়, কান, খাটকা, মুরকি, অন্দোলন প্রভৃতির নান্দনিক ব্যবহার বোঝার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করে। ভারতীয় সংগীতে সংগীতশিক্ষা দীর্ঘকাল কেবল প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ছিল না। শৃঙ্খলা, নিয়মিত অনুশীলন, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক এবং সংগীতকে আত্মোন্নতির পথ হিসেবে গ্রহণের ধারণা বহু পরম্পরায় টিকে রয়েছে। ধারাবাহিকতার পাশাপাশি পার্থক্যগুলিও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীত আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত
গ্রাম, মূর্চ্ছনা, জাতি; পরে রাগ রাগ
শ্রুতি, গ্রাম, স্বরস্থান রাগভিত্তিক স্বরপ্রয়োগ
গীত, জাতিভিত্তিক রূপ, প্রবন্ধ ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, কৃতি, বর্ণম ইত্যাদি
প্রাচীন ক্রিয়া, মাত্রা, কাল ও তালরীতি ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল, আদি, রূপক ইত্যাদি
যজ্ঞ, নাট্য, রাজসভা, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান কনসার্ট, মঞ্চ, মন্দির, দরবারের উত্তরাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ
অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনেক ক্ষেত্রে পৃথক শিল্পশাখা
গুরু-শিষ্য ও মৌখিক পরম্পরা গুরু-শিষ্য + প্রতিষ্ঠান + লিখিত ও রেকর্ডভিত্তিক উপকরণ
প্রাচীন বীণা, বাঁশি, বিভিন্ন তালবাদ্য সেতার, সরোদ, সারেঙ্গি, তবলা, বীণা, মৃদঙ্গম, বেহালা ইত্যাদি
ক্রমবিকাশমান সুসংহত কেন্দ্রীয় সংগীত-ধারণা

এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে প্রাচীন সঙ্গীতের পুনরাবৃত্তি বলা যায় না। বরং এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল।

প্রাচীন সংগীতে গীত, বাদ্য ও নৃত্যের ঐক্য

আধুনিক সংগীতচর্চায় কণ্ঠসংগীত, বাদ্যসংগীত এবং নৃত্য পৃথক শিল্পক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে তাদের সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি নিবিড়। সঙ্গীতরত্নাকর-এর কাঠামোতেও গীত, বাদ্য ও নৃত্যকে বৃহত্তর সংগীত-পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নাট্যশাস্ত্র-এর পরিবেশে সংগীত ছিল নাট্য ও অভিনয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অর্থাৎ সুরকে একা শোনার জন্য সংগীতের সৃষ্টি—এই আধুনিক ধারণা তখন সর্বজনীন ছিল না।

এই পরিবর্তন আধুনিক সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। আজ রাগসংগীত অনেক সময় নাট্য, নৃত্য বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নান্দনিক শিল্প হিসেবে পরিবেশিত হয়।

সংগীতের সামাজিক পরিসর: রাজসভা থেকে জনসমাজ

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল—রাজসভা, মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায়, আঞ্চলিক শাসক এবং পেশাদার শিল্পীসমাজ। দেশী সংগীতের বিকাশে আঞ্চলিক সমাজের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তী যুগে বিভিন্ন রাজসভা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাধ্যমে সংগীতের নতুন নতুন রূপ বিকশিত হয়েছে। আধুনিক যুগে এই পৃষ্ঠপোষকতার চরিত্র আবার বদলেছে। মুদ্রণ, রেকর্ডিং, রেডিও, চলচ্চিত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, সঙ্গীত সম্মেলন এবং ডিজিটাল মাধ্যম সংগীতের বিস্তারকে একেবারে নতুন সামাজিক পরিসর দিয়েছে। ফলে আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ‘শাস্ত্রীয়তা’ কেবল তার প্রাচীনত্বের ফল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা, সংগীত-ভাণ্ডার, লিখিত স্বরলিপি, রেকর্ডিং এবং সাংস্কৃতিক নীতির দীর্ঘ ইতিহাস।

শাস্ত্র ও প্রয়োগ: প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে শাস্ত্র ও প্রয়োগের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংগীতের পরিবর্তন শুধু শাস্ত্র থেকে প্রয়োগের দিকে একমুখীভাবে ঘটেনি। জীবন্ত সংগীতচর্চাও শাস্ত্রের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে, পরিবর্তন করেছে এবং নতুন তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। বৃহদ্দেশী এবং সঙ্গীতরত্নাকর এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্রের আলোচনায় বৃহদ্দেশী-কে নাট্যশাস্ত্রসঙ্গীতরত্নাকর-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সঙ্গীতরত্নাকর প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংগীতধারণার বিস্তৃত সংশ্লেষ ঘটায়। অতএব ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসকে শুধু ‘শাস্ত্রের ইতিহাস’ বলা যায় না। এটি একই সঙ্গে শাস্ত্র ও প্রয়োগের পারস্পরিক নির্মাণের ইতিহাস

প্রাচীন সঙ্গীতকে আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা করার পদ্ধতি

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তুলনা করার সময় তিনটি স্তরকে আলাদা করে দেখা দরকার। শ্রুতি, স্বর, লয়, তাল, অলংকার, রাগাত্মকতা ইত্যাদি ধারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এগুলির সবকিছুর বর্তমান অর্থ অবশ্য প্রাচীন অর্থের সঙ্গে অভিন্ন নয়, কিন্তু ধারণাগত সূত্রগুলি বহু দূর পর্যন্ত অনুসরণ করা যায়। জাতি থেকে রাগ, গ্রাম থেকে পরবর্তী রাগ-সংগঠন, প্রবন্ধ থেকে পরবর্তী গীতরূপ, প্রাচীন তাল থেকে আধুনিক তাল—এই পরিবর্তনগুলি সরল রেখায় ঘটেনি। বিভিন্ন সময়ে নানা প্রবাহ একে অন্যের সঙ্গে মিলেছে, আবার আলাদাও হয়েছে। যজ্ঞ, নাট্য, মন্দির, রাজসভা থেকে আধুনিক সভাগৃহ, বিশ্ববিদ্যালয়, রেডিও, রেকর্ডিং এবং ডিজিটাল মাধ্যম—সংগীতের সামাজিক পরিবেশে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই তিনটি স্তর একসঙ্গে বিবেচনা না করলে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস হয় অতিরিক্ত ‘প্রাচীনত্ববাদী’, নয়তো অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে পড়ে।

আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রাচীন উত্তরাধিকারের উপস্থিতি

আজকের একজন হিন্দুস্তানি শিল্পী যখন একটি রাগ পরিবেশন করেন, তিনি অবশ্যই নাট্যশাস্ত্র-এ বর্ণিত প্রাচীন সংগীতের সেই রূপে পরিবেশন করছেন না। তবু তাঁর সংগীতে কয়েকটি গভীর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সক্রিয় থাকে। স্বরকে কেন্দ্র করে রাগের নির্মাণ, স্বরের ন্যাস, অলংকারের ব্যবহার, লয়-তালের শৃঙ্খলা, তাৎক্ষণিক সৃজনের গুরুত্ব এবং মৌখিক শিক্ষার ভূমিকা—এসবের মধ্যে বহু শতাব্দীর সংগীতচিন্তার উত্তরাধিকার নিহিত। একইভাবে কর্ণাটক সঙ্গীতেও রাগ, স্বর, গমক, তাল এবং মানোদর্ম সংগীতের যে সমন্বয় দেখা যায়, তা একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিকাশের ফল। অতএব আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে প্রাচীন সংগীতের ‘সংরক্ষিত নমুনা’ হিসেবে না দেখে একটি চলমান ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা অধিক যথার্থ।

উপসংহার

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীত ছিল একক, অপরিবর্তনীয় এবং কেবল ‘শাস্ত্রীয়’ সংগীতের একটি প্রাথমিক রূপ—এই ধারণা ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট নয়। তার মধ্যে ছিল বৈদিক সামগান, গান্ধর্ব সঙ্গীত, নাট্যসংগীত, মার্গ ও দেশী প্রবাহ, জাতি ও গ্রামভিত্তিক সুরচিন্তা, ক্রমবিকাশমান রাগধারণা, গীত ও প্রবন্ধের নানা রূপ এবং বহুবিধ তাল-লয়ব্যবস্থা। নাট্যশাস্ত্র আমাদের প্রাচীন সংগীততত্ত্বের একটি সুসংহত কাঠামো দেয়। দত্তিলম্ গান্ধর্ব সঙ্গীতের স্বতন্ত্র সংগীততাত্ত্বিক পরিসরকে স্পষ্ট করে। বৃহদ্দেশী জাতি থেকে রাগের দিকে এবং মার্গ থেকে দেশীর দিকে সংগীতচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে ধারণ করে। আর সঙ্গীতরত্নাকর প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংগীততত্ত্বের একটি বিস্তৃত সংশ্লেষ ঘটায়। এই ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ভারতীয় সঙ্গীতের শক্তি তার স্থিরতায় নয়, পরম্পরার ভিতরে পরিবর্তনকে গ্রহণ করার ক্ষমতায়। প্রাচীন মার্গ ও দেশী, জাতি ও রাগ, গীত ও প্রবন্ধ, প্রাচীন তাল ও আধুনিক তাল—সবই এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশ। সুতরাং আধুনিক হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে প্রাচীন সঙ্গীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি বলা যেমন ভুল, তেমনি তাকে প্রাচীন পরম্পরা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলাও ইতিহাসবিরুদ্ধ। আধুনিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গভীরে যে স্বরচিন্তা, রাগাত্মকতা, তাল-লয়, অলংকার, মৌখিক পরম্পরা ও সাধনার ধারণা কাজ করে, তার বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক শিকড় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় সংগীতচিন্তার মধ্যে বিস্তৃত। এই কারণেই প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতকে বোঝার প্রকৃত পদ্ধতি ‘অতীতের একটি হারিয়ে যাওয়া সংগীতকে পুনর্গঠন’ করা নয়; বরং শাস্ত্র, প্রয়োগ, সমাজ ও নন্দনতত্ত্বের পারস্পরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংগীতের দীর্ঘ যাত্রাকে বোঝা

গ্রন্থপঞ্জি

  1. Bharata Muni. Nāṭyaśāstra. বিভিন্ন সমালোচনামূলক সংস্করণ ও অনুবাদ।
  2. Dattila. Dattilam. Edited and translated by Mukund Lath. New Delhi: Indira Gandhi National Centre for the Arts, 1988. IGNCA-র বিবরণে গ্রন্থটিকে প্রাচীন সংগীততাত্ত্বিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র দলিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
  3. Mataṅga Muni. Bhaddeśī. Edited and translated by Prem Lata Sharma, assisted by Anil Bihari Beohar. New Delhi: IGNCA, 1992–1994.
  4. Śārṅgadeva. Sagītaratnākara. বিভিন্ন সংস্করণ ও অনুবাদ।
  5. Widdess, D. R. “Tāla and Melody in Early Indian Music: A Study of Nānyadeva’s Pāṇikā Songs with Musical Notation.” Bulletin of the School of Oriental and African Studies 44, no. 3 (1981): 481–508.
  6. Velička, Eirimas. “Tāla: Features of Rhythm System in Indian Classical Music.” Acta Orientalia Vilnensia 2 (2001): 164–177.
  7. IGNCA. Texts on Music and Dance / Kalāmūlaśāstra Series. Indira Gandhi National Centre for the Arts.
  8. Nijenhuis, Emmie te. Indian Music: History and Structure. Leiden: Brill.
  9. Rowell, Lewis. Music and Musical Thought in Early India. Chicago: University of Chicago Press.
  10. Prajnananda, Swami. Historical Development of Indian Music. বিভিন্ন সংস্করণ।

 

গবেষণাগত মন্তব্য

এই প্রবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত অবস্থান হল—‘প্রাচীন = মার্গ = শাস্ত্রীয়’ এবং ‘দেশী = লোক’—এই সরল দ্বৈত বিভাজনকে গ্রহণ না করা। কারণ ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলিতে দেশী সংগীতের পরিসর আধুনিক ‘লোকসংগীত’-এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত ছিল। একইভাবে আজকের ‘উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত’ ধারণাটিও প্রাচীন মার্গ ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন নয়। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৃহদ্দেশী সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলা কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রন্থটি একই সঙ্গে রাগ, প্রবন্ধ, দেশী ও মার্গের ধারণাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে এবং পরবর্তী সঙ্গীতরত্নাকর-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণ করে।