Sangit Bhavana, Visva-Bharati
Keywords : Dhananjay, Song, Play, Prayaschitta, Muktadhara, Baul, Devotion
Abstract : Two plays, Prayaschitta and Muktadhara, are particularly notable in Rabindranath’s dramas. An important character in these two plays is Dhananjay Bairagi. Muktadhara was written a long time after the composition of Prayaschitta. In these two plays, the character of Dhananjay Bairagi is a very spontaneous and fluent Baul character and at the same time he is the driving force of the two plays. It is as if Rabindranath expressed his views through this Dhananjay. In addition, the presence of Baul music through Dhananjay is observed in almost all parts of the two plays. Although there are some similarities in the use of music in the plays Prayashchitta and Muktadhara, the sequence of events is different. The playwright Rabindranath has skillfully used Baul songs here, which is very important in the narrative analysis of the two plays. Every Baul song used in the atonement play is a protest under the guise of metaphor, which resists the injustice done to the common man. For the first time, Rabindranath Tagore introduced a character named Dhananjay Bairagi in the play, who is always protesting. His protesting thoughts are not just offering offerings of sorrow at the feet of God through devotional (Puja parjay) songs, but in his voice, Baul melodies have become a language of roaring against injustice. Therefore, whenever Dhananjay asks everyone to awaken from ignorance and recognize the person within, the form of the thought of God present in the worship level song adds a different dimension.
ভূমিকা : বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের বহুবিধ নাটক রয়েছে যার মধ্যে প্রায়শ্চিত্ত এবং মুক্তধারা নাটক দু’টি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রায়শ্চিত্ত নাটকটির রচনাকাল ১৯০৯ সাল এবং মুক্তধারা নাটকটির রচনাকাল ১৯২২ সাল। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে রচিত রবীন্দ্রনাথের উক্ত দু’টি নাটক নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য হল একটি বিশেষ চরিত্র। তিনি হলেন ধনঞ্জয় বৈরাগী। দুইটি নাটকেই তিনি নাট্যধারাকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেন এবং তার গানগুলি সেই কাহিনীর ভাবের অনুপূর্বিক রচিত হওয়ায় তা পূজা পর্যায়ের ভাবের সাথে বাউল ভাবনার অবিমিশ্র রূপকে সার্থক করে তোলে। ধনঞ্জয় বৈরাগী এমন একটি চরিত্র যা বাংলা নাট্য সাহিত্যে এর আগে কখনো নির্মিত হয়নি। উক্ত দুখানি নাটকে এই চরিত্রটি মুখ্য রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। এই চরিত্রটিতে অনেকেই সেই সময়কালের একজন প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছায়া দেখতে পান যিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত। তবে রবীন্দ্রনাথের এই ধনঞ্জয় চরিত্রটি কোনো রাজনৈতিক গরিমায় নিজেকে তুলে ধরতে চান নি। বরং আধ্যাত্মিক ভাবনার সাথে দেশীয় ঐক্য, আত্মসম্মানবোধ এবং সাহসিকতার পরিচয়ে একজন আদর্শ মানুষের চরিত্রে নিজেকে গঠন করতে চেয়েছেন। নানাবিধ ঘটনা পরিস্থিতিতে সকলকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করে লড়াইয়ে যোগদান করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তবে এই প্রতিবাদের মাঝে ধনঞ্জয়ের ভাবনায় বারে বারে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় বাউল সাধনার মূল তত্ত্বটি। তাই নাটক দুটিতে সংগীত ব্যবহারে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ বাউল সুরের আবহে নাট্য পরিবেশ রচনা করেছেন। প্রতিটি নাট্য পরিস্থিতিতে ধনঞ্জয়ের কথায় ভাবনায় এবং গানে সেই ছাপ খুবই স্পষ্ট। নাটকের বেশিরভাগ গানগুলি ধনঞ্জয়ের কণ্ঠে গীত হয়েছে আর সেখানে কাহিনীর ঘটনা পরম্পরায় চরম পরিণতিকে তুলে ধরতে পূজা পর্যায়ের গানগুলি প্রধান হয়ে উঠেছে। গানগুলি হয়ে ওঠে নাট্য অন্তর্নিহিত ভাষা আর তাতে বাউল সুরের ব্যবহার আরও সহজ সরল ভাবে গানের অর্থ প্রকাশ করেছে। ধনঞ্জয়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাই নাট্যগতিমুখ এগিয়ে চলে। নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ ধনঞ্জয়ের সংলাপে গানে গানে নানা সংকেতে নাট্য পরিণতিকে দর্শক হৃদয়ে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস করেছেন। সর্বতোভাবে ধনঞ্জয় বৈরাগীর সদা হাস্য, নির্ভীক, সৎ, আধ্যাত্মিক ভাবনা কাহিনীর মধ্যে যেভাবে নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে তেমনি দর্শকের মনে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ করে। ফলত নাটকের মূল বিষয় প্রকাশে সম্পূর্ণ নাটকটিতে ধনঞ্জয় এক বিশেষ ভাবমূর্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ সর্বদাই নাটক রচনায় নাট্যবিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয়ের নানা দিক তুলে ধরেছেন রূপক-সাংকেতিকতার মাধ্যমে এবং শুধু সমস্যাগুলি তুলে ধরাই নয় এর থেকে নিষ্কৃতির পথ তিনি বলে গেছেন নাটকের ভিতর দিয়ে। আর সেই সব বিষয়গুলি তুলে ধরার দায়িত্ব তিনি দিয়েছেন ধনঞ্জয়ের কাঁধে। রূপক-সাংকেতিকতার সেই সব দিকগুলিই ধনঞ্জয়ের কন্ঠে গীত গানগুলির মাধ্যমে প্রকাশিত। ধনঞ্জয় তাই গানে গানে নানা ঘটনা ও অন্যান্য চরিত্র বিশ্লেষণে বাউলের সহজিয়া মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তাতে বিশেষ করে পূজা পর্যায়ের গানগুলির দ্বারা সহজ উপায়ে পরমাত্মাকে খোঁজার চেষ্টা এবং কঠিন সময়ে তাঁর প্রতি সমর্পণের ভাব রূপটি স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে ধনঞ্জয়ের মাধ্যমে। অতএব ধনঞ্জয় এখানে একটি বিশেষ চরিত্র। এর পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ বাউলদের ‘মনের মানুষ’কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন ধনঞ্জয় বৈরাগীর মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন বাউল তত্ত্বে যে মানবতার বাণী প্রকাশ পায় তা সামাজিক অজ্ঞানতা দীনতাকে ঘুচিয়ে মানুষকে এক উচ্চ আসনে পৌঁছে দিতে পারে এবং সকল বিভেদ দূর করে সকল মানুষকে এক মন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারে। আর তা হল মানব ধর্ম। ব্যক্তি সীমারেখাকে অতিক্রম করে মানুষকে বিশ্বজনীন ধর্মে উন্নীত করতে নিজের অন্তরে থাকা মানুষটির সাধনা করার প্রয়োজন তা ধনঞ্জয়ের মাধ্যমে নাট্যকার সকলকে বোঝাতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রচেতনার ঈশ্বর ‘জীবনদেবতা’ নামে প্রকাশ পেয়েছে যা বাউলের মনের মানুষ অন্বেষণে মিশে এক বিচিত্র অনুভূতি ও কল্পনার রসে গান হয়ে উঠেছে বৈরাগীর কন্ঠে। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকায় গুরুদেব তাই লিখেছেন – “আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি।… আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে।’’১ তাই গানে গানে কিভাবে রবীন্দ্রনাথ ধনঞ্জয় বৈরাগীর মাধ্যমে নাটকে পূজা পর্যায়ের বাউলাঙ্গের ভাবনা পরিবেশিত করেছেন তা আলোচনা করা হল —
বিশ্লেষণ :
প্রায়শ্চিত্ত
এই নাটকে ব্যবহৃত প্রতিটি বাউলাঙ্গের গান হল রূপকের আড়ালে ধ্বনিত প্রতিবাদ যা সাধারণ মানুষের উপর হওয়া অন্যায়কে প্রতিহত করে। ধনঞ্জয় বৈরাগী নামে এমন একটি চরিত্র রবীন্দ্রনাথ নাটকে প্রথমবার নিয়ে এলেন যিনি সর্বদা প্রতিবাদে মুখর। তবে এই চরিত্রটি কাহিনীতে যথাযথ হয়েছে তার বাউল ভাবনার পটভূমিতে। তাই তার কন্ঠে সংলাপ কিংবা গান সর্বত্রই রবীন্দ্র মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে বাউলাঙ্গের সুরে ও ভাবনায়। আবার নাটকের কাহিনীর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটি শুধুমাত্র নাট্য সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যে রচিত হয় নি, তাতে দেশীয় লোক-সুর যেমন ব্যবহার করেছেন তার সঙ্গে দেশীয় সমস্যাকে তুলে ধরে তৎকালীন সময়ের সাধারণ মানুষের মনে স্বদেশী ভাবনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন। এই নাটকে ব্যবহৃত বাউলাঙ্গের গানগুলি অলক্ষ্যে সাধারণ দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার গান। ধনঞ্জয় বৈরাগীর মধ্যদিয়ে এমন ভাবে সাংকেতিকতার মোড়কে রবীন্দ্রনাথ নাটকটি প্রকাশ করেছেন যেখানে অধ্যাত্মদর্শন ও দেশপ্রেমের যুগল সম্মিলন ঘটেছে। যদিও প্রায়শ্চিত্ত নাটকটি একটি সামাজিক নাটক। কিন্তু এখানে ধনঞ্জয় কেবলমাত্র একটি নাট্য চরিত্র নয়, এটি একটি রূপক চরিত্র বটে। তাই হয়তো পরবর্তীতে তিনি একে রূপক- সাংকেতিক ভাবনায় আরও একবার প্রকাশ করেছেন মুক্তধারা নাটকে। এই ধরনের রবীন্দ্র চিন্তার ফসল হিসাবে ধনঞ্জয় চরিত্রটিকে বিশিষ্ট চরিত্র বলা চলে। তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের বৈরাগী বাউল নন; তিনি দেহতত্ত্বের কথা বলেন নি। তিনি দেশরক্ষার কথা বলেছেন। মানবমুক্তির কথা বলেছেন। তার কন্ঠের উদাত্ত সুরে প্রজাদের তিনি সহজ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। নাটকটিতে ধনঞ্জয়ের প্রবেশের পর প্রথম গান ‘আরো আরো প্রভু’ যার কথায় রয়েছে পল্লী বাউলের সুর যা সহজেই মনে ধরা দেয় আর রয়েছে এক সূক্ষ্ণ দর্শনবোধ যা অচিরেই রবিবাউলের ভাবনাকে ধনঞ্জয়ের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত করে। ধনঞ্জয় গায় —
আরো আরো প্রভু, আরো আরো ।
এমনি করে আমায় মারো ।
লুকিয়ে থাকি আমি পালিয়ে বেড়াই,
ধরা পড়ে গেছি আর কি এড়াই ?
যা কিছু আছে সব কাড়ো কাড়ো ।
এবার যা করবার তা সারো সারো ।
আমি হারি কিম্বা তুমিই হারো !
হাটে ঘাটে বাটে করি মেলা,
কেবল হেসে খেলে গেছে বেলা,
দেখি কেমনে কাঁদতে পারো ! ২
গানটির পূর্বে ধনঞ্জয় মাধবপুরের প্রজাদের উদ্দেশ্যে বলে – “এখনো সবাই তোদের গায়ে ধুলো দেয় না রে? তবে এখনো তোরা ধরা পড়িস নি”৩। আর এই সূত্রেই নাটকে গানটির ব্যবহার। এর অর্থ মানুষের দেহের খাঁচার ভিতরে অন্তস্থলে যে মনের মানুষ রয়েছে তাকে প্রজার দল এখনও চিনতে পারে নি। তাই বৈরাগী তার গানের মধ্য দিয়ে সেই কথাই ব্যাখ্যা করেছে। ভয়কে জয় করে বুক পেতে গ্রহণ করার যে অভয়মন্ত্র তিনি দিয়েছেন তা একবার উপলব্ধি করতে পারলে অন্যায়ের দেওয়া মার আর দেহকে আঘাত করতে পারে না। তাই মারের বদলে মার নয় বরং তা সহ্য করার দীক্ষা দিয়েছেন ধনঞ্জয় বৈরাগী। ভিতরে থাকা প্রাণের দেবতাকে যেন এই মার আঘাত করতে না পারে — এটিই ধনঞ্জয়ের বৈরাগ্য সাধনা। তাই শেষে গানে গানে সে বলেছে ‘দেখি কেমনে কাঁদাতে পারো’!
এই একই ভাবনাকে কেন্দ্র করে ধনঞ্জয়ের আরও একটি বাউলাঙ্গের পূজা পর্যায়ের গান হল –‘আমারে পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়ায় কোন্ খ্যাপা সে’। সেখানে বাউলের খ্যাপামি ধনঞ্জয়ের মাধ্যমে নাট্যকার ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন প্রজাদের মধ্যে। তাই ধনঞ্জয় সৎ সাহস নিয়ে রাজা প্রতাপাদিত্যের সন্মুখে স্বীকার করে যে সে প্রজাদের খেপিয়েছে যুবরাজকে রাজা মানতে। এরই সঙ্গে সে নির্ভয়ে গায় —
আমারে পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়ায়
কোন্ খ্যাপা সে।
ওরে আকাশ জুড়ে মোহন সুরে
কী যে বাজে কোন বাতাসে।
গেল রে গেল বেলা, পাগলের কেমন খেলা –
ডেকে সে আকুল করে, দেয় না ধরা ।
তারে কানন-গিরি খুঁজে ফিরি,
কেঁদে মরি কোন্ হুতাশে ! ৪
ধনঞ্জয় স্বভাবগত একজন ক্ষ্যাপা কিন্তু ভিতরে সে একজন সাধকও বটে। তাই সেই খ্যাপামির তালে তালেই সে সমস্ত ভালো মন্দের বিচার করে। বাউলের বৈরাগ্য সাধনের আড়ালে রবীন্দ্রনাথের দর্শন আসলে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে নাটকে। উপনিষদে বলা রয়েছে ‘আনন্দাদ্ব্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে, আনন্দেন জাতানি জীবন্তি, আনন্দং প্রয়ন্তভিসংবিশন্তি।’৫ অর্থাৎ ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ। সেই আনন্দ হতেই সমস্ত কিছু উৎপন্ন, জীবিত, সচেষ্ট এবং রূপান্তরিত হচ্ছে। সেই কথাকে বাউল ভাবনার সাথে এক আসনে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ ধনঞ্জয় চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন। তাই ধনঞ্জয় শুধুমাত্র প্রজাদের অভয়মন্ত্র দেন নি, তার সাথে দিয়েছেন আনন্দমন্ত্র। এর প্রকাশ দেখা যায় এর পরবর্তী গানটিতে নৃত্যের তালে ধনঞ্জয়ের উপস্থাপনে। উক্ত গানটি কেবলমাত্র গান নয় তা নাট্য ক্লাইমেক্সকে বোঝাতে বিশেষ উল্লেখ্য। বন্দীশালায় আগুন লাগার ফলে যুবরাজ উদয়াদিত্য মুক্ত হয় আর সেই কাজে তার খুড়ো বসন্ত রায় সহয়তা করে। তখন নাট্য প্রসঙ্গে আসে আলোচ্য গানটি। গানটি হল —
ওরে আগুন, আমার ভাই,
আমি তোমারি জয় গাই ।
তোমার শিকল-ভাঙা এমন রাঙা মূর্তি দেখি নাই ।
তুমি দু হাত তুলে আকাশ-পানে
মেতেছ আজ কিসের গানে ।
এ কী আনন্দময় নৃত্য অভয়, বলিহারি যাই ।
যে দিন ভবের মেয়াদ ফুরোবে ভাই,
আগল যাবে সরে,
সে দিন হাতের দড়ি পায়ের বেড়ি
দিবি রে ছাই করে ।
সে দিন আমার অঙ্গ তোমার অঙ্গে
ওই নাচনে নাচবে রঙ্গে,
সকল দাহ মিটবে দাহে
ঘুচবে সব বালাই । ৬
যে কোনো প্রকারেই হোক এই আগুন যুবরাজকে মুক্ত করবে এটি ধনঞ্জয়ের বিশ্বাস। কারণ যেদিন ভবের মেয়াদ ফুরোবে সেদিন আগল অর্থাৎ সকল বন্ধন সরে যাবে। আগুন সত্যের প্রতীক; তার রুদ্রতা সকল মিথ্যাকে ছাই করে সত্যের পথকে উন্মুক্ত করবে আর যুবরাজকে মুক্তির পথ দেখাবে। ধনঞ্জয় এমন এক মুহুর্তের আভাস পেয়ে তাই আপন খেয়ালে আগুনের জয়গান গাইছে। নৃত্য সহযোগে এই গানটির উপস্থাপন নাটকে যেমন বিশেষ ভূমিকা পালন করে তেমনি ধনঞ্জয়ের এই প্রাণখোলা স্বভাবের সাথে আমরা পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচিত গগন হরকরার স্বভাব প্রকৃতিতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করে থাকি। জানা যায় এই গগন হরকরা বাউল সাধনার পাশাপাশি ডাক হরকরার কাজে নিযুক্ত ছিলেন আর আনন্দের সাথে নেচে গেয়ে চিঠিবিলি করেতেন। সেই স্বভাব বৈশিষ্ট্য ধনঞ্জয় চরিত্রটিতে স্পষ্ট। নাটকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি যেন এই ধনঞ্জয় বৈরাগী যিনি যুবরাজ উদয়াদিত্যের মাধ্যমে সকলকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তার মতে বাউলের রাঙা পথেই রয়েছে একমাত্র শান্তির উপায়। তাই বোন বিভাকেও শেষে সংসারের সকল কষ্ট থেকে সরিয়ে এনে বৈরাগ্যের মেঠো পথে এগিয়ে চলার দিশা দেখিয়েছেন ধনঞ্জয় বৈরাগী।
মুক্তধারা
সঙ্গীতের ছন্দ মাধুর্যে ও কাহিনীর ধারাবাহিকতায় বাউল সুরের গানগুলির নাট্যমূল্য অপরিসীম। মুক্তধারায় ধনঞ্জয় বৈরাগীর কন্ঠে গীত বাউলাঙ্গের গানগুলি তার যথার্থ রূপ পায় বাউল দর্শন ও রবীন্দ্রভাবনার অপূর্ব মিশ্রণে। ধনঞ্জয়কে প্রকৃত অর্থে একজন বাউল সাধক বললেও অসঙ্গত হয় না। রবীন্দ্রনাথ তার গানের ভাষায় পরম দক্ষতায় যে নাট্য উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছেন তাতে বাউল সুর বাস্তব ও অতীন্দ্রিয় জগতের মাঝে সেতু বন্ধন করে। তাই এর গানগুলি কেবল বাউল সুরে বাঁধা নয়, তাতে বাউল আদর্শও বর্তমান; যার সাথে রবীন্দ্রনাথ বারে বারে একাত্মতা বোধ করেছিলেন এবং গেরুয়া বসন পরিহিত হাতে একতারা নিয়ে নাট্য পরিণাম স্পষ্ট করেছেন। নাটকে প্রতিটি গানেই বাউলের বিষয়গত ভাবনাগত দিকগুলি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, আবার সেই সঙ্গে তাঁর পূজা পর্যায়ের বাউলাঙ্গ গানগুলির দ্বারা ধনঞ্জয়ের মতো বলিষ্ঠ চরিত্রের চিন্তনকে প্রকাশ করেছেন নাট্যকার। রবীন্দ্র ভাবের আবেশ প্রকাশ করতেই আসলে ধনঞ্জয় বৈরাগী চরিত্রটির নির্মাণ।
মুক্তধারায় ধনঞ্জয় বৈরাগী হল এমন একটি চরিত্র যিনি সমাজবিচ্যুত বৈরাগ্য সাধক নন বরং সংসারে থেকে কর্ম ও অধ্যাত্মসাধনের দ্বারা কী ভাবে জীবনের আসল আনন্দ পাওয়া যায় তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রজাদের নানা ভাবে জীবনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সমস্ত বস্তু জগৎকে স্বীকার করে সেগুলি থেকে নিজেকে অনাসক্ত থাকার যে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন তারই সংকেতময়তা গানগুলিতে বোঝানো হয়েছে। নাটকের প্রথম অংশে দেখা যায় রাজা রণজিৎ যুবরাজ অভিজিৎকে বন্দী করার ফলে তার অনুগত সঙ্গী সঞ্জয় যুবরাজের জন্য ব্যাকুল হয়ে তার সাথে কারাগারে বন্দী হতে চায়। কিন্তু তাতে সে নিস্ফল হওয়ায় তার মনে যে বেদনার সঞ্চার হয় তার সঙ্গে সকল শিবতরাইবাসীদের উপর চলতে থাকা কষ্টের অনুভূতিকে এক করে নাট্যকার তুলে ধরতে চেয়েছেন আলোচ্য গানটিতে। কারন সেই প্রতিকূলতাকে জয় করার সময় এবার এসে গেছে। তার জন্য প্রস্তুত হতে ধনঞ্জয়ের কন্ঠে ধ্বনিত হয় এই গানটি —
আমি মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে
আমার ভয় – ভাঙা এই নায়ে ।
মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে
ছেঁড়াপালে বুক ফুলিয়ে
তোমার ওই পারেতেই যাবে তরী
ছায়াবটের ছায়ে ।
পথ আমারে সেই দেখাবে
যে আমারে চায় —
আমি অভয়মনে ছাড়ব তরী
এই শুধু মোর দায় ।
দিন ফুরালে জানি জানি
পৌঁছে ঘাটে দেব আনি
আমার দুঃখদিনের রক্তকমল
তোমার করুণ পায়ে । ৭
অহিংসার দ্বারা প্রতিবাদ করার নীতি হল ধনঞ্জয়ের আদর্শ। ধনঞ্জয়ের প্রতিবাদের ধরণটি এই গানের দ্বারা স্পষ্ট। এই গানের মাধ্যমে যেমন একদিকে মারকে সহ্য করে মারকে ঠেকানোর নীতিগত শিক্ষা দিয়েছে সে, তেমনি গণ আন্দোলনে বিশ্বাসী ধনঞ্জয় যন্ত্রশক্তির বিরুদ্ধে ভৈরবের অপরিসীম শক্তির পরিচয় দিয়েছে এবং তার সাথে আসন্ন ভয়াবহ পরিণামের প্রতি সত্যের অবসম্ভাবী জয়ের বার্তা বহন করেছে। এখানে ধনঞ্জয়ের সৎ, নির্ভীক, সদাহাস্য, অহিংস ভাবনার সাথে বাউল মতাদর্শের ছাপটি অপূর্ব ভাবে পরিবেশিত।
ধনঞ্জয় শিবতরাইয়ের প্রজাদের কানে যে অভয়মন্ত্র দিয়েছে সেটি হল — ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলে চলবে না বরং মারটাকে বুক পেতে নিতে হবে। সে আরও বলেছে – “ঢেউকে বাড়ি মারলে ঢেউ থামে না, হালটাকে স্থির করে রাখলে ঢেউ জয় করা যায়”।৮ কিন্তু এতকিছুর পরেও যখন প্রজাদের মনে তার বানী সাড়া জাগাতে পারে নি তখন ওই ক্রোধে রাঙা মানুষগুলির গলায় সে সুর ধরিয়ে দিতে গান গায় —
আরো, আরো, প্রভু, আরো, আরো
এমনি করেই মারো, মারো ।
লুকিয়ে থাকি আমি পালিয়ে বেড়াই,
ভয়ে ভয়ে কেবল তোমায় এড়াই —
যা-কিছু আছে সব কাড়ো কাড়ো ।
এবার যা করবার তা সারো, সারো —
আমিই হারি কিংবা তুমিই হারো।
হাটে ঘাটে বাটে করি খেলা
কেবল হেসে খেলে গেছে বেলা —
দেখি কেমনে কাঁদাতে পারো । ৯
গানে গানেই ধনঞ্জয় প্রজাদের মনে মারের প্রতি তাদের আক্রোশ দূর করার চেষ্টা করে। গানের কথা এবং সুরের টানে যে ভাবে নাটকে প্রজাদের মনের ভয় দূর হয় তা শুধুমাত্র সংলাপের দ্বারা হয়তো ততটা সহজবোধ্য হত না। ধনঞ্জয়ের এই স্বভাবসিদ্ধ চারিত্রিক দৃঢ়তার কারনেই নাটকে সাধারন মানুষদের কাছে সে এতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে কালিদাস নাগ মহাশয়কে একটি পত্রে লিখেছেন — ‘‘… ধনঞ্জয় হচ্ছে যন্ত্রের হাতে মারখানেওয়ালার ভিতরকার মানুষ। সে বল্চে, ‘‘আমি মারের উপরে; মার আমাতে এসে পৌঁছয় না —’’১০ অর্থাৎ বাইরে যতই আঘাত আসুক তা যেন অন্তরে কখনই না পৌঁছয়। আধ্যাত্মিক চেতনার দ্বারা চিত্তকে এতটাই প্রস্তুত করতে হয় যাতে কিনা প্রভুকে সে বলতে পারে — ‘আরো, আরো, প্রভু, আরো, আরো / এমনি করেই মারো মারো।’
এরপর অন্যায়ের প্রতিবাদে ধনঞ্জয় একা রাজদরবারে যেতে চাইলে প্রজারা তাকে বারণ করে। তখনও আবার ধনঞ্জয় তার বাউলাঙ্গের সুরে ইতিবাচক ভাবের দ্বারা প্রজাদের রাজত্বের অধিকার সম্পর্কে অবগত করে। গানটি —
তোমার আসন – ’পরে বসাতে চাও
নাম আমাদের হেঁকে হেঁকে ।
দ্বারী মোদের চেনে না ,
বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি ,
লও ভিতরে ডেকে ডেকে ।
মোদের প্রাণ দিয়েছ আপন হাতে
মান দিয়েছ তারি সাথে ।
থেকেও সে মান থাকে না যে
লোভে আর ভয়ে লাজে ,
ম্লান হয় দিনে দিনে ,
যায় ধুলাতে ঢেকে ঢেকে। ১১
অর্থাৎ এই যে রাজার রাজত্ব সেটি না রাজার না প্রজার। যিনি এই রাজার রাজা তথা ঈশ্বর — তাঁর আসন বলে যতদিন প্রজারা চিনবে না ততদিন এদের প্রাণের ভয়ে মরতে হবে। তাই এই রাজত্বের উপর যতখানি রাজার অধিকার ততটাই প্রজার। আসলে যিনি সবার উপরে আছেন তিনি সকলকেই চালনা করেন। সিংহাসনে অধিষ্টিত রাজা রণজিৎ হলেন নিমিত্ত মাত্র। তাই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোশ করা অন্যায়। ধনঞ্জয় কখনোই তা সমর্থন করেন নি। ঈশ্বরের কাছে একদিন এর বিচার হবে আর সেদিনের অপেক্ষায় বৈরাগী এই গান গায়।
রাজা রণজিতের কাছে শিবতরাইবাসীরা যুবরাজকে ফিরে পাবার দাবী জানাতে এলে রাজা ধনঞ্জয়কে খাজনা দিতে ফাঁকি দেবার পরিপ্রেক্ষিতে বলে – “তুমি এই-সমস্ত প্রজাদের খেপিয়েছ ?”১২ তখন ধনঞ্জয় আবার তার গীতমুখর স্বভাব নিয়ে গাইতে আরম্ভ করে —
আমারে পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়ায় কোন্ খ্যাপা সে ?
ওরে আকাশ জুড়ে মোহন সুরে
কী যে বাজায় কোন্ বাতাসে ?
গেল রে গেল বেলা ,
পাগলের কেমন খেলা ?
ডেকে সে আকুল করে, দেয় না ধরা —
তারে কানন গিরি খুঁজে ফিরি,
কেঁদে মরি কোন্ হুতাশে । ১৩
ধনঞ্জয়ের সদাহাস্য ক্ষ্যাপা মন আসলে কার কথা মত সকলকে খেপিয়ে বেড়ায় সেই কথাই গানের ছলে উহ্য ভাবে ব্যক্ত করেছেন নাট্যকার। গানটির প্রকৃত অর্থ সেই সর্বশক্তিমানকেই উদ্দেশ্য করে রচিত। এই জাগতিক সত্তা যথা – ধন সম্পত্তি, যশখ্যাতি প্রভৃতি থেকে ধনঞ্জয়ের দৃষ্টি যে সীমাহীন অখন্ড সত্তার প্রতি নিবন্ধ সেই আধ্যাত্মিকবোধ থেকে তার এই গান। তাই গান গাওয়া শেষ হলে সে রাজাকে বলে – “আমার উদ্বৃত্ত অন্ন তোমার, ক্ষুধার অন্ন তোমার নয়”।১৪ আসলে তিনি রাজাকে জব্দ করতে নয় বরং রাজাকে অনাহারে অর্ধমৃত প্রজাদের নরহত্যার পাপ থেকে রক্ষা করতেই প্রজাদের খাজনা দেওয়ার আদেশ থেকে তাকে বিরত করেছেন।
এরপর অবশেষে ধনঞ্জয় বুঝতে পারে সে শিবতরাইয়ের মানুষের মনে সাহস জোগাতে ব্যর্থ। তাই সে স্বীকার করে – “ওদের যতই মাতিয়ে তুলেছি ততই পাকিয়ে তোলা হয় নি আর-কি”।১৫ সেই কারণে সে প্রজাদের কাছ থেকে দূরে সরে থেকে তাদের শিক্ষা দিতে চায়। যাতে কিনা তারা স্বনির্ভর হয়ে নিজেদের হকের দাবী জানানোর সাহস পায়। এরপর ধনঞ্জয় রাজার কাছে নিজেই বন্দি হতে চলে যায়। এদিকে রাজা রণজিতও তাকে বন্দি করে রাখতে চায়। তখন ধনঞ্জয় রাজাকে বলে সে তাকে বন্দি রাখলেই তো সে চিরবন্দি হবার নয়। যথার্থ সময়ে সকল অন্যায় বন্ধন ছিন্ন করে সে মুক্তি পাবেই। উপনিষদে উল্লেখিত ‘আত্মানাং বিদ্ধি’১৬ কথাটির যথার্থতা ধনঞ্জয়ের বক্তব্যে দেখতে পাওয়া যায়। যার অর্থ নিজেকে জানো নিজেকে চেনো। নিজের ভিতরের মানুষটিকে চিনতে পারলে তবেই তো ধনঞ্জয়ের মতো সকল প্রজার মনে আত্মবিশ্বাস জেগে উঠবে। এরপর আবারও প্রতিবাদী সুরে বৈরাগীর গলায় আরেকটি বাউলাঙ্গের গান শোনা যায় —
তোর মারে মরম মরবে না ।
তাঁর আপন হাতের ছাড়-চিঠি সেই-যে
আমার মনের ভিতর রয়েছে এই-যে ,
তোদের ধরা আমায় ধরবে না ।
যে পথ দিয়ে আমার চলাচল
তোর প্রহরী তার খোঁজ পাবে কী বল ?
আমি তাঁর দুয়ারে পৌঁছে গেছি রে,
মোরে তোর দুয়ারে ঠেকাবে কী রে ?
তোর ডরে পরান ডরবে না । ১৭
গানের মাঝেই ধনঞ্জয় জগতের ধরাধরি টানাটানির কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু তিনি এসবের অনেক উর্দ্ধে। তাই এভাবে ভয় দেখিয়ে ধনঞ্জয়কে আটকে রাখা যাবে না। বাউলের মূল্যবোধের সাথে প্রতিবাদের ভাষা যেন এক হয়ে রূপক-সাংকেতিক নাট্যধারায় নতুন ধরনের চরিত্রের সৃষ্টি করে। এর আগে প্রায়শ্চিত্ত নাটকে ধনঞ্জয় চরিত্রটি প্রথম অবতরণ হলেও মুক্তধারায় তা যেন পায় একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ। ধনঞ্জয় তাই আরও দৃঢ় ভাবে গেয়ে উঠে সত্যের জয়গান। তার গানে গানে সে জানায় সত্য একদিন শিকল ভেঙে এগিয়ে চলবে, কোনো বাধা মানবে না। ভৈরবের জাগার সময় ক্রমশ যতই এগিয়ে আসবে ভৈরব তার পথ নিজেই উন্মুক্ত করে নেবে।
এরপর আসে নাটকের মূল ক্লাইমেক্স (পরমক্ষণ) যেখানে যন্ত্রশক্তির বিনাশ এবং প্রাণশক্তির জয় লাভের সন্ধিক্ষণ আর তাতে ভৈরবের প্রকাশের প্রথম সংকেত ঘটেছে আগুনের মাধ্যমে। নাটকের শেষে যার মাধ্যমে সত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সে হল যুবরাজ অভিজিত। তাই তার পিতা মহারাজ রণজিত তাকে সেই কাজে বাঁধা দিতে বন্দি করে রাখলেও অবশেষে আগুন সকল বন্ধন থেকে মুক্ত করে যুবরাজ অভিজিৎকে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিয়েছে। অভিজিৎ সকল সম্পর্কের মায়া ত্যাগ করে ব্রতী হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিকার করতে। তাই জীবনকে সে তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছে মুক্তধারার স্রোতের পানে। অপরদিকে ধনঞ্জয়ের সহিষ্ণু মনোভাব, বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ক্ষমতা, ধীর সঞ্চারী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নাটকে সকলকে সম্মিলিত করেছে একত্র হতে। ড. অশ্রুকুমার সিকদার মহাশয়ের এই বিষয় প্রাসঙ্গিক একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে — ‘‘তত্ত্বগত বিচারে রবীন্দ্রনাটকে ঘুরে-ফিরে নানান্ মূর্তিতে একটি বিষয়েই আসে — জড়শক্তির সঙ্গে প্রাণশক্তির বিরোধ এবং পরিণামে প্রাণের জয়।’’১৮ খুড়ো মহারাজ বিশ্বজিৎ যুবরাজ অভিজিৎকে নাট্য চরম পরিণতির পূর্বে তার পিতার রাজ্য থেকে নিয়ে যেতে চাইলে সে অসম্মত হয়। এদিকে ধনঞ্জয় তার বাউল সুরে অচিরেই দর্শককে প্রস্তুত করে আগামীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হতে। ভৈরবের জাগার সংকেত পায় ধনঞ্জয় তার আধ্যাত্মিক বোধের দ্বারা আর সেই সংকেত সে গানের মাধ্যমে সকলে বোঝাবার চেষ্টা করে। তার এই গান —
আগুন , আমার ভাই ,
আমি তোমারি জয় গাই ।
তোমার শিকল-ভাঙা এমন রাঙা
মূর্তি দেখি নাই ।
দু-হাত তুলে আকাশ-পানে
মেতেছ আজ কীসের গানে ?
এ কী আনন্দময় নৃত্য অভয়
বলিহারি যাই ।
যেদিন ভবের মেয়াদ ফুরোবে, ভাই,
আগল যাবে সরে ,
সেদিন হাতের দড়ি পায়ের দড়ি
দিবি রে ছাই করে ।
সেদিন আমার অঙ্গ তোমার অঙ্গে
ওই নাচনে নাচবে রঙ্গে ,
সকল দাহ মিটবে দাহে ,
ঘুচবে সব বালাই । ১৯
আসলে ধনঞ্জয় আর যুবরাজ অভিজিৎ হল সমাজের দর্পন; যাদের মধ্যে অত্যাচারে নিপীড়িত মানুষদের ভিতরের অবস্থাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ও নিবারণের শক্তি রয়েছে। ধনঞ্জয় পার্শ্ব চরিত্র হিসাবে নাটক দুটিতে মঞ্চস্থ হলেও সেই কাহিনীর কান্ডারী। তাই দর্শকের মূল আকর্ষণ সে। অভিজিৎ যন্ত্রের বাড়াবাড়িকে প্রতিরোধের জন্য সংগ্রাম করলেও তার মূল বিশ্লেষক হল ধনঞ্জয়ের গান। সে প্রতি মুহূর্তে সকলে প্রস্তুত করেছে আসন্ন পরিণামের জন্য। তাই উক্ত গানে ভৈরবের আভাস জানতে পেরে আগুনের সঙ্গে মিত্রতা করেছে, তার জয়গান গাইছে। শিবতরাইয়ের সাধারণ মানুষদের পা অন্যায় আঘাতের ভয়ে পিছু হটে যায় কিন্তু ধনঞ্জয়ের পা কখনই অন্যায়কে আপোষ না করে। বরং সে নির্ভয়ে নৃত্য করে। এই মনোবল তিনি পেয়েছেন ভৈরবের কাছ থেকে। ধনঞ্জয় নিজেকে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করেছে তাই সে আত্মশক্তিতে বলীয়ান। আর অভিজিৎ হল ভৈরবের এই মহান কাজের সেবক। অভিজিৎ যেন নিজের ভিতরে থাকা মনের মানুষের ডাক শুনতে পেয়েছে মুক্তধারার ঝর্ণায়। এই চরিত্রদ্বয় আসলে মানুষের মনে মনুষ্যত্ব জাগানোর তাগিদে লড়াই করেছে। রবীন্দ্রনাথ এখানে বিজ্ঞানের বা যন্ত্রের বিরোধ করেন নি। কিন্তু যন্ত্র যখন মানুষের থেকে বড়ো হয়ে গিয়ে মানুষের অকল্যাণের কাজে নিযুক্ত হয় তখন রবীন্দ্রনাথ এভাবেই তাঁর প্রতিবাদ জানান। তিনি যন্ত্রের বিরুদ্ধে মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়েছেন। এই সম্পর্কে তাঁর একটি উক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – “মানুষের আর-একটি প্রাণ আছে, সেটা শারীর-প্রাণের চেয়ে বড়ো — সেইটে তার মনুষ্যত্ব।‘’২০ সেই প্রাণের ডাকেই ধনঞ্জয় বারবার গান গেয়ে সাড়া দিয়েছে আর নাট্যধারা এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই নাটকটিতে বাস্তব সমস্যাটিকে সাংকেতিকতার মোড়কে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা বাউল ভাবনা ও রবীন্দ্রভাবনা সম্মিলিত করে নাটকে এক গভীর রেখাপাত করে।
উপসংহার : উক্ত নাটক দুইটিতে প্রায় তেরো বছরের ব্যবধান রয়েছে। তার ফলে প্রায়শ্চিত্তে যে মনোভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে ধনঞ্জয় বৈরাগীকে অবতরণ করিয়েছেন তাতে মুক্তধারা নাটক রচনাকালে এসে কবির অন্য মন কাজ করেছে। কারণ সময়ে সময়ে সামাজিক সমস্যাগুলো বদলে গেছে। প্রায়শ্চিত্তে যে সমস্যাটি রাজা এবং প্রজার রাজতন্ত্রের অন্যায় অত্যাচার নিয়ে তৈরী হয়েছিল, তা মুক্তধারায় এসে এক বিশ্ব ব্যাপী ধনতন্ত্রের লড়াই হিসাবে দেখানো হয়েছে। ফলে নাটক দুইটিতে কিছু কিছু গানে এবং দৃশ্যে সাদৃশ্য থাকলেও তাতে ধনঞ্জয়ের প্রতিবাদের কৌশল অনেকটাই পাল্টে গেছে মুক্তধারা নাটকে এসে। প্রায়শ্চিত্ত নাটকে ধনঞ্জয় এক সমবেত দলের প্রতিনিধি আর মুক্তধারায় একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর হয়ে বাঁধ পড়া ও বাঁধ খোলার সমস্যা নিয়ে তিনি প্রতিবাদের মুখর হয়েছেন। ফলে ধনঞ্জয়ের চিন্তা এবং প্রতিবাদের প্রকাশ ভঙ্গী কিছুটা ভিন্ন হয়ে যায় মুক্তধারায়। এই বাদী বিবাদী সমস্যার মাঝে পূজা পর্যায়ের বাউলাঙ্গের গানগুলি যেন অন্যমাত্রা পায়। বাউলের নিগুঢ় সাধনায় যে আধ্যাত্মিক দর্শন রয়েছে তার থেকে এই নাটকগুলির ধারা অনেকটাই ভিন্ন দিক। কিন্তু তাকে রবীন্দ্রনাথ সুনিপুণ ভাবে প্রতিবাদের ভাষায় ব্যবহার করেছেন যা বাউল ধর্মবোধকে আরও উচ্চ আসনে উন্নীত করে। বাউলের উদার ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার সাথে রবীন্দনাথ বিশ্ব সংসারের পরিচয় ঘটান ধনঞ্জয়ের মধ্য দিয়ে। তাই এই চরিত্রটিতে আজও অত্যন্ত আধুনিক চিন্তাশীল মানসিকতার প্রকাশ পায় যা বর্তমানকালেও বিশ্ব অস্থিরতার সময়কালে সমভাবে প্রাসঙ্গিক। ধনঞ্জয়ের ভাবনা তার দেখানো পথ আসলেই রবীন্দ্রনাথের পথ। তাই পরিশেষে বলা যায় বাংলা তথা বিশ্বের নাট্য সাহিত্যের বিচিত্র সম্ভারে সংগীতের সহযোগে এক অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যে ধনঞ্জয় বৈরাগী একজন সর্বকালীন যথার্থ পথিকৃৎ।
তথ্য নির্দেশিকা :-
১। সম্পাদিত মৌলবী মহম্মদ মনসুরউদ্দীন। হারামণি। আশীর্ব্বাদ। বৈশাখ ১৩৩৭
২। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-নাট্য-সংগ্রহ প্রথম খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ৭০০
৩। তদেব। পৃষ্ঠা ৭০০
৪। তদেব। পৃষ্ঠা ৭১৩
৫। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন প্রথম খন্ড। কর্ম। চৈত্র ১৩৭৮। পৃষ্ঠা ৯১
৬। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাট্যসংগ্রহ প্রথম খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ৭২৯
৭। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-নাট্য-সংগ্রহ দ্বিতীয় খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ২৪
৮। তদেব। পৃষ্ঠা ২৫
৯। তদেব। পৃষ্ঠা ২৬
১০। নাগ, কালিদাস (৪ঠা মে ১৯২২)। ‘চিঠিপত্র ১২’। পৃষ্ঠা ৩২০
১১। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-নাট্য-সংগ্রহ দ্বিতীয় খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ২৭
১২। তদেব। পৃষ্ঠা ৩০
১৩। তদেব। পৃষ্ঠা ৩০
১৪। তদেব। পৃষ্ঠা ৩১
১৫। তদেব। পৃষ্ঠা ৩২
১৬। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন দ্বিতীয় খন্ড। ফাল্গুন ১৪০১। পৃষ্ঠা ৩৭৩
১৭। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-নাট্য-সংগ্রহ দ্বিতীয় খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ৩৩
১৮। সম্পাদিত সুচিত্রা মিত্র, সুভাস চৌধুরী। ‘রবীন্দ্রসংগীতায়ন প্রথম খন্ড’। ড. অশ্রুকুমার শিকদার।‘রবীন্দ্র-নাটকে গান’, জানুয়ারী ১৯৮৯। পৃষ্ঠা ১২৫
১৯। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-নাট্য-সংগ্রহ দ্বিতীয় খন্ড। মাঘ ১৪০৬। পৃষ্ঠা ৩৭
২০। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্ররচনাবলী চতুর্দশ খন্ড। আত্মপরিচয়। আশ্বিন ১৪২৬। পৃষ্ঠা ১৫২