শান্তিনিকেতনের বসন্ত বন্দনার ইতিহাস-পল্লবী চট্টোপাধ্যায়

ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে

ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে,

আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে।।

       শিমুল পলাশের রঙে রঙে ফাগুন এসে ধরা দিয়েছে শান্তিনিকেতনের মাটিতে। তার সাথে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে বিশ্বভারতী পরিচালিত বসন্ত উৎসবের। এই আলোচনায় সেই বহুল জনপ্রিয় বসন্ত উৎসবের ইতিহাস কিছুটা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করা হবে। বহুকাল ধরে প্রচলিত হয়ে আসছে, ১৯০৭ সালের ‘শ্রীপঞ্চমী’ তিথিতে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ট পুত্র বালক শমীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রথম ‘বসন্তোৎসব’-এর সূচনা করেছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৩১৩ বঙ্গাব্দের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে শান্তিনিকেতনে শমীন্দ্রনাথ যে অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন তা ছিল ‘ঋতু-উৎসব’। ‘রবীন্দ্রজীবনী’-কার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য থেকে জানা যায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি শমীন্দ্রনাথ পরিচালিত সেই ঋতু উৎসবে শমীন্দ্রনাথ এবং আরো দুইজন ছাত্র সেজেছিলেন বসন্ত, একজন বর্ষা; আর তিনজন সেজেছিলেন শরৎ। ‘রবিজীবনী’-কার প্রশান্তকুমার পালের মতানুসারে, সেবছর ‘শ্রীপঞ্চমী’ পড়েছিল ১৮ জানুয়ারি। শমীন্দ্রনাথের একটি পত্রাংশ থেকে তিনি সেদিনের উৎসবের বিবরণ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনে ‘শ্রীপঞ্চমী’ তিথিতে ‘বসন্তোৎসব’ উদযাপন করা হয়েছে, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। ১৯২৩ সালের ২২ জানুয়ারিতে মাঘীপূর্ণিমার রাতে আশ্রমিকরা মেতে উঠেছিলেন বসন্তের গানে। সে বছর ফাল্গুনী পূর্ণিমায় পুনরায় পালিত হয় বসন্তোৎসব। প্রমথনাথ বিশী-র ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৯১৮-১৯ সালে বসন্ত বন্দনা হয় ‘উৎসবরাজ’ দিনু ঠাকুরের নেতৃত্বে। অসিত হালদার, নগেন গাঙ্গুলি আর আশ্রমের অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রীগণ খোল-করতাল সহযোগে আবির ছড়াতে ছড়াতে শাল-বীথিকার পথে আশ্রমের দিকে যাত্রা করলেন। আর সেই সঙ্গে “যা ছিল কালোধলো / তোমার রঙে রঙে রাঙা হলো।” – গানে গানে সেবার ভরে উঠেছিল আশ্রমপ্রাঙ্গন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিশ্বভারতী হওয়ার আগের পর্বে দোলের দিন শান্তিনিকেতনে বসন্ত-উদযাপন হলেও তা তখনো উৎসবে পরিণত হয়নি।

       ‘শান্তিনিকেতন পত্রিকা’-র ৪ৰ্থ বর্ষ মাঘ সংখ্যা সূত্রে ১৯২০ সালে শ্রীপঞ্চমীর দিনের একটি আভাস পাওয়া যায়, “এইদিন সন্ধ্যাবেলায় গুরুদেব ছাত্রীদের লইয়া কলাভবনে গান করিয়াছিলেন। ছাত্রীরা সকলেই বাসন্তী রঙে ছোপানো শাড়ী পরিয়াছিল, মাথায় সকলের ফুল গোঁজা ছিল। পূজনীয় গুরুদেব ঐ রং-এর পোশাক পরিয়া তাঁহাদের মধ্যে বসিয়া ছিলেন।”

       ১৯২৬ সালে বসন্তোৎসব অনুষ্ঠিত হয় ৪ চৈত্র বসন্ত পূর্ণিমার দিন, অভিনীত হয়েছিল ‘নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’। ১৯৩১-এর ৪ মার্চ পুরাতন লাইব্রেরীর বারান্দায় বসন্তোৎসব উপলক্ষে ‘নবীন’ নাটিকাটি অভিনীত হয়। সাথে ছিল সাবিত্রী গোবিন্দের গান, রমা চক্রবর্তী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “মরি মরি চলে যায় বসন্তের দিন”। গানটির সঙ্গে কীভাবে নাচতে হবে তার নির্দেশনা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর ‘গুরুদেব’-এর কাছ থেকেই। ‘ক্লান্ত যখন আকুলির কাল’ গানটির সঙ্গে নাচ করেছিলেন অমিতা সেন। শান্তিদেব ঘোষ ১৯৩১ সালের ওই বসন্ত উৎসবের স্মৃতিচারণা করেন, ভ্রাতৃপুত্র শমীক ঘোষকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, তখন ‘বসন্তোৎসব’ বলতে কিছু ছিল না। সবাই মিলে আবির খেলা, গান গাওয়া – এসবই করা হত। সন্ধ্যায় থাকত কোনো অনুষ্ঠান’। দোলের শোভাযাত্রার সাথে ‘ওরে গৃহবাসী’ গানটি তখনও যুক্ত হয়নি। খুব নির্দিষ্ট করেই শান্তিদেব ঘোষ বলেছেন, সকালের শোভাযাত্রার নাচটা “১৯৩৪ সালের আগে পর্যন্ত হতো না”। ১৯৩১-এ দোলের অনুষ্ঠানে শান্তিদেব আর কলাভবনের ছাত্র বংশীধারী ঘোষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাউলের ভঙ্গিমায় নেচে উঠেছিলেন। তবে শান্তিদেব ঘোষের মন্তব্য: “আগে দোল-উৎসব যেটা হতো, সেটাকে গুরুদেব আর বেশি উৎসাহ দিলেন না কারণ ঐ সময় নানারকম নোংরামি হতো। নোংরামি মানে কী – কাদা দিয়ে দিল, ছেলেরা দুষ্টুমি করে কালি দিয়ে দিল – এরকম এলোমেলো ভাব। উনি [রবীন্দ্রনাথ] ভাবলেন, এটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে বেঁধে দিতে হবে। উনি সকালে ‘বসন্তোৎসব’ বলে একটা বিধিবদ্ধ উৎসব করা ঠিক করলেন। তখন থেকে আরম্ভ হলো সকালবেলার অনুষ্ঠান – তাতে গান হবে, কিছু নাচ হবে – ছেলেরা মেয়েরা নাচবে, গুরুদেব আবৃত্তি করবেন। তখন থেকে ‘ওরে গৃহবাসী’ গানটার সঙ্গে নানারকম অর্ঘ্য নিয়ে মেয়েরা আসত…।” সেসময় “গানের দল আগে আসত মেয়েরা পিছনে আসত, তারপর হলো যে অল্প জন্য কুড়ি-পঁচিশ মেয়ে আগে আসত আর গানের দল পিছনে থাকত।” “বছর দুয়েক এরকম চলার পর আমার মাথায় খেয়াল এল, মেয়েদের প্রসেশনটা নৃত্যের ভঙ্গিতে করলে কেমন হয়। ফোকড্যান্স যেমন হয়। এই নিয়ে গুরুদেবের সঙ্গে কথা বললাম। গুরুদেব বললেন, হ্যাঁ, ভালোই হবে। – আমি ঠিক করলাম, বেশ কমপ্লিকেটেড নয়, মণিপুরী একটা সিম্পল স্টেপ, এগিয়ে যাওয়া ঢঙে – এই স্টেপে নাচ করবে, এক হাতে অর্ঘ্য থাকবে, গানের দল চলবে সঙ্গে সঙ্গে। – ব্যস, এই শুরু হয়ে গেল নতুন একটা দিক। ওরা নাচতে নাচতে এগিয়ে চলত, নন্দনবাবু [নন্দলাল বসু] তালপাতা দিয়ে হাতের ডালি তৈরি ক’রে দিতেন তাতে ফুল, আবীর থাকত,কোনোটি আবার থালা, সেগুলো নিয়ে গিয়ে রাধা হতো, তারপর শুরু হয়ে যেত বসন্তোৎসব। – ‘দোল উৎসবে উঠে গিয়ে এই [বসন্তোৎসব] চালু হয়ে গেল। এই প্রসেশনের নাচটা আমিই প্রথম ইন্ট্রোডিউস করলাম।’

       বর্তমান বসন্ত উৎসবে লক্ষ্য করা যায়, দু’জন-দু’জন করে নেচে প্রসেশন এগিয়ে চলে, কাঁচির নাচ, মদিরার নাচ, হাতের তালির নাচ – এইরকম ভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়। তাতে এই শোভাযাত্রায় অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবং দর্শকদের কাছেও তা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আশ্রম প্রদক্ষিণ করে আম্রকুঞ্জে গিয়ে শেষ হয় সেই শোভাযাত্রা। শান্তিনিকেতনের স্মৃতিচারণায়, আম্রকুঞ্জে বেশ যত্ন করে নিকোনো একটা মণ্ডলী বা বেদিতে বসন্ত গানের দল। আমগাছগুলোকেও ভালো করে সাজিয়ে দেওয়া হত। একটা প্রকাণ্ড রেকাবি বা পরাতে চূড়া করে রাখা হত আবির। অনুষ্ঠান শেষে সেই আবির নিয়ে একে অপরকে মাখামাখি সবাই। আশির দশকের গোড়া পর্যন্ত আম্রকুঞ্জে অনুষ্ঠিত হত শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব। ১৯৮১ সালে আম্রকুঞ্জের গাছে চড়ে বসা উৎসাহী দর্শকদের ভেরে তেড়ে পড়ে আমের ডাল। তারপরই বসন্তোৎসবের আম্রকুঞ্জপালা শেষ হয়ে গৌরপ্রাঙ্গণ পর্ব শুরু হয়। এই বিশৃঙ্খলার কারণে ১৯৮২ সেবছর বসন্তোৎসব-উদযাপন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ১১ মার্চ শেষপর্যন্ত অবশ্য ‘বসন্তোৎসব’ দোলের দিনেই (৬ মার্চ) অনুষ্ঠিত হয়, তবে পূর্বের তুলনায় তার রঙ ফিকে হয়ে আসে। ১৯৮২ থেকে শান্তিনিকেতনে ‘বসন্তোৎসব’ অনুষ্ঠিত হবার সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ সকালের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া শুরু করেছিলেন। বর্তমানে চেনা বসন্তোৎসবের সূচনা এই সময় থেকেই। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন সুষ্ঠু শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এই অনুষ্ঠান এগিয়ে নিয়ে যেতে। তবে এই শৃঙ্খলা যে সবসময় রক্ষিত হয়েছিল তাও বলা যায় না। ১৯৩৮ সালের উৎসবের দিন বেতারিকের গানের সময় ছাদের উপর উঠে কয়েকজনকে হৈ হৈ করতে দেখে সেসময়ের নবাগত ছাত্র পঞ্চানন মণ্ডল ভারাক্রান্ত মনে ডায়েরিতে লিখেছিলেন, তাঁদের ‘অসংযত আমোদে মত্ততার আকার বহির্ভূত হইতেছে। লজ্জা দিতেছে আজ আশ্রমের এই মধুময় উৎসবকে।’

       ১৯৪৬ সালে বসন্তোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০ মার্চ তারিখে। আর সকালের মূল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ‘ফাল্গুনী’ থেকে কিয়দংশ পাঠ করার পর এবহর ‘বসন্তোৎসবের মর্মকথা’ ব্যাখ্যা করেছিলেন।

       এখনকার মতো তখনও ছিল এক-একটা রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে এক-একটা নাচ। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্র জীবনী’-র চতুর্থ খণ্ড থেকে সেবারের অনুষ্ঠানের বিবরণ পাওয়া যায়। ‘কে দেবে চাঁদ, তোমায় দোলা’ এবং ‘তোমার বাস কোথা হে পথিক’ গানদুটির সঙ্গে অন্যান্যদের সঙ্গে নেচেছিলেন ছাত্রী ইন্দিরা। সুজাতা মিত্রের একটি স্মৃতিচারণায় জানা যায়, “বসন্তোৎসবের জন্য উত্তরায়ণে ‘উদয়ন’ বাড়িতে গুরুদেবের নির্দেশনায় অনেক-দিন ধরে মহড়া চলত। – মাস্টারমশাইরা সুন্দর করে আম্রকুঞ্জ সাজিয়ে দিতেন। মাঝখানের বেদীতে থাকত গুরুদেবের বসার আসন। তার পাশে ক্ষিতিমোহন সেন এবং অন্যান্য আমন্ত্রিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বসতেন। কলাভবনের ছেলেরা অনেকদিন ধরে পরিশ্রম করে সারা আম্রকুঞ্জ আল্পনায় ভরিয়ে দিত। – যে মেয়েরা নাচতে পারত, তারাই নাচে যোগ দিত। নাচের মেয়েদের সাজিয়ে দিতেন কলাভবনের মাস্টারমশাইরা। আমরা হলুদ কাপড় পরে হাতে নিতাম আবির ও ফুল। প্রসেশন করে পুরোনো লাইব্রেরির বারান্দার কাছে এসে নাচ শুরু করতাম, নাচতে নাচতে এগিয়ে যেতাম আম্রকুঞ্জের দিকে। ‘খোল্ দ্বার খোল্’ গানের সঙ্গে আম্রকুঞ্জের আল্পনাকে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে শেষ হত আমাদের নাচ।”

       ১৯৩৬ সালের ৮ মার্চ দোল পূর্ণিমার দিনে পালিত হয় বসন্তোৎসব। সদ্যপ্রয়াত কমলা নেহরুর স্মরণে কবি সেদিন ভাষণ দেন।

       এই ১৯৪০-এই কবি শেষবারের মত এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ১৯৪১-এ অসুস্থতার মধ্যেও কবি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এই শেষ বসন্তোৎসব উপলক্ষেই কবি লেখেন ‘জন্মদিনে’ কাব্যগ্রন্থের ৪ সংখ্যক কবিতাটি। “আর বার ফিরে এল উৎসবের দিন।/ – /এ বৎসরে বৃথা হল পলাশবনের নিমন্ত্রণ।/”

       পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও উৎসবেই এই ধারাই বজায় ছিল বেশকিছুকাল। বর্তমানে উৎসবের রীতি কিছুটা বদলে গেলেও তার স্বকীয়তা এবং জৌলুস এক বিন্দুও কমেনি।

সহায়ক গ্রন্থাবলী

১.     প্রমথনাথ বিশী, পুরানো সেই দিনের কথা, মিত্র ও ঘোষ, ২০০৫

২.     শান্তিদেব ঘোষ, স্মৃতি ও সঞ্চয় (আলপনা রায় সম্পা.), দে’জ, ২০১৩

৩.     পঞ্চানন মণ্ডল, সেকালের শান্তিনিকেতন প্রাত্যহিক ডায়রি ১৯৩৬-১৯৩৮, সুবর্ণরেখা, ২০১৭

৪.     প্রণতি মুখোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন ও অর্ধশতাব্দীর শান্তিনিকেতন, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৪০৬

৫.     সুতপা ভট্টাচার্য (সম্পা.), আমাদের শান্তিনিকেতন শতবর্ষের আলোয়, বন্ধুসভা, ২০০১