গুরু আমুবী সিংয়ের নৃত্যশৈলী

সায়ন্তনী চৌধুরী

গুরু আমুবী সিংয়ের নৃত্যশৈলী

ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অপূর্ব সুন্দর নৃত্যশৈলী হল মণিপুরী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম মণিপুরী নৃত্য দেখেছিলেন তখন এটি তার সমস্ত সৌন্দর্য্য, কাবধর্মিতা ও ভাবের আবেদন নিয়ে কবির চিত্তবীণায় নাড়া দিয়েছিল। মণিপুরের বাইরে নৃত্য প্রচারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে গুরু আমুবী সিং এটিকে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বের করে শুধুমাত্র শিল্পের খাতিরে মঞ্চে পরিবেশনার উপযুক্ত করে তোলায় ও মণিপুরের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় এর প্রচারে এক বিরাট পদক্ষেপ নেন। তাঁর নৃত্য রচনার কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।

    জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’র হরিরিহমুগ্ধব’ রচনাটির উপর গুরুজীর নৃত্যরচনায় “গোপবধূরনু গায়তি….রাগম” অংশটিতে যেখানটা ঐ স্তবকটা শেষ হয়ে পরের স্তবক ‘কাপি বিলাসবিলোলবিলোচন’ শুরু হয়েছে সেখানে বসা থেকে ওঠাটা খুব শিল্পসম্মত। ওখানেই তাঞ্চেপ তালের আগের আবর্তন শেষ হয়ে পরের আবর্তন শুরু হচ্ছে, গানে পরের স্তবকটি শুরু হচ্ছে (অর্থাৎ নতুন বর্ণনা শুরু হচ্ছে) তার সঙ্গে বসা থেকে ঘুরে ঘুরে ওঠা শুরু হচ্ছে। তার ঠিক আগের আর্বতনের শেষ মাত্রায় বাঁ পা ফেলে বসা হচ্ছে। তাল, কাব্য ও movement-এর এত precise সমাপতন আমার মতে খুব সৌন্দর্য্যপূর্ণ। গুরুজীর নৃত্যচরনাগুলি দেখলে আমার ব্যক্তিগতভাবে ওনাকে খুব precise ভাবে কাজ করা ও perfectionist মানুষ বলে মনে হয়।

    আমার ধারণা শিল্পের একটি শাখার মাধ্যমে প্রকাশ করা বিষয়বস্তুকে অন্য শাখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে হলে প্রয়োজনীয় বদল আনতে হয়। কারণ একই বিষয়বস্তু শিল্পের একটা শাখার মাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ করলে ভাল লাগে অন্য শাখার মাধ্যমে হুবহু সেই একইভাবে প্রকাশ করলে ভাল নাও লাগতে পারে। যেমন কোনো উপন্যাস থেকে সিনেমা বানাতে গেলে উপন্যাসটিকে হুবহু অনুসরণ করলে অনেক সময় সিনেমাটা ভালমতো বানানো যায় না। কারণ সাহিত্য ও চলচ্চিত্র শিল্পের দুটি আলাদা শাখা। এটা গুরুরীর রচনাগুলিতেও দেখা যায়। যেমন ‘শ্রিতকমলা’তে “কালিয় বিষধরগঞ্জন জনরঞ্জন” এই অংশতে শ্লোকের মানে কালীয়সর্পকে দমনকারী, জনমনোরঞ্জন। গুরুজী এখানটা কাব্যের ভাষাকে হুবহু অনুসরণ করেননি। নৃত্য যেহেতু শিল্পের অন্য একটি শাখা, তাই কালিয়নাগ যে আসছে ও নর্তকী (ভক্ত) তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে এইটুকুই দেখিয়েছেন। কারণ এর বেশী দেখালে ভাল লাগত না, হয়ত তালের মধ্যে দেখানোও যেত না।

    গুরু আমুবীর নর্তনশৈলীতে কবজি ও গলার movement ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ ও সুন্দর। দশাবতারের “ক্ষত্রিয়রুধিরময়ে” অংশে বামনের বর্ণনা শেষ হয়ে পরশুরামের বর্ণনা যেখানে শুরু হচ্ছে সেখানে তাল তাঞ্চেপ থেকে তেওড়া হচ্ছে, লয়টা দ্রুত হচ্ছে এবং হঠাৎ করে একটি বাকী শরীরসহ গলার movement এই অংশটিতে নাটকীয় করে তুলছে ও mood-টা বদলে দিচ্ছে। কারণ পরশুরামের বর্ণনায় রৌদ্ররস রয়েছে, উপরন্তু তেওড়া তালের মধ্যে একটা spirit ও আছে। এছাড়া ‘শ্রিতকমলা’তে রামের বর্ণনাতে (“অমলকমলদললোচন”) ‘লোচন’ – এর জায়গাটা কব্জি না ভেঙে চোখ দেখালে সেটা শৃঙ্গাররসপূর্ণ (erotic) হয়ে যেত বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। দশাবতারে কল্কি অবতারের বর্ণনায় (“ধুমকেতুমিব”তে) ধূমকেতু দেখানোর সময়ও কব্জি  ভাঙ্গাটা আমার খুব সংযত ও রুচিসম্মত বলে মনে হয়েছে। Dance is stylized body language. গুরুজীর রচনাগুলি দেখলে এটাও বোঝা যায় যে ওনার body language – এর sense খুব ভাল ছিল। 

গুরুজী নিজে মণিপুরী নাচের সঙ্গে গানের সুরও রচনা করতেন। এ প্রসঙ্গে গুরু দেবযানী চালিহার লেখা ‘Maisnam Guru Amubi Singh’ বইটির থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি, “Guruji was a great singer, being trained in the Sankirtana tradition. Early in the morning with a shovel in hand, he would take care of the garden while humming a tune. His imaginative mind was always alert. I discovered that he composed songs while tending to the garden.” অতএব, মণিপুরী নাচের গানে ওনার নিজস্ব কিছু সংযোজন থাকতেই পারে।

    মণীপুরে তিনজন প্রধান নৃত্যগুরু ছিলেন। ওজা  মৈষ্‌নাম আমুবী সিং, ওজা আতন্বা সিং ও ওজা আমুদোন শর্মা। গুরু আমুবী সিংকে এই তিনজনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়। আজ কবিগুরুর গানের মাধ্যমেই তাঁর রচনা সম্পর্কে বলি, তাঁর রচিত নৃত্যগুলি দেখলে মনে হয়,

“মুগ্ধ নয়ন মম, পুলকিত মোহিত মন।।”

[বিশিষ্ট গুরু লাইসরাম মঙ্গোলজাও সিং এবং চৌবু শর্মার অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, গুরু আমুবি সিং (ওজা আমুবি নামেও পরিচিত) মণিপুরী নৃত্যের ক্ষেত্রে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এমন একটি সময়ে যেখানে দেশের বাকি অংশে এই নৃত্য ধারার খুব বেশি প্রকাশ ছিল না, আমুবি সিং ইম্ফল থেকে মণিপুরী নৃত্য শেখাতে এসেছিলেন এবং উদয় শঙ্করের একাডেমির সাথে যুক্ত ছিলেন। একজন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ছাড়াও, তিনি অনেক রকলের সঙ্গীত ও নৃত্য চর্চা করেছেন এসব তত্ব অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সুপরিচিত সুরকার।

১৯৫৪ সালে যখন জেএন মণিপুর ড্যান্স একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন আমুবি সিং এর প্রথম সুপারভাইজার হন। তিনি ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রীয় সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার এবং১৯৭০ সালে পদ্মশ্রী পান।

গুরু। মাইসনাম আমুবি সিং ছিলেন সমস্ত ম্যান ইপুরির মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর নৃত্য গুরু যারা নৃত্য সিংয়ের মণি-পুরি শৈলীর সৃজনশীল বিবর্তনে একটি নতুন অভিযোজন দিয়েছেন। তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা ভক্তের প্রতি তাঁর বিশ্বাসের সাথে মিলিত হয়েছিল। তাঁর কাছে নৃত্য ছিল নিছক বিনোদন নয় বরং একটি বিরল সাধনা। এটা ঈশ্বর উপলব্ধি করার একটি উপায় ছিল। তিনি সাহসী উদ্ভাবনশীলতা দিয়ে এর শিল্পের ঐশ্বর্য পুনঃআবিষ্কার করেছিলেন। তার নতুন রচনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধুমাত্র মণিপুরের শৈল্পিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেনি বরং ভারতীয় নৃত্যের সমসাময়িক আন্দোলনকেও গতি দিয়েছে।]

সায়ন্তনী চৌধুরী

Mobile No. : 8697053872

E-mail ID : scpritea@gmail.com প্রাক্তনী, রবীন্দ্রভারতী, নৃত্য বিভাগ

তথ্যসূত্র

১।http://snarepository.nvli.in/bitstream/123456789/3271/1/JSNA%2868%2939-41.pdf

২। https://bn.wikipedia.org/wiki/গুরুবিপিনসিংহ

৩।https://lokogandhar.com/শান্তিনিকেতনের-নৃত্য-ধার/

৪।https://sunitidebnath.blogspot.com/2018/06/blog-post.html









Read more

সত্যেন মৈত্র ও সাক্ষরতা আন্দোলন

   -শক্তি মণ্ডল স্বাধীনতা-উত্তরকালে এদেশে সাক্ষরতা তথা আ-বাঁধা শিক্ষাকে সত্যেন মৈত্র এক সুসংহত তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে গেছেন। দেশজুড়ে তার রূপায়ণে রেখে গেছেন অনন্য অবদান। আবিষ্কার করেছেন প্রাপ্ত বয়স্ক নিরক্ষদের শেখানোর জন্য ‘সারগ্রাহী’ পদ্ধতি। তৈরি করেছেন তাদের শেখানোর জন্য অতুলনীয় প্রাইমার ও বহুবিধ শিক্ষা উপকরণ। নিপীড়িতদের কাছে শিক্ষাগত ফ্রন্টে লড়াইয়ের জন্য রেখে গেছেন ধারালো … Read more

ভাদু গান, ভাদু নাচ : আদিবাসী পরব থেকে সাধারণের লোক উৎসব

দেবাশিস মণ্ডল বাংলার রাঢ় অঞ্চলে যেসব লোক উৎসব ব্রত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান সাধারণভাবে বেশিরভাগ মানুষ পালন করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ভাদু উৎসব। প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়, বর্ধমান জেলার পশ্চিম অংশে এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের কিছু অঞ্চলে ভাদু উৎসব হয়ে থাকে। ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকেই এই উৎসবের সূচনা … Read more

A Socio-Political Debate on the Crisis of Humanity and Tagore’s View

Dr. Rajshree Bhattacharya, Bengal Music College “Naginira charidike feliteche bishakto niswas,Shantir lalit bani shonaibe byartha parihas—Biday nebar age taiDak diye jaiDanober sathe jara sangramer tarePrastut hoteche ghore ghore.”(Prantik, Poem 18) “নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাসশান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—বিদায় নেবার আগে তাইডাক দিয়ে যাইদানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরেপ্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।”(প্রান্তিক, কবিতা ১৮) Introduction … Read more

Humanistic Philosophy of Lalon and Tagore Song

Dr. Srabani Sen, Associate Professor, Department of Music, Tarakeswar Degree College, Tarakeswar, Hooghly, e-mail-srabanisn1@gmail.com Mobile no- 6290242709 Dr. Srabani Sen Assistant Professor, Department of Music, Tarakeswar Degree College, Tarakeswar, Hooghly e-mail-srabanisn1@gmail.com Mobile no- 6290242709 Baul is a secular sect ( Lokayata Darsana). Baul the popular cultural way of life, is mainly dependent upon songs which … Read more

Contents

Volume III. No. IV. : July-August 2021 Angashuddhi : Bharatnatyam Dance -NrityaChuramani Rahul Dev Mondal  Page 1-4 রাঢ় বাংলার লোকসংগীতে আধুনিকতা-দেবাশিস মণ্ডল Page 9-14 শিশুশিক্ষার উপকরণে ছন্দ : বিদ্যাসাগর ও আধুনিক প্রজন্ম Page 15-16 চিত্তপটে নাট্যভাবনা-কৃষ্ণপদ দাস Page 17-29 ঠাকুরবাড়ির দুই সংগীত বিদুষী : প্রতিভা ও ইন্দিরা– ড. জয়ন্তী মণ্ডল Page 30-35 ইউরোপের ঐতিহ্য, শিক্ষা … Read more

Angashuddhi : Bharatnatyam Dance

Author  : NrityaChuramani Prof. Rahul Dev Mondal ( Assistant Professor , Rabindra Bharati University, Department of Dance  ) Bharatanatyam dancer is said to possess Angashudhi. Anga meaning body parts, and shudhi means perfection or purity. The Natyashastra has shlokas describing how to perform all the above movement. Anagalakshana means the way of moving the body … Read more

রাঢ় বাংলার লোকসংগীতে আধুনিকতা

দেবাশিস মন্ডল বহুকাল আগেই বাংলায় নগরায়ণ শুরু হয়েছিল। সেসময় এই নগরায়ণে স্থানীয় মানুষদের ও দেশজ উপকরণের  প্রাধান্য ছিল বেশি। ফলে লোক সংস্কৃতির উপকরণের বৈপরিত্য ঘটেনি। ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নয়ন সাধনের ফলে সারা বিশ্বে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে বাংলায় ইংরেজদের বানিজ্য ও ভারত … Read more

শিশুশিক্ষার উপকরণে ছন্দ : বিদ্যাসাগর ও আধুনিক প্রজন্ম

দেবাশিস মণ্ডল লেখাপড়া শেখার শুরুতে ছড়া গান, কবিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি সারা পৃথিবীতে সব ভাষাতেই প্রচলিত পদ্ধতি। ছন্দে পাঠ স্মৃতিতে সহজেই স্থান করে নেয় বলেই প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণ রচয়িতারা অনেক জটিল নীতিকথাও ছন্দের মাধ্যমে শিশু কিশোরদের অন্তরে প্রবেশ করিয়ে দেবার জন্য সচেষ্ট হন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও তাই করেছেন। তার বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ এ স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণগুলি … Read more