January 1, 2022

বাংলার লোকনাট্য

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

সারসংক্ষেপ

বাংলার লোকসংস্কৃতির বিপুল ভাণ্ডারে লোকনাট্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ এখনও তুলনামূলকভাবে কম-আলোচিত শিল্পধারা। গান, সংলাপ, অভিনয়, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, আঞ্চলিক ভাষা, লোকবিশ্বাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশকের তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা—এই সবকিছুর মিলিত প্রয়াসে বাংলার নানা অঞ্চলে লোকনাট্যের যে রূপগুলি গড়ে উঠেছে, সেগুলিকে একটিমাত্র নান্দনিক ছাঁচে ফেলা যায় না। আলকাপ, গম্ভীরা, বোলান, লেটো, ডোমনি, কুশান পালা, বিষহরা পালা, বানবিবির পালা, পালাটিয়া, ঝুমুর-পালা, খন প্রভৃতি রীতিতে এই বহুরূপী ঐতিহ্যের পরিচয় মেলে।

কোনও কোনও রূপের সঙ্গে আচার ও লোকধর্মের সম্পর্ক গভীর; কোনওটি পৌরাণিক আখ্যাননির্ভর; কোথাও সামাজিক ব্যঙ্গ মুখ্য; আবার কোথাও সমকালীন জনজীবনের সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে নাট্যরূপ লাভ করে। উত্তরবঙ্গের পালাটিয়া, কুশান ও বিষহরা পালায় গীতিকাহিনি, বর্ণনা, সংলাপ এবং অভিনয়ের একটি বিশেষ সমন্বয় দেখা যায়। গম্ভীরা আবার সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।

এই প্রবন্ধে প্রথমে ‘লোকনাট্য’ ধারণাটির পরিসর নির্ধারণ করে বাংলার প্রধান গীতিনাট্যধর্মী লোকনাট্যের আঞ্চলিক বিস্তার, বিষয়বৈচিত্র, সুর, তাল, নৃত্য, ভাষা, চরিত্রায়ন এবং অভিনেতা-দর্শকের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরে নগরায়ণ, গণমাধ্যমের প্রসার, পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তন, শিল্পীদের পেশাগত অনিশ্চয়তা, আঞ্চলিক ভাষার ক্ষয়, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং পরিবেশনার সময় কমে আসার ফলে লোকনাট্যের যে পরিবর্তন ঘটছে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এই পরিবর্তনকে সরলভাবে ‘অবক্ষয়’ বলে দেখার পরিবর্তে লোকসংস্কৃতির স্বাভাবিক অভিযোজনের অংশ হিসেবে বোঝার প্রয়োজনীয়তাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সঙ্গীত ও নাট্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক একাডেমি এবং ডিজিটাল সংগ্রহশালার সমন্বিত ভূমিকার একটি সম্ভাব্য কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।

মূল বক্তব্য হল—লোকনাট্যের সংরক্ষণ মানে কেবল পুরনো পালার লিখিত বা অডিও-ভিডিও রেকর্ড রেখে দেওয়া নয়। শিল্পী, সম্প্রদায়, ভাষা, সুর, তাল, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, পরিবেশনার স্থান ও কাল, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত জ্ঞান—সবকিছুকেই একসঙ্গে ধরে রাখতে হবে। লোকনাট্যকে জীবন্ত রাখতে হলে সংরক্ষণ ও সৃজনশীল পুনর্নির্মাণের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি।

মূলশব্দ: লোকনাট্য, লোকনাট্য, আলকাপ, গম্ভীরা, বোলান, লেটো, ডোমনি, কুশান পালা, পালাটিয়া, লোকসঙ্গীত, পরিবেশনবিদ্যা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, লোকশিক্ষা।

ভূমিকা

বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাস আসলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রারই ইতিহাস—তাদের বিশ্বাস, শ্রম, উৎসব, দুঃখ, আনন্দ, সামাজিক সম্পর্ক এবং চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের ইতিহাস। লিখিত সাহিত্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চার বাইরে গ্রামীণ ও প্রান্তিক সমাজ নিজেদের জীবন-অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে গান, পালা, কাহিনি, নৃত্য, অভিনয়, ছড়া, কথোপকথন এবং আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এই বহুমুখী প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল লোকনাট্য।

‘লোকনাট্য’ কথাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্য একটি পদ্ধতিগত সতর্কতা দরকার। বাংলার সব লোকনাট্য গীতিনাট্য নয়; আবার সব পালাগানও নাট্যরূপ লাভ করে না। কোথাও গান কাহিনিকে বহন করে, কোথাও সংলাপ কাহিনির গতি নির্ধারণ করে, কোথাও নৃত্য নাট্যক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ, আবার কোথাও কোনও আচারই সমগ্র পরিবেশনার কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই প্রবন্ধে ‘লোকনাট্য’ বলতে এমন লোকপরিবেশনাকে বোঝানো হয়েছে যেখানে গান ও নাট্যক্রিয়া পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয় এবং সংগীত, সংলাপ, অভিনয় ও নৃত্য মিলিতভাবে কাহিনি অথবা সামাজিক বক্তব্য প্রকাশ করে।

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সাংস্কৃতিক নথিতে লোকনাট্যের বিভিন্ন রূপকে ‘পালা’ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে আলকাপ, কুশান পালা, মনসামঙ্গল প্রভৃতির পাশাপাশি গম্ভীরা ও ডোমনির মতো সামাজিক ব্যঙ্গধর্মী রূপেরও উল্লেখ রয়েছে। লোকনাট্যকে সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা, আকাঙ্ক্ষা ও অভিযোগ প্রকাশের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়েছে।

এই দৃষ্টিতে বাংলার লোকনাট্যকে শুধু ‘গ্রামীণ বিনোদন’ বলা তার প্রকৃত সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে খর্ব করে। এর মধ্যে বিনোদন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে লোকস্মৃতি, সামাজিক যোগাযোগ, নৈতিক শিক্ষা, সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং কখনও কখনও প্রতিবাদের ভাষা।

লোকনাট্যকে তাই কেবল লিখিত ‘পাঠ’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি মূলত একটি জীবন্ত পরিবেশন-ঘটনা। গায়ক, অভিনেতা, বাদ্যযন্ত্রী, দর্শক, স্থান, সময়, পোশাক, আলো, নৃত্য এবং তাৎক্ষণিক সংলাপ—সব মিলিয়েই একটি পরিবেশনা সম্পূর্ণ হয়।

লোকনাট্যের সামাজিক পরিবেশ, সম্প্রদায়গত অংশগ্রহণ, ধর্মীয় সহাবস্থান, জীবিকা, আঞ্চলিক পরিচয় এবং পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতিও এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার Chain সম্প্রদায়ের মৌখিক সাহিত্য ও পরিবেশনাশিল্প নিয়ে Chanchal Adhikary-এর মাঠসমীক্ষাভিত্তিক গবেষণায় গম্ভীরা, ঝুমুর ও আলকাপের মতো ধারার উল্লেখ রয়েছে। এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে লোকশিল্পকে তার সম্প্রদায়গত জীবন ও পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না।¹

বাংলার লোকনাট্যের শ্রেণিবিন্যাস

বাংলার লোকনাট্যকে একটি মাত্র মানদণ্ডে শ্রেণিবদ্ধ করা কঠিন। বিষয়, পরিবেশনের উদ্দেশ্য, আচারগত সম্পর্ক, সংগীত, ভাষা, নাট্যরীতি কিংবা ভৌগোলিক বিস্তার—প্রতিটি দিক থেকেই আলাদা আলাদা শ্রেণি তৈরি করা যায়। আবার এই শ্রেণিগুলি পরস্পর সম্পূর্ণ পৃথকও নয়। একটি পালায় পৌরাণিক কাহিনি, সামাজিক বক্তব্য এবং সমকালীন ব্যঙ্গ একই সঙ্গে থাকতে পারে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকবিদ্যা পাঠ্যক্রমেও বাংলার নির্বাচিত লোকনাট্যরূপের তালিকায় বোলান, আলকাপ, লেটো, বানবিবি, মাচানি, গম্ভীরা, কুশান, ডোমনি এবং খনের উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং লোকনাট্যকে স্থির ও বন্ধ শ্রেণির মধ্যে না দেখে একটি চলমান সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

বাংলার প্রধান লোকনাট্যের বিস্তৃত রূপবিশ্লেষণ

আলকাপ

বাংলার লোকনাট্য-সংস্কৃতিতে আলকাপ একটি উল্লেখযোগ্য গীতিনাট্যধর্মী রূপ। মূলত মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং সংলগ্ন অঞ্চলে এর বিকাশ ঘটেছে। গান, নৃত্য, অভিনয়, সংলাপ, কৌতুক এবং সামাজিক ব্যঙ্গ—সব মিলিয়ে আলকাপের পরিবেশনা গড়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক নথিতেও আলকাপকে লোকনাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সাধারণত একটি দল আলকাপ পরিবেশন করে। দলের মধ্যে মূল গায়েন, দোহার, বাদ্যযন্ত্রী এবং বিভিন্ন চরিত্রাভিনেতার ভূমিকা থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে ‘ছোকরা’ চরিত্র আলকাপের একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য। পুরুষ শিল্পীর নারীসুলভ পোশাক, অঙ্গভঙ্গি ও নৃত্যভঙ্গির মধ্য দিয়ে যে অভিনয়রীতি তৈরি হয়, তা একদিকে হাস্যরস সৃষ্টি করে; অন্যদিকে লোকসমাজে লিঙ্গ-পরিচয়ের অভিনয়মূলক নির্মাণের একটি আকর্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। আলকাপের কাহিনির উৎসও একরৈখিক নয়। পৌরাণিক বা ধর্মীয় কাহিনির পাশাপাশি প্রেম, বিবাহ, দাম্পত্য, দারিদ্র্য, মহাজনি শোষণ, সামাজিক ভণ্ডামি এবং সমকালীন ঘটনাও পালার বিষয় হয়েছে। যে বিষয় কোনও নির্দিষ্ট সময়ে দর্শকের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়, সেটিই নতুন পালায় ঢুকে পড়তে পারে। এই বিষয়-পরিবর্তনশীলতাই আলকাপের প্রাণ।

গানের মধ্য দিয়ে কখনও কাহিনির ভূমিকা তৈরি হয়, কখনও চরিত্রের আবেগ প্রকাশ পায়, কখনও বা এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। দোহার সমবেত কণ্ঠে গানের পুনরাবৃত্তি এবং আবহ নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ঢোল, করতাল, হারমোনিয়াম, বাঁশি কিংবা স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র ছন্দ ও নাটকীয়তা বাড়িয়ে দেয়। আলকাপের অন্যতম বড় শক্তি তার তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতা। পরিবেশকেরা দর্শকের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সংলাপ, রসিকতা কিংবা ব্যঙ্গের ধরন বদলে নিতে পারেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় আলকাপের এই তাৎক্ষণিকতা, ব্যঙ্গ এবং লোক-উৎসবধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে।² তাই আলকাপকে কেবল ‘হাসির লোকনাট্য’ বলে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। হাসির আড়ালেই সেখানে গ্রামীণ সমাজের আত্মসমালোচনা, সামাজিক অসঙ্গতির উন্মোচন এবং ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করার প্রবণতা কাজ করে।

গম্ভীরা

গম্ভীরা বাংলার লোকনাট্যধর্মী ঐতিহ্যের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-ব্যঙ্গাত্মক রূপ। এর সঙ্গে মালদহ অঞ্চলের চৈত্রসংক্রান্তি, গাজন এবং শিব-উপাসনার সম্পর্ক রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীরা ধর্মীয় আচারকেন্দ্রিক পরিবেশনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমকালীন সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। গম্ভীরার সবচেয়ে পরিচিত নাট্যকাঠামো ‘নানা-নাতি’। নানা অভিজ্ঞ প্রবীণ; নাতি প্রশ্ন করে, জানতে চায়, কখনও সরলভাবে আবার কখনও কৌতুকের মাধ্যমে কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে। নাতির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নানা সমাজের নানা অসঙ্গতির কথা বলেন। এই প্রশ্নোত্তরের কাঠামো গম্ভীরাকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য করে তুলেছে।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কৃষকের সমস্যা, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় প্রশাসন, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনা—সবই গম্ভীরার বিষয় হতে পারে। তবে এগুলি সাধারণত বক্তৃতার ভাষায় আসে না। গান, হাস্যরস, প্রশ্নোত্তর ও ব্যঙ্গের মধ্য দিয়েই বক্তব্য প্রকাশ পায়। গম্ভীরার সংগীতে পুনরাবৃত্ত সুরাংশ, ছন্দময় সংলাপ এবং সমবেত কণ্ঠের গুরুত্ব আছে। গান কখনও বক্তব্যের ভূমিকা তৈরি করে, কখনও বক্তব্যকে সংহত করে, আবার কখনও ব্যঙ্গের ধার বাড়ায়।

গম্ভীরার বিশেষ শক্তি হল স্থানীয়তার সঙ্গে সমকালীনতার যোগ। কোনও অঞ্চলের সদ্যঘটা ঘটনা পরবর্তী পরিবেশনায় পালার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই গম্ভীরা স্থির কোনও ঐতিহাসিক রূপ নয়; তার জীবনীশক্তি অনেকখানি নিহিত রয়েছে বর্তমানের সঙ্গে তার কথোপকথনে।³

গম্ভীরার সামাজিক পরিসরও লক্ষণীয়। গবেষণায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শিল্পীর অংশগ্রহণের কথা পাওয়া যায়। ফলে গম্ভীরা শুধু একটি লোকনাট্য নয়; লোকসমাজে পারস্পরিক সহাবস্থান ও জনমত প্রকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

বোলান

বোলান মূলত বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও সংলগ্ন অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি লোকপরিবেশনাধারা। গাজন, চৈত্রসংক্রান্তি এবং শৈব লোকবিশ্বাসের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। তবে অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে বোলানের পরিবেশনরীতি ও বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। বোলানের প্রধান বৈশিষ্ট্য দলগত গান ও নাট্যপরিবেশনার মিলন। একটি দল গান করতে করতে অগ্রসর হয় এবং কোনও নির্দিষ্ট কাহিনি বা ঘটনাকে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করে। ফলে গান এখানে নিছক শ্রুতিনির্ভর নয়; দেহভঙ্গি ও নাট্যক্রিয়াও তার সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত। বোলানের কাহিনিতে পৌরাণিক বিষয়ের প্রাধান্য থাকলেও সামাজিক অভিজ্ঞতা ক্রমশ প্রবেশ করেছে। দেবদেবী, লোকবিশ্বাস, নৈতিকতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানুষের নানা সংকটও এর বিষয় হতে পারে।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সমবেত কণ্ঠের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঢোল, করতাল, খোল, মন্দিরা প্রভৃতি তালবাদ্য পরিবেশনার গতি ও আবেগ বাড়িয়ে তোলে। বোলানের একটি বিশেষ দিক হল আচার থেকে নাট্যরূপে উত্তরণের প্রক্রিয়া। সেই কারণে একে শুধু লোকনাট্য হিসেবে না দেখে লোকধর্ম, উৎসব এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।

লেটো

লেটো রাঢ় অঞ্চলের লোকনাট্যধর্মী গান ও পালার একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য। গান, অভিনয়, নৃত্য, সংলাপ এবং কৌতুক—সব মিলিয়ে এর পরিবেশনা তৈরি হয়।

লেটোর নাট্যকাঠামো সাধারণত লিখিত নাটকের মতো কঠোর নয়। মৌখিক স্মৃতি ও দলগত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পালা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছয়। ফলে একই পালার একাধিক আঞ্চলিক বা শিল্পীভেদে সংস্করণ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় কাহিনি এবং হাস্যরস লেটোর বিষয়ের মধ্যে আসে। বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনই কাহিনির মূল ভিত্তি। লেটোর সঙ্গীতে স্থানীয় সুরভাষা এবং তালপ্রধানতা লক্ষণীয়। নৃত্য কেবল গানের সঙ্গে যুক্ত অলংকার নয়; চরিত্রের আবেগ, পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং নাট্যঘটনার গতি প্রকাশের মাধ্যম। মৌখিক সৃষ্টিশীলতাই লেটোর বড় শক্তি। লিখিত পাঠের অনুপস্থিতি সবসময় দুর্বলতা নয়; অনেক সময় তা পরিবেশককে নিজের মতো করে পালাকে রূপ দেওয়ার স্বাধীনতা দেয়।

ডোমনি

ডোমনি মালদহ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক লোকনাট্য। গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সম্পর্ক, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক অসঙ্গতি হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকাশ করা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সংসারের দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সামাজিক কৌতুক এবং গ্রামীণ জীবনের নানা অসামঞ্জস্য ডোমনির কাহিনিতে স্থান পায়। ডোমনির ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব আলাদা করে উল্লেখ করা দরকার। আঞ্চলিক কথ্যভাষা, বাগধারা, প্রবাদ এবং স্থানীয় রসিকতা এর প্রাণশক্তি। এই ভাষাকে সরিয়ে প্রমিত বাংলায় ডোমনিকে মঞ্চস্থ করলে কাহিনি হয়তো থাকবে, কিন্তু তার সামাজিক স্বাদ অনেকটাই হারিয়ে যাবে। সরকারি সাংস্কৃতিক নথিতে ডোমনির ঐতিহ্যগত পরিবেশনার পাশাপাশি আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রবেশ এবং পরিবেশনার সময় কমে আসার মতো পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে। এই পরিবর্তনের দুই দিক আছে। একদিকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে পুরনো সুর, বাদ্যযন্ত্র, ভাষা এবং দীর্ঘ পালার অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

কুশান পালা

উত্তরবঙ্গের লোকনাট্য ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপ কুশান পালা। নামের সঙ্গে রামায়ণের লব-কুশ কাহিনির সম্পর্ক থাকলেও সময় ও অঞ্চলভেদে এর বিষয়বস্তু বিস্তৃত হয়েছে। কুশানের মূল শক্তি গীতিকাহিনি ও নাট্যকাহিনির সংযোগে। মূল পরিবেশক বা গায়ক কাহিনি বর্ণনা করেন; তারপর চরিত্ররা সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে সেই কাহিনিকে দৃশ্যমান করে তোলে। কুশানের গানে পয়ার-জাতীয় ছন্দ এবং আখ্যানধর্মী গীতিরীতি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরবঙ্গের লোকনাট্য নিয়ে গবেষণায় গান, বর্ণনা, সংলাপ ও অভিনয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।⁴ দোতরা-জাতীয় তারবাদ্য, ঢোল, করতাল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। সুরের মধ্যেও উত্তরবঙ্গের লোকসংগীতের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায়। কুশানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল বর্ণনাকারী। তিনি শুধু গান করেন না; দর্শককে কাহিনির সঙ্গে ধরে রাখেন, ঘটনার ব্যাখ্যা দেন এবং নাট্যপরিবেশনের মধ্যে সেতুর কাজ করেন। সেই অর্থে কুশান একদিকে লোকসঙ্গীত, অন্যদিকে আখ্যাননির্ভর নাট্যরীতির একটি সুন্দর সংযোগস্থল।

পালাটিয়া

পালাটিয়া উত্তরবঙ্গের একটি স্বতন্ত্র লোকনাট্যধর্মী রূপ। পালাগান, সংলাপ, অভিনয় এবং সংগীতের সমন্বয়ে এর পরিবেশনা গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পালাটিয়ার সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পরিবেশনরীতিকে উত্তরবঙ্গের অন্যান্য লোকনাট্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়েছে।⁵

এর কাহিনির কেন্দ্রে সাধারণত সামাজিক জীবন, প্রেম, পরিবার, সংঘাত ও নৈতিকতার প্রশ্ন থাকে। কখনও পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক প্রসঙ্গও প্রবেশ করে। এখানে গান কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর উপায়। সংলাপ চরিত্রের দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে এবং অভিনয় সেই দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করে। পালাটিয়া নিছক গান নয়, আবার প্রচলিত যাত্রাও নয়। এর নিজস্ব লোকভাষা, গীতিরীতি, অভিনয় এবং পরিবেশন-প্রেক্ষিত রয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্যই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

বিষহরা পালা

উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বিষহরা পালার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। এর কেন্দ্রে মনসা-সংক্রান্ত লোকবিশ্বাস এবং সাপের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। ধর্মীয় বিশ্বাস এই পালার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও এর মধ্যে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বিপদ, মৃত্যু, পরিবার, দাম্পত্য এবং ভাগ্য সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। বিষহরার গানে আখ্যানধর্মী প্রবণতা প্রবল। গায়ক কাহিনি বর্ণনা করেন; নির্দিষ্ট চরিত্রের অংশে সংলাপ ও অভিনয় যুক্ত হয়। এর নৃতাত্ত্বিক গুরুত্বও কম নয়। সাপকে ঘিরে মানুষের ভয়, বিশ্বাস, রোগ, মৃত্যু এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যা এখানে একত্রিত হয়েছে। ফলে বিষহরা কেবল পৌরাণিক কাহিনির পালা নয়; প্রকৃতি ও ঝুঁকির সঙ্গে লোকসমাজের সম্পর্কের একটি সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাও বটে।

মনসামঙ্গল-ভিত্তিক পালা

মনসামঙ্গল বাংলার লোকসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী আখ্যানভাণ্ডার। মনসা, চাঁদ সদাগর, বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গান, পালা ও নাট্যরূপে পরিবেশিত হয়েছে। এই পালার বড় তাৎপর্য দেবতা ও মানুষের সম্পর্কের নাট্যায়নে। চাঁদ সদাগরের অহংকার, মনসার স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং বেহুলার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে এখানে শক্তিশালী নাট্যসংঘাত তৈরি হয়। বেহুলা চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কেবল স্বামীনিষ্ঠ নারী নন; দীর্ঘ যাত্রা, বিপদ এবং সামাজিক ও অতিপ্রাকৃত বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এক সক্রিয় চরিত্র। সেই কারণে মনসামঙ্গল পালাকে নারীর ভূমিকা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লোকআখ্যান—এই তিনটি দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা যায়।

বনবিবির পালা

সুন্দরবনের সাংস্কৃতিক ভূগোলে বানবিবির পালা একটি অনন্য লোকনাট্যধর্মী ঐতিহ্য। বন, বাঘ, নদী, মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, কাঠ সংগ্রহ এবং বনজীবনের ঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। বানবিবি, দক্ষিণ রায় এবং দুখের কাহিনির মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের মানুষের জীবনসংগ্রাম ফুটে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক নথিতেও এই পালাকে সুন্দরবনের বনজীবন এবং মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বানবিবির পালার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধর্মীয় সমন্বয়। ইসলামী ও হিন্দু লোকবিশ্বাসের বিভিন্ন উপাদান এখানে পাশাপাশি অবস্থান করে। এই সমন্বিত চরিত্র বাংলার লোকসংস্কৃতির বহুত্ববাদী প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিবেশগত। বন এখানে নিছক পটভূমি নয়; কাহিনির সক্রিয় শক্তি। বাঘ, নদী, ঝড় এবং বনজ সম্পদ মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন ও সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষিতে বানবিবির পালাকে লোকপরিবেশবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে নতুন করে দেখা যেতে পারে।

ঝুমুর-পালা

পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান এবং সংলগ্ন অঞ্চলের ঝুমুর সংস্কৃতিতে গান ও নৃত্যের সঙ্গে পালাভিত্তিক নাট্যরূপের সমন্বয় ঘটে। ঝুমুরের মূল বৈশিষ্ট্য ছন্দ, দলগত নৃত্য এবং কণ্ঠসঙ্গীতের মিলিত প্রকাশ। প্রেম, বিরহ, কৃষিজীবন, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং রাধাকৃষ্ণ ভাবনা এর বিষয় হতে পারে। ঝুমুর-পালায় নৃত্য নাট্যক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেহের গতি, পদক্ষেপ, দলগত বিন্যাস এবং পুনরাবৃত্ত চলন সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র দৃশ্যভাষা নির্মাণ করে।

খন

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত খন লোকনাট্যধর্মী পরিবেশনার একটি বিশেষ রূপ। গান, সংলাপ, হাস্যরস ও সামাজিক ব্যঙ্গ এর প্রধান উপাদান। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, স্থানীয় ঘটনা এবং সামাজিক অসঙ্গতি এর বিষয় হয়ে ওঠে। ভাষা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উপভাষার মধ্যে যে বাগধারা, রসিকতা এবং সামাজিক স্মৃতি জমা থাকে, খনের মাধ্যমে তার অনেকটাই সংরক্ষিত হয়। এই কারণেই খনের ভাষাগত উপাদান কেবল ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় নয়; লোকসমাজের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আধার।

লোকনাট্যের কয়েকটি মৌল বৈশিষ্ট্য

এত বৈচিত্র সত্ত্বেও বাংলার লোকনাট্যগুলির মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, মৌখিকতা। অধিকাংশ রূপ লিখিত পাঠের চেয়ে স্মৃতি ও পরিবেশনানির্ভর। দ্বিতীয়ত, সমষ্টিগত সৃষ্টিশীলতা। একটি পালা সাধারণত একজন লেখকের ব্যক্তিগত সৃষ্টি হয়ে থাকে না। বহু প্রজন্মের পরিবেশকের সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে তার বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে। তৃতীয়ত, দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণ। দর্শক এখানে নিছক শ্রোতা নয়। তার প্রতিক্রিয়া পরিবেশনার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। চতুর্থত, সঙ্গীতের নাট্যকার্য। গান শুধু বিরতি বা বিনোদনের উপাদান নয়; কাহিনি, চরিত্র ও আবেগ নির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। পঞ্চমত, আঞ্চলিক ভাষা। লোকনাট্য তার নির্দিষ্ট ভূগোলের ভাষিক পরিচয় বহন করে। ষষ্ঠত, তাৎক্ষণিকতা। বিশেষত আলকাপ, গম্ভীরা ও ডোমনির মতো রূপে তাৎক্ষণিক সংলাপ ও প্রতিক্রিয়া পরিবেশনাকে প্রতি বার নতুন করে তৈরি করে। সপ্তমত, অভিযোজনশীলতা। পুরনো কাহিনির কাঠামোর মধ্যে নতুন সামাজিক বিষয় ঢুকে পড়তে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলিই লোকনাট্যকে লিখিত নাটকের থেকে আলাদা একটি জীবন্ত শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠা করে।

বিষয়বৈচিত্র –বাংলার লোকনাট্যের বিষয়বৈচিত্রকে কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।

পৌরাণিক বিষয় –রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল এবং রাধাকৃষ্ণের কাহিনি লোকনাট্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে লোকসমাজ কখনও শুধু মূল কাহিনি পুনরাবৃত্তি করেনি। নিজেদের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে কাহিনির নতুন অর্থ তৈরি করেছে।

সামাজিক বিষয়

বিবাহ, দাম্পত্য, দারিদ্র্য, কৃষি, ঋণ, মহাজনি, পরিবার, নারীর অবস্থান এবং সামাজিক বৈষম্য লোকনাট্যের বহুল ব্যবহৃত বিষয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যঙ্গ-বিশেষত গম্ভীরা, আলকাপ ও ডোমনির মতো রূপে সমকালীন সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যাকে হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। প্রেম ও মানবিক সম্পর্ক-প্রেম, বিরহ, দাম্পত্য, সামাজিক বাধা এবং মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বহু পালার কেন্দ্রে রয়েছে।

ধর্মীয় সমন্বয়-বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ধর্মীয় সহাবস্থান ও সমন্বয়। গম্ভীরা, আলকাপ এবং বানবিবির পালার মতো ধারায় তার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা যায়। পরিবেশ-বানবিবির পালার মতো রূপে মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্কই কাহিনির কেন্দ্রে চলে আসে। সঙ্গীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য –লোকনাট্যের সংগীত বিশ্লেষণে সুর, তাল-লয় এবং কণ্ঠপ্রয়োগ—এই তিনটি স্তর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুর-লোকসুর সাধারণত পরিবেশনের প্রয়োজন অনুসারে গড়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় সংগীতের মতো নির্দিষ্ট রাগলক্ষণ অনুসরণ করা এর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য নয়। তবে লোকসুরে কোনও সুরসংগঠন নেই—এমন ধারণাও ঠিক নয়। স্বল্পস্বরের পুনরাবৃত্তি, সুরবাক্যের পুনরাগমন, ধুয়া এবং আঞ্চলিক স্বরচালনা মিলিয়ে লোকসুরের নিজস্ব সংগীতব্যাকরণ তৈরি হয়। তাল ও লয়-ঢোল, খোল, করতাল, মন্দিরা, দোতরা, জুড়ি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনার ছন্দগত কাঠামো নির্মাণ করে। নাট্যপরিস্থিতি অনুসারে লয়ের পরিবর্তনও ঘটে।

কণ্ঠপ্রয়োগ-উন্মুক্ত পরিবেশে গান ও অভিনয় করার কারণে কণ্ঠপ্রক্ষেপণ, উচ্চারণ, স্বরাঘাত এবং আবেগপ্রকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোকনাট্যের কণ্ঠসঙ্গীত মূলত নাট্যগত কার্যকারিতা বহন করে। ফলে একই সুরাংশ পরিস্থিতি বা চরিত্রের আবেগ অনুসারে বদলে যেতে পারে।

নৃত্য ও দেহভাষা-লোকনাট্যের নৃত্য শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনুকরণ নয়। তার নিজস্ব দেহভাষা আছে। দেহের অতিরঞ্জিত ভঙ্গি, মুখভঙ্গি, হাঁটার ধরন, ঘূর্ণন, দলগত চলন এবং চরিত্রবিশেষের নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি—সবই নাট্যার্থ তৈরি করে। আলকাপের ছোকরা, গম্ভীরার নানা-নাতির অঙ্গভঙ্গি, ঝুমুরের দলগত চলন কিংবা বোলানের আচারনির্ভর গতি—প্রতিটি আলাদা নাট্যভাষা নির্মাণ করে।

আঞ্চলিক ভাষা ও লোকপরিচয়

লোকনাট্যের ভাষা তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহক। মালদহের ভাষা, মুর্শিদাবাদের কথ্যরীতি, রাঢ়বঙ্গের ভাষা এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন উপভাষা লোকনাট্যের চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষার পরিবর্তন তাই নিছক ভাষাগত পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্মৃতির পরিবর্তনও জড়িত। কোনও পালার পুরনো আঞ্চলিক শব্দ, উচ্চারণ কিংবা বাগধারা হারিয়ে গেলে সেই পালার একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক স্তরও হারিয়ে যেতে পারে।

দর্শক ও অভিনয়শিল্পীর সম্পর্ক

লোকনাট্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম দূরত্ব। প্রোসেনিয়াম থিয়েটারে মঞ্চ সাধারণত অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করে। লোকনাট্যে সেই সীমা অনেক সময় থাকে না, অথবা থাকলেও তা খুব সহজেই ভেঙে যায়। দর্শক মন্তব্য করতে পারে, শিল্পী উত্তর দিতে পারেন, গানের অংশে দর্শক যোগ দিতে পারে এবং কোনও কৌতুক দর্শকের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে বদলে যেতে পারে। এই পারস্পরিকতা লোকনাট্যকে একটি জীবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশনা করে তোলে।

লোকনাট্য ও সামাজিক শিক্ষা

লোকনাট্যের সামাজিক শিক্ষামূলক ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সাংস্কৃতিক নথিতেও লোকনাট্যকে বিনোদনের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  অতীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষ পুরাণ, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ এবং বিভিন্ন জীবনবোধের সঙ্গে লোকনাট্যের মাধ্যমে পরিচিত হতেন। বর্তমানেও এই মাধ্যম ব্যবহার করা যায়—

  • পরিবেশ সংরক্ষণ;
  • জলবায়ু পরিবর্তন;
  • স্বাস্থ্য সচেতনতা;
  • নারীশিক্ষা;
  • শিশুশিক্ষা;
  • মাদকবিরোধী প্রচার;
  • সামাজিক সম্প্রীতি;
  • লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। লোকনাট্যকে কেবল সরকারি প্রচারের বাহন বানিয়ে ফেললে তার নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব ও স্বাধীন সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

বর্তমান সংকট

বাংলার লোকনাট্য এখনও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পীগোষ্ঠী সক্রিয় এবং অনেক দল এখনও গ্রাম থেকে গ্রামে পরিবেশন করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় আলকাপ, গম্ভীরা ও কুশানের মতো ধারার অনেক দলকে নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের ডাক বা ‘কল-শো’-এর ভিত্তিতে পরিবেশন করতে দেখা যায়; কিছু শিল্পীর জীবিকার সঙ্গেও এই পরিবেশনা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।⁶

কিন্তু তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ দ্রুত বদলে গেছে।

শিল্পীর আর্থিক অনিশ্চয়তা

অনেক লোকশিল্পীর নিয়মিত আয় নেই। ফলে শিল্পচর্চা পেশা হিসেবে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

উত্তরাধিকারসূত্রে শিক্ষার সংকট

প্রবীণ শিল্পীরা তরুণদের শেখালেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে সেই ধারাবাহিকতা সবসময় বজায় থাকে না।

দীর্ঘ পালার সংকোচন

সমকালীন দর্শকের সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিবর্তিত ধরন দীর্ঘ পালাকে ছোট করে দিচ্ছে।

ভাষার পরিবর্তন

আঞ্চলিক ভাষা ক্রমশ প্রমিত বা বৃহত্তর প্রচলিত বাংলার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে।

বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তন

ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এতে শব্দের শক্তি বাড়লেও ঐতিহ্যগত বাদ্যযন্ত্রের ভূমিকা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাজার ও গণমাধ্যমের প্রভাব

জনপ্রিয় সংস্কৃতির সুর, নৃত্য ও দৃশ্যভাষা লোকনাট্যের মধ্যে প্রবেশ করছে।

পরিবেশন-প্রেক্ষিতের পরিবর্তন

যে উৎসব, আচার বা সামাজিক পরিবেশকে কেন্দ্র করে কোনও লোকনাট্যের জন্ম, সেই পরিবেশ বদলে গেলে নাট্যরীতিতেও পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক।

পরিবর্তন কি অবক্ষয়?

লোকসংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় একটি সহজ সমীকরণ প্রায়ই দেখা যায়—‘পুরনো মানেই বিশুদ্ধ, নতুন মানেই বিকৃত’। এই ধারণা লোকসংস্কৃতির স্বভাবকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করে না।

লোকশিল্প স্থির নয়। গম্ভীরা যদি আজকের সামাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বলে, তা তার ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ গম্ভীরার শক্তি তার সমকালীনতায়।

আলকাপে নতুন সামাজিক প্রসঙ্গ আসতে পারে। কুশান পালায় নতুন কাহিনি যুক্ত হতে পারে। বোলানে নতুন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতে পারে।

অতএব পরিবর্তনকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা লোকঐতিহ্যকে জীবন্ত শিল্প থেকে জাদুঘরের বস্তুতে পরিণত করতে পারে।

তবে তার অর্থ এই নয় যে ঐতিহ্যগত রূপের নথিকরণ অপ্রয়োজনীয়। বরং দুটি কাজ পাশাপাশি করতে হবে—একদিকে পুরনো রূপের যথাযথ নথি সংরক্ষণ, অন্যদিকে আধুনিক রূপের স্বাধীন বিকাশ। গবেষণার স্বচ্ছতার জন্য কোনটি ঐতিহ্যগত সংস্করণ এবং কোনটি সমকালীন পুনর্নির্মাণ, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা জরুরি।

সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বৈচিত্রের গুরুত্ব

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল—‘বাংলার লোকনাট্য’ নামে একটি সাধারণ শ্রেণি তৈরি করে সব রূপকে একই পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যথার্থ নয়।

আলকাপ সংরক্ষণ করতে হলে তার তাৎক্ষণিক সংলাপ ও পরিবেশকের সৃজনশীলতা নথিবদ্ধ করতে হবে। গম্ভীরার ক্ষেত্রে নানা-নাতির কথোপকথন এবং সময়ের সঙ্গে বিষয় পরিবর্তনের ধারাটি ধরে রাখতে হবে। কুশানের ক্ষেত্রে সুর, আখ্যান ও বর্ণনাকারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বানবিবির পালায় ধর্মীয় সমন্বয় এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত প্রেক্ষাপটকে বাদ দেওয়া যাবে না। ঝুমুর-পালায় নৃত্য ও ছন্দের সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রতিটি লোকনাট্যের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ব্যাকরণ আছে। সংরক্ষণ পদ্ধতিও সেই ব্যাকরণ অনুযায়ী হওয়া দরকার। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ‘লোকসংস্কৃতি’ নামে একটি সাধারণ পাঠ যথেষ্ট নয়। লোকপরিবেশনা-অধ্যয়ন, লোকসঙ্গীতবিদ্যা, পরিবেশনা নথিবদ্ধকরণ এবং ডিজিটাল লোকঐতিহ্য সংগ্রহশালার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : একটি সম্ভাব্য কাঠামো

লোকনাট্যের ভবিষ্যৎ সংরক্ষণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের জ্ঞানসংগ্রহ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান-হস্তান্তরের কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে।

বিদ্যালয় স্তর

বিদ্যালয়ের ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ পাঠের মধ্যে লোকগান, লোকবাদ্য, লোকনৃত্য, লোকনাট্য, আঞ্চলিক ভাষা ও লোককথাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয় বছরে অন্তত একটি লোকনাট্য শেখানোর উদ্যোগ নিতে পারে।

লোকনাট্য ক্লাব

বিদ্যালয় ও কলেজে লোকনাট্য ক্লাব গঠন করা যেতে পারে। একটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা—

১. একটি পালা শুনবে;
২. শিল্পীর সাক্ষাৎকার নেবে;
৩. গানের কথা লিখে রাখবে;
৪. সুর রেকর্ড করবে;
৫. বাদ্যযন্ত্র চিহ্নিত করবে;
৬. পালার একটি সংক্ষিপ্ত অংশ পরিবেশন করবে।

এতে লোকসংস্কৃতি শুধু পড়ার বিষয় থাকবে না; অভিজ্ঞতার বিষয় হয়ে উঠবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক পাঠ্যক্রম

বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলার লোকসঙ্গীত ও লোকনাট্য’ নামে একটি আন্তঃবিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু করা যেতে পারে।

তাত্ত্বিক অংশ

  • লোকনাট্যের ধারণা;
  • লোকসংস্কৃতি তত্ত্ব;
  • পরিবেশনবিদ্যা;
  • লোকসঙ্গীত;
  • লোকনৃত্য;
  • লোকবাদ্য;
  • লোকভাষা;
  • সামাজিক নৃতত্ত্ব।

ব্যবহারিক অংশ

  • একটি পালা শেখা;
  • গান;
  • নৃত্য;
  • বাদ্যযন্ত্র;
  • অভিনয়;
  • তাৎক্ষণিক সংলাপ।

গবেষণামূলক অংশ

  • মাঠসমীক্ষা;
  • মৌখিক ইতিহাস;
  • শ্রুতি-দৃশ্য নথিবদ্ধকরণ;
  • পাঠলিপি প্রস্তুত;
  • স্বরলিপি;
  • সংগ্রহশালা নির্মাণ।

প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ শিক্ষার ব্যবস্থা

প্রবীণ লোকশিল্পীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষক বা আবাসিক শিল্পী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।

একজন গম্ভীরা শিল্পী একটি সেমিস্টার গম্ভীরা শেখাতে পারেন। আলকাপের একজন অভিজ্ঞ ওস্তাদ শিক্ষার্থীদের আলকাপের পরিবেশনরীতি শেখাতে পারেন। কুশান শিল্পী পালার সুর, আখ্যান ও অভিনয়ের কাঠামো হাতে-কলমে দেখাতে পারেন।

বইয়ের পাতায় যে জ্ঞান পাওয়া যায় না, এই প্রত্যক্ষ শিক্ষার মধ্য দিয়ে তার অনেকটাই শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছতে পারে।

লোকনাট্য গবেষণাগার

প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লোকপরিবেশনা গবেষণাগার স্থাপন করা যেতে পারে।

সেখানে থাকতে পারে—

  • শব্দ রেকর্ডিং কক্ষ;
  • ভিডিও নথিকরণ ব্যবস্থা;
  • ডিজিটাল সংগ্রহশালা;
  • লোকবাদ্য সংগ্রহ;
  • মৌখিক ইতিহাসের সংরক্ষণাগার;
  • পাণ্ডুলিপি ও গীতপাঠের সংগ্রহ;
  • আঞ্চলিক ভাষার তথ্যভাণ্ডার;
  • পরিবেশনার আলোকচিত্র সংগ্রহ।

এ ধরনের একটি কেন্দ্র ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য স্থায়ী তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পারে।

ডিজিটাল সংগ্রহশালা

প্রতিটি পালার একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি তৈরি করা দরকার। সেখানে থাকবে—

  • শিল্পীর নাম;
  • দলের নাম;
  • অঞ্চল;
  • তারিখ;
  • পালার নাম;
  • গানের কথা;
  • সুরের রেকর্ড;
  • তাল;
  • বাদ্যযন্ত্র;
  • ভিডিও;
  • ভাষা;
  • কাহিনি;
  • পরিবেশনের সামাজিক ও আচারগত প্রেক্ষাপট;
  • শিল্পীর অনুমতি;
  • কপিরাইট ও সম্প্রদায়গত অধিকার।

শিল্পী বা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অনুমতি ছাড়া সংগৃহীত উপাদান বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। লোকজ জ্ঞান সংগ্রহের সঙ্গে নৈতিক অধিকার এবং সৃষ্টির স্বীকৃতির প্রশ্নটিও সমানভাবে জড়িত।

 ক্ষেত্র সমীক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীতবিদ্যা, লোকসংস্কৃতি, বাংলা, নৃতত্ত্ব এবং নাট্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্র সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। ক্ষেত্র সমীক্ষার সময় প্রশ্ন হতে পারে—

  • শিল্পী কার কাছে শিখেছেন?
  • কত বছর ধরে পরিবেশন করছেন?
  • পালাটি কে লিখেছেন?
  • গানের সুর কোথা থেকে এসেছে?
  • কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়?
  • কোন উৎসবে পালাটি পরিবেশিত হয়?
  • দর্শক কারা?
  • পরিবেশনের সময় কত?
  • আগের তুলনায় কী কী পরিবর্তন হয়েছে?
  • শিল্পীর অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন?
  • নতুন প্রজন্ম শিখছে কি না?

এই তথ্যগুলি ভবিষ্যতের লোকসংস্কৃতি গবেষণায় অমূল্য হয়ে উঠবে।

সুর ও তাল নথিবদ্ধকরণ

লোকনাট্য সংরক্ষণে শুধু গানের কথা সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ হয় না।

সম্ভব হলে প্রতিটি গানকে—

  • অডিও রেকর্ড;
  • স্বরলিপি;
  • তাললিপি;
  • গানের কাঠামো;
  • ধুয়া;
  • অন্তরা;
  • স্বরপরিসর;
  • সুরের পুনরাবৃত্তি;
  • লয়ের পরিবর্তন

সহ নথিবদ্ধ করা উচিত।

একই গানের বিভিন্ন শিল্পীর সংস্করণ পাশাপাশি রেখে তুলনা করাও জরুরি। এতে একটি সুর কীভাবে সময়, অঞ্চল ও পরিবেশকের সঙ্গে বদলে যায়, তার ইতিহাস বোঝা সম্ভব।

আঞ্চলিক ভাষার সংরক্ষণ

লোকনাট্যের ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ বা প্রমিত বাংলায় সংশোধন করে নেওয়া উচিত নয়। প্রথমে মূল উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার এবং ভাষার নিজস্ব রূপটি সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রয়োজন হলে চারটি স্তরে নথি তৈরি করা যেতে পারে—

মূল পাঠ বাংলা লিপ্যন্তর প্রমিত বাংলায় অর্থ ইংরেজি অনুবাদ

এতে ভাষাগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকবে, আবার গবেষকদের ব্যবহারও সহজ হবে।

লোকবাদ্য সংরক্ষণ

লোকনাট্যের বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষণেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার লোকবাদ্য সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সংরক্ষিত থাকবে—

  • নাম;
  • অঞ্চল;
  • নির্মাণপদ্ধতি;
  • নির্মাণসামগ্রী;
  • বাজানোর পদ্ধতি;
  • কোন পালায় ব্যবহৃত হয়;
  • শিল্পীর নাম;
  • পরিবেশনের দৃশ্য;
  • বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ভিডিও।

এ ধরনের সংগ্রহশালা সংগীতবিদ্যা ও নৃতত্ত্ব—দুই ক্ষেত্রেই মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

শিল্পীর অর্থনৈতিক মর্যাদা

শিল্পীর জীবন যদি অনিরাপদ থাকে, তবে শুধু নথি তৈরি করে লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলির উচিত—

  • যথাযথ সান্মানিক;
  • আবাসিক কর্মশালা;
  • গবেষণা-সম্মানী;
  • রেকর্ডিং পারিশ্রমিক;
  • ভ্রমণভাতা;
  • শিল্পী সহায়তা বা পেনশন প্রকল্প;
  • তরুণ শিক্ষার্থীদের বৃত্তি চালু করা। লোকশিল্পীদের কাছ থেকে বিনামূল্যে জ্ঞান সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে—এই প্রবণতা বন্ধ করা দরকার। শিল্পীর শ্রম ও জ্ঞান উভয়েরই মূল্য আছে।

জীবন্ত ঐতিহ্য বনাম জাদুঘর

লোকনাট্যকে শুধু জাদুঘরে রেখে দিলে তার প্রাণশক্তি থাকে না। সংরক্ষণকে একটি চলমান চক্র হিসেবে ভাবা দরকার—

নথিবদ্ধকরণ সংগ্রহশালা শিক্ষা পরিবেশনা গবেষণা পুনর্নির্মাণ পুনরায় নথিবদ্ধকরণ

অর্থাৎ পুরনো রূপ সংরক্ষণ করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাকে জীবিতও রাখতে হবে।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ভারসাম্য

এখানে দুটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি।

ঐতিহ্যগত সংস্করণ

পুরনো গান, সুর, ভাষা, বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশনরীতির পূর্ণাঙ্গ নথি।

সমকালীন সংস্করণ

আধুনিক বিষয়, মঞ্চ, বাদ্যযন্ত্র এবং নাট্যরীতির সৃজনশীল ব্যবহার। এই দুই সংস্করণকে এক বলে উপস্থাপন করা উচিত নয়। গবেষণার স্বচ্ছতার জন্য কোনটি ঐতিহ্যগত এবং কোনটি আধুনিক পুনর্নির্মাণ, তা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

লোকনাট্য ও নতুন প্রজন্ম

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে লোকনাট্য পৌঁছে দিতে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যায়। তথ্যচিত্র, পডকাস্ট, শিক্ষামূলক স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, ডিজিটাল সংগ্রহশালা, মানচিত্রভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার এবং ভার্চুয়াল প্রদর্শনী তৈরি করা যেতে পারে। তবে ডিজিটাল জনপ্রিয়তার জন্য লোকশিল্পের ভাষা, সুর ও পরিবেশনাকে অতিরিক্ত পরিবর্তন করা উচিত নয়। ডিজিটাল মাধ্যম হবে বাহন; লোকঐতিহ্যই থাকবে মূল বিষয়।

আন্তঃবিষয়ক গবেষণার সম্ভাবনা

লোকনাট্য নিয়ে গবেষণা কোনও একটি বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

সংগীতবিদ বিশ্লেষণ করবেন—
সুর, তাল, কণ্ঠপ্রয়োগ ও বাদ্যযন্ত্র।

নাট্যবিদ বিশ্লেষণ করবেন—
চরিত্র, সংলাপ, অভিনয় ও মঞ্চপরিবেশ।

নৃতত্ত্ববিদ দেখবেন—
সম্প্রদায়, আচার ও সামাজিক সম্পর্ক।

সাহিত্য গবেষক বিশ্লেষণ করবেন—
ভাষা, কাহিনি, অলংকার ও লোকসাহিত্য।

সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করবেন—
শ্রেণি, লিঙ্গ, ক্ষমতা ও সামাজিক পরিবর্তন।

এই সমন্বিত দৃষ্টিই লোকনাট্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে পারে।

ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাব্য ক্ষেত্র

আগামী দিনে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে বিশেষ গবেষণার সুযোগ রয়েছে—

১. গম্ভীরার সুর ও তালব্যবস্থা;
২. আলকাপের তাৎক্ষণিক সংলাপের নন্দনতত্ত্ব;
৩. বোলানের আচার ও নাট্যরূপ;
৪. কুশান গানের সুরভাষা;
৫. পালাটিয়ার নাট্যকাঠামো;
৬. ডোমনির আঞ্চলিক ভাষা;
৭. বানবিবির পালা ও পরিবেশচেতনা;
৮. লোকনাট্যে নারীর উপস্থাপনা;
৯. লোকনাট্যে পুরুষের নারীচরিত্র অভিনয়;
১০. লোকবাদ্যের পরিবর্তন;
১১. ডিজিটাল যুগে লোকনাট্যের রূপান্তর;
১২. লোকনাট্যের অর্থনীতি;
১৩. লোকশিল্পীদের মৌখিক ইতিহাস;
১৪. ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে একই পালার রূপভেদ;
১৫. লোকনাট্য ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান।

উপসংহার

বাংলার লোকনাট্য সাধারণ মানুষের জীবন থেকে উঠে আসা একটি সমন্বিত শিল্পভাষা। এর মধ্যে গান যেমন আছে, তেমনি নাট্য; নৃত্য যেমন আছে, তেমনি সংলাপ। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশে সামাজিক ব্যঙ্গ, পৌরাণিক কাহিনির পাশে সমকালীন জীবনের সংকট—সবই এখানে পাশাপাশি অবস্থান করে।

আলকাপের হাস্যরস ও ব্যঙ্গ, গম্ভীরার সমকালীন সামাজিক বক্তব্য, বোলানের আচারনির্ভরতা, লেটোর গ্রামীণ জীবনচিত্র, ডোমনির সামাজিক কৌতুক, কুশানের পৌরাণিক আখ্যান, পালাটিয়ার নাট্যরীতি, বিষহরার মঙ্গলকাব্যিক ঐতিহ্য এবং বানবিবির পরিবেশ-সংস্কৃতি—প্রতিটি রূপ বাংলার সমাজজীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে।

এই লোকনাট্যগুলির বর্তমান সংকটকে শুধু ‘অবক্ষয়’ বলে চিহ্নিত করলে সমস্যাটির প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়বে না। লোকসংস্কৃতি স্বভাবতই পরিবর্তনশীল। দর্শক বদলাবে, সামাজিক পরিবেশ বদলাবে, অর্থনৈতিক কাঠামো বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে—তার সঙ্গে লোকনাট্যেরও পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যে ঐতিহ্যগত রূপের নথি যদি হারিয়ে যায়, তবে সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আর ফিরে পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর একসঙ্গে গ্রহণ করা দরকার।

প্রথমত—নথিবদ্ধকরণ: পুরনো গান, সুর, তাল, ভাষা, বাদ্যযন্ত্র, পালা এবং শিল্পীর মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ। দ্বিতীয়ত—জ্ঞান-হস্তান্তর: প্রবীণ শিল্পীর কাছ থেকে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া।

তৃতীয়ত—পুনঃসৃজন:
নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নতুন পালা ও নতুন পরিবেশনা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া। এই তিনটি স্তর পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। নথি থাকবে, শিক্ষা হবে, পরিবেশনা চলবে এবং নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ঐতিহ্য আবার নতুন রূপে ফিরে আসবে। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কেবল ‘লোকনাট্য উৎসব’ আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই সঙ্গে সংগ্রহশালা, গবেষণাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আর্কাইভ এবং জীবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে হবে।

লোকনাট্যের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক নীতির মূলকথা হতে পারে—

“শুধু সংরক্ষণ নয়—উত্তরাধিকার;
শুধু প্রদর্শন নয়—শিক্ষা;
শুধু নথিকরণ নয়—জীবন্ত অনুশীলন;
শুধু অতীত নয়—ভবিষ্যৎ নির্মাণ।”

বাংলার লোকনাট্য তখনই সত্যিকার অর্থে সংরক্ষিত হবে, যখন একজন প্রবীণ শিল্পীর কণ্ঠে থাকা অপ্রকাশিত পালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে নথিভুক্ত হবে; বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তা শিখবে; নতুন শিল্পী তার নিজস্ব সৃজনশীলতায় তাকে পুনর্নির্মাণ করবে; এবং একই সঙ্গে মূল শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় তাদের জ্ঞান, শ্রম ও সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি এবং অধিকার লাভ করবে। এই সমন্বিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লোকনাট্য অতীতের স্মারক হয়ে থেমে থাকবে না; ভবিষ্যতেরও একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক সম্পদ হয়ে উঠবে।

__________________________

পাদটীকা

১. Ashutosh Bhattacharyya, Banglar Lokasamskriti (Calcutta: Calcutta Book House, 1962).

২. Chanchal Adhikary, “Oral Literature and Performing Arts of a Marginalized Community: The Chain of West Bengal,” Journal of the Anthropological Survey of India 10, no. 1 (2018), https://doi.org/10.1177/2455328X17744626.

৩. Aniket De, “Theatres of Nationhood,” in The Boundary of Laughter: Popular Performances across Borders in South Asia (Oxford: Oxford University Press, 2022), 58–100, https://doi.org/10.1093/oso/9780190131494.003.0003.

৪. Mir Masudul Hoque and Md. Sujauddin Shaikh, “The Folk Carnivalesque: Resistance and Subversive Wit in Bengal’s Alkap Tradition,” ShodhKosh: Journal of Visual and Performing Arts 5, no. 6 (2024): 689–693, https://doi.org/10.29121/shodhkosh.v5.i6.2024.4253.

৫. Jayanta Kumar Barman, “Folk Theatre: The Kushan Gaan of North East,” International Journal of Creative Research Thoughts 10, no. 12 (2022): a204–a213.

৬. Pabitra Roy, “Palatiya, A Folk Theatre of North Bengal: Its Social Context and Performance Style,” Educational Administration: Theory and Practice 30, no. 6 (2024): 2099–2105, https://doi.org/10.53555/kuey.v30i6.5657.

৭. “The Transformation of a Folk Theatre: A Study of Gambhira with the Aid of Performance Theory,” Amrita Vishwa Vidyapeetham, 2020.

৮. West Bengal Government Cultural Documentation, “Folk Theatre,” government-supported cultural resource material.

 

গ্রন্থপঞ্জি

Adhikary, Chanchal. “Oral Literature and Performing Arts of a Marginalized Community: The Chain of West Bengal.” Journal of the Anthropological Survey of India 10, no. 1 (2018). https://doi.org/10.1177/2455328X17744626.

Banerjee, Archita. “Re-Visiting the Theatrical Performances of Bengal: An Evolution from the Folk Traditions to Contemporary Practices.” Think India Journal (2019).

Barman, Jayanta Kumar. “Folk Theatre: The Kushan Gaan of North East.” International Journal of Creative Research Thoughts 10, no. 12 (2022): a204–a213.

Bhattacharyya, Ashutosh. Banglar Lokasamskriti. Calcutta: Calcutta Book House, 1962.

De, Aniket. “Theatres of Nationhood.” In The Boundary of Laughter: Popular Performances across Borders in South Asia, 58–100. Oxford: Oxford University Press, 2022. https://doi.org/10.1093/oso/9780190131494.003.0003.

Hoque, Mir Masudul, and Md. Sujauddin Shaikh. “The Folk Carnivalesque: Resistance and Subversive Wit in Bengal’s Alkap Tradition.” ShodhKosh: Journal of Visual and Performing Arts 5, no. 6 (2024): 689–693. https://doi.org/10.29121/shodhkosh.v5.i6.2024.4253.

Howladar, Priyanka. “Gambhira: Medium of Bhakti Becomes Literature.” International Journal of Creative Research Thoughts (2024).

Roy, Pabitra. “Palatiya, A Folk Theatre of North Bengal: Its Social Context and Performance Style.” Educational Administration: Theory and Practice 30, no. 6 (2024): 2099–2105. https://doi.org/10.53555/kuey.v30i6.5657.

West Bengal Cultural Documentation. “Folk Theatre.” Government-supported cultural resource material.