January 1, 2020

জোড়াসাঁকো : হারিয়ে যাওয়া দক্ষিণের বারান্দা

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

জয়ন্তী মণ্ডল

পাঁচ নন্বর জোড়সাঁকো ঠাকুরবাড়ির বৈঠকখানার দক্ষিণের বারান্দা। কালো ডোরাকাটা লাল মেঝে। আরামকেদারায় বসে দুই ভাই। গিরীন্দ্রপুত্র গণেন্দ্রনাথ ও গুনেন্দ্রনাথ। গগনেন্দ্রনাথ লেখায় ব্যস্ত। কখনো নাটক, কখনো গান। গুনেন্দ্রনাথ তখন মগ্ন ছবি আঁকায়। দুজনের সাধনায় রচিত হল স্বদেশ প্রীতির প্রথম গান ও কবিতা। সেই সঙ্গে জন্ম নিল নবযুগের শিল্পরূপটি।  

বৈঠকখানা বাড়ির দোতলায় স্টেজ বাঁধা। বালক রবির গণদাদা রামনারায়ণ তর্করত্নকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন ‘নবনাটক’। বাড়ির বড়দাদা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়বর্গ মিলে দিনের বেলায় চলছে ‘নবনাটকে’র রিহার্সাল। রাতে কনসার্টের মহড়া। সন্ধ্যে বেলায় দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় নাটক হবে। সন্ধে থেকে সারা বাড়ি আলোয় আলোকময়। বাড়ির সদর দরজায় সারিসারি গাড়ির আনাগোনা। অতিথিরা এক এক করে গাড়ি থেকে নামছেন। বাড়ির অগ্রজেরা ব্যস্ত অতিথি অভ্যর্থনায়।

একটুখানি তফাতে ছ’নম্বর বাড়ি। দু’বাড়ির বারান্দায় ফাঁক শুধু একটু। পাঁচ নম্বর বাড়ির আমোদ অনুষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে ছ’নম্বর বাড়ির শিশু কিশোরেরা। বড়োদের এই আমোদ অনুষ্ঠানে ছোটদের প্রবেশ মানা। এদিকের বারান্দায় উপচেপড়া হাসি, ঠাট্টা, অক্ষয় চৌধুরীর উদ্দাম নৃত্য, পুরুষের কণ্ঠে মেয়েলি কান্নার সুরটুকুর ভাগীদার হতে ঝুঁকে পড়ে মরিয়া ছ’নম্বর দক্ষিনের বারান্দার শিশু রবীন্দ্রনাথ ও তার সঙ্গীরা।

‘নবনাটক’ শেষ হতেই দেবেন্দ্রনাথের পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ও গিরীন্দ্রপুত্র গণেন্দ্রনাথরা মেতে উঠলেন হিন্দু মেলায়। উদ্দেশ্য মেলার মধ্য দিয়ে জাতীয় চেতনার উন্মেষ। এবারও মেলার উদ্যোক্তা সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু নবগোপাল মিত্র। মেলার পরামর্শদাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ। মেলার আলাপ আলোচনা, আয়োজন, গুনীজনের সমাগমে দুই বাড়িই সরগরম। কখনো পাঁচ নম্বরের দক্ষিণের বারান্দা কখনো ছ’নম্বরের দক্ষিণের বারান্দা উদ্যোক্তাদের কলোচ্ছাসে ভরপুর। রবীন্দ্রনাথ তখন ছ’বছরের। দাদাদের মেলার আয়োজনে তাঁর যাবার অনুমতি নেই। ছ’নম্বরের দক্ষিণের বারান্দার জানালার ফাঁক দিয়ে শিশু রবি দেখে মেলার আয়োজন। সেই সুদূর শিশু বয়সে হিন্দু মেলার আলাপ-আলোচনা, আয়োজন রবীন্দ্রনাথে্র মনে রোপন করে দেয় জাতীয়তাবাদের বীজটি।

মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা বই-দক্ষিণের বারান্দা

পাঁচ নম্বর বাড়িটি দ্বারকানাথের পরিকল্পনায় তৈরি বৈঠকখানা বাড়ি। দেশ বিদেশের রাজা-রাজড়া, অভিজাত বন্ধু-বান্ধবদের অতিথিশালা। বৈঠকখানা বাড়ির লাইব্রেরি ঘর ও দক্ষিণের বারান্দায় চলত অতিথিদের আপ্যায়ণ ও ভোজসভা। সেসব এলাহি ভোজসভার বিবরণ তখনকার সংবাদপত্রের শিরোনামে থাকত। পরে দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর দ্বারকানাথপুত্র গিরীন্দ্রনাথের ভাগে পড়ে পাঁচ নম্বরের বৈঠকখানা বাড়ি। ছ’নম্বর ভদ্রাসন বাড়িটি ভাগে পড়ে দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দেবেন্দ্রনাথের। এই দুই বাড়ির দুই দক্ষিণের বারান্দাকে মহর্ষি ও গিরীন্দ্রের  পুত্র ও প্রপৌত্রেরা ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থানে পরিণত করে। পাঁচনম্বর ও ছ’নম্বর বাড়ি ভাগ হলেও দুই পরিবারের মধ্যে ছিল অবাধ যাতায়াত। আলাপ-আলোচনা, গল্প, আড্ডা এসব কখনো চলত বোঠকখানা বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায়। আবার কখনো ‘বাহির বাড়ির’ অর্থাৎ ছ’নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায়।

ছ’নম্বরের দক্ষিণের বারারান্দার পুবদিকের কোনে চাকরদের একটা ঘরে ছোট রবীন্দ্রনাথের দিন কাটে। বাড়ির চাকর শ্যাম খড়ি দিয়ে গণ্ডী কেটে দিয়েছে। পার হলেই বিপদ। নিরুপায় রবি জানালার খড়খড়ি তুলে সারাদিন তাকিয়ে থাকে বাইরের পৃথিবীর দিকে। দেখে জানালার বাইরের গাছ, পুকুর, বাগান, জল পড়ে, পাতা নড়ে, মেঘের আনাগোনা কত কী ! দেখতে দেখতেই কল্পনার জগতে পাড়ি দেয় বালক রবি। জানালার নীচেই ঘাট বাঁধানো পুকুর। সকাল থেকেই হাপুস নয়নে তাকিয়ে দেখে প্রতিবেশীদের স্নান করতে আসা যাওয়া। কেউ দু’কানে আঙ্গুল চাপা দিয়ে টপটপ করে ডুব দিয়েই ছুট দেয় বাড়ির দিকে। কেউ আবার সিঁড়ি থেকেই ধাঁ করে ঝাঁপ দেয় জলে। এক এক জনের স্নানের রীতি এক এক রকম। দেখতে দেখতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। পুকুরের পুব দিকে চিনা বট, দক্ষিণ দিকে নারিকেল গাছের সারি দেখতে দেখতে দুপুর কেটে যায় রবির।

কখনো আবার দক্ষিণের বারান্দা রবির কাছে হয়ে যায় ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ক্লাসরূম। স্কুলে পড়ানোর কথা মনে না থাকলেও মনে ছিল গুরুমশাইয়ের শাসনের কথা। স্কুলের ছাত্র হয়ে হীনতা মোচনের উপায় হিসেবে বালক রবি বেছে নিতেন দক্ষিণের বারান্দাকে। বারান্দার কাঠের রেলিংগুলো ছিল ছাত্র। মাষ্টারমশায় বালক রবীন্দ্রনাথ। চৌকি নিয়ে লাঠি হাতে মাষ্টারমশায় বসতেন লাঠি হাতে বসতেন ছাত্রের সামনে। একের পর এক লাঠির ঘায়ে ছাত্রের অবস্থা হত করুণ।

বিরাট জোড়াসাঁকোবাড়ির সদস্য অনেক। পরিবারের এক এক জনের এক একটি দিক নির্দিষ্ট। রবির বড়ো দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের নির্দিষ্ট জায়গা বাড়ির দক্ষিণের বারান্দা। এখানে বসেই দ্বিজেন্দ্রনাথ আত্মীয়-পরিজন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, গল্প, আড্ডা জমাতেন। তাঁর লেখালেখি, সাহিত্য সৃষ্টি সবই এই বারান্দায় বসেই। বেশ লম্বা চওড়া দক্ষিণের বারান্দা। দ্বিজেন্দ্রনাথ বারান্দায় বসে ডেস্কের উপর লিখছেন ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ কাব্যখানি। এমন সময় প্রতিদিনের মতো গুণেন্দ্রনাথ এসে হাজির। দ্বিজেন্দ্রনাথ লিখছেন গুণেন্দ্রনাথ শুনছেন। তারপর দুজনেই ফেটে পড়ছেন অট্টহাস্যে। কখনো বা মনোমতো না হওয়া লেখার পাতা ছিঁড়ে ফেলছেন। বড়োদের এই হাসি ঠাট্টার আসরে ছোটদের আসার অনুমতি নেই। তবে, দাদাদের ফেলে দেওয়া পাতা থেকে সাহিত্যের ঘ্রাণ নিতে বাদ যেত না বাড়ির ছোটদের সঙ্গে রবিরও।

এদিকে পাঁচ নম্বরের পুব থেকে পশ্চিমে দক্ষিনমুখো বিরাট বারান্দার কেদারায় বসে তিন ভাই কাজ করছেন।  গুণেন্দ্র পুত্র গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র, অবনীন্দ্র। সে সময় স্বদেশী যুগ। জোড়াসাঁকোর দুই বাড়ি স্বদেশি হাওয়ায় মাতোয়ারা।  

পাঁচ নম্বরের দক্ষিণের বারান্দার চেয়ারে বসে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সামনে তিনপায়া টুলের উপর জার্মান সিলভারের গোল পাত্রে নানা রঙের জলের গামলা। পাশে কালো লম্বা টেবিলের উপর রাখা হরেক রকমের রঙের বাক্স। আঁকার সাজ সরঞ্জাম। অবনীন্দ্রনাথ একের পর ছবি আঁকছেন। তারপর চওড়া ব্রাস রঙে ডুবিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবির উপর ঘষছেন। কিছুক্ষণ পর পরই ছবিটাকে পাশে টুলের উপর রাখা গামলার জলে ডোবাচ্ছেন। তারপরই পাশে রাখা ছোট্ট কার্ড বোর্ডে ভেজানো ছবিটাকে পিন করে শুকিয়ে নিচ্ছেন। এমনি করে তাঁদের বিশ্ববন্দিত দক্ষিণের বারান্দায় বসে অবনীন্দ্রনাথ একের পর এক এঁকেছেন- আরব্য রজনীর গল্পের সিরিজ, ওমর খৈয়ামের গল্পের সিরিজ, শাজাহানের মৃত্য, ভারতমাতার ছবি আরো কত কী ! এসবের মাঝে মাঝেই চলেছে অন্য ঢঙের ছবি আঁকা। কখনো পূর্ববঙ্গের বর্ষার অপূর্ব দৃশ্য। কখনো বা কার্শিয়াং এর বরফের পাহাড়, ভুটিয়া রমণী।

পাঁচ নম্বরের দক্ষিণের বারান্দার অবন ঠাকুরের কথা তখন দেশ থেকে দেশান্তরে। দেশ বিদেশ থেকে তাঁর কাছে আসছেন কত নামী দামি চিত্রকর। কখনো জাপানী চিত্রকর ওকাকুরা, কখনো টাইক্কান প্রমুখেরা। তাঁরাও অবন ঠাকুরের সঙ্গে বসে একের পর এক ছবি আঁকছেন। অবন ঠাকুর ওকাকুরার কাছে রপ্ত করছেন ছবি আঁকার নতুন ‘ওয়াস পদ্ধতি’। তাঁরাও অবন ঠাকুরের কাছে শিখছেন ভারতীয় দেব দেবীদের ছবি আঁকার রীতি। আবার কখনো অবনীন্দ্রনাথ পামার, গিলার্ডির কাছে ছবি আঁকার পদ্ধতি শিখে ইউরোপীয় রীতিতে আঁকলেন তেল রঙের নানা ছবি, পোট্রেট। এমনি করেই দক্ষিণের বারান্দায় মেল বন্ধন ঘটলো প্রাচ্য পাশ্চাত্য শিল্প রীতির। সেই সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় শিল্পরীতিকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পরীতির মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘অবন দেশের সব রুচি বদলে দিয়েছে’।

একবার হল কী ! বর্ষার শেষ অবনীন্দ্রনাথ পাঁচ নম্বরের দক্ষিণের বারান্দায় ‘কুটুম-কাটামে’র কাজ করছেন, এই সময় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে ফিরলেন। শুরু হয়ে গেল ‘শেষ বর্ষণ’ উৎসব। ‘শেষ বর্ষণে’র অভিনয়ের আয়োজন, রিহার্সাল নিয়ে দুই বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় হৈ হৈ ব্যাপার। ছ’নম্বরের দক্ষিণের বারান্দায় রিহার্সাল চলছে, অবনীন্দ্রনাথ চুপ করে বসে মহড়া দেখছেন। তারপর নিজের মনে রাঙিয়ে নিলেন মহড়ার বিভিন্ন দৃশ্যের ছবিগুলি। এরপর পাঁচনম্বরের দক্ষিণের বারান্দার কেদারায় বসে একের পর এক এঁকে ফেললেন ‘শেষ বর্ষণ’ এর অভিনয়ের মহড়ার ছবিগুলি।

একদিন শোনা গেল রূপকথার ‘রাজার বাড়ি’ জোড়াসাঁকোতে সত্যি দেশের রাজা রাণী আসবেন। ছ’নম্বর বাড়ির উঠোন সাজলো ভারি মখমলের গদি, আরাম কেদারায়। দর্শক আসনে প্রথমে মখমলের গদিতে বসলেন বেলজিয়ামের রাজা রানি ও পারিষদরা। মুগ্ধ হয়ে দেখলেন ‘শেষ বর্ষণে’র অভিনয়।

আজ আর পাঁচ নম্বর বৈঠকখানা বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার অস্তিত্ব নেই। ছ’নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দা, বারান্দার পুব কোনের ঘর, জানালার খড়খড়ি আজও একই রকম আছে। শুধু দুই বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার মানুষজন, উৎসব-আয়োজন, আলাপ-আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা, মজলিশ কেবলই স্মৃতি। আর অনাদিকালের দিকে তাকিয়ে শুধু অপেক্ষা ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার…………’