January 1, 2020

Rabindranath Tagore’s Late Musical Creativity (1921–1941):Aesthetic Transformation and Human Crisis

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

Dr. Rajasree Bhattacharya

Abstract

The final two decades of Rabindranath Tagore’s life cannot be regarded as a phase of creative decline; rather, they represent a period of extraordinary artistic expansion and aesthetic profundity. This phase reveals an unprecedented synthesis of poetry, music, painting, and philosophical introspection. Although this study focuses primarily on Tagore’s songs, it situates them within the broader framework of his late poetic, dramatic, and visual creativity. From the age of sixty onward, Tagore’s songs display a striking transformation in imagery, melodic structure, and thematic intensity, reflecting his deep engagement with nature, humanity, cosmic consciousness, and the moral crises of modern civilization.

During this period, the interaction between word, sound, and image becomes inseparable, particularly as poetic metaphors and musical expressions find visual resonance in his paintings. The influence of global events—especially the two World Wars, the rise of mechanized violence, and ideological conflicts—deeply shaped Tagore’s creative consciousness. His correspondence with thinkers such as Romain Rolland and essays like Crisis of Civilization reveal a poet profoundly disturbed by the erosion of human values, yet unwavering in his faith in humanity.

Tagore’s late songs articulate a dual vision: profound serenity and spiritual reconciliation coexist with anxiety, protest, and moral outrage. His seasonal songs from this period exhibit a refined architectural brilliance, moving beyond romantic sensibility toward a luminous, contemplative aesthetic shaped by scientific awareness and cosmic perception. In his late dramas, songs function not as ornamental insertions but as essential vehicles of social, ethical, and philosophical protest. Ultimately, Tagore’s late musical works emerge as a timeless artistic benchmark—where simplicity attains depth, melody becomes meaning, and song transforms into an embodiment of truth and human hope.

Key Words

Rabindranath Tagore; Late Period Songs; Rabindra Sangeet; Poetry and Painting; Cosmic Consciousness; World War and Human Crisis; Seasonal Songs; Dramatic Music; Modernity and Aesthetics

গানের রবীন্দ্রনাথ : প্রজ্ঞায় বিভায়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ দুই দশককে তাঁর সৃজনক্ষমতার স্তিমিত বা অবসানকাল বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেলেও, এই ধারণা আদৌ যুক্তিসংগত নয়¹। কারণ, এই পর্বে কবির সৃষ্টিকর্মে যে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য, ভাবগভীরতা ও শিল্পরূপের অভিনব রূপান্তর লক্ষ করা যায়, তা তাঁর জীবনের পূর্ববর্তী যে কোনো সৃজনপর্বকে ছাপিয়ে গেছে। সংখ্যার বিচারে যেমন এই সময়ে তাঁর রচনার পরিমাণ কম নয়, তেমনি গুণগত দিক থেকেও এই সৃষ্টি এক অভূতপূর্ব উৎকর্ষে উত্তীর্ণ। এই পরিণত বয়সে এসে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিকে আর কেবল আত্মমগ্ন রোম্যান্টিকতার প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং তা হয়ে উঠেছে জীবন, সমাজ, মানবসভ্যতা ও বিশ্ববীক্ষার গভীর উপলব্ধির মাধ্যম।

যদিও এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয় রবীন্দ্রনাথের গান, তবু তাঁর শেষ দুই দশকের কাব্যসৃষ্টির অভিনবত্ব উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ, এই সময়ের কবিতা ও গান পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত—একই ভাবলোক, একই দর্শন এবং একই অন্তর্দৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন শিল্পরূপ মাত্র। এই পর্বে কবিতায় যে প্রতীকী গভীরতা, ভাষার সংহতি ও দর্শনগত প্রসারণ লক্ষ করা যায়, তারই অনুরণন আমরা গানের বাণী ও সুরে প্রত্যক্ষ করি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই জীবনের স্বর্ণসায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যেখানে কাব্য ও গানের শব্দ, রূপকল্প ও সুরের ব্যঞ্জনা ধীরে ধীরে রঙ ও রেখার ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ, শব্দশিল্প ও সংগীতশিল্পের অন্তর্নিহিত অনুভব চিত্রকলার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এই পর্বে সৃষ্ট রবীন্দ্রনাথের বিপুল চিত্রসম্ভার কেবল একটি নতুন শিল্পমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ নয়; বরং তাঁর কবিমানসের এক গভীর, ধ্যানমগ্ন ও অন্তর্মুখী বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে²। ফলে, তাঁর শেষ জীবনের চিত্রকলাকে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং কাব্য–সংগীত–চিত্রকলার সম্মিলিত শিল্পচেতনার এক পরিণত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, প্রথম যৌবনে রবীন্দ্রনাথ একটি কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ‘ছবি ও গান’। কিন্তু সেই নামকরণের মধ্যেও প্রকৃত অর্থে চিত্রকলার অনুশীলন তখন অনুপস্থিত ছিল। যৌবন ও মধ্যবয়সে রচিত ‘চিত্রা’, ‘কল্পনা’, ‘বলাকা’, ‘পূরবী’ কিংবা ‘বীথিকা’—এই কাব্যগ্রন্থগুলিতে ‘ছবি’ মূলত রূপক ও প্রতীকের স্তরে উপস্থিত, দৃশ্যমান চিত্ররূপে নয়। এই গ্রন্থগুলিতে আমরা রবীন্দ্রনাথের মননচিন্তার ক্রমবিবর্তন, দার্শনিক অনুসন্ধান এবং কাব্যভাষার রূপান্তর লক্ষ্য করি। একই সঙ্গে এই পর্বে তাঁর কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও এক নতুন রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করা যায়—যেখানে মানবমনের জটিলতা ও সমাজবাস্তবতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ স্পষ্ট।

কিন্তু এই সব সত্ত্বেও, তখনো শব্দ, বচন ও রঙ সম্পূর্ণভাবে একাকার হয়ে যায়নি। অর্থাৎ, কাব্য, গান ও চিত্র—এই তিন শিল্পমাধ্যম তখনও স্বতন্ত্র সীমানায় অবস্থান করছিল। ষাটোত্তীর্ণ বয়সে প্রবেশের পরেই প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে এই তিনের এমন এক গভীর সংমিশ্রণ ঘটে, যেখানে শব্দের ভাবব্যঞ্জনা রঙের অভিঘাতে রূপান্তরিত হয় এবং রঙ ও রেখা হয়ে ওঠে নীরব কবিতা বা নির্বাক সংগীত²। এই সমন্বয়ই রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের সৃষ্টিকে এক অনন্য শিল্পপর্বে উত্তীর্ণ করেছে।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ দুই দশককে তাঁর সৃজনক্ষমতার স্তিমিতপর্ব বলে কোনওভাবেই গণ্য করা যায় না¹। কেননা, এই শেষ দুই দশকে কবির সৃষ্টির বৈচিত্র্য তাঁর জীবনের অন্য যে কোনো পর্বকে অতিক্রম করে গেছে।

আমাদের আলোচ্য বিষয় গান হলেও, তাঁর এই দুই দশকের কাব্যসৃষ্টির অভিনবত্ব বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। আবার, এই স্বর্ণসায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির আরেকটি দিককে গভীর ধ্যানমগ্নতায় উদ্ভাসিত করেছেন—যেখানে কাব্য ও গানের শব্দ, রূপকল্প ও সুরের ব্যঞ্জনা রঙে রেখায় রূপান্তরিত হয়ে আমাদের বিমুগ্ধ করেছে। আমরা বলছি, এই পর্বে রবীন্দ্রনাথের ছবির ঐশ্বর্যের কথা²।

প্রথম যৌবনে কবি একটি কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ‘ছবি ও গান’। কিন্তু সেই যৌবনপর্বে এবং তার পরেও ‘চিত্রা’ থেকে ‘কল্পনা’, ‘কল্পনা’ থেকে ‘বলাকা’, ‘বলাকা’ থেকে ‘পূরবী’, ‘পূরবী’ থেকে ‘বীথিকা’—কোথাও আমরা তাঁকে প্রকৃত অর্থে চিত্রকলার ভুবনে পাই না। বরং পাই রবীন্দ্র-মনন-চিন্তার বিবর্তনধারা। এমনকি, গল্পকার রবীন্দ্রনাথকেও এই পর্বে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু শব্দ, বচন ও রঙ তখনও একাকার হয়ে যায়নি, যেমনটি হয়েছে তাঁর ষাটোত্তীর্ণ বয়সের পর থেকে²।

এক্ষেত্রে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলা যায়, এই পরিণত সময়পর্বের উত্তরাধিকার রবীন্দ্রোত্তর যুগের সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ কবিদের সৃষ্টিকেও সমৃদ্ধ করেছে। অর্থাৎ, poetry in painting এবং painting in poetry—এই ধারণা তাঁদের রচনাতেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে²।

ষাট থেকে আশি বছর বয়স পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ প্রায় এক সহস্র গান রচনা করেছেন³। মানুষ, প্রকৃতি, জীবন, বিশ্বজগত, প্রেম, মৃত্যু, প্রশান্তির প্রার্থনা, বাউল-বৈরাগ্যের ব্যাকুলতা এবং বিশ্বজুড়ে মানবশক্তি ও দানবশক্তির সংঘাতে মানবতার ক্ষয়ক্ষতির গভীর আশঙ্কা—এই বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের সঙ্গে কবি নিজেকে নিবিড়ভাবে সংলগ্ন করেছেন। এই বৈচিত্র্য গানের মধ্যে প্রকাশ পেলে শব্দতরঙ্গ রঙে রঙে ঝলমল করে ওঠে—যা তাঁর প্রথম ও মধ্যপর্বের গানে এত উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে না³।

এই পর্বে একদিকে কবি গভীর প্রশান্তিতে মগ্ন—দৃষ্টির সামনে এক অন্তহীন শান্তির পারাবার, আবার অন্যদিকে কবিচিত্তে সংক্ষোভ ও বিক্ষোভের প্রবল আলোড়ন। এই আলোড়নের অনুরণন তাঁর শেষ পর্বের কবিতা, গল্প ও নাটকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ—বিশেষ করে গানের রবীন্দ্রনাথ—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মঙ্গল ও সৌন্দর্যের উপাসক। প্রেম, প্রকৃতি ও পূজার ভাব সব পর্বের গানেই সাধারণ। কিন্তু উপাসনার মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে যখন দানবশক্তির হুংকার ও মানুষের আর্তনাদ শোনা যায়, তখন বিশ্বাসের ভূমি কেঁপে ওঠে⁴। মনোযোগী গীতবিশ্লেষণে এই দ্বৈত রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যক্ষ করা যায়।

যুদ্ধে, জাতিবিদ্বেষে, হিংস্রতায় ও ক্ষমতালোলুপতায় মানবসভ্যতা যে সর্বনাশের অন্ধকার গহ্বরে পৌঁছেছে—রবীন্দ্রনাথ তাতে শুধু উদ্বিগ্ন নন, গভীরভাবে আতঙ্কিতও⁴। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তখনও ‘দেবতার অমর মহিমা’-য় তাঁর বিশ্বাস অটুট ছিল। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণডঙ্কা তাঁর বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

১৯৩৮ সালের ২৫ জুলাই রোমাঁ রল্যাঁকে লেখা চিঠিতে তিনি ইউরোপ ও রাশিয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছিলেন—পশ্চিমে আবার কেন এই রণডঙ্কা⁵। উত্তরে রল্যাঁ লিখেছিলেন—“strain your harp ever and forever”⁶। এই আহ্বান রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে সৃজনমগ্ন হতে প্রেরণা দেয়।

এই মানসিক পীড়ার প্রতিফলন ঘটে ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে—“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ…”⁷। একই প্রত্যয় তিনি গানে উচ্চারণ করেন—“ওই মহামানব আসে…”⁸। সমস্ত বিষাদ অতিক্রম করে এক ক্ষমাসুন্দর ঋষির মতো তিনি মানবকল্যাণের শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে অভিশাপ উচ্চারণ করেন এবং কল্পনা করেন এক নতুন মানবসভ্যতার।

বাংলা গানে ঋতুবৈচিত্র্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবেও রবীন্দ্রনাথ অনন্য। শেষ দুই দশকের ঋতুগানে বিজ্ঞানচেতনা ও বিশ্বসৃষ্টির রহস্যবোধ তাঁর রোম্যান্টিক ভাবমগ্নতাকে নতুন দ্যোতনায় রূপান্তরিত করেছে¹⁰। এই গানগুলি হীরকোজ্জ্বল নান্দনিক স্থাপত্যের নিদর্শন।

শেষ পর্বের নাটকগুলিতে গান নাটকীয় প্রয়োজনেই রচিত। ‘মুক্তধারা’, ‘রক্তকরবী’, ‘শাপমোচন’, ‘তপতী’ প্রভৃতি নাটকের গানে প্রতিবাদী রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রক্ষেপণ স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন নীহাররঞ্জন রায়⁹। এখানে গান আরোপিত নয়—বরং নাট্যভাবনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

দেশ, সমাজ ও সভ্যতার সঙ্কটকালে রবীন্দ্রনাথের বীণায় যে সুর বেজেছে, তা একার নয়—সর্বজনের, বিশ্বজনের। বিশ্বভ্রমণ, যুদ্ধের অভিঘাত ও আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের প্রেরণায় কবির শেষ জীবনের গান হয়ে উঠেছে সত্যের আনন্দময় রূপ। এই রবীন্দ্রসংগীত তাই কালজয়ী—এবং শেষ পর্বের রবীন্দ্রসংগীত শিল্পের এক স্বতন্ত্র মানদণ্ড।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনজীবনের শেষ দুই দশক কেবল একটি কালপর্ব নয়, এটি তাঁর শিল্পচেতনার সর্বোচ্চ পরিণতির পর্ব। এই সময়কে সৃজনক্ষমতার অবসানকাল হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রচলিত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল, এই আলোচনার আলোকে তা সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত ও অসার বলে প্রতিপন্ন হয়। বরং এই পর্বেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিশীলতার সর্বাধিক বিস্তার ঘটিয়েছেন—সংখ্যার বিচারে যেমন, তেমনি ভাব, রূপ ও দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতার দিক থেকেও। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর শিল্প আর ব্যক্তিগত অনুভবের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বিশ্বমানবের অভিজ্ঞতার ধারক ও বাহক।

এই পর্বের রবীন্দ্রসংগীত বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, গান এখানে আর কেবল সৌন্দর্যের আরাধনা নয়—তা এক গভীর দার্শনিক উচ্চারণ। প্রেম, প্রকৃতি ও পূজার চিরাচরিত বিষয়বস্তুর পাশাপাশি মানবসভ্যতার সংকট, যুদ্ধের বিভীষিকা, যান্ত্রিকতার আগ্রাসন এবং মানুষের ওপর মানুষের নির্মমতার বিরুদ্ধে কবির তীব্র প্রতিবাদ এই গানগুলিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। অথচ এই প্রতিবাদ কখনোই শ্লোগানধর্মী নয়; তা শিল্পরূপে সংহত, অন্তর্মুখী এবং গভীরভাবে মানবিক। শান্তি ও অশান্তি, বিশ্বাস ও সংশয়, আশ্বাস ও আতঙ্ক—এই দ্বৈত সত্তা একত্রে উপস্থিত থেকেই এই পর্বের গানের বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করেছে।

একই সঙ্গে লক্ষ্য করা যায়, জীবনের এই অন্তিম পর্বে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে কাব্য, সংগীত ও চিত্রকলার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছে। শব্দের ব্যঞ্জনা রঙের ভাষায়, সুরের কম্পন রেখার ছন্দে রূপান্তরিত হয়ে শিল্পের একটি সমগ্রতর রূপ নির্মাণ করেছে। এর ফলে তাঁর চিত্রকলা আর বিচ্ছিন্ন কোনো সৃজনপ্রয়াস নয়; বরং তা রবীন্দ্রসংগীত ও কবিতার অন্তর্গত অনুভবের দৃশ্যমান সম্প্রসারণ। এই সমন্বিত শিল্পচেতনা রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক বিশ্বশিল্পের পরিসরে এক স্বতন্ত্র ও অগ্রগণ্য অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নাট্যসংগীতের ক্ষেত্রেও শেষ পর্বের রবীন্দ্রনাথ এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করেন। এখানে গান আর অলংকার নয়, নাট্যবস্তুর অন্তর্গত ভাষ্য। সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সংকটকালে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের এবং ক্ষমতার সঙ্গে মানবিকতার সংঘাতকে প্রকাশ করতেই এই গানগুলি রচিত। ফলে ‘মুক্তধারা’ বা ‘রক্তকরবী’-র গানগুলি কেবল নাট্যঘটনার অনুষঙ্গ নয়, বরং কবির প্রতিবাদী মানবচেতনার শিল্পরূপ।

তথ্যসূত্র

¹ ঘোষ, শঙ্খ। রবীন্দ্রনাথ: অন্ত্যপর্ব। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯২।

² সেন, সুকুমার। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতা। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৭৪।

³ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। গীতবিতান। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।

⁴ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। কালান্তর। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৯৪১।

⁵ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রাশিয়ার চিঠি। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৯৩১।

⁶ রল্যাঁ, রোমাঁ। I Shall Not Rest। ইংরেজি গ্রন্থ।

⁷ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। “সভ্যতার সঙ্কট।” অন্তর্ভুক্ত: কালান্তর। বিশ্বভারতী, ১৯৪১।

⁸ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। গীতবিতান; কালান্তর

⁹ রায়, নীহাররঞ্জন। রবীন্দ্রপরিক্রমা। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৬১। অধ্যায়: “নাটকের সংগীত”।

¹⁰ দত্ত, অশোক কুমার। রবীন্দ্রসংগীত: রূপ রস। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৯৮৮।