রবীন্দ্রনাট্য ঋণশোধ : জীবনবোধের বিস্তারিত অনুভব
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য , বেঙ্গল মিউজিক কলেজ
প্রকৃতিকে বরণ করেন রবীন্দ্রনাথ অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে। প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের সম্বন্ধ তাঁর। সৃষ্টিমূলক বহু রচনায় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের স্বাক্ষর রেখে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কবিমানসের স্ফুরণ ঋতুসংগীতে ঋতুনাট্যে ফিরে ফিরে দেখা দিয়েছে। প্রকৃতির সংসারে পাই সৌন্দর্যের সমাহার, যা বৈচিত্র্যময় অথচ নিয়ত শৃঙ্খলামণ্ডিত মঙ্গলদাত্রী রূপের প্রকাশ।
ছয় ঋতুর সমাহারে আশ্রিত বাংলার জীবনধারা নিবিড় এক জীবনভাবনা ভাবতে শেখায়, যেখান থেকে হয়তো গড়ে ওঠে কোনো তত্ত্ব বা বিশেষ বোধ। সেই বোধকে মর্যাদা দেন রবীন্দ্রনাথ। এমনই এক বোধিমগ্ন তত্ত্বনাট্যের নাম ঋণশোধ(১৯২১), যার উৎসে আছে শারদোৎসব নাটক (১৯০৮)।
বালক উপনন্দর গুরুঋণ শোধের গল্প এই ঋণশোধ। প্রয়াত গুরুর ঋণ শোধ করে শিষ্য উপনন্দ– পুঁথি লিখে। আনন্দের সব দরজা বন্ধ করে এক মনে কাজ সম্পন্ন করতে থাকে। ঋণ শোধ না হলে তার মুক্তি নেই। অবশ্যই সেই মুক্তি তার অন্তরের। আনন্দের সঙ্গে এই দায় সে নিজের ওপর তুলে নেয়। এ তার ভালোবাসার দায়– শ্রদ্ধার, প্রেমের দায়।
আপন তাগিদ থেকে আগ্রহ থেকে এ দায় বহন করতে আসে উপনন্দ– যেন ব্রতপালন।
ঋণগ্রস্তের বাধ্যতামূলক পরিশোধ তো এক ক্লান্তিকর কর্তব্য পালন। নিয়ম পালন। তার মধ্যে মানবিক বন্ধনের যোগ নেই। প্রয়োজনের দায়। কিন্তু অপ্রয়োজনের আনন্দ যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্ম দেয়, যে কাজের দায় উপনন্দকে কেউ চাপিয়ে দেয় নি, সেই দায় বহন করার ভিতর দিয়ে গুরুর সান্নিধ্য অনুভব করে সে। গুরুর সম্মান রক্ষা করে। সেখানেই তার পরম প্রাপ্তি ঘটে। এই প্রাপ্তিও বেদনাঘন। ত্যাগের মধ্যে দিয়ে, বিরহবেদনার মধ্যে দিয়ে, দুঃখের ভিতর দিয়ে তার প্রকাশ।
বোধের এই প্রতিধ্বনি ধ্বনিত হয় শারদোৎসব নাটকের সন্ন্যাসীর সংলাপে:
সন্ন্যাসী। জগত আনন্দের ঋণ শোধ করছে। বড় সহজে করছে না, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সমস্ত ত্যাগ করে করছে। সেইজন্যেই ধানের ক্ষেত এমন সবুজ ঐশ্বর্যে ভরে উঠেছে, বেতসিনীর নির্মল জল এমন কানায় কানায় পরিপূর্ণ। কোথাও সাধনার এতটুকু বিশ্রাম নেই, সেই জন্যেই এত সৌন্দর্য।
ঠাকুরদাদা। একদিকে অনন্ত আনন্দ আনন্দভাণ্ডার থেকে তিনি কেবলই ঢেলে দিচ্ছেন, আর এক দিকে কঠিন দুঃখে তারই শোধ চলছে।…..
সন্ন্যাসী। লক্ষ্মী যখন মানবের মর্ত্যলোকে আসেন তখন দুঃখিনী হয়েই আসেন;……. শত দুঃখেরই দলে তাঁর সোনার পদ্ম সংসারে ফুটে উঠেছে, সে খবরটি আজ ওই উপনন্দের কাছ থেকে পেয়েছি।
ঋণের ফাঁদে মানুষই পড়ে। ঋণ দেয়, ঋণ নেয়। দেনাপাওনার হিসেবের মধ্যে জীবনকে বেঁধে রাখে। কিন্তু উপনন্দ! এই পুঁথি নকল করতে করতে যখন ঋণ শেষ হবে তার— প্রকৃতি তাকে একেবারে আপন করে নেবে।
‘ঋণশোধে’ শেখর ও সন্ন্যাসীর কথোপকথনেই তার প্রকাশ। সন্ন্যাসী বলেন,
সন্ন্যাসী। এই ঋণশোধের ছবি আমি দেখে নিলেম ওই উপনন্দের মধ্যে। ওই তো প্রেমের ঋণ প্রেম দিয়ে শুধছে। উপনন্দকে তুমি দেখেছ?
শেখর। হ্যাঁ। তাকে দেখেছি। বুঝেও নিয়েছি।…….
সন্ন্যাসী। ওকে সবাই ভালোবাসে কেননা– ও যে দুঃখের শোভায় সুন্দর।
শেখর। ঠাকুর, যদি তাকিয়ে দেখো, তবে দেখবে সব সুন্দরই দুঃখের শোভায় সুন্দর। এই যে ধানের ক্ষেত আজ সবুজ ঐশ্বর্যে ভরে’ উঠেছে এর শিকড়ে শিকড়ে পাতায় পাতায় ত্যাগ। মাটি থেকে, জল থেকে, হাওয়া থেকে যা-কিছু ও পেয়েছে– সমস্তই আপন প্রাণের ভিতর দিয়ে একেবারে নিংড়ে নিয়ে মঞ্জরীতে মঞ্জরীতে উৎসর্গ করে দিলে। তাইতো চোখ জুড়িয়ে গেল।
সন্ন্যাসী। ঠিক বলেছ উদাসী,– প্রেমের আনন্দে দুঃখের ভিতর দিয়ে উপনন্দ জীবনের ভরা ক্ষেতের ফসল ফলিয়ে তুললে–
শেখর। ওই দুঃখের রতনমালা বিশ্বের কন্ঠে ঝলমল করছে—
শেখর গেয়ে ওঠেন,
তোমার সোনার থালায় সাজাবো আজ দুঃখের অশ্রুধার
জননী গো গাঁথবো তোমার গলার মুক্তাহার…
শেখরের এই গানের সুর কী এক অনির্দেশ্য অজানা বেদনায় অন্তরকে মথিত করে তোলে। ঋণশোধের গানগুলিতে সেই বেদনার প্রকাশ … কৃতার্থতা… ধন্যতাবোধের প্রকাশ… নতিস্বীকারের বিনম্র ছবি। জগত প্রকৃতি ডালা উজাড় করে যা কিছু আমাদের দেন, তার প্রতিদানে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, কৃতার্থতাই আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি আবার প্রকৃতিকেই; আর এই সম্পর্কবোধেই আমাদের অপার আনন্দের প্রাপ্তি।
শেখর তাই গানে বলেন,
দেওয়া-নেওয়া ফিরিয়ে দেওয়া তোমায় আমায়
জনম জনম এই চলেছে
বিশ্বপ্রকৃতির মন্দ্ররব আর একতারার মেঠো সুরের ঐকতান শোনা যায়, সোনার আলো ধার নিয়ে গাছে ফুল ফোটে। তাতেই ধার শোধ হয়। হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনায় মানবপ্রকৃতি আর বিশ্বপ্রকৃতি মিলেমিশে যায়। একের দায় অপরে বহন করে।
ঋণশোধের তত্ত্ববিচারে এই জীবনবোধের ধারণাটি স্পষ্ট হয়ে আসে। শারদোৎসব একই গল্প বলে। কিন্তু তার নামেই নিহিত আছে তার প্রকৃতি-উৎসবের পরিচয়। আলোর উজ্জ্বলতা… টলটলে জলরাশি… নীল আকাশজোড়া সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘের মেলা… ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া… ধান পাকানো সোনালী রঙের ক্ষেত… শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা… কেমন এক আকুল আবার উদাস ভাব… উৎসবের আহ্বান… প্রাচীনকালে রাজাদের দিগ্বিজয়ে বেরোনোর মতো অজানার হাতছানি… তারই ভিতরে পদ্মপাতায় টলটলে জলের মত উপনন্দের দুঃখটুকুতে সূর্যের প্রথম আলোর রক্তিম আভা নন্দনবনের পারিজাতসৌরভের আভাস এনে দেয়।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর এই শারদোৎসবের কিছু পরিমার্জনাসহ যখন ঋণশোধ আমরা পাই, তখন দেখি, সেখানে আরো বেশি করে যুক্ত হয়েছে জীবনের কিছু বিশেষ উপলব্ধিকে প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা। ঋণশোধ তাই তত্ত্বনাট্য।
দুই নাটকেই আকাশ ভেঙে বাহিরকে লুট করে নেবার দুর্মর ইচ্ছে। তবু ঋণশোধে অন্তর্গত এক ঘরের আশ্রয়ের আহ্বান—
ঘর ছাড়া আজ ঘর পেল যে আপন মনে রইলো মজে..
আর আত্মগত সেই ঘরের ডাক কানে নিয়ে ঘরছাড়া মেঘ ভাসতে ভাসতে চলল অনির্দেশ্য ঠিকানার পথে।
এই যে সামগ্রিক সংযুক্তিকরণ; সবকিছু ভালোর ভিতর দিয়ে মঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘটাতে চেয়েছেন নাট্যকার— ঋণদাতা আর ঋণগ্রহীতা, উত্তমর্ণ ও অধমর্ণ যেন এক বিন্দুতে মিলে যেতে চায় শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতায়, করুণায়, প্রেমে; তাকেই বারে বারে নানা মাধ্যমে খুঁজেছেন তিনি গানে গল্পে নাটকে।
ঋণশোধ নাটকে শেখরের কন্ঠে গান যুগিয়েছেন:
আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার মনে আমার মনে
সে আছে বলে আমার আকাশ জুড়ে ফোটে তারা রাতে প্রাতে ফুল ফুটে রয় বনে
শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রকৃতিলালনে এবং আশ্রমিক ছাত্র-ছাত্রীদের মনন বিকাশে শারদোৎসব ও ঋণশোধ-সহ যত নাটক লেখা হয়েছে, সেই সবের মধ্যেই প্রকৃতিচেতনার বিস্তারিত অবগাহনস্নানে আমরা স্নাত হই।