খেলতে খেলতে ফুটেছে ফুল : রবীন্দ্রকবিতায় সুরবিস্তারের খেলা
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য
Abstract
This paper, titled “Blossoming Through Play: The Play of Melodic Expansion in Tagore’s Poetry”, explores the transformative relationship between text (bāṇī) and melody (sura) in the songs of Rabindranath Tagore. While a poem read from Gitabitan offers a specific tonal and semantic mood, its musical rendering often produces a distinct emotional resonance. The study argues that Tagore consciously employed melodic variation, repetition, accentuation, and even deliberate departures from strict raga grammar to reshape poetic meaning and intensify aesthetic experience.
Through close reading of selected songs—such as “Na bujhe kare tumi bhasale āṅkhijale,” “Noy e madhur khela,” “Aji jhoro jhoro mukhoro bādor dine,” and several storm-themed compositions—the paper demonstrates how shifts in rhythm, metric structure (e.g., 2/2 versus 2/4 patterns), register (madhya and mandra saptak), and tonal contour (ascending leaps versus descending phrases) create contrasting expressive moods. Repetition of words like “na,” elongation of syllables, and intentional return to alternative lines function not merely as musical devices but as semantic amplifiers. In certain cases, Tagore’s subtle raga deviations or mixtures generate new expressive dimensions without disrupting aesthetic coherence.
The discussion also situates these compositional strategies within Tagore’s evolving theoretical reflections on music, as articulated in essays from Sangit O Bhav, Gan Sambandhe Prabandha, and Sangiter Mukti. His thought progresses from viewing melody as subordinate to poetic meaning, to asserting music’s autonomous expressive power, and finally to proposing an inseparable synthesis of word and tune. The paper concludes that Tagore’s songs exemplify a dynamic interplay in which melody does not merely ornament poetry but reinterprets and re-creates it, producing layered aesthetic experience that transcends textual reading alone.
Key Words
Rabindranath Tagore; Rabindra Sangeet; Gitabitan; Text–Melody Relationship; Raga Adaptation; Musical Semiotics; Aesthetic Mood (Rasa); Repetition and Variation; Storm Motif in Tagore; Word–Tune Synthesis.
গীতবিতান অনুসারে একটি গান পাঠ করলে তার এক ধরনের মেজাজ আমরা পাই। আবার সুরে ঢেলে যখন গানটি গাওয়া হয়, হয়তো রস-আস্বাদনের ভিন্ন একটা আমেজ তখন তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সুরের একটি কাজ কবিতার পাঠটিকে নতুন আর একটা দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার করা।
আমরা জানি, শিল্পবস্তু যখন মাধ্যম পরিবর্তন করে, তখন নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলেই করে।
তাই নন্দলাল ও রবীন্দ্রনাথের হাতে একই ‘নটীর পূজা’য় দুজন ‘শ্রীমতী’ রূপায়িত হয়—নাট্যচরিত্রে ও চিত্রকলায়।
বিভূতিভূষণ আর সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখবার দুটো নতুন দৃষ্টিকোণ আনে।
‘দেখি নাই ফিরে’তে বিকাশ ভট্টাচার্যর চিত্রায়ন
নিছক ইলাস্ট্রেশনে আটকে থাকে না।
গুপি আর বাঘা, উপেন্দ্রকিশোর আর সত্যজিতের হাত ধরে, দুটো আলাদা মাধ্যম থেকে আলাদা ধরনের মজা বিতরণ করে।
এমনকি, ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্র কখনোই গল্পটির অনুকৃতি হয়ে থাকে না।
রবীন্দ্রনাথও রূপান্তরের এই খেলায় সামিল ছিলেন।
সারা জীবন ধরে নানা ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়েই উত্তরণ ঘটিয়েছেন আপন শিল্পের। ‘কবিতার গানে রূপান্তর’ তাই নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সুর প্রয়োগের কিছু বিশিষ্ট ধরন তিনি ব্যবহার করেন, যা মেজাজের পার্থক্য ঘটিয়ে দেয়। অর্থ ও ভাবের পরিবর্তন হয়ে যায়– বা বক্তব্যের জোরটা ভিন্ন জায়গায় পড়ে। শিল্পস্রষ্টার প্রয়োগ-প্রকৌশলের সার্থকতা বিচার করা কঠিন, যেহেতু তা’ ব্যক্তিসাপেক্ষ। কিন্তু, শ্রোতার কানে মেজাজের এই পরিবর্তনসাধন এবং তার আস্বাদনটুকু অবশ্যই ব্যক্তি-নিরপেক্ষ।
রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে অনেক সময়ে দেখি, সুর প্রয়োগ করতে গিয়ে গানের বাণীতে কিছু অতিরিক্ত কথা যোগ হচ্ছে। অথবা দেখি, কথার কোনো কোনো টুকরোতে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণযোগে আলোচনা করা যেতে পারে;-
না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে..
গানের শেষে প্রথম লাইনের পরিবর্তে দ্বিতীয় লাইনে ফিরছে সুরে ঢালা কথা :
শেষ লাইন : দেখোনি ফিরে কার ব্যাকুল প্রাণের সাধ এসেছ দলে।।
দ্বিতীয় লাইন : ওগো কে আছে চাহিয়া শূন্য পথ পানে কাহার জীবনে নাহি সুখ কাহার পরান জ্বলে
তারপরে বলছি প্রথম লাইন : না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখি জলে
এ গানের বক্তা নির্দিষ্ট। শ্রোতা অর্থাৎ ‘তুমি’ও নির্দিষ্ট। কিন্তু তৃতীয় আর এক ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে– যে অস্পষ্ট, যাকে বিনা অপরাধে আঁখিজলে ভাসতে হয়, যার নিরুচ্চার আত্মনিবেদন ‘তুমি’কে স্পর্শ করে না। সে নিরন্তর আহত হয়। তারই শূন্য পথে শূন্যদৃষ্টিমাখানো করুণ চাহনি বক্তাকে উদ্বেল করে। সে ‘তুমি’কে বোঝাতে চেনাতে চায় এই প্রতীক্ষমানের অস্তিত্ব; মৃদু ভর্ৎসনার আঙ্গিক নিয়ে। গানের শেষ লাইন গেয়ে দেওয়ার পরেও আবার বক্তা মনে করিয়ে দিতে চায় ‘তাকে’, সেই অস্পষ্ট সত্তার বেদনাকে.. আর দ্বিতীয় লাইনটির পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এই কাজটা হয়ে যায়।
গানটি কবিতা হিসেবে পাঠ করলে এভাবে আমরা ভাবতে পারবনা হয়তো বা। কারণ,
‘ব্যাকুল প্রাণের সাধ এসেছ দলে’ বলেই বক্তব্য কবিতা সব শেষ হয়ে যাচ্ছে; যে মেজাজে কেবলই ধিক্কার ভেসে আসে শ্রোতার প্রতি- বক্তার।
‘নয় এ মধুর খেলা…’ গানের পাঠে এই একবারই ‘নয়’এলো। সুরে কতবার ঘুরে ঘুরে দুবার তিনবার করে ‘নয়’ বলছি। শুরুতেই দুবার ‘নয়’– যেন সাবধানবাণী। বারবার মনে করিয়ে দেওয়া। পাঠে কিন্তু এই সতর্কীকরণ নেই। বরং কেন যে ‘নয়’, সেই ব্যাখ্যা পাই।
‘শ্যামল ছায়া নাইবা গেলে..’ গানের দ্বিতীয় লাইনটি গীতবিতানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তাই পাঠেও অনুপস্থিত। কিন্তু সুরে আছে। এই ‘না না নাইবা গেলে’ টুকু বাদ দিলে গানের মহিমা আর থাকে না। ‘না’ গুলোতে মিনতি করা হয়। থেকে যেতে বলার আর্তি ঝরে পড়ে। আর্তস্বর বোঝাতে গিয়ে সুরে মাত্রা বাড়িয়ে নেওয়া হয়।
‘নাইবা এলে যদি সময় নাই..’ গানের পাঠে একই ধরনে ‘না’ কথাটি একেবারেই নেই। অথচ গানে কতক্ষণ ধরে মীড় দিয়ে মিনতির সুর। বারবার। ঘুরেফিরে। মিনতির এই আর্তিমাখা উচ্চারণ পাঠের বেলায় করা যাবে না। সেখানে ‘না’- ই তো নেই! এই গানেরই শেষ কথা
‘যেন সময়হারা সেই সময়ে একটি সে গান গাই।’
‘একটি’ পাঠে একবার, গানে দুবার। প্রথম ‘একটি’র এক- তিন মাত্রা জুড়ে প্রলম্বিত। ‘কেবল একবার’… মহাকালের প্রতিতুলনায় কেবল একটিবার, অনন্তের পাশে মাত্র এক মুহূর্ত… বোঝাতে। ‘টি’ দারুণ নির্দিষ্ট স্বর। এমনভাবে সুরবদ্ধ- যেন মনে হয়- একটিই। একাধিক নয়। পরের ‘একটি’- গান গাইবার বাসনার দিকে বিসর্পিত। এত ব্যঞ্জনা পাঠে আনার উপায় কই!
‘না না না বন্ধু….’ বন্ধুত্বের অনুরোধ। তুলনায় আর্তি কম। আপত্তির ভাব বেশি।
‘না যেওনা, যেও নাকো…’ প্রথম ‘না’– মিনতির সুর থেকে বদলে গিয়ে, আর্তনাদ ছাপিয়ে, রীতিমতো হাহাকারে পৌঁছে যায়।
‘ডাকব না ডাকব না…’গানের ‘না’- র সুর প্রতিবারই খুব সুনিশ্চিত।
‘নারে নারে হবে না তোর স্বর্গসাধন..’ এর ‘নারে’র সুরও একেবারে নির্দিষ্ট, নিশ্চিত। কারণ, গানগুলির বক্তব্যও নিশ্চিত, সুনির্দিষ্ট।
এই শেষ তিনটি গানের ক্ষেত্রে অবশ্য গানে পাঠে ভেদ নেই।
‘নীল অঞ্জনঘনপুঞ্জছায়ায় সম্বৃত অম্বর..’
‘হে গম্ভীর…’ পাঠে একবার, গানে দুবার। দুবারে দুটো সুর। প্রথম সুরে গম্ভীরকে আবাহন, সম্বোধন। দ্বিতীয় সুরে তার গাম্ভীর্যকে বোঝানো, সুরের গভীরতা দিয়ে। ‘মেঘমন্দ্রিত ছন্দে’- দুবার। প্রতিটি তুকের শেষ লাইন– দুবার।
‘নন্দিত তব উৎসবমন্দির।’ এবং
‘ছিন্ন হয়েছে বন্ধন বন্দীর।’
পাঠে এভাবে নেই। বলতে পারি, দুটো ভিন্ন সুরে দুবার গাওয়ার জোরের মধ্যে দিয়ে উৎসবমন্দিরের আনন্দ, মেঘের মন্দ্ররব, ঝিল্লির ঝংকার, বন্দীর বাধনছেঁড়ার উচ্ছ্বাস বোঝাচ্ছেন।
গানে যে পুনরাবর্তন ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতের রীতি অনুসারে হয়– (অর্থাৎ স্থায়ী ও সঞ্চারী দুবার, অন্তরা ও আভোগে প্রথম দু লাইন দুবার ইত্যাদি) সেই পুনরাবৃত্তি এখানে আলোচ্য নয়। গানের স্বাভাবিক চলনের রীতি ভেঙে দিয়ে একই কথা দুবার বা বারবার বলা; প্রথম লাইনে ফিরতে গিয়েও অন্য কলির মাধ্যমে একটু ঘুরপথে ফেরা; এসব কিন্তু সুরগত নিয়ম বজায় রাখার স্বার্থে নয়।
‘না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে..’ গানে সুরের যে বনেদ, তাতে অনায়াসেই ‘ব্যাকুল প্রাণের সাধ এসেছ দলে’-র পর প্রথম লাইনে ফেরা যেত।
‘নীল অঞ্জনঘনপুঞ্জছায়ায়’ গানেও তাই। সুতরাং, এই পুনরাবর্তন উদ্দেশ্যমূলক,— বাণীপাঠের মেজাজের সঙ্গে সুরে গাওয়া গানের মেজাজে বৈচিত্র্য বৈভিন্ন তৈরি করতে। আর সুর এখানে অর্থকে নির্দিষ্ট করে বক্তব্যকে আলাদা মাত্রা দিচ্ছে। কারণ, সুরের কাজই হল কথার সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা।
এবার একটু অন্যরকম ভাবে বিষয়টিতে আলো ফেলা যেতে পারে—
১) বাণী এক + সুরের ভিন্নতা > মেজাজের ভিন্নতা
২) প্রসঙ্গ এক + বিষয় ও সুরের ভিন্নতা > মেজাজের ভিন্নতা
১) একই গানে দুবার দু-ধরনের সুরযোজনা হচ্ছে। তাতে গানের অর্থ আর ভাব যাচ্ছে বদলে। অর্থাৎ, সুরান্তর ঘটালে একটি কবিতা আসলে দুটি কবিতা হয়ে যায়।
‘আজি ঝরোঝরো মুখর বাদর দিনে…’ গানের একটি সুর-ছন্দে গানে গানে নন্দিত হয়ে ওঠা। ঝর্ ঝর্ বৃষ্টির আনন্দ, মজা। বৃষ্টির সঙ্গে চলে মন হারাবার খেলা।
২/২ ছন্দের চালও সাথসঙ্গত দেয়।
কিন্তু সুরান্তরের গানটিতে ২/৪ ছন্দের চালে আছে একটানা, একঘেয়েমির বর্ণনা। ছন্দ অসমান।
২/৪-এর ৪ ভাগের চলনটি যেন একঘেয়েমির ব্যঞ্জনা আনে। গোলাকৃতি সুরও বিষণ্ণ, একটানা, পুনরাবৃত্তিধর্মী— যা ওই ক্লান্তিমগ্ন প্রকৃতিরই গল্প বলে। এই গানের এই চলনটির সমর্থনে আরো কয়েকটি গানের কথা মনে আসে—
আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার.., নাই রস নাই.., প্রখর তপনতাপে…।
এই সব গানগুলিরই সুরের ছক ঘুরে ঘুরে, একটানা, মনভারাক্রান্ত ধরনে।
আর একটি গান– ‘ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো…’ দারুণ কল্লোল, ঝড়ের দাপট, বিজলির চমক, অনিয়ন্ত্রণের নিশীথগগনজোড়া বিস্তার গর্জে ওঠে– দ্রুত ছন্দের হাম্বীর আশ্রিত সুরটিতে।
অপর সুরটি কিন্তু সকুণ্ঠ ভয়ে লজ্জায় সংকুচিত। হাহাকারে ভরা দীর্ঘশ্বাস ‘গুমরে ফেরে সারা গান জুড়ে। আঁধার ঘরের তলা পর্যন্ত নির্লজ্জ নির্মম দৃষ্টি হানে বিজলি। সব লজ্জার, গোপনীয়তার আবরণ টুটে যায়। কুণ্ঠায় সংকোচে জর্জরিত স্বরক্ষেপের স্বরসঙ্গতি অবরোহী। গলা নেমে যেতে চায় গভীরে– যখন বলা হয় “আমার রইল না লাজলজ্জা..”, “আঁধার ঘরের তলে তারে রাখতে নারি টানি..।”
২) ‘ঝড়’ প্রসঙ্গে আরো গান—
‘হৃদয় আমার ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে…’
বাউল ছন্দের দোলায় এই ‘ঝড়’কে অনুভব করা হয়। ‘ঝড়’ এখানে পরমসত্তার প্রতীক, যাকে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছেন ঔপনিষদিক চেতনায়, আবার বাউলদের সহজিয়া সুরে।
‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার…’ এ গানের ‘ঝড়’ বহিরঙ্গের ঝড়। গানের অভিমুখ অভিসারের দিকে। ‘ঝড়’ এখানে কেবল পশ্চাৎপট রচনা করে। তাই শিসধ্বনি ব্যবহার করে ঝোড়ো হওয়ার প্রবাহ বোঝাতে হয়;– ‘আকাশ কাঁদে হতাশসম’। তখন নাসিক্যধ্বনির অনুপ্রাসে আসে ঝড়ের প্রেক্ষাপটে কোমলতার ব্যঞ্জনা— ‘নাই যে ঘুম নয়নে মম’। একবার মুক্তছন্দে, আর একবার পাঁচ মাত্রার ছন্দে গানটি গাওয়া যেতে পারে। মুক্ত ছন্দের গানে আগমনীর সুরটিই প্রধান। তালনিবন্ধ গানের ছন্দে শুনতে পাই আসন্ন মিলনক্ষণে হৃদস্পন্দনধ্বনি। গানটির রূপ বাগেশ্রী রাগে বাঁধা।
‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে…’– এ গানের ‘ঝড়’ অন্তরের দোলাচল। দুঃখ, মৃত্যু, বিচ্ছেদের রূপক ‘ঝড়’। দুটি গানের রাগরূপ এক হলেও অর্থ ও ভাবকে স্পষ্ট করতে গিয়ে রাগরূপ, সুরের চলন আমূল পাল্টে যাচ্ছে। যতবার ‘ঝড়’ সর্বনাশের প্রতীক হয়ে আসছে, ততবারই সুর অধোগামী। অবরোহী স্বরসমন্বয় শুধু নয়; নিচের গভীর, মন্দ্র স্বরসপ্তক ব্যবহৃত হচ্ছে শূন্যতা, হাহাকার, সব হারানোর যন্ত্রণার গাঢ় ব্যথার কথা বলতে গিয়ে। কিন্তু যখনই ‘ঝড়’ জয়পতাকা হয়ে ওঠে, সে উল্লাস প্রকাশ করতে গিয়ে সুরটা লাফ দিয়ে এক সপ্তক পার করে দেয়। তার ঠিক আগের কথাটিতে ছিল অবসাদের অন্ধকারে জড়বৎ পড়ে থাকা– একেবারে ধরাশায়ী। সুরও নিচের সা-এর মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে। এখান থেকেই উত্তুঙ্গ লাফে বিজয়কেতনের শীর্ষ স্পর্শ করে পরের লাইনের সুর,– ‘ঝড়ে’র জয়গান করবে বলে। আমরা দেখি, বাগেশ্রী অঙ্গের হওয়া সত্ত্বেও, দুটি গানের চলনে বিস্তর পার্থক্য। অবশ্য খুব প্রকট রাগমিশ্রণ বা বর্জিত স্বরের ব্যবহার কোনো গানেই নেই। সাধারণভাবে বিবর্জিত স্বর লাগিয়ে রাগভ্রষ্ট হলে একটা অসম্পূর্ণতা তৈরি হবার কথা।
রবীন্দ্রনাথ কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাগভ্রষ্ট হন। কিন্তু কেন? তিনি তো পূর্ণতার পূজারী! তবে কি রাগচ্যুত চলন গানে নতুন কোনো মাত্রা আনছে? বিপরীত দিক থেকে বলতে পারি, রাগমিশ্রণ বা ভ্রষ্ট না হলে কি এই অভিনবত্ব আনা যেত না? এ কি তবে দূরবর্তীর সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের (রবীন্দ্রনন্দনতত্ত্বের সূত্র অনুযায়ী) প্রয়াস!
আরো একটা কথা বলবার কথা এই যে— অদীক্ষিত শ্রোতার কানে রবীন্দ্রনাথের এই রাগচ্যুতির খেলাকে কিন্তু কখনো বে-পর্দা মনে হয় না। গানের অর্থ ও ভাবের সঙ্গে মিলিয়ে একটা পূর্ণ সঙ্গতি (হার্মনি অর্থে নয়, সুষমা অর্থে), তিনি খুঁজে পান। রবীন্দ্রনাথের মতো, এই সুরমিশ্রণের খেলা খেলেছিলেন সলিল চৌধুরী। আরো আগে দ্বিজেন্দ্রলাল, দিলীপকুমার। কিন্তু এই সুরকাররা শ্রোতাকে সুর বোঝার কান তৈরি করতে বাধ্য করেন। রবীন্দ্রনাথ সে দায় চাপান না। তাঁর সুরে ও ভাবে কথার সঙ্গে অনায়াস এক সামঞ্জস্য (balance) থাকে। যেমন, ইমনকল্যাণে ‘পূরবী’ (আজি হৃদয় আমার যায় যে ভেসে), ইমননকল্যাণে ‘শ্রী’ (এলো যে শীতের বেলা), ইমনকল্যাণে বর্জিত স্বর ‘কোমল রে’ (এই উদাসী হওয়ার পথে পথে) গানগুলির সুর বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবো– গানের সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে রাগযুক্ত স্বরের ব্যবহার এখানে অনিবার্য— এবং নতুন মাত্রাযোগের একমাত্র হাতিয়ার। সুরবিযুক্ত করে গানগুলি পাঠ করলে শব্দতরঙ্গে এত আলো পড়বে না।
এই ভাবনাগুলি একান্তই ব্যক্তিগত। রবীন্দ্রনাথের গান সম্বন্ধে আমার নিজের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সকলে সহমত না হতেও পারেন। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, শিল্পসৃষ্টির প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ উপকরণই রবীন্দ্রনাথ সচেতন ভাবে ব্যবহার করেন তাঁর সৃষ্টির কাজে। সুর সম্বন্ধে সারা জীবন ধরে অজস্র চিন্তা ভাবনা তিনি করেছেন। তার স্বাক্ষর রয়ে গেছে নানা লেখালেখিতে, প্রবন্ধ বা চিঠির পাতায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাবনার জগতে পরিবর্তন এসেছিল।
অল্প বয়সে (৩০-৩১ বছর) বলেছিলেন সুর ভাব প্রকাশের উপায়মাত্র। বাক্যে যা বলা হয়, সুর তাকেই আরেকটু পরিশীলিত করে দেয় — এবং এটাই সুরের একমাত্র কাজ।
(প্রবন্ধ: সঙ্গীত ও ভাব/সঙ্গীতচিন্তা/রবীন্দ্রনাথ)
মধ্য বয়সে (৫০-৫১ বছর) ভাবনা পরিবর্তিত হয়ে গেল। তখন বললেন গান বা সুর আপন ঐশ্বর্যেই বড়। কাব্যের দাসত্ব সে কেন করবে! যেখানে অনির্বচনীয় সেখানেই গানের প্রভাব।
(প্রবন্ধ: গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ/সঙ্গীতচিন্তা/রবীন্দ্রনাথ)
পরিণত বয়সে (৬০ বছর) আবার বিবর্তিত হল ভাবনা। তখন বললেন কথা ও সুর অবিভাজ্য দোসর। বাণী রথ, সুর তার সারথি। কথাশিল্প ও সুরশিল্পের মিলনে একটি অপরূপ শক্তি রূপ নিতে চায়। দুইয়ের মধ্যে আদান-প্রদানের স্বাভাবিক সম্পর্ক আছে। উভয়ের যুগলস্পন্দনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়েও ইন্দ্রিয়াতীত অখণ্ড রসসৃষ্টিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
(প্রবন্ধ: সঙ্গীতের মুক্তি/সঙ্গীতচিন্তা/রবীন্দ্রনাথ)
এমন আজীবনের চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব যখন শিল্পরচনায় বসেন— তখন বাণী, সুর, ভাবের উপকরণগুলি যথাযথ আলো পায় বৈকি!
আর, সেই আলোতেই বিচ্ছুরিত হয় নন্দনের বিভা।
তথ্যসূত্র
- Rabindranath Tagore, গীতবিতান (কলকাতা: বিশ্বভারতী)।
- Nandalal Bose ও Rabindranath Tagore, নটীর পূজা (নাট্য ও চিত্ররূপে ভিন্ন উপস্থাপনা)।
- Bibhutibhushan Bandyopadhyay, পথের পাঁচালী (উপন্যাস); এবং Satyajit Ray, পথের পাঁচালী (চলচ্চিত্র, ১৯৫৫)।
- Upendrakishore Ray Chowdhury, গুপি গাইন বাঘা বাইন (কাহিনি); এবং Satyajit Ray, গুপি গাইন বাঘা বাইন (চলচ্চিত্র, ১৯৬৯)।
- Satyajit Ray, সোনার কেল্লা (চলচ্চিত্র, ১৯৭৪)।
- Rabindranath Tagore, “না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “নয় এ মধুর খেলা,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “শ্যামল ছায়া নাইবা গেলে,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “নাইবা এলে যদি সময় নাই,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “না যেওনা, যেও নাকো,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “ডাকব না ডাকব না,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “নারে নারে হবে না তোর স্বর্গসাধন,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “নীল অঞ্জনঘনপুঞ্জছায়ায় সম্বৃত অম্বর,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “আজি ঝরোঝরো মুখর বাদর দিনে,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “হৃদয় আমার ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,” গীতবিতান।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে,” গীতবিতান।
- Salil Chowdhury — রাগমিশ্রণ ও সুরবৈচিত্র্যের প্রয়োগ প্রসঙ্গে।
- Dwijendralal Roy — সুরসংগঠনে ধ্রুপদী ও পাশ্চাত্য প্রভাব।
- Dilip Kumar Roy — রাগরূপ ও গীতিনাট্যধর্মী সংগীতচর্চা।
- Rabindranath Tagore, “সঙ্গীত ও ভাব,” সঙ্গীতচিন্তা।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ,” সঙ্গীতচিন্তা।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , “সঙ্গীতের মুক্তি,” সঙ্গীতচিন্তা।