January 1, 2026

Brick Industry in the Evolution of Civilization and Its Present Scenario in West Bengal -Nayan Saha

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

Assistant Professor, Gobardanga Hindu College

Abstract

Brick-making is one of the earliest technological innovations in human civilization, emerging from the practical need for durable shelter and gradually evolving into a vital construction industry across cultures and continents. From sun-dried bricks in ancient Mesopotamia to kiln-fired bricks in Roman, Chinese, and later European civilizations, the brick industry reflects the interplay between natural resources, technological advancement, and socio-economic change. In India, evidence of brick usage dates back to the Harappan civilization, where baked bricks played a crucial role in urban planning, architecture, and infrastructure. The commercialization and scientific standardization of brick production, however, gained momentum during the British colonial period.
This paper examines the historical evolution of the brick industry with special reference to West Bengal, highlighting its geographical concentration along riverine alluvial belts, particularly the Hooghly, Bhagirathi, Damodar, Ajay, and Rupnarayan river systems. It further analyzes the present condition of the industry in West Bengal, focusing on the proliferation of brick kilns, issues of legality and environmental regulation, and the dependence on migrant labor. Special attention is given to the socio-economic conditions of brick kiln workers, especially women and children, whose lives are marked by exploitation, poor living conditions, lack of education, and inadequate state intervention. The study underscores the paradox of brick as a symbol of development and civilization on the one hand, and the persistent marginalization of those who produce it on the other.

Key Words

Brick industry, Civilization and technology, West Bengal, Brick kilns, Alluvial soil, Colonial industrialization, Migrant labor, Women and child labor, Environmental regulation, Socio-economic conditions

সভ্যতার বিবর্তনে ইটশিল্প এবং পশ্চিমবঙ্গে এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা-নয়ন সাহা

ইটের উদ্ভব

৭৫০০ স্ত্রীঃ পূর্বাব্দ, প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রাণভূমি টাইগ্রিস নদীর তীরবর্তী অঞ্চল, মানুষ দেখল ঝড় বৃষ্টির মত দুর্যোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সামান্য কাঠ পাতার ঘর যথেষ্ট নয়। কিছু শক্তপোক্ত জিনিস দিয়ে ঘর নির্মাণ করা দরকার। টাইগ্রিস নদীর মাটি পলিযুক্ত, সেই মাটিকে হাতের কায়দায় নির্দিষ্ট আকার দিলে কিছুদিন পর সেই মাটি রোদে পুড়ে শক্ত হয়। সেখান থেকেই এল ইটের ভাবনা। হাতে তৈরি মাটির তৈরি ইটকে রৌদ্রে শুকিয়ে তৈরি হতে থাকল বাড়ি। ক্রমে এই পদ্ধতি টাইগ্রিস নদীর তীর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল দূরদুরান্তের নানা সভ্যতায়। দক্ষিণপূর্ব আনাতোলিয়ায় ৭০০০ খ্রীঃ পূঃ-৬৩৯৫ খ্রীঃ পূর্ব সময় কালের মধ্যে রোদে পোড়া ইটের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এর পরবর্তীকালে জেরিকা এবং চিনে ইটের ব্যবহার শুরু হয়।

বিভিন্ন দেশে ইটের বিস্তার

ইটের আবিষ্কার কোন একটি নির্দিষ্ট সময় বা কোন নির্দিষ্ট আবিষ্কারকের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশে বিবর্তনের হাত ধরেই এই শিল্পের বিকাশ হয়েছে। যেমন মিশরীয় সভ্যতার মূল আকর্ষণও ছিল ইট। তবে পোড়া ইটের ব্যবহার রোমানরা প্রথম শুরু করে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন জার্মানিতেও ইটের ব্যবহার প্রচলিত ছিল, প্রধানত রাজপ্রাসাদ নির্মাণের কাজেই ইটের ব্যবহার হত। তবে জার্মানীতে ইটের ব্যবহার মূলত রোমান শিল্পেরই ধারাবাহিকতা।

উন্নত চীন সভ্যতা বিকাশের পূর্বে চীনে ইটের ব্যবহার ছিল। এই সময় চীনে ইটশিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের নিচু নজরে দেখা হত। ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় চীনের ‘Xian’ প্রদেশে প্রায় ৩৮০০ বছর পূর্বে ইটের ব্যবহারের নিদর্শন রয়েছে।

দ্বাদশ শতকে ইতালি, জার্মানি, বাল্টিক সাগর তীরবর্তী অঞ্চল, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ডেনমার্কে ইটের পুনরুদ্ভাবন ঘটে, পোড়া ইটের বাড়ি ও তার নান্দনিক কারুকার্য আজও শিল্পরসিক পর্যটকদের নজর কাড়ে। অষ্টাদশ শতকের নবজাগরণে ইটের বিশেষ ভূমিকা ছিল। পোটস্/ডামের ডাচ কোয়াটারগুলি এর উদাহরণ।

অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনেও বাড়ি তৈরি রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রভৃতি কাজে ইটের ব্যবহার বহুল পরিলক্ষিত। এসময় ব্রিটেনে শহর থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরবর্তী কোন স্থানে ইট তৈরি হত এবং ঘোড়ার গাড়ি বা গোরুর গাড়িতে করে সেই ইট কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়া হত।

আমেরিকার দেশগুলিতে ইটের প্রচলন শুরু হয় উনিশ শতকে। এই সময় ভারি গাড়ি চলাচলের পথ নির্মাণে ইটের ব্যবহার হত। যা পরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বোস্টন, নিউইয়র্ক প্রভৃতি অঞ্চলে এবং নিউজার্সিতেও ইটের বা Brown Stone-এর ব্যবহার শুরু হয়।

ভারতে ইট শিল্প

প্রাক ঐতিহাসিক কালে অর্থাৎ হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকেই যে শিল্পটি লক্ষ করা যায়। তা হল মৃৎশিল্প। মাটির হাড়ি কড়াই থেকে শুরু করে মাটির মূর্তি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি বহন করে এসেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি লক্ষ্যণীয় যে এই সভ্যতাতেই ভারতের প্রথম পোড়া ইটের নিদর্শন মেলে। মাটি খুড়ে এই সভ্যতার ইটের তৈরি বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্নানাগার, শস্যাগারের নিদর্শন পাওয়া যায় হরপ্পা সভ্যতার মূল বৈশিষ্টাই ছিল ইটের তৈরি একতল, দ্বিতল বাড়িগুলি। আবার এই সভ্যতা ধ্বংসের একটি প্রধান কারণও ছিল ইট পোড়ানোর জন্য অতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদন। তবে ভারতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ইটের বিকাশ ঘটেছে অনেক পরে। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার W. Bull প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইট তৈরির কাজ শুরু করেন। কোম্পানির বিভিন্ন নির্মাণ কাজের সুবিধার জনাই তখন ইট উৎপাদিত হতো, পরে তা সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায়। তবে ব্রিটিশের আগমনের পূর্বে ভারতে ইটের তৈরি যে সব বাড়ি হত, সেইগুলিতে ব্যবহৃত ইটগুলি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে পড়া ইট ভাটার ইট ছিল না। নির্মাণকারী ব্যাক্তি প্রয়োজনমত ইট, নির্মাণস্থল সংলগ্ন অঞ্চলেই তৈরি করে নিতেন। ঔপনিবেশিক আমলেই ধীরে ধীরে ইটের কোম্পানি তৈরি হতে থাকে।

ইট তৈরির উপাদান

ইট তৈরির প্রধান উপাদানগুলির ভাগ

i. Silica (sand) : 50-60%

ii.Alumina (clay) : 20-30%

iii. Iron Oxide : 5-7%

iv. Lime : 2-5%

v. Magnesia : less than 1%

Temperature : 900-1000°C

পশ্চিমবঙ্গে ইট শিল্প

পশ্চিমবঙ্গে ইট শিল্পের ইতিহাস যথেষ্ট পুরাতন। চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপা নামক স্থানের নিকট চন্দ্রকেতুগড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫০-১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে খননকার্য চালিয়ে ইট খোলার সন্ধান পায়। সেখানে ২৩ ফুট পর্যন্ত গর্ত খুঁড়েও প্রাকৃতিক মাটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এই অঞ্চলে একটি প্রাচীর পাওয়া যায় যেটি খুব সম্ভবত স্ত্রীঃ পূর্ব প্রথম শতকে বহিঃশত্রুর আক্রমন প্রতিহত করার কাজে ব্যবহৃত হত। উত্তর ভারতের অনেক জায়গায় পোড়া ইটের বদলে কেবল শুকনো মাটি দিয়ে দেওয়াল গাঁথা হত। প্রাচীর গাঁথারজন্য ব্যবহার হত চুন সুরকি, যার জন্যে শামুখ আনা হত। স্ত্রীঃ পূর্ব দ্বিতীয় শতকে খনা-মিহিরের ঢিপিতে নির্মিত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়। যেখানে কারুকার্যময় ইটের অস্তিত্ব মেলে।

বর্তমানে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩৫০০ থেকে ৩৮০০টির মত ইটভাটা আছে। সকল ইটভাটা সরকারী অনুমোদন প্রাপ্ত না হওয়ার কারণে এই সব ইটভাটার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব নয়। এই অবৈধ ইটভাটাগুলি মূলত রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়েই ইট তৈরি করে চলেছে। এখানে শ্রমিকদের অবস্থা যথেষ্ট করুণ। শিশু ও মহিলা শ্রমিকের আধিক্য বেশি। তবে সবচেয়ে বড় কথা এই অবৈধ ইটভাটাগুলি সরকারকে কোন প্রকার রাজস্ব না দেবার ফলে সরকারের বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতি হয়।

গৃহ নির্মাণ শিল্পের পরিধী বৃদ্ধির সাথে সাথে ইট হয়ে উঠল এক অপরিহার্য উপাদান। পূর্বে যেখানে পুকুর কেটে তোলা মাটি দিয়ে নির্মাণস্থল সংলগ্ন অঞ্চলে ইট তৈরি করা হত, তার পরিবর্তে শুরু হল ইট তৈরির কারখানা বা ইট ভাটা। পশ্চিমবঙ্গেও এই ভাটার সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকল। মূলত মাটি এবং জল এই শিল্পের প্রধান উপাদান হওয়ায় নদী পার্শ্ববর্তী পলিযুক্ত অঞ্চলে এই শিল্পের জন্য আদর্শ, সেকারণেই ইছামতি, রূপনারায়ণ, দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী নদী সংলগ্ন অঞ্চল এবং সর্বপরি ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ইটভাটা গড়ে উঠতে থাকে। তবে কেবল পলিমাটির জন্যই নয়, নদীপথে যাতায়াতের সুবিধা এবং সহজে জ্বালানি নিয়ে আসাও ছিল সুবিধাজনক। একারণেই এই স্থানগুলিকে সরকারের থেকে লিজ নেওয়া হত।

পশ্চিমবঙ্গের দুই ২৪ পরগণা হুগলী এবং হাওড়া জেলাতে ইটশিল্প ব্যাপক প্রসার লাভকরেছে। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি ইটভাটা অবস্থিত উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণায়। সুন্দরবনের নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর ইটভাটা অবস্থিত, আবার হুগলী জেলাতে দুই ভাবে ইটভাটা গড়ে উঠেছে- একটি পলির ইট অপরটি মাঠ কেটে পাওয়া মাটি দিয়ে তৈরি ইট। ১৯০২ সালের তথ্য অনুসারে হুগলী জেলাতে এসময় প্রায় ৩১টি ইটভাটার অস্তিত্ব ছিল। যেখানে প্রায় গড়ে ৫০ জন করে শ্রমিক কাজ করত। যার মধ্যে অর্ধাংশ ছিল মহিলা। এমনকি শিশু শ্রমিকেরও অস্তিত্ব ছিল।

১৯১২ সালের Bengal District Gazetteer, Hooghly থেকে জানা যায় “Bricks are made along the west bank of the hooghly river from Bansberia to Bally, and along Bally Khal wherever suitable soil is found” হুগলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত বালি খালের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শতাব্দি প্রাচীন ইটভাটাগুলির অস্তিত্ব আজও বর্তমান।

বর্তমানে হুগলী জেলায় ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ১২৭ টি। এছাড়া বেশকিছু ইটভাটা আছে যারা অবৈধভাবে ব্যবসা করে। বৈধ ভাটাগুলির মালিকদের সংগঠন হুগলী ব্রিক মেকারস্ অ্যাসোসিয়েশন, ১৯৭৩ সালে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সারা বাংলা এবং সারা ভারতেও ইট শিল্প মালিকদের সংগঠন রয়েছে। কলকাতার ২৩এ নেতাজী সুভাষ রোড, বেঙ্গল ব্রিক-ফিল্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর, এই ব্রিক-ফিল্ড মালিক সংগঠনগুলি প্রায়সই সরকারের নিকট তাদের দাবিপত্র পেশ করে থাকেন। এদের মূল দাবিগুলির মঞ্চে অন্যতম কয়লা মাফিয়ারাজ বন্ধ করা এবং মাটির রাজস্বের পরিমান হ্রাস করা।

ইট শিল্প শ্রমিক

ইট শিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই উঠে আসবে ইট শিল্প শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থার কথা। ১৯০৭ সালে হুগলী জেলায় প্রায় ১৫০০ জন শ্রমিক ইট শিল্পের সাথে যুক্ত ছিল। হুগলী জেলার প্রধান শিল্প ছিল পাট, সমগ্র জেলাতে সকল ক্ষেত্র মিলিয়ে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৪৬৯৩৪ জন, সুতরাং দেখা যাচ্ছে মোট শ্রমিকের ৪ শতাংশ ছিল ইট ভাটার শ্রমিক। দিন বদলের সাথে সাথে উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে গিয়ে ইট যতই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ইটভাটার সংখ্যাও, পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে এই শিল্প, বেড়েছে শ্রমিকের সংখ্যা, সেই অনুসারে দেখতে গেলে বর্তমানে হুগলী জেলায় ইট শিল্প শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৩০০০০ জন এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি হবে প্রায় চার লক্ষ।

ইট শিল্পে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমান শ্রমিকের যোগান কেবলমাত্র বাংলা থেকেই হয় না। ভিন রাজ্য এমনকি ভিন দেশের থেকেও বহু মানুষ এই শিল্পে কাজ করার জন্য আসে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া থেকে প্রচুর শ্রমিক যেমন এই শিল্পে কাজ করার জন্য এসে থাকে তেমন ভাবেই উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড, ছত্রিশগড়, উড়িষ্যা থেকে প্রচুর শ্রমিক এই শিল্পে কাজের তাগিদে ছুটে আসে। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ইট ভাটাগুলিতে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রচুর শ্রমিক কাজ করতে আসেন। হাওড়া জেলার বেশির ভাগ শ্রমিক অসে উড়িষ্যা থেকে।

ইটশিল্পে কাজ করতে আসা শ্রমিকেরা আসে মুলত শুষ্ক ও রুক্ষ্য অনুর্বর কৃষিজমি অধু্যুসিত অঞ্চলগুলি থেকে। শুদ্ধ অনুর্বর পাথুরে মাটিতে ইটও খুব ভালো হয় না। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মালভূমি ও পার্বত্য অঞ্চলে ইটভাটা খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। যে সকল ইট এখানে উৎপন্ন হয় তা নিম্নমানের। এ কারণে উক্ত অঞ্চলগুলির শ্রমিকেরা নিজ অঞ্চলে কাজের যোগান না পেয়ে গাঙ্গেয় অঞ্চলের ভাটাগুলিতে কাজের সন্ধানে চলে আসতে বাধ্য হন। এই সকল শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে চর্চা করতে গেলে সর্বপ্রথম উঠে আসে অন্ধকার’। ইটভাটা সংলগ্ন ছোট ছোট অপরিসর অস্বাস্থ্যকর ঘরগুলিই হল এদের বাসস্থান। এদের নেই যথেষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য, নেই উপযুক্ত পারিশ্রমিক, নেই যথেষ্ট শিক্ষার আলো, এদের শিশুরা প্রায়সই অপুষ্টির শিকার হয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজ জীবন তাদের করে তোলে অসামাজিক, যা দেশ ও জাতির পক্ষে বিভীষিকা স্বরূপ।

ইট শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের অধিকাংশই মহিলা ও শিশু শ্রমিক। কারণ এদের দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নেওয়া সহজ। মুলত কোন দালাল বা মুন্সির তত্ত্বাবধানে এরা কাজ করে যারা এই সকল মহিলা শ্রমিকদের উপর শারীরিক নির্যাতন করতেও পিছপা হয়না। একটি চার পাঁচ বছরের শিশুও জানে যে, কাজ করাই হল শেষ কথা এবং বাইরের কোন ব্যক্তির কাছে মুখ খোলা হল অপরাধ।

মহিলা ও শিশুরা মূলত ইটের ছাঁচ তোলা, রোদে শুকানো এবং সেই শুকনো ইটকে চুল্লিতে পৌঁছে দেবার কাজ করে। বিভিন্ন ইটভাটায় শিশু শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এরা ভোর পাঁচটায় কাজে যোগ দেয় প্রায় ২০০ মিটার পথ মাথায় করে কাঁচা ইট বয়ে নিয়ে যায় চুল্লিতে। এসময় তাদের দাঁড়াবার কোন ফুরসৎ নেই। কেবল ছোটা। একটি শিশু শ্রমিকের কথায় ‘আমরা দৌড়ে দৌড়ে ইট নিয়ে যাই।’ তবে চুল্লি থেকে ইট বের করা এবং এই পোড়া ইট বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেবার কাজগুলি প্রধানত পুরুষ শ্রমিকেরাই করে থাকে। যদিও বর্তমানে মহিলারাও এই কাজে অংশ নিচ্ছেন।

সরকারের তরফ থেকে ইট শিল্পকে বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এই নিয়ন্ত্রন কেবল পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলিতেই সীমাবদ্ধ। নদী তীরবর্তী অঞ্চল থেকে মাটিকাটা এবং ইট পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ধোঁয়া থেকে পরিবেশ দূষিত হয়, এই কারণে বিভিন্ন সময় অতিরিক্ত দূষণ ছড়ানো ইটভাটাগুলিতে পরিবেশ দপ্তরের নোটিশ পাঠানো হয়। এই পরিবেশ দূষণজনিত কারণে উচ্চ ন্যায়ালয়ের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ইট ভাটারই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা কাটানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের National Environmental Engineering Research Institute (NEERI) এর বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনাও করা হচ্ছে।” কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয়ের বিচারপতি সৌমিত্র পাল ২০১২ সালের মার্চ মাসে একটি রায় ঘোষণার দ্বারা এই সকল ইটভাটাগুলির নিয়ন্ত্রনে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? 

ইটশিল্প শ্রমিকদের আর্থসামাজিক উন্নতির দিকে সরকার গুরুত্ব সহকারে নজর দেয়নি। সরকারের তরফে শ্রমিকদের প্রতি কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেহেতু বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই শ্রমিকেরা ইট শিল্পের সাথে যুক্ত থাকেন সে কারণে তাদের পূর্ণ শ্রমিকের মর্যাদাও দেওয়া হয়না। প্রতি বছর একই স্থানে কাজ করতে না আসার ফলে কোন শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনও গড়ে তোলা এই শ্রমিকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। CITU সহ কিছু শ্রমিক সংগঠন এদের সংগঠিত করার চেষ্টা করলেও এই সংগঠনের নেতারা এই শিল্পের সাথে যুক্ত না হওয়ায় তাদের প্রয়াসও সফলতা লাভ করেনি। ফলে কোন ক্ষোভ বিক্ষোভ বা বিদ্রোহ সেভাবে এই শিল্প মালিকদের বিব্রত করেনা। তবে ১৮৪৮-৮৯ সালের গঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে একটি ইট শ্রমিক বিদ্রোহের কথা জানা যায়, তবে এর প্রভাব খুব একটা সুদুরপ্রসারী ছিলনা।

যদিও P.F., ES.I. এর মত সুবিধা বা অবসর কালিন সুযোগ সুবিধা এবং অসংগঠিত শ্রমিকদের নিয়ে সরকারের ঘোষিত প্রকল্পগুলি এই শিল্প শ্রমিকদের কাছে অজানা। তবু বলা যায় যে, সরকারের আংশিক সহযোগিতা এবং বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির উদ্যোগে কিছু। পদক্ষেপ এই শিল্প শ্রমিকদের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন, শিশু শ্রমিকদের শিক্ষার ব্যবস্থা, বিভিন্ন রোগের টিকা প্রদান, বস্ত্র বিতরণ প্রভৃতি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। UNICEF এর তরফ থেকে বিভিন্ন গবেষণা প্রক্রিয়া চালিয়ে চব্বিশ পরগণার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এই শিল্পীদের সামাজিক উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের ইটভাটার শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা অতি স্বল্প। UNICEF এর তরফে “Sreenath Cheruvari” উত্তর চব্বিশ পরগণার শিশুদের উপর গবেষণা করে বেশ কিছু তথ্য সামনে এনেছেন। ভারতের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও এই বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেছে। কিন্তু এই শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণার এবং এদের আর্থ সামাজিক মান উন্নয়নের প্রচেষ্টার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এই শ্রমিকদের আনন্দ, হাসি, কান্না, নেশা, বদ অভ্যাদ, শালিনতা, অবসরকালীন পেশা নিয়ে গবেষণার পথ খোলা রয়েছে যা ভবিষ্যতের ইতিহাস চর্চায় উঠে আসা স্বাভাবিক। 

তথ্যসূত্র

১. Omalley L.S.S. and Chakravarti Monmhan EDAL., Bengal District Gazetter, Hooghly-1912, page-182

২. Hunter, W.W., A Statistical Account of Bengal (Hugli), Trubner & Co. London – 1876

৩. ঘোষ, দেবপ্রসাদ, ভারতীয় শিল্পধারা প্রাচ্য ভারত ও বৃহত্তর ভারত- পৃষ্ঠা ১৭-১৮

৪. ঘোষ, দেবপ্রসাদ- পূর্বোক্ত

৫. হুগলী জেলা সেকাল একাল, অনিমা প্রকাশন

৬. হুগলী জেলা সেকাল একাল- পূর্বোক্ত

৭. Omalley, L.S.S. and Chakravarti Monmohan – পূর্বোক্ত

৮. পত্রিকা (BRICKS 2011-2012) হুগলী ডিস্ট্রিক্ট ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যাসোসিয়েশন

৯. পত্রিকা (BRICKS 2011-2012) – পূর্বোক্ত

১০. Omalley, LSS and Chakravarti Monmohan – পূর্বোক্ত

১১. পত্রিকা (BRICKS 2011-2012) পূর্বোক্ত

১২. In the High Court at Calcutta, Constitutional write Jurisdiction. Appellate side, W.P. No. 2699 (W) of 2012

১৩. Dehan, RP-EDAL, India’s Labouring Poor Lucassn John The Brick Makers Strick on the Ganges Chanal in 1848-49