অবোলা জীবের দোসর রবীন্দ্রনাথ : ঘোড়া আর তোতার গল্প
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য
Abstract
Rabindranath Tagore as the Companion of the Voiceless: The Allegory of the Horse and the Parrot
This paper explores Rabindranath Tagore’s philosophical vision of freedom through two allegorical prose pieces from Lipika — “Totakahini” (The Parrot’s Tale) and “Ghora” (The Horse). Through symbolic representation of a caged parrot and a domesticated horse, Tagore critiques oppressive educational systems, authoritarian power structures, and the mechanization of life. The narratives transcend mere animal fables and unfold as profound commentaries on human freedom, creativity, and spiritual autonomy. By situating these texts alongside Tagore’s broader oeuvre — including Dakghar, Raktakarabi, Naibedya, and selected songs from Gitabitan — the study demonstrates the continuity of his liberationist philosophy. The paper argues that Tagore’s aesthetic strategy combines irony, lyrical prose, and symbolic layering to expose the violence inherent in imposed discipline and institutional rigidity. Ultimately, the death of the parrot and the silenced cry of the horse become metaphors for the suffocation of the human spirit, while the arrival of spring signifies liberation beyond physical bondage. The relevance of these texts persists in contemporary discussions on education, freedom, and ethical humanism.
Key Words
Rabindranath Tagore; Lipika; Totakahini; Ghora; Allegory; Freedom; Education; Symbolism; Humanism; Liberation Philosophy; Power Structure; Spiritual Autonomy.
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লিপিকা’ (১৯২২) গ্রন্থে ক্ষুদ্রায়তন ‘কথিকা’র মাধ্যমে যে গদ্য-কাব্যের অভিনব রূপ নির্মাণ করেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক নীরব বিপ্লব।¹ তিনি নিজেই এই রচনাগুলিকে “কথিকা” বলে অভিহিত করেছিলেন। সংক্ষিপ্ত, সংহত, রূপকধর্মী—কিন্তু ভাবের দিক থেকে গভীর।
তোতাকাহিনী : শিক্ষার নামে শোষণ
‘তোতাকাহিনী’তে দেখা যায়—
“এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না।”²
এই সরল সূচনার মধ্যে ব্যঙ্গের সূক্ষ্ম বীজ নিহিত। পাখির স্বাভাবিক স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করে তাকে বন্দি করে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার আয়োজন শুরু হয়।
রাজকীয় ব্যবস্থাপনার অন্তঃসারশূন্যতা ফুটে ওঠে—
“খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে।”³
শিক্ষার নামে প্রাণহীন তথ্যগিলন—এ যেন ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথ অন্যত্রও লিখেছেন—
“শিক্ষার ফল হইল মানুষকে পুঁথির ভিতরে পুরিয়া ফেলা।”⁴
শেষে যখন পাখির মৃত্যু ঘটে, তখন প্রকৃতি যেন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়—
“বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।”⁵
এখানে মৃত্যু মুক্তির প্রতীক। ‘দুই পাখী’ কবিতায়ও তিনি লিখেছিলেন—
“না আমি শিকলে ধরা নাহি দিব।”⁶
ঘোড়া : মুক্তির স্বভাব ও মানুষের আস্তাবল
‘ঘোড়া’ রচনায় ব্রহ্মার সৃষ্ট জীব—
“এ হাওয়ার আগে ছুটতে চায়, অসীম আকাশকে পেরিয়ে যাবে ব’লে পণ ক’রে বসে।”⁷
এখানে মরুৎ-ব্যোমের আধিক্য মানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু মানুষ তাকে আস্তাবলে বেঁধে ফেলে।
“প্রাণীটাকে মরুৎব্যোম মুক্তির দিকে অত্যন্ত উসকে দিলে, কিন্তু বন্ধন থেকে বাঁচাতে পারলে না।”⁸
মানুষ তার গতি রুদ্ধ করে, তবু তার আর্তস্বর থামে না—
“কিন্তু দম বন্ধ না করলে মুখ তো একেবারে বন্ধ হয় না। তাই চাপা আওয়াজ মুমূর্ষুর খাবির মতো মাঝে মাঝে বেরোতে থাকে।”⁹
এই উচ্চারণ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে আত্মার প্রতিবাদ।
মুক্তিতত্ত্ব : বৃহত্তর দর্শন
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যেই মুক্তির বাণী প্রতিধ্বনিত। ‘গীতবিতান’-এ তিনি লিখেছেন—
“আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে।”¹⁰
‘নৈবেদ্য’-এ—
“অসংখ্য বন্ধনমাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ।”¹¹
‘পলাতকা’র “মুক্তি” কবিতায়—
“মধুর ভুবন, মধুর আমি নারী, / মধুর মরণ, ওগো আমার অনন্ত ভিখারি।”¹²
‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘অচলায়তন’ প্রভৃতি নাটকেও একই মুক্তিচিন্তার বিস্তার দেখা যায়। শাসন, যন্ত্রসভ্যতা ও প্রতিষ্ঠানগত অনুশাসনের বিরুদ্ধে মানবাত্মার স্বর সেখানে প্রবল।
সমাপনী ভাবনা
‘তোতাকাহিনী’ ও ‘ঘোড়া’—দুটি রচনার বহিরঙ্গ পৃথক হলেও অন্তর্গত দর্শন অভিন্ন। একটিতে শিক্ষা-ব্যবস্থার ব্যঙ্গ, অন্যটিতে সভ্যতার আস্তাবল; কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই কেন্দ্রে মুক্তিকামী প্রাণ।
রবীন্দ্রনাথ দেখান—মনুষ্যত্ব যদি স্বাধীনতা হরণ করে, তবে তা মনুষ্যত্ব নয়, মুখোশ।
অতএব, পাখির মৃত্যু ও ঘোড়ার আর্তস্বর—দুটি মিলেই এক চিরন্তন মুক্তিসংগীত।
এক যে ছিল ঘোড়া, আর ছিল এক তোতা। তাদের নিয়ে নানা কাণ্ডকারখানা। কবি শুনলেন সব। কবির মনেও নানা কথা, অনেক ব্যথা জমা হল। কলম ধরলেন কবি। তাঁর ‘লিপিকা’য় এদের জন্যে জায়গা করে দিলেন।
‘লিপিকা’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। ‘লিপিকা’র রচনাগুলি ‘সবুজপত্র’, ‘ভারতী’, ‘প্রবাসী’ ও আরো নানা পত্রিকায় ইতস্তত প্রকাশ পাচ্ছিল। তাদের গেঁথে নিয়ে এক অভিনব গল্পসম্ভার উপহার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ৩৯টি গল্পকে তিনি নিজেই উল্লেখ করেন ‘কথিকা’ বলে।
সংক্ষিপ্ত আয়তনের গল্পগুলি। ঠিক যেন গদ্যও নয়, যেন কিছুটা কবিতার সাজ পরানো।– এই কাব্যময় গদ্য বা গদ্যময় কবিতার সমাবেশে বাংলা গদ্যসাহিত্যের ধারার এক পালাবদল হল যেন। সূক্ষ্মতার পথে আরো এগিয়ে গেল তার ভাব ও শৈলী।
‘তোতাকাহিনী’ ও ‘ঘোড়া’ এই দুটি রচনাকেই রবীন্দ্রনাথ ‘লিপিকা’য় রেখেছেন।
প্রথম গল্প ‘তোতাকাহিনী’র প্রথম প্রকাশ সবুজপত্র মাঘ ১৩২৪ (১৯১৭)। তৃতীয় গল্প ‘ঘোড়া’ প্রকাশিত হয় সবুজপত্র বৈশাখ ১৩২৬ (১৯১৯)। দুটির ব্যবধান এক বছরের কিছু বেশি।
প্রতীক বা রূপকে মোড়া কাহিনীদুটি নিছক একটি পশু ও একটি পাখির ছেলেভোলানো গল্প নয়, ছেলেমানুষের আড়াল ব্যবহার করেছেন লেখক। গল্পের আশ্রয়ে এ বরং পচনশীল সমাজের ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র কুঠারাঘাত।
এক যে পাখি। উড়ে বেড়াতো, গান গাইতো, স্বাধীন ছিল, মুক্ত ছিল… তাকে জোর করে খাঁচায় পুরে শিক্ষা দিতে চাইলেন দেশের রাজা ও তার সঙ্গী সাথী আত্মীয় পার্ষদগণ। শেখাবার রাজকীয় আয়োজনের নিষ্ঠুর চাপে পরাহত হয়ে কী করে শেষকালে পাখিটা মরেই গেল… তারই করুণ গল্প বলেছেন রবীন্দ্রনাথ, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের আশ্রয় নিয়ে, তাঁর ‘তোতাকাহিনী’তে।
তোতাকাহিনী
এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’
২
রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।
৩
স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’
ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করা ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।
৪
সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।
৫
শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!’
মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’
ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।’
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।
৬
পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্পট্ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’
তখন শিক্ষামহালে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।
৭
পাখিটা মরিল। কোন্কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্ণীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’
রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়।’
ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’
‘আর কি ওড়ে।’
‘না।’
‘আর কি গান গায়।’
‘না।’
‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।’
‘না।’
রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্খস্ গজ্গজ্ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।
(তোতাকাহিনী। লিপিকা)
‘ঘোড়া’র ধরনটি একটু অন্যরকম।
ঘোড়া
সৃষ্টির কাজ প্রায় শেষ হয়ে যখন ছুটির ঘণ্টা বাজে ব’লে, হেনকালে ব্রহ্মার মাথায় একটা ভাবোদয় হল।
ভাণ্ডারীকে ডেকে বললেন, ‘ওহে ভাণ্ডারী, আমার কারখানাঘরে কিছু কিছু পঞ্চভূতের জোগাড় করে আনো, আর-একটা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করব।’
ভাণ্ডারী হাত জোড় করে বললে, ‘পিতামহ, আপনি যখন উৎসাহ করে হাতি গড়লেন, তিমি গড়লেন, অজগর সর্প গড়লেন, সিংহ-ব্যাঘ্র গড়লেন, তখন হিসাবের দিকে আদৌ খেয়াল করলেন না। যতগুলো ভারি আর কড়া জাতের ভূত ছিল সব প্রায় নিকাশ হয়ে এল। ক্ষিতি অপ্ তেজ তলায় এসে ঠেকেছে। থাকবার মধ্যে আছে মরুৎ ব্যোম, তা সে যত চাই।’
চতুর্মুখ কিছুক্ষণ ধরে চারজোড়া গোঁফে তা দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা ভালো, ভাণ্ডারে যা আছে তাই নিয়ে এসো, দেখা যাক।’
এবারে প্রাণীটিকে গড়বার বেলা ব্রহ্মা ক্ষিতি-অপ-তেজটাকে খুব হাতে রেখে খরচ করলেন। তাকে না দিলেন শিঙ, না দিলেন নখ; আর দাঁত যা দিলেন তাতে চিবনো চলে, কামড়ানো চলে না। তেজের ভাণ্ড থেকে কিছু খরচ করলেন বটে, তাতে প্রাণীটা যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো কোনো কাজে লাগবার মতো হল কিন্তু তার লড়াইয়ের শখ রইল না। এই প্রাণীটি হচ্ছে ঘোড়া। এ ডিম পাড়ে না তবু বাজারে তার ডিম নিয়ে একটা গুজব আছে, তাই একে দ্বিজ বলা চলে।
আর যাই হোক, সৃষ্টিকর্তা এর গড়নের মধ্যে মরুৎ আর ব্যোম একেবারে ঠেসে দিলেন। ফল হল এই যে, এর মনটা প্রায় ষোলো-আনা গেল মুক্তির দিকে। এ হাওয়ার আগে ছুটতে চায়, অসীম আকাশকে পেরিয়ে যাবে ব’লে পণ ক’রে বসে। অন্য-সকল প্রাণী কারণ উপস্থিত হলে দৌড়য়; এ দৌড়য় বিনা কারণে; যেন তার নিজেই নিজের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার একান্ত শখ। কিছু কাড়তে চায় না, কাউকে মারতে চায় না, কেবলই পালাতে চায়– পালাতে পালাতে একেবারে বুঁদ হয়ে যাবে, ঝিম হয়ে যাবে, ভোঁ হয়ে যাবে, তার পরে ‘না’ হয়ে যাবে, এই তার মৎলব। জ্ঞানীরা বলেন, ধাতের মধ্যে মরুৎব্যোম যখন ক্ষিতি-অপ-তেজকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে ওঠে তখন এইরকমই ঘটে।
ব্রহ্মা বড়ো খুশি হলেন। বাসার জন্যে তিনি অন্য জন্তুর কাউকে দিলেন বন, কাউকে দিলেন গুহা, কিন্তু এর দৌড় দেখতে ভালোবাসেন ব’লে একে দিলেন খোলা মাঠ।
মাঠের ধারে থাকে মানুষ। কাড়াকুড়ি করে সে যা-কিছু জমায় সমস্তই মস্ত বোঝা হয়ে ওঠে। তাই যখন মাঠের মধ্যে ঘোড়াটাকে ছুটতে দেখে মনে মনে ভাবে, ‘এটাকে কোনো গতিকে বাঁধতে পারলে আমাদের হাট করার বড়ো সুবিধে।’
ফাঁস লাগিয়ে ধরলে একদিন ঘোড়াটাকে। তার পিঠে দিলে জিন, মুখে দিলে কাঁটা-লাগাম। ঘাড়ে তার লাগায় চাবুক আর কাঁধে মারে জুতোর শেল। তা ছাড়া আছে দলামলা।
মাঠে ছেড়ে রাখলে হাতছাড়া হবে, তাই ঘোড়াটার চারি দিকে পাঁচিল তুলে দিলে। বাঘের ছিল বন, তার বনই রইল; সিংহের ছিল গুহা, কেউ কাড়ল না। কিন্তু, ঘোড়ার ছিল খোলা মাঠ, সে এসে ঠেকল আস্তাবলে। প্রাণীটাকে মরুৎব্যোম মুক্তির দিকে অত্যন্ত উসকে দিলে, কিন্তু বন্ধন থেকে বাঁচাতে পারলে না।
যখন অসহ্য হল তখন ঘোড়া তার দেয়ালটার ‘পরে লাথি চালাতে লাগল। তার পা যতটা জখম হল দেয়াল ততটা হল না; তবু, চুন বালি খ’সে দেয়ালের সৌন্দর্য নষ্ট হতে লাগল।
এতে মানুষের মনে বড়ো রাগ হল। বললে, ‘একেই বলে অকৃতজ্ঞতা। দানাপানি খাওয়াই, মোটা মাইনের সইস আনিয়ে আট প্রহর ওর পিছনে খাড়া রাখি, তবু মন পাই নে।’
মন পাবার জন্যে সইসগুলো এমনি উঠে-পড়ে ডাণ্ডা চালালে যে, ওর আর লাথি চলল না। মানুষ তার পাড়াপড়শিকে ডেকে বললে, ‘আমার এই বাহনটির মতো এমন ভক্ত বাহন আর নেই।’
তারা তারিফ করে বললে, ‘তাই তো, একেবারে জলের মতো ঠাণ্ডা। তোমারই ধর্মের মতো ঠাণ্ডা।’
একে তো গোড়া থেকেই ওর উপযুক্ত দাঁত নেই, নখ নেই, শিঙ নেই, তার পরে দেয়ালে এবং তদভাবে শূন্যে লাথি ছোঁড়াও বন্ধ। তাই মনটাকে খোলসা করবার জন্যে আকাশে মাথা তুলে সে চিঁহি চিঁহি করতে লাগল। তাতে মানুষের ঘুম ভেঙে যায় আর পাড়াপড়শিরাও ভাবে, আওয়াজটা তো ঠিক ভক্তিগদ্গদ শোনাচ্ছে না। মুখ বন্ধ করবার অনেকরকম যন্ত্র বেরোল। কিন্তু, দম বন্ধ না করলে মুখ তো একেবারে বন্ধ হয় না। তাই চাপা আওয়াজ মুমূর্ষুর খাবির মতো মাঝে মাঝে বেরোতে থাকে।
একদিন সেই আওয়াজ গেল ব্রহ্মার কানে। তিনি ধ্যান ভেঙে একবার পৃথিবীর খোলা মাঠের দিকে তাকালেন। সেখানে ঘোড়ার চিহ্ন নেই।
পিতামহ যমকে ডেকে বললেন, ‘নিশ্চয় তোমারই কীর্তি! আমার ঘোড়াটিকে নিয়েছ।’
যম বললেন, ‘সৃষ্টিকর্তা, আমাকেই তোমার যত সন্দেহ। একবার মানুষের পাড়ার দিকে তাকিয়ে দেখো।’
ব্রহ্মা দেখেন, অতি ছোটো জায়গা, চার দিকে পাঁচিল তোলা; তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ক্ষীণস্বরে ঘোড়াটি চিঁহি চিঁহি করছে।
হৃদয় তাঁর বিচলিত হল। মানুষকে বললেন, ‘আমার এই জীবকে যদি মুক্তি না দাও তবে বাঘের মতো ওর নখদন্ত বানিয়ে দেব, ও তোমার কোনো কাজে লাগবে না।’
মানুষ বললে, ‘ছি ছি, তাতে হিংস্রতার বড়ো প্রশ্রয় দেওয়া হবে। কিন্তু, যাই বল, পিতামহ, তোমার এই প্রাণীটি মুক্তির যোগ্যই নয়। ওর হিতের জন্যেই অনেক খরচে আস্তাবল বানিয়েছি। খাসা আস্তাবল।’
ব্রহ্মা জেদ করে বললেন, ‘ওকে ছেড়ে দিতেই হবে।’
মানুষ বললে ‘আচ্ছা, ছেড়ে দেব। কিন্তু, সাত দিনের মেয়াদে; তার পরে যদি বল, তোমার মাঠের চেয়ে আমার আস্তাবল ওর পক্ষে ভালো নয়, তা হলে নাকে খত দিতে রাজি আছি।’
মানুষ করলে কী, ঘোড়াটাকে মাঠে দিলে ছেড়ে; কিন্তু, তার সামনের দুটো পায়ে কষে রশি বাঁধল। তখন ঘোড়া এমনি চলতে লাগল যে, ব্যাঙের চাল তার চেয়ে সুন্দর।
ব্রহ্মা থাকেন সুদূর স্বর্গে; তিনি ঘোড়াটার চাল দেখতে পান, তার হাঁটুর বাঁধন দেখতে পান না। তিনি নিজের কীর্তির এই ভাঁড়ের মতো চালচলন দেখে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘ভুল করেছি তো।’
মানুষ হাত জোড় করে বললে, ‘এখন এটাকে নিয়ে করি কী। আপনার ব্রহ্মলোকে যদি মাঠ থাকে তো বরঞ্চ সেইখানে রওনা করে দিই।’
ব্রহ্মা ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘যাও যাও, ফিরে নিয়ে যাও তোমার আস্তাবলে।’
মানুষ বললে, ‘আদিদেব, মানুষের পক্ষে এ যে এক বিষম বোঝা।’
ব্রহ্মা বললেন, ‘সেই তো মানুষের মনুষ্যত্ব।’ (ঘোড়া।লিপিকা)
সৃষ্টির একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্রহ্মা তাঁর ভাবনায় এক নতুন প্রাণী সৃষ্টি করতে চাইলেন, যা তাঁর পরিকল্পনায় আগে ছিল না। পঞ্চভূত বা সৃষ্টির উপাদানগুলি তখন প্রায় শেষ। ক্ষিতি, অপ, তেজ এসব ভারী আর কড়া উপাদানগুলো তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাতাস আর আকাশ নিচে রয়েছে, তাই একটি হালকা প্রাণী তৈরি হচ্ছে– যে দ্রুত দৌড়াতে চায়… আলোর থেকেও জোরে আকাশে উড়তে চায়… আমরা বুঝতে পারি সৃষ্টির যে মাপ বা মানদন্ড ভূতের মধ্যে ভারসাম্য থাকার কথা এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না। শিং নখ দাঁত এইসব আত্মরক্ষা বা আক্রমণের হাতিয়ার ব্রহ্মা ঘোড়াকে দিলেন না। লড়াই করে বাঁচবার, প্রতিবাদ করবার কোন অস্ত্রই তার নেই। তেজ দিচ্ছেন কেবল তার গতিতে। এমনকি, যুদ্ধের ঘোড়াও স্বাধীন যুদ্ধ করে না। সেখানেও সে বাহনমাত্র। সৃষ্টিকর্তার খেয়ালের অপরিকল্পনার ফসল সে। তবে ঘোড়া বাঁচবে কী করে? আশ্চর্যজনকভাবে রবীন্দ্রনাথ এবার বলেন ঘোড়ার ডিমের কথা। মানুষ আরো অদ্ভুতভাবে বাগ্-ধারাটি কল্পনাও করে নেয়। এই দু-ধরনের কল্পনাকে ধারণ করে এবার বললেন, তাই একে দ্বিজও বলা চলে। দ্বিজ, অর্থাৎ দুবার জন্ম যার। এক জন্ম সৃষ্টিকর্তা দেন; আর এক জন্ম হয় মানুষের কল্পনায়।
সৃষ্টিকর্তা তাকে মুক্তিপ্রিয় করে গড়ে তোলেন। খোলা মাঠে ছুটে বেড়াতে দেন; আর মানুষ তাকে আস্তাবলে বন্ধ করে। তার ওপর দখলদারি করে আধমরা বন্দীতে পরিণত করে।
মূলত জল মাটি আর আগুনের মিশেলে তৈরি হয় ভারী স্থূল পদার্থ; এক্ষেত্রে জীবন। আকাশ বাতাস সূক্ষ্ম উপাদান— হালকা, তাই মুক্ত। অথচ, এই উপাদানেই মহাজাগতিক সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করে। তাই অপরপক্ষে, তার ক্ষমতা অসীম, অপার। এ হেন উপাদানে সৃষ্ট জীবকে বাহনে পরিণত করেছে মানুষের দুর্বুদ্ধির জাল।
‘তোতাকাহিনী’র তোতাটিও তার খোলা আকাশ হারিয়ে ফেলে সোনার খাঁচায় বন্দী হয়েছিল। তার গান বন্ধ হল। ওড়া বন্ধ হল। শেষ পর্যন্ত দানাপানিটুকুও পেল না। ঘোড়ার দৌড়ও ফুরিয়ে গেল তার মাঠ হারিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে, প্রায় ২৫ বছর আগে লেখা ‘সোনার তরী’র ‘দুই পাখী’ কবিতায় ও গানে একই যন্ত্রণা ও দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে—
“না আমি শিকলে ধরা নাহি দিব।”
(দুই পাখী। সোনার তরী)
মানুষ ঘোড়ার পা বেঁধে তার গতিরোধ করে। আর তোতার ডানা কাটা পড়ে শাসকের নির্দেশে। মুক্তির পথই বন্ধ।
চারপাশের স্বার্থগন্ধী সমাজের পাড়াপড়শিরা মানুষের দুর্বুদ্ধিকে প্রশ্রয় দেয় সংকীর্ণ বিনিময়ের লোভে।
ভাগিনা, অমাত্য প্রমুখ শাসকের কাছের জন প্রকৃতপক্ষে স্তাবক, রাজাকে আগলে রাখে। তোতার করুণ পরিণতিটা বুঝতে দেয় না।
স্তাবকরা ঘিরে থাকে ক্ষমতার কেন্দ্র জুড়ে। রাজাকে স্তাবকরা আসল সত্যিটা দেখতে দেয় না। রাজা দেখতে পান না। তাঁর চোখ ঢাকা থাকে।
ভগবানেরও দৃষ্টি বাধিত। তিনি এতই দূরে থাকেন যে তাঁর সৃষ্টির সত্যিকারের করুণ পরিণতির দিকে তাঁর চোখ পড়েই না। দুই অবোলা জীবের কপালেই ‘অকৃতজ্ঞ’ তকমা জোটে।
‘তোতাকাহিনী’র নিন্দুক বারবার বিবেকের ভূমিকা নেয়।আড়ালে থাকে। কেউ তাকে পছন্দ করেনা। সে শাস্তি পায়। কিন্তু, শেষ সত্যিটা সেই বলে— পাখি মরেছে।
যমরাজও ব্রহ্মাকে দিকনির্দেশ করেন; মানুষের পাড়ার দিকে নজর দিতে বলেন।
ব্রহ্মা পর্যবেক্ষণে মনও দেন, কিন্তু, মানুষের ছলচাতুর্যে পথভ্রষ্ট হন। সত্যিটা দেখতে পান না। রাজাও একইভাবে তোতার উন্নতি দেখতে গিয়ে সঙ্গীদলের প্রকোপে বিভ্রান্ত হন।
দুই গল্পেই দেখি— ক্ষমতার কাছাকাছি বৃত্তে যারা থাকে, স্যাকরা, পণ্ডিত, কামার, সহিস…. এরাই বস্তুগতভাবে লাভবান হয়।
আকাশের দিকে মুখ তুলে নিরুপায় রুগ্ন ঘোড়া আর্তস্বরে চিঁহি ডাক ছাড়ে। বন্দি পাখি ডানা ঝাপটায় আর স্বভাবদোষে আলোর দিকে নিরুপায় দৃষ্টিপাত করে।
মানবমনের আত্মিক মুক্তির ভাবনা আজীবন রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন সৃষ্টির নব নব শাখায়। সেই ভাবনার প্রকাশও করেছেন। শুধু তোতাকাহিনী বা ঘোড়ার রূপকেই নয়, অজস্র প্রবন্ধ আছে মুক্তিচিন্তার বিষয়ে।
ডাকঘরের অমল, মুক্তধারার অভিজিৎ, ছুটি গল্পের ফটিক, অতিথির তারাপদ, রক্তকরবীর রঞ্জন, বিশু, অচলায়তনের পঞ্চক গানে গানে গেঁথে দিয়েছেন মুক্তির বার্তা—
”জীবন যেন দিয়ে আহুতি মুক্তিআশে”(আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে। গীতবিতান)
“তুমি আমার মুক্তি হয়ে এলে বাঁধনরূপে“(তুমি ঊষার সোনার বিন্দু। গীতবিতান)
কত কবিতা—
“অসংখ্য বন্ধনমাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ”(নৈবেদ্য ৩০)
স্বার্থলগ্ন জীবনের দাবি মেটাতে গিয়ে মুক্তিভাণ্ডারে টানাটানি পড়ে। ঘোড়া মুক্তভাবে ছুটতে চায়, কিন্তু বাধা পড়ে। তোতা ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চায়, পায়ে শিকল
পড়ে। ঘোড়া বা তোতাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে রচয়িতার নিজস্ব দর্শন– মুক্তিতত্ত্ব।
জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রকেই মুক্ত রূপে চিনতে হয়। সকল ক্ষেত্রেই মুক্ত রূপে থাকতে হয়। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাই। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনাতেও তাই মুক্তিচেতনারই বিস্তার। জীবন ও কর্ম দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন শিক্ষার প্রকৃত বিস্তার– মুক্তিসাপেক্ষেই কেবল সম্ভব। শৈশব থেকেই মুক্তির আনন্দে শিক্ষা লাভ করার প্রায়োগিক ক্ষেত্র গড়ে, পড়ুয়া শিশুদের প্রকৃত মানুষ করে তুলে, তাঁর বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই শিক্ষাধারা শান্তিনিকেতনে আজও বহমান। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বুনিয়াদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোন্ শৈশবে অস্বীকার করে সম্পূর্ণ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেকে গড়ে তুলেছেন! গৃহবন্দী করে কুঠিকে কলমের ডগায় ঠেসে পড়াতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পাখিটা তো মরল! ঘোড়াও বন্দী হয়ে মরে বেঁচে রইল! ঘোড়া বা তোতার এই বন্ধন তাদের মৃত্যুর সামিল। তবু মানুষ মুক্তিকামী। এই চিন্তা গ্রহণ করতে চায় না। এই সমস্যার গোড়া খুঁজতে গিয়ে তখন রবীন্দ্রনাথকে বলতে হয় ক্ষমতার আস্ফালন; শাসকের দর্পিত শোষণের ভয়ের কথা;– দমনপীড়ন নীতির প্রয়োগ ত্রাসের সঞ্চার করে। সহজ মনের মধ্যে ক্ষমতার আঙুল স্তব্ধ করে দেয় সকল স্বাধীন মুক্ত মন ও মুক্তমতকে। রাষ্ট্রধর্মের অত্যাচার চুপ করিয়ে রাখে সকল স্বাধীন বার্তা। ঘোড়া তখন হয় জলের মতো ঠাণ্ডা। ধর্মের মত ঠাণ্ডা। পাখির কলকাকলি স্তব্ধ হয়ে যায়। আরোপিত চাপিয়ে দেওয়া বুলির বাইরে আর কেউ রাগ করে না।
মনে আসে বাবুরামের সাপদুটোর কথা।
সুকুমার রায় সচেতন করেন :
যে সাপের চোখ নেই
শিং নেই নখ নেই
ছোটে না কি হাঁটে না
কাউকে যে কাটেনা
করে না কো ফোঁসফাঁস
মারে নাকো ঢুঁসঢাঁস
নেই কোন উৎপাত
খায় শুধু দুধভাত
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আন তো
তেড়ে মেরে ডান্ডা
করে দিই ঠাণ্ডা।
(বাবুরাম সাপুড়ে/ আবোল তাবোল/ সুকুমার রায়)
এবার রবীন্দ্রনাথ মনে করিয়ে দেন, “কিন্তু দম বন্ধ না করলে মুখ তো একেবারে বন্ধ হয় না। তাই চাপা আওয়াজ মুমূর্ষুর খাবির মত মাঝে মাঝে বেরোতে থাকে।” (ঘোড়া। লিপিকা)
ঘোড়ার আর্তস্বরের ডাক বন্ধ হয় না। অভাগা পাখিও আলোর দিকে চায় একটু মুক্তির কামনায়। প্রাণকে বেঁধে দিলে কী যে টানাপড়েন হয়… কীভাবে কষ্ট পেয়ে সেই প্রাণ মরে…. শোষক ও দমিত-পীড়িত-শোষিতের কাহিনীগুলিতে তার পরিচয়। শোষণপদ্ধতিগুলিকেই রূপক আকারে দেখাতে চান রবীন্দ্রনাথ। ‘রক্তকরবী’তে অত্যাচারিতের বর্ণনা করতে গিয়ে গা শিউরে ওঠে। প্রাণের ওপর যন্ত্রের আঘাত নামে। সে আঘাত সর্বকালের শাসকের। চিরকালের রাষ্ট্রক্ষমতার। যন্ত্ররূপী খাঁচায় ঢোকে তোতা… খোলা মাঠে পাচিল গেঁথে ঘোড়ার আস্তাবল তৈরি হয়।
জীবনের এই দুর্দশা রাজা তথা শাসকের চোখে বা বুদ্ধিতে তো আসেই না, বোধকরি স্বয়ং জীব সৃষ্টি করে প্রাণ দিয়েছেন যিনি, সেই সৃষ্টিকর্তার সঙ্গেও কৌশলী দূরত্ব ঘনিয়ে তোলে অত্যাচারীর দল। সৃষ্টিকর্তার চোখেও ঠুলি এঁটে দেওয়া হয়। তাঁরই সৃষ্ট মুক্ত জীবের পঙ্গুদশা দেখে তিনিও ভাবেন এ যে মস্ত বোঝা! কঠোর বন্দীজীবনযাপনের নিদান দেন। স্বার্থগন্ধীদের প্রবঞ্চনা ধূর্ততা ছলনা বুঝতে না পেরে তাদেরই কাছে আর্জি পেশ করেন — একে কোনো ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে.. যাতে মনুষ্যত্ব নামে কোন কলঙ্ক না পড়ে।
সুতরাং রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিলেন মনুষ্যত্ব এক্ষেত্রে কেবল আরোপিত এক ধারণামাত্র। না হলে, যে মানুষ ওর প্রাণটাকে বেঁধে ফেলে প্রায় মেরেই দিয়েছে, তখন তার নিঃশ্বাসটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে! মনুষ্যত্বের আড়ালে মনুষ্যত্বের মুখোশে নিজের মুখের বিকারটাকে ঢেকে রাখছে; সাজিয়ে রাখছে ছদ্মবেশে।
দুটি রচনাতেই জীব-জীবন-মনুষ্যত্ব সৃষ্টিকর্তা সবকিছু নিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ দর্শন তৈরি করছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জীবনদর্শনের আর এক পূর্ণ প্রকাশ ধরা রয়েছে ‘তোতাকাহিনী’র একেবারে শেষে–
নিন্দুকে রটায় পাখি মরেছে। রাজা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয় পাখির সম্পূর্ণ ধ্যানস্থ, অর্থাৎ মৃত; ঠিক তখনই বাইরে বসন্ত এসে গেল। এ যেন প্রকৃতির জীবের জন্য প্রকৃতিরই প্রত্যুত্তর, উপশম। পাখির মন আগেই মরেছিল। এবার প্রাণ গেল। দেহজ মৃত্যু হল। যেন মরে সে বাঁচলো। মৃত্যুই তার মুক্তিদূত হয়ে এলো। মুক্তিকামী প্রাণকে বাঁধা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেন শীতের রিক্ততার শেষে বসন্তের নুপূরনিক্কন ধ্বনিত হবেই। বসন্তের জড়ত্বনাশা শক্তি মৃত্যুঞ্জয়ী ক্ষমতাধর। নব বসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয় গুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাখির যন্ত্রণার বেদনায় তবু প্রাণের মূল্যে মুক্তির বার্তা বহন করে। মনে আসে রঞ্জনের, অমলের মুক্তির কথা।
মনে পড়ে ‘পলাতকা’র সেই বাইশ বছরের সেই মেয়ের শেষ কথাগুলি:
“মধুর ভুবন, মধুর আমি নারী,
মধুর মরণ, ওগো আমার অনন্ত ভিখারি।
দাও, খুলে দাও দ্বার,
ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাবার।”
(মুক্তি। পলাতকা)
তোতাকাহিনী আর ঘোড়ার অমিলের তুলনায় মিলই বেশি। অমিল কেবল বহিরঙ্গে। রচনা দুটির নির্মাণশৈলী পৃথক। ঘোড়া একটি গল্পের মত করে বিবৃত করা রচনা, যদিও তার বেশ কিছু কথা অপরূপ কাব্যময়।
“… কেবলই পালাতে চায় পালাতে পালাতে একেবারে বুঁদ হয়ে যাবে ঝিম হয়ে যাবে ভোঁ হয়ে যাবে তারপরে না হয়ে যাবে….”(ঘোড়া। লিপিকা)
“… হৃদয় তাঁর বিচলিত হলো”(ঘোড়া। লিপিকা)
এসব কথা আমাদের মনকে কবিতাভিসারী করে তোলে।
তোতাকাহিনী আবার সরাসরি সংলাপধর্মী রচনা। চরিত্রদের চোখে দেখা যায়।
১/২/৩/৪ ভাগে স্তবকবিন্যাস *প্রতিযোগেই প্রতি ভাগেই শিক্ষা ধর্ম নিয়ে কোন না কোন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এই শৈলী তোতাকাহিনীর শেষ পর্বের শব্দ বিন্যাস বা ধ্বনিবিন্যাসের অভিনবত্বও উল্লেখের দাবি রাখে– যেন চিত্রময়তায় ভরা।
“… পাখি আসিল সঙ্গে কোতোয়াল আসিল ঘোড়সওয়ার আসিল রাজা পাখিটাকে টিপিলেন সে হাঁ করিলো না হু করিলো না কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খসখস গজগজ করিতে লাগিল।”
(তোতাকাহিনী। লিপিকা)
মায়াময় ছবি তৈরীর পাশাপাশি তৈরি করছেন ধ্বনির মায়া। ধাক্কা মারে মনের মধ্যে। খসখস গজগজ শব্দে পুঁথির পাতাগুলিকে যেন অনুভব করা যায়। শিসধ্বনির ব্যবহারে নিষ্ফল অপার শূন্যতা আর দীর্ঘনিঃশ্বাস বেথিয়ে তোলে।
রবীন্দ্রনাথের স্পর্শকাতর কোমল শিল্পী মন চূড়ান্ত নান্দনিক শৈলী ও ভাবের অবলম্বনে শিক্ষার সঠিক বিস্তার ও মুক্তির যে পথ দেখিয়েছে আজ থেকে ১০০বছরেরও আগে, ‘লিপিকা’র তোতাকাহিনী ও ঘোড়া গল্পকে আশ্রয় করে; তার প্রাসঙ্গিকতা প্রয়োজন সমাজে আজও বর্তে রয়েছে।
তথ্যসূত্র
- Tagore, Rabindranath. Lipika. Kolkata: Visva-Bharati, 1922.
- Tagore, Rabindranath. “Totakahini.” Sabujpatra, Magh 1324 (1917).
- Tagore, Rabindranath. “Ghora.” Sabujpatra, Baisakh 1326 (1919).
- Tagore, Rabindranath. “Dui Pakhi.” Sonar Tori. Kolkata: 1894.
- Tagore, Rabindranath. “Amar Mukti Aloy Aloy.” Gitabitan.
- Tagore, Rabindranath. “Tumi Ushar Sonar Bindu.” Gitabitan.
- Tagore, Rabindranath. “Naibedya,” Poem 30.
- Tagore, Rabindranath. “Mukti.” Palataka.
- Tagore, Rabindranath. “Ghora.” In Lipika.
- Ray, Sukumar. “Baburam Sapur.” Abol Tabol. Kolkata: 1923.
- Tagore, Rabindranath. Raktakarabi. Kolkata: Visva-Bharati.
- Tagore, Rabindranath. Dakghar. Kolkata: 1912.