সার্বভৌমত্বের সুর: জাতীয় সংগীতের ইতিহাস, সুর সৃষ্টি ও ভূ-রাজনীতির একটি বিশ্বজনীন তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ
দেবাশিস মণ্ডল
জাতীয় সংগীত হলো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সুরময়, সাহিত্যিক ও প্রতীকী ভিত্তি। এগুলো কেবল ক্রীড়ানুষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আগে বাজানো সাধারণ কোনো সুর নয়; বরং এগুলো একটি জাতির ইতিহাস, আদর্শগত দিকনির্দেশনা, আত্মপরিচয় এবং ভূ-রাজনৈতিক আঘাতকে ধারণ করে রাখা গভীর প্রতীকী শিল্পকর্ম। এগুলো মূলত এমন কিছু সামাজিক সংগীত, যা সমষ্টিগত পরিচয় গড়ে তুলতে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে বৈধতা দিতে এবং সাধারণ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে নাগরিকদের সংবদ্ধ করতে ব্যবহৃত হয় (Cerulo, 1993)। জাতীয় সংগীতের বিকাশ ১৬৪৮ সালের ‘পিস অব ওয়েস্টফেলিয়া’ এবং ১৮ শতকের শেষের দিকের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত (Anderson, 2006)। রাজনৈতিক বৈধতা যখন রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার থেকে সরে এসে জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রগুলোর এমন কিছু প্রতীকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে যা সাংস্কৃতিক, ভাষাগত বা আঞ্চলিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। জাতীয় পতাকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীকের পাশাপাশি জাতীয় সংগীতও তখন ‘নিত্যনৈমিত্তিক জাতীয়তাবাদ’ (Banal Nationalism)—অর্থাৎ জাতীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠে (Billig, 1995)। এই লেখায় ছ’টি মূল দৃষ্টিকোন থেকে জাতীয় সংগীতের বৈশ্বিক রূপটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেগুলি হল, – ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ, সুরের কাঠামো, বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ, প্রধান প্রধান জাতীয় সংগীতের নির্দিষ্ট উদাহরণ, কতিপয় ব্যতিক্রমী বিষয় এবং জাতীয় সংগীত সংশোধনের সাথে জড়িত জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক বিতর্ক।
ঐতিহাসিক বিকাশ ও শ্রেণিবিভাগ
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় সংগীতের আত্মপ্রকাশ মূলত চারটি সুস্পষ্ট ধাপে ঘটেছে: রাজতান্ত্রিক / রাজবংশীয় পর্যায় (১৬শ–১৮শ শতক): প্রথম পর্যায়টি রাজতান্ত্রিক সংগীত দ্বারা চিহ্নিত, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজার ঐশ্বরিক অধিকার এবং রাজবংশের বৈধতাকে জোরদার করা। স্প্যানিশ হাবসবার্গ শাসনের বিরুদ্ধে ওলন্দাজ বিদ্রোহের সময় রচিত ডাচ জাতীয় সংগীত (‘ভিলহেলমুস’) এবং গ্রেট ব্রিটেনের ‘গড সেভ দ্য কিং’ এই যুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক উদাহরণ। বিপ্লবী / প্রজাতান্ত্রিক পর্যায় (১৮ শতকের শেষ–১৯ শতক): দ্বিতীয় ধাপে মুক্তি আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সরাসরি উঠে আসা গণমুখী ও সংগ্রামী সংগীতের উত্থান দেখা যায়। ফ্রান্সে ‘লা মার্সেইয়েজ’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গেলড ব্যানার’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঔপনিবেশিক উত্তর / স্বাধীনতা পর্যায় (২০ শতকের মধ্যভাগ): মধ্য-বিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া নবীন স্বাধীন দেশগুলো তাদের স্থানীয় সুরের সাথে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ভাবধারার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে জাতীয় সংগীত রচনা করে। ভারতের ‘জনগণমন’ এবং ঘানার ‘গড ব্লেস আওয়ার হোমল্যান্ড ঘানা’ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
ভারতের জাতীয় সঙ্গীত- মূল রূপ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত মূল বাংলা/সংস্কৃতায়িত বাংলা). জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা! পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিস মাগে, গাহে তব জয়গাথা। জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা! জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥ সাম্যবাদ উত্তর / রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন পর্যায় (২০ শতকের শেষভাগ): শেষ পর্যায়টিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক পতন ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের পর ঐতিহাসিক সুরের নতুন রূপান্তর বা সম্পূর্ণ নতুন সংগীত সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। রূশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রীয় সংগীত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ জাতীয় সংগীত (‘ঙ্কোসি সিকলেল’ ইআফ্রিকা’) এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ।
রাজতান্ত্রিক ও রাজবংশীয় পটভূমি- সবচেয়ে প্রাচীন জাতীয় সংগীতগুলো সাধারণ মানুষের গাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি; বরং সেগুলো ছিল তৎকালীন শাসকদের জন্য প্রার্থনা বা শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্প্যানিশ হাবসবার্গ শাসনের বিরুদ্ধে ওলন্দাজ বিদ্রোহের সময় ১৫৬৮ থেকে ১৫৭২ সালের মধ্যে রচিত ডাচ জাতীয় সংগীত “হেট ভিলহেলমুস” (দ্য উইলিয়াম)-কে বিশ্বের প্রাচীনতম জাতীয় সংগীতের টেক্সট হিসেবে গণ্য করা হয় (Swart, 1975)। এটি অরেঞ্জের উইলিয়ামকে উৎসর্গ করে রচিত একটি বিশেষ কবিতা, যা মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সংগীতের সাথে প্রাক-আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনাকে যুক্ত করে। একইভাবে, গ্রেট ব্রিটেনের “গড সেভ দ্য কিং” (১৭৪৫ সালে প্রথম প্রকাশ্যে পরিবেশিত) রাজতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এর সরল ও রাজকীয় ছন্দ এবং প্রার্থনামূলক কথাগুলো সমগ্র ইউরোপ জুড়ে রাজতন্ত্রের জন্য একটি সর্বজনীন সংগীতের মানদণ্ড হয়ে ওঠে, যা বিভিন্ন সময়ে প্রাশিয়া, রাশিয়া, লিচেনস্টাইন এবং সুইজারল্যান্ড গ্রহণ করেছিল (Richards, 2001)।
সুইজারল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত: “Swiss Psalm” (Schweizerpsalm)
মূল জার্মান রূপ (প্রথম স্তবক):
Trittst im Morgenrot daher,
Seh’ ich dich im Strahlenmeer,
Dich, du Hocherhabener, Herrlicher!
Wenn der Alpenfirn sich rötet,
Betet, freie Schweizer, betet!
Eure derived Seele ahnt
Gott im hehren Vaterland,
Gott, den Herrn, im hehren Vaterland.
বাংলা অনুবাদ:
ভোরের প্রাতে যখন তুমি হেঁটে আসো,
আলোর সমুদ্রে আমি তোমাকে দেখি,
হে মহীয়ান, হে পরম গৌরবময়!
আল্পসের বরফ যখন রক্তিম রূপ নেয়,
প্রার্থনা করো, মুক্ত সুইসগণ, প্রার্থনা করো!
তোমাদের আত্মায় অনুভব করো
মহান মাতৃভূমিতে ঈশ্বরকে,
প্রভু ঈশ্বরকে আমাদের মহান মাতৃভূমিতে।
বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্রের যুগ
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব জাতীয় সংগীতের উদ্দেশ্য ও সুরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ১৭৯২ সালে ক্লোদ জোসেফ রুজে দ্য লিসল কর্তৃক “লা মার্সেইয়েজ” রচনা সামরিক, আক্রমণাত্মক ছন্দ এবং স্পষ্ট প্রজাতান্ত্রিক চেতনার সূচনা করে। রাজতন্ত্রের গানগুলোর মতো ঈশ্বরের কাছে রাজার দীর্ঘায়ু প্রার্থনা না করে, “লা মার্সেইয়েজ” নাগরিকদের টাইরানি বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায়। এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়। ১৯ শতকে লাতিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়ার উদীয়মান প্রজাতন্ত্রগুলো সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে নিজেদের স্বাধীনতা প্রমাণের জন্য এই ধরনের সামরিক ও বিপ্লবী সংগীত সৃষ্টি করেছিল (Boyd, 2008)।
ঔপনিবেশিক উত্তর ও আধুনিক যুগের পরিবর্তন
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশমুক্তির তরঙ্গ এমন কিছু সংগীতের চাহিদা তৈরি করে যা সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করে ঔপনিবেশিক সীমানার ভেতরের বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে পারে। পোস্ট-কলোনিয়াল বা ঔপনিবেশিক উত্তর রাষ্ট্রগুলো তখন এক সুরসংক্রান্ত দ্বিধায় পড়ে: তারা কি ইউরোপীয় ব্রাস ইনস্ট্রুমেন্টে বাজানো পাশ্চাত্য সুর গ্রহণ করবে, নাকি তাদের নিজস্ব সুর, স্কেল ও ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করবে (Turino, 2000)।
গানের সুর ও সুরসংযোজনের কাঠামো
স্থানীয় শিল্প ঐতিহ্য, ইউরোপীয় অর্কেস্ট্রা এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে জাতীয় সংগীতগুলো বিভিন্ন সুরের কাঠামোতে রচিত হয়েছে:
ইউরোপীয় স্তোত্র / মার্চ ধারা: ইউরোপের জাতীয় সংগীতগুলো সাধারণত সংবৃত (Strophic) এবং ডায়াটোনিক মেজর কি-র সুরের হয়, যা ব্রাস ব্যান্ডের সামরিক মার্চ বা গম্ভীর ধার্মিক সংগীতের মতো শোনায়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত এর প্রধান উদাহরণ, যাতে ফ্রাঞ্জ জোসেফ হেইডন এবং ক্লোদ জোসেফ রুজে দ্য লিসলের মতো বিখ্যাত সুরকারদের অবদান রয়েছে।
লাতিন আমেরিকান “বেল কান্টো” অপেরা ধারা: লাতিন আমেরিকার সংগীতগুলো তাদের দীর্ঘ অপেরা শৈলী, জটিল একক কণ্ঠের অংশ, একাধিক ধাপের সুর এবং দীর্ঘ অর্কেস্ট্রা ভূমিকার জন্য পরিচিত। চিলি, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও এল সালভাদরের মতো দেশের এই সুরগুলো প্রায়শই মিকেল নোভারো এবং ফ্রান্সিসকো হোসে দে বালির মতো বিখ্যাত ইতালীয় অপেরা সুরকারদের দ্বারা রচিত হয়েছিল।
দক্ষিণ এশীয় রাগ-ভিত্তিক ধারা: দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয় সংগীতগুলোতে সূক্ষ্ম সুরের তারতম্য, শাস্ত্রীয় রাগ এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্যের কাব্যিক ছন্দ ব্যবহার করা হয়। নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
উপ-সাহারীয় আফ্রিকান গায়কদলীয় (Choral) ধারা: উপ-সাহারীয় আফ্রিকার জাতীয় সংগীতগুলোতে চার অংশের কণ্ঠসংগীত (SATB), প্রশ্নোত্তর বা ডাক-ও-সাড়ার সুর এবং পাঁচ বা সাত স্বরের স্কেল দেখা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া ও তাঞ্জানিয়ার জাতীয় সংগীতে ব্যবহৃত এই ঐতিহ্যবাহী ধারার প্রচলনে সুরকার ইনোক সন্তোঙ্গার বড় অবদান ছিল।
পূর্ব এশীয় মোডাল (Modal) ধারা: পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জাতীয় সংগীত মূলত ‘গাগাকু’ এবং অন্যান্য শাস্ত্রীয় সুরের মতো ঐতিহ্যবাহী পেন্টাটোনিক (পাঁচ স্বরের) স্কেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা গম্ভীর ও ধীরগতির হয়। জাপান ও নেপালের সংগীত এর উদাহরণ, এবং এসব সুর তৈরিতে হিরোমোরি হায়াশি, ফ্রাঞ্জ একার্ট এবং অম্বার গুরুং প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নেপালের জাতীয় সঙ্গীত: “Sayaun Thunga Phool Ka” (सयौं थुँगा फूलका)
মূল নেপালি রূপ:
सयौं थुँगा फूलका हामी, एउटै माला नेपाली
सार्वभौम भई फैलिएका, मेची–महाकाली।
प्रकृतिका कोटी–कोटी सम्पदाको आंचल
वीरहरूका रगतले, स्वतन्त्र र अटल।
ज्ञानभूमि, शान्तिभूमि तपोभूमि तराई, पहाड, हिमाल
अखण्ड यो प्यारो हाम्रो मातृभूमि नेपाल।
बहुजाति, भाषा, धर्म, संस्कृति छन् विशाल
अग्रगामी राष्ट्र हाम्रो, जय जय नेपाल।
বাংলা অনুবাদ:
শয়ে শয়ে ফুলের তৈরি আমরা, একই মালা নেপালি,
মেচী থেকে মহাকালী পর্যন্ত বিস্তৃত সার্বভৌম সত্তা।
কোটি কোটি প্রাকৃতিক সম্পদের আঁচল,
বীরদের রক্তে সিঞ্চিত, স্বাধীন ও অটল।
জ্ঞানভূমি, শান্তিভূমি, তপোভূমি—তরাই, পাহাড় ও হিমালয়,
অখণ্ড আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি নেপাল।
বহু জাতি, ভাষা, ধর্ম আর সংস্কৃতি বিশাল,
অগ্রগতিশীল রাষ্ট্র আমাদের, জয় জয় নেপাল।
লাতিন আমেরিকার অপেরা শৈলী
লাতিন আমেরিকার গানগুলো তাদের অসাধারণ দৈর্ঘ্য, জটিল সুরের ব্যবহার এবং অপেরার প্রভাবের কারণে সংগীতে অনন্য। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেখানকার তরুণ প্রজাতন্ত্রগুলো দক্ষিণ আমেরিকা সফররত ইতালীয় অপেরা সুরকারদের (যেমন—ফ্রান্সিসকো হোসে দে বালি এবং মিকেল নোভারো) বিশাল আকারের সুর রচনার দায়িত্ব দেয়। এই সংগীতগুলোতে দীর্ঘ যন্ত্রসংগীতের ভূমিকা, সূর ও স্কেলের নাটকীয় পরিবর্তন এবং উচ্চমাত্রার টেনর কণ্ঠের প্রয়োজন হয় যা কেবল পেশাদার গায়করাই গাইতে পারেন (Kuss, 2004)।
মোডাল জাতীয় সংগীত ও পেন্টাটোনিক স্কেল
পাশ্চাত্য সুরের স্কেলের থেকে আলাদা হয়ে বেশ কিছু এশীয় জাতীয় সংগীত ঐতিহ্যবাহী পেন্টাটোনিক (পাঁচ স্বরের) স্কেলের ওপর ভিত্তি করে রচিত। জাপানের “কিমিগায়ো” ঐতিহ্যবাহী ‘গাগাকু’ (দরবারি সংগীত) স্কেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা এটিকে একটি শাস্ত্রীয় সুর দেয় এবং পাশ্চাত্য সুরের মতো কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তি নির্দেশ করে না। এই সুরসংযোজন একটি চিরন্তন আবহ তৈরি করে, যা সম্রাটের শাসন হাজার বছর ধরে স্থায়ী হওয়ার কামনামূলক গীতিকবিতার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাপানের জাতীয় সঙ্গীত: “Kimigayo” (君が代)
মূল জাপানি রূপ (রোমাজি):
Kimigayo wa
Chiyo ni yachiyo ni
Sazare-ishi no
Iwaho to narite
Koke no musu made
বাংলা অনুবাদ:
আপনার (সম্রাটের) শাসনকাল,
এক হাজার, আট হাজার যুগ ধরে স্থায়ী হোক,
যতদিন না ছোট নুড়ি পাথরগুলো
বিশাল পাথরে পরিণত হয়
আর শ্যাওলায় ঢেকে যায়।
জাতীয় সংগীতের বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
ভাষাগত এবং ভাবধারার দিক থেকে জাতীয় সংগীতের কথাগুলোকে প্রধানত চারটি মূল ভাগে ভাগ করা যায়:
সামরিক ও প্রতিরোধমূলক কাঠামো: এই কাঠামোর গানগুলো যুদ্ধ ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই কেন্দ্রিক। উদাহরণস্বরূপ—ফ্রান্স ও আলজেরিয়ার জাতীয় সংগীত।
আলজেরিয়ার জাতীয় সঙ্গীত: “Kassaman” (قَسَمًا – আমরা শপথ করি)
মূল আরবি রূপ (প্রথম স্তবক):
قَسَمًا بِالنَّازِلاَتِ المُاحِقَاتِ وَالدِّمَاءِ الزَّاكِيَاتِ الطَّاهِرَاتِ وَالْبُنُودِ اللَّامِعَاتِ الْخَفَّاقَاتِ فِي الْجِبَالِ الشَّامِخَاتِ الشَّاهِقَاتِ نَحْنُ ثُرْنَا فَحَيَاةٌ أَوْ مَمَاتٌ وَعَقَدْنَا الْعَزْمَ أَنْ تَحْيَا الْجَزَائِرْ فَاشْهَدُوا! فَاشْهَدُوا! فَاشْهَدُوا!
বাংলা অনুবাদ:
শপথ সেই ধ্বংসাত্মক বজ্রপাতের, শপথ বিশুদ্ধ ও পবিত্র রক্তের, শপথ সেই উজ্জ্বল ও পতপত করে ওড়া পতাকাসমূহের, যা উড্ডীন মহীয়ান ও উচ্চ পর্বতমালায়, আমরা বিদ্রোহ করেছি—হয় জীবন, না হয় মৃত্যু, আর আমরা দৃঢ়সংকল্প যে আলজেরিয়া জীবিত থাকবেই! অতএব তোমরা সাক্ষী থাকো! সাক্ষী থাকো! সাক্ষী থাকো!
ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত: “La Marseillaise” (প্রথম স্তবক ও কোরাস)
মূল ফরাসি রূপ:
Allons enfants de la Patrie, Le jour de gloire est arrivé! Contre nous de la tyrannie, L’étendard sanglant est levé! (répété) Entendez-vous dans les campagnes Mugir ces féroces soldats? Ils viennent jusque dans vos bras Égorger vos fils, vos compagnes!
Refrain: Aux armes, citoyens! Formez vos bataillons! Marchons, marchons! Qu’un sang impur Abreuve nos sillons!
বাংলা অনুবাদ:
চলো, পিতৃভূমির সন্তানেরা, গৌরবের দিন এসেছে! আমাদের বিরুদ্ধে অত্যাচারীদের রক্তাঙ্কিত পতাকা উড্ডীন হয়েছে! (পুনরাবৃত্তি) তোমরা কি প্রান্তর জুড়ে শুনতে পাচ্ছ ওই হিংস্র সৈন্যদের গর্জন? তারা আসছে ঠিক তোমাদের বাহুর ডোরে, কাটতে তোমাদের পুত্র ও স্ত্রীদের গলা!
কোরাস: হে নাগরিকগণ, অস্ত্র ধরো! গড়ে তোলো তোমাদের সৈন্যদল! এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো! সেই অপবিত্র রক্ত যেন আমাদের ফসলি জমি ভিজিয়ে দেয়!
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ল্যান্ডস্কেপ কাঠামো: এই থিমটি কোনো দেশের ভৌগোলিক সৌন্দর্য, অর্থাৎ তার নদী, পাহাড় ও মাটিকে সম্মান জানানোর ওপর ভিত্তি করে রচিত। উদাহরণস্বরূপ—কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের জাতীয় সংগীত।
ধর্মীয় ও প্রার্থনামূলক কাঠামো: ঈশ্বর বা পরম শক্তির কাছে আশীর্বাদ, সুরক্ষা এবং করুণা কামনার মাধ্যমে এই গানগুলো চিহ্নিত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ—যুক্তরাজ্য, কেনিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত। যুক্তরাজ্যের জাতীয় সঙ্গীত: “God Save the King”। God save our gracious King, Long live our noble King, God save the King! Send him victorious, Happy and glorious, Long to reign over us: God save the King!
বাংলা অনুবাদ: ঈশ্বর আমাদের সদয় রাজাকে রক্ষা করুন, আমাদের মহান রাজা দীর্ঘজীবী হোন, ঈশ্বর রাজাকে রক্ষা করুন! তাঁহাকে বিজয়ী করুন, সুখী ও মহিমান্বিত করুন, আমাদের ওপর যেন তিনি দীর্ঘকাল শাসন করতে পারেন: ঈশ্বর রাজাকে রক্ষা করুন!
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত: “The Star-Spangled Banner” (প্রথম স্তবক)- O say can you see, by the dawn’s early light, What so proudly we hailed at the twilight’s last gleaming? Whose broad stripes and bright stars, through the perilous fight, O’er the ramparts we watched, were so gallantly streaming? And the rockets’ red glare, the bombs bursting in air, Gave proof through the night that our flag was still there. O say does that star-spangled banner yet wave O’er the land of the free and the home of the brave?
বাংলা অনুবাদ: ওহ বলো, ভোরের প্রথম আলোয় তুমি কি দেখতে পাচ্ছ, সন্ধ্যার শেষ আলোকরশ্মিতে যা আমরা সগর্বে অভিবাদন জানিয়েছিলাম? যার চওড়া ডোরা আর উজ্জ্বল তারাগুলো, ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্যেও, দুর্গের ওপর থেকে আমরা দেখেছি কতটা বীরত্বের সাথে উড়ছিল? আর রকেটের লাল আলো, বাতাসে বোমার বিস্ফোরণ, সারারাত প্রমাণ দিয়েছে যে আমাদের পতাকা সেখানেই ছিল। ওহ বলো, সেই তারখচিত পতাকা কি আজও উড়ছে— মুক্ত মানুষের দেশ আর বীরদের আবাসের ওপর? সর্বজনীন ও আন্তঃজাতিগত ঐক্য কাঠামো: এই কাঠামোটি দেশের অভ্যন্তরে জাতিগত বা আঞ্চলিক ঐক্য রক্ষা ও জোর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। উদাহরণস্বরূপ—দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাঞ্জানিয়ার জাতীয় সংগীত।
দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীত (সম্মিলিত রূপ)। মূল বহুভাষিক রূপ:
(isiXhosa) Nkosi sikelel’ iAfrika / Maluphanyisw’ uphondo lwayo,
(isiZulu) Yizwa imithandazo yethu, / Nkosi sikelela, thina lusapho lwayo.
(Sesotho) Morena boloka setjhaba sa heso, / O fedise dintwa le matshwenyeho,
O se boloke, O se boloke setjhaba sa heso, / Setjhaba sa South Afrika – South Afrika.
(Afrikaans) Uit die blou van onze hemel, / Uit die diepte van ons see,
Over ons ewige gebergtes, / Waar die kranse antwoord gee,
(English) Sounds the call to come together, / And united we shall stand,
Let us live and strive for freedom / In South Africa our land.
বাংলা অনুবাদ:
(খোসা) ঈশ্বর আফ্রিকাকে আশীর্বাদ করুন / এর মহিমা উচ্চে তুলে ধরুন,
(জুলু) আমাদের প্রার্থনা শুনুন / ঈশ্বর আমাদের আশীর্বাদ করুন, আমরা তো এরই সন্তান।
(সোথো) প্রভু আমাদের জাতিকে রক্ষা করুন / যুদ্ধ আর সকল দুঃখের অবসান ঘটান,
রক্ষা করুন, আমাদের জাতিকে রক্ষা করুন / দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিকে—দক্ষিণ আফ্রিকাকে।
(আফ্রিকান) আমাদের নীল আকাশ থেকে / আমাদের সমুদ্রের গভীরতা থেকে,
আমাদের চিরন্তন পর্বতমালা পেরিয়ে / যেখানে পাহাড়ের চূড়া সাড়া দেয়,
(ইংরেজি) ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান বেজে ওঠে / আর আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াব,
চলো আমরা বাঁচি ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করি / আমাদের এই দক্ষিণ আফ্রিকা ভূমিতে।
তাঞ্জানিয়ার জাতীয় সঙ্গীত: “Mungu ibariki Afrika”
মূল সোয়াহিলি রূপ (প্রথম স্তবক):
Mungu ibariki Afrika
Wabariki Viongozi wake
Hekima Umoja na Amani
Hizi ni ngao zetu
Afrika na watu wake.
Korus:
Ibariki Afrika, Ibariki Afrika
Tuberiki watoto wa Afrika.বাংলা অনুবাদ:
ঈশ্বর আফ্রিকাকে আশীর্বাদ করুন,
এর নেতাদের আশীর্বাদ করুন।
প্রজ্ঞা, ঐক্য এবং শান্তি—
এগুলোই আমাদের ঢাল,
আফ্রিকা এবং তার মানুষের জন্য।
কোরাস:
আফ্রিকাকে আশীর্বাদ করুন, আফ্রিকাকে আশীর্বাদ করুন, আফ্রিকার সন্তানদের আশীর্বাদ করুন।
সামরিক ও প্রতিরোধের গল্প: এই গানগুলোতে বিদেশী আক্রমণকারীদের সাথে ঐতিহাসিক সংঘাতের কথা বলা হয়, জনগণকে অস্ত্র হাতে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং শহীদদের প্রশংসা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আলজেরিয়ার “কাসামান” (আমরা শপথ করি)—যা ফরাসি কারাগারে বন্দী অবস্থায় মুফদি জাকারিয়া লিখেছিলেন, এবং পোল্যান্ডের “মাজুরকা দাব্রোভস্কিগো” (পোল্যান্ড এখনো হারিয়ে যায়নি)। পোল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত: “Mazurek Dąbrowskiego” (প্রথম স্তবক)
মূল পোলিশ রূপ:
Jeszcze Polska nie zginęła,
Kiedy my żyjemy.
Co nam obca przemoc wzięła,
Szablą odbierzemy.
Refren:
Marsz, marsz, Dąbrowski,
Z ziemi włoskiej do Polski.
Za twoim przewodem
Złączym się z narodem.
বাংলা অনুবাদ:
পোল্যান্ড এখনো হারিয়ে যায়নি,
যতদিন আমরা বেঁচে আছি।
বিদেশী শক্তি আমাদের থেকে যা কেড়ে নিয়েছে,
আমরা তলোয়ার দিয়ে তা পুনরুদ্ধার করব।
কোরাস:
এগিয়ে চলো, ডাব্রোভস্কি,
ইতালীয় ভূমি থেকে পোল্যান্ডের দিকে।
তোমার নেতৃত্বে
আমরা সমগ্র জাতির সাথে পুনর্মিলিত হব।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বদেশ বন্দনা: এই গানগুলো সামরিক সংঘাতের চেয়ে জন্মভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, পাহাড় এবং মাটির উর্বরতাকে উদ্ভাসিত করে। এই প্রকৃতির প্রীতি ও রোমান্টিক ঐতিহ্যের দুটি সেরা উদাহরণ হলো কানাডার “ও কানাডা” এবং সুইজারল্যান্ডের “সুইস সালম”। কানাডার জাতীয় সঙ্গীত: “O Canada”
O Canada! Our home and native land!
True patriot love in all of us command.
With glowing hearts we see thee rise,
The True North strong and free!
From far and wide, O Canada,
We stand on guard for thee.
God keep our land glorious and free!
O Canada, we stand on guard for thee.
O Canada, we stand on guard for thee.
বাংলা অনুবাদ:
ও কানাডা! আমাদের ঘর ও জন্মভূমি!
আমাদের সবার অন্তরে প্রকৃত দেশপ্রেমের আদেশ।
উদ্দীপ্ত হৃদয়ে আমরা তোমার উত্থান দেখি,
সেই সত্য উত্তর—শক্তিশালী ও মুক্ত!
বহুদূর বিস্তৃত প্রান্ত থেকে, ও কানাডা,
আমরা তোমার সুরক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।
ঈশ্বর আমাদের দেশকে মহীয়ান ও মুক্ত রাখুন!
ও কানাডা, আমরা তোমার সুরক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।
ও কানাডা, আমরা তোমার সুরক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।
ধর্মীয় ও ভক্তিপূর্ণ আকুতি: দেশের সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির জন্য পরম শক্তির কাছে সরাসরি প্রার্থনারূপী সংগীত। উদাহরণ হিসেবে কেনিয়ার “ই মুঙ্গু এনগুবু ইয়েতু” (হে সব সৃষ্টির ঈশ্বর) এবং যুক্তরাজ্যের “গড সেভ দ্য কিং” উল্লেখযোগ্য।
সর্বজনীন ও বহুজাতিক মেলবন্ধন: প্রধানত ঔপনিবেশিক বা বর্ণবাদ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে ভ্রাতৃত্ব, বহুজাতিক ঐক্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে এই গানগুলো রচিত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বিত জাতীয় সংগীত এই মডেলের বিশ্বসেরা উদাহরণ।
প্রধান প্রধান জাতীয় সংগীতের নির্দিষ্ট উদাহরণ
৫.১. ভারত: “জনগণমন”
ভাষা ও গীত: এটি মূলত ১৯১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায় “ভারত ভাগ্য বিধাতা” শিরোনামে রচিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান সভা এর প্রথম স্তবকটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে। সুরের কাঠামো: এটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় আলহিয়া বিলাবল রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যা একটি শান্ত, বিজয়ী ভোরের পরিবেশ তৈরি করে। এর পূর্ণাঙ্গ রূপটি পরিবেশন করতে ঠিক ৫২ সেকেন্ড সময় লাগে। ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: রবীন্দ্রনাথের এই রচনায় সামরিক জয়ের বদলে ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়েছে; যেখানে পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল ও বাংলার নাম উঠে এসেছে। এটি পরম ভাগ্য বিধাতার অধীনে জাতীয় ভাগ্যের এক বহুত্ববাদী, অহিংস এবং সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
ফ্রান্স: “লা মার্সেইয়েজ”- ভাষা ও গীত: ১৭৯২ সালের এপ্রিলে ফ্রান্স অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ক্লোদ জোসেফ রুজে দ্য লিসল স্ট্রাতসবার্গে এটি লিখেছিলেন। মূলত এর নাম ছিল “শঁ দ্য গ্যার পুর লারমে দ্যু র্যাঁ” (রাইন সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধের গান)। সুরের কাঠামো: এটি জি-মেজর স্কেলে রচিত একটি দ্রুত গতির মার্চ গান, যাতে নাটকীয় ব্রাস ব্যান্ড ও উদ্দীপনামূলক কোরাস রয়েছে (“ও জার্ম, সিথোয়ায়াঁ!” / নাগরিকগণ, অস্ত্র ধরো!)। ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: এটি বিপ্লবী জাতীয় সংগীতের এক অনন্য প্রতীক। এর রক্তক্ষয়ী কথাগুলো (“ক্যাঁ সং অ্যাঁপুর আব্রুভ নো সিয়োঁ!” / অপবিত্র রক্তে আমাদের মাঠ ভেসে যাক!) বিপ্লবী ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের সংকটকে প্রতিফলিত করেছিল। এটি ১৯ এবং ২০ শতকে বিশ্বজুড়ে বামপন্থী ও রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলনগুলোকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকা: “দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সংগীত”- ভাষা ও গীত: ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার শাসনকালে গৃহীত এটি একটি অনন্য ও সমন্বিত জাতীয় সংগীত। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি সরকারি ভাষার মধ্যে ৫টি ভাষায় (ইসিজোসা, ইসিজুলু, সেসোথো, আফ্রিকান ও ইংরেজি) সুরের সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরি। সুরের কাঠামো: গানটি জি-মেজর স্কেলে ইনোক সন্তোঙ্গার ১৮৯৭ সালের খ্রিস্টীয় প্রার্থনা গান “ঙ্কোসি সিকলেল’ ইআফ্রিকা” দিয়ে শুরু হয়, এরপর বর্ণবাদের আমলের গান “ডি স্টেম ভান সুইদ-আফ্রিকা” (দক্ষিণ আফ্রিকার আহ্বান)-এ প্রবেশ করে এবং ডি-মেজর স্কেলে ইংরেজি কথার মাধ্যমে শেষ হয়। ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: এটি সুরের কৌশলের মাধ্যমে রাজনৈতিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুক্তির গান এবং পূর্ববর্তী শাসনের আফ্রিকান গানকে একসাথে যুক্ত করে রাষ্ট্রটি বিভক্ত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে একটি সুরের সেতু নির্মাণ করেছে।
জাপান: “কিমিগায়ো”
ভাষা ও গীত: গানটির কথাগুলো ১০ম শতকের ‘কোকিন ওয়াকাসু’ কাব্যগ্রন্থের একটি শাস্ত্রীয় ‘ওয়াকা’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। চার লাইনে মাত্র ৩২টি অক্ষরের এই গানটি বিশ্বের সংক্ষিপ্ততম জাতীয় সংগীতগুলোর একটি। সুরের কাঠামো: এটি মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী সুরে রচিত হয়েছিল। ১৮৮০ সালে হিরোমোরি হায়াশি এটি সংশোধন করেন এবং জার্মান ব্যান্ডমাস্টার ফ্রাঞ্জ একার্ট এটিকে পাশ্চাত্য রূপ দেন। এটি ডোরিয়ান মোড / ঐতিহ্যবাহী ইচিকোৎসুচো মোডে রচিত, যাতে সাধারণ পাশ্চাত্য সুরের মতো কোনো সমাপ্তি নির্দেশক ক্যাডেন্স নেই। ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: এই সংগীতটি সম্রাটের (কিমি) শাসন হাজার বছর ধরে স্থায়ী হওয়ার প্রার্থনা করে—যতদিন না ছোট নুড়ি পাথর শ্যাওলাচ্ছন্ন বিশাল পাথরে পরিণত হয়। শিন্টো জাতীয়তাবাদ এবং ইম্পেরিয়াল জাপানের সাথে সম্পর্কের কারণে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্কুলে এটি বাধ্যবাধকতামূলকভাবে গাওয়ানো তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ব্যতিক্রমী বিষয়, অসামঞ্জস্য ও চরম উদাহরণ।
দৈর্ঘ্য ও সংক্ষিপ্ততা। দীর্ঘতম পাঠ্য: গ্রিসের “হিম্নোস এস তেন এলেউথেরিয়ান” (স্বাধীনতার গান) ১৮২৩ সালে ডিওনিসিওস সোলোমোস লিখেছিলেন, যার স্তবক সংখ্যা ১৫৮টি। সম্পূর্ণ কবিতাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হলেও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কেবল প্রথম দুটি স্তবক পরিবেশন করা হয়। দীর্ঘতম পরিবেশনা (সুর): উরুগুয়ের “হিম্নো নাসিওনাল দে উরুগুয়ে” সংগীতে ১০৫টি বার রয়েছে। এর অপেরা কাঠামো এবং জটিল যন্ত্রসংগীতের কারণে এটি পুরো বাজাতে ৫ থেকে ৬ মিনিট সময় লাগে। সংক্ষিপ্ততম সময়: উগান্ডার “ও উগান্ডা, ল্যান্ড অব বিউটি” অন্যতম সংক্ষিপ্ত জাতীয় সংগীত; মাত্র ৮ বারের এই সুরটি বাজাতে সময় লাগে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড। প্রোটোকল মেনে চলার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে প্রায়শই এটি পর পর দু’বার বাজানো হয়।
শব্দহীন বা পাঠ্যহীন জাতীয় সংগীত। বিশ্বের চারটি সার্বভৌম দেশের অফিশিয়াল জাতীয় সংগীতে কোনো কথা বা শব্দ নেই: স্পেন (“লা মার্চা রিয়াল” – দ্য রয়াল মার্চ): ১৭৬১ সালে তৈরি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই জাতীয় সংগীতে আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে একাধিকবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও কোনো অফিশিয়াল কথা যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (“ইন্টারমেসো”): ১৯৯৯ সালে গৃহীত এই সুরটিতে কোনো শব্দ রাখা হয়নি, যাতে পূর্বের গানটি সার্ব ও ক্রোটদের বদলে কেবল বোসনিয়াকদের প্রাধান্য দিচ্ছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল তা দূর করা যায়।
কসোভো (“ইউরোপ”): ২০০৮ সালে গৃহীত এই সংগীতটিতে সার্ব বা অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ না করার জন্য কোনো কথা রাখা হয়নি।
সান মারিনো (“ইন্নো নাসিওনাল”): এটি ১০ম শতকের এক গানের ওপর ভিত্তি করে ফেদেরিকো কনসোলোর তৈরি একটি কথা ছাড়া যন্ত্রসংগীত।
বিতর্ক, সংশোধন ও বর্তমান ভূ-রাজনীতি। জাতীয় সংগীত কোনো স্থির উপাদান নয়; বরং এগুলো জাতীয় স্মৃতি এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি ধারাবাহিক চর্চাক্ষেত্র।
রাশিয়ার সুরের ধারাবাহিকতা- ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, রাশিয়া অ্যালেক্সান্ডার আলেকজান্দ্রোভের মহান সোভিয়েত সংগীতটি ত্যাগ করে এবং মিখাইল গ্লিনকার শব্দহীন “প্যাত্রিয়োতিচেস্কায়া পেসনিয়া” গ্রহণ করে। কিন্তু এই নতুন সুরটি জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা পায়নি। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের অধীনে রাশিয়া আলেকজান্দ্রোভের সেই ক্লাসিক সোভিয়েত সুরটি ফিরিয়ে আনে এবং এতে সার্গে মিখালকভের লেখা নতুন কথা যুক্ত করে। বিশেষ বিষয় হলো, এই মিখালকভই ১৯৪৪ সালে স্ট্যালিনের আমলে মূল সোভিয়েত গানটি লিখেছিলেন। এই ঘটনাটি দেখায় যে কীভাবে একটি জাতীয় সংগীতের সুর রাষ্ট্রের মহিমা এবং ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। রাশিয়া: “State Anthem of the Russian Federation” (প্রথম স্তবক ও কোরাস)
মূল রূশ রূপ:
Россия – священная наша держава,
Россия – любимая наша страна.
Могучая воля, великая слава –
Твое достоянье на все времена!
Припев:
Славься, Отечество наше свободное,
Братских народов союз вековой,
Предками данная мудрость народная!
Славься, страна! Мы гордимся тобой!
বাংলা অনুবাদ:
রাশিয়া—আমাদের পবিত্র দেশ,
রাশিয়া—আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
শক্তিশালী সংকল্প, মহান গৌরব—
চিরকালের জন্য তোমার সম্পত্তি!
কোরাস:
মহীয়ান হও, আমাদের মুক্ত পিতৃভূমি,
ভাই ভাই জাতিদের যুগ যুগান্তরের মিলন,
পূর্বপুরুষদের দেওয়া জনগণের প্রজ্ঞা!
মহীয়ান হও, দেশ! আমরা তোমাকে নিয়ে গর্বিত!
নিরপেক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তির জন্য পাঠ্য সংশোধন
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ লিঙ্গ সমতা এবং আদিবাসীদের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটাতে তাদের জাতীয় সংগীতের কথা পরিবর্তন করেছে:
অস্ট্রিয়া (২০১২): “ল্যান্ড ডের বার্গে, ল্যান্ড আম স্ট্রমে” গানটিতে “হাইমাট বিস্ট দু গ্রোসার সোনে” (মহান ছেলেদের দেশ) লাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন করে “হাইমাট গ্রোসার তখতার উন্ড সোনে” (মহান মেয়ে ও ছেলেদের দেশ) করা হয়। কানাডা (২০১৮): কানাডীয় পার্লামেন্ট লিঙ্গ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে “ও কানাডা” গানের দ্বিতীয় লাইনটি “আওয়ার হোম অ্যান্ড নেটিভ ল্যান্ড” পরিবর্তন করে ” ট্রু প্যাট্রিয়ট লাভ ইন অল অব আস কমান্ড” করে। অস্ট্রেলিয়া (২০২১): ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের আগে হাজার হাজার বছরের আদিবাসী ইতিহাসকে স্বীকৃতি দিতে “অ্যাডভান্স অস্ট্রেলিয়া ফেয়ার” গানের দ্বিতীয় লাইনটি “ফর উই আর ইয়ং অ্যান্ড ফ্রি” থেকে পরিবর্তন করে “ফর উই আর ওয়ান অ্যান্ড ফ্রি” করা হয়।
উরুগুয়ের জাতীয় সঙ্গীত: “Himno Nacional de Uruguay” (প্রথম স্তবক)
মূল স্প্যানিশ রূপ:
Orientales, la Patria o la Tumba!
Libertad o con gloria morir!
Es el voto que el alma pronuncia,
Y que heroicos sabremos cumplir!
বাংলা অনুবাদ:
হে উরুগুয়েবাসী, মাতৃভূমি অথবা কবর!
স্বাধীনতা, নয়তো গৌরবের সাথে মৃত্যু!
এটাই সেই শপথ যা আমাদের আত্মা উচ্চারণ করে,
আর বীরত্বের সাথে আমরা তা পূরণ করব!
উগান্ডার জাতীয় সঙ্গীত: “Oh Uganda, Land of Beauty”
Oh Uganda! may God uphold thee,
We lay our future in thy hand.
United, free, for liberty
Together we’ll always stand.
বাংলা অনুবাদ:
ওহ উগান্ডা! ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করুন,
আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ তোমার হাতে সঁপে দিই।
ঐক্যবদ্ধ, মুক্ত, স্বাধীনতার জন্য
একসাথে আমরা সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকব।
অস্ট্রিয়ার জাতীয় সঙ্গীত: “Land der Berge, Land am Strome” (প্রথম স্তবক)
মূল জার্মান রূপ:
Land der Berge, Land am Strome,
Land der Äcker, Land der Dome,
Land der Hämmer zukunftsreich!
Heimat großer Töchter und Söhne,
Volk begnadet für das Schöne,
Vielgerühmtes Österreich,
Vielgerühmtes Österreich!
বাংলা অনুবাদ:
পাহাড়ের দেশ, নদীর ধারের দেশ,
ফসলি জমির দেশ, ক্যাথেড্রালের দেশ,
হাতুড়ির দেশ (শিল্পের দেশ), উজ্জ্বল ভবিষ্যতের!
মহান কন্যা ও পুত্রদের গৃহ,
সৌন্দর্যে ধন্য এক জাতি,
বহুল প্রশংসিত অস্ট্রিয়া,
বহুল প্রশংসিত অস্ট্রিয়া!
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সঙ্গীত: “Advance Australia Fair” (প্রথম স্তবক)
Australians all let us rejoice,
For we are one and free;
We’ve golden soil and wealth for toil;
Our home is girt by sea;
Our land abounds in nature’s gifts
Of beauty rich and rare;
In history’s page, let every stage
Advance Australia Fair.
In joyful strains then let us sing,
Advance Australia Fair.
বাংলা অনুবাদ:
এসো অস্ট্রেলিয়ানরা, আমরা সবাই আনন্দ করি,
কারণ আমরা এক এবং মুক্ত;
আমাদের আছে সোনালী মাটি আর কঠোর পরিশ্রমের সম্পদ;
আমাদের ঘর সমুদ্রে ঘেরা;
আমাদের দেশ ভরপুর প্রকৃতির অনন্য
আর ধনী সৌন্দর্য্যের উপহারে;
ইতিহাসের পাতায়, প্রতিটি ধাপে,
এগিয়ে যাক সুন্দর অস্ট্রেলিয়া।
আনন্দমুখর সুরে তবে গান গাই,
এগিয়ে যাক সুন্দর অস্ট্রেলিয়া।
নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সঙ্গীত: “Het Wilhelmus” (প্রথম স্তবক)-মূল ডাচ রূপ:
Wilhelm us van Nassouwe
ben ik, van Duitsen bloed,
den vaderland getrouwe
blijf ik tot in den dood.
Een Prinse van Oranje
ben ik, vrij onverveerd,
den Koning van Hispanje
heb ik altijd geëerd.
বাংলা অনুবাদ:
নাসাউয়ের উইলিয়াম
আমি, জার্মান রক্তের সন্তান,
মাতৃভূমির প্রতি বিশ্বস্ত
আমি থাকব মৃত্যু পর্যন্ত।
অরেঞ্জের একজন রাজপুত্র
আমি, মুক্ত ও নির্ভীক,
স্পেনের রাজাকে
আমি সর্বদা সম্মান জানিয়েছি।
পৃথিবীর সমস্ত ধ্বনি প্রতীকের মধ্যে জাতীয় সংগীত অন্যতম শক্তিশালী। কলকাতায় শাস্ত্রীয় রাগের সুর বাজানো হোক, প্যারিসে ব্রাস ব্যান্ডের মার্চিং হোক, কিংবা জোহানেসবার্গে বহুভাষিক গান গাওয়া হোক—বিশ্বজুড়ে নাগরিকরা আনুগত্য প্রকাশ করতে, যৌথ শোক প্রকাশ করতে এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এই সংগীতগুলো ব্যবহার করে। সার্বভৌমিক রাষ্ট্রগুলো বিশ্বায়ন, আঞ্চলিক সংহতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার সাথে সাথে তাদের জাতীয় সংগীতগুলোকেও খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে সঙ্গীত, কবিতা এবং রাজনীতির এই মিলনস্থলটি আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতটা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জন্মের সময় ছিল।
তথ্যসূত্র
Anderson, B. (2006). Imagined communities: Reflections on the origin and spread of nationalism (Revised ed.). Verso.
Billig, M. (1995). Banal nationalism. SAGE Publications.
Boyd, M. (2008). National anthems of the world (11th ed.). Cassell Reference.
Cerulo, K. A. (1993). Symbols and the world system: National anthems and flags. Sociological Forum, 8(2), 243–271. https://doi.org/10.1007/BF01115611
Kuss, M. (Ed.). (2004). Music in Latin America and the Caribbean: An encyclopedic history (Vol. 1). University of Texas Press.
Richards, J. (2001). Imperialism and music: Britain, 1876–1953. Manchester University Press.
Swart, K. W. (1975). The Black Legend and the William the Silent myth. Britain and the Netherlands, 5, 36–53.
Tagore, R. (1911). Bharoto Bhagyo Bidhata [National Anthem Text]. Tattwabodhini Patrika.
Turino, T. (2000). Nationalists, cosmopolitans, and popular music in Zimbabwe. University of Chicago Press.







