September 1, 2026

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অপরাজিত’ ছবির সঙ্গীত বিষয়ে দু-চার কথা

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

 

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অপরাজিত ছবি প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় শারদীয় এক্ষন ১৩৯১ সালে একটি ছোট নিবন্ধ লেখেন তাতে তিনি লিখেছিলেন: ‘পথের পাঁচালীর’ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যের পর আমি ডি.জে. কীমার কোম্পানির বিজ্ঞাপনের আপিসে আর্ট ডিরেক্টরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছবির কাজে নেমে পড়ি। তখনই দ্বিতীয় ছবির বিষয়বস্তু মোটামুটি স্থির হয়ে গেছে। অপু কাহিনীর দ্বিতীয় পর্বের চিত্ররূপ দেওয়া হবে। ছবির প্রথমার্ধে অপুর বেনারস পর্ব থাকবে, এবং ছবি শেষ হবে সর্বজয়ার মৃত্যুর পর অপুর আবার শহরে ফিরে যাওয়া দিয়ে….. আমার একটা ভয় ছিল যেহেতু ‘অপরাজিত’ ছবিতে দুই বয়সের অপু-কে দেখানো হবে, সেহেতু দুটি বিভিন্ন অভিনেতার প্রয়োজন হবে বালক ও কিশোর অপুর চরিত্রে। এ জিনিস ছবিতে বিশ্বাসযোগ্য করা সহজ ব্যাপার নয়… মোট কথা, ‘পথের পাঁচালী’র Unity ‘অপরাজিত’-তে থাকবে না এমন একটা আশঙ্কা ছিল। এ আশঙ্কা যে অমূলক নয় সেটা ছবি দেখেও আমি বুঝেছিলাম। একমাত্র সর্বজয়া চরিত্রই অপরাজিত-কে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই সূত্রে ধরে রাখতে কিছুটা সাহায্য করেছে। অপু-র বালক অবস্থা আর কিশোর অবস্থার মধ্যে একটা ছেদ থেকেই যায়। এটা চিত্রনাট্যে ততটা বোঝা না গেলেও, ছবিতে যায়-কারণ চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে এক অপু গিয়ে আরেক অপু তার স্থান নিচ্ছে….. তবে এটাও আমার মনে হয়েছে যে প্রথমার্ধে কাশীর দৃশ্যগত বৈচিত্র ও তার ব্যবহার ছবিতে যে আকর্ষণ আরোপ করেছে, দ্বিতীয়ার্ধে তার অভাব সত্ত্বেও যেখানে ছবি অনেকাংশে সার্থক সেটা হলো অপু-সর্বজয়া সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ও কেবলমাত্র চিত্রভাষার সাহায্যে নিঃসঙ্গ সর্বজয়ার ট্র্যাজেডির উপস্থাপনা।

 

ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘অপরাজিত’-র প্রথমার্ধের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় । ছবিটি ১৯৫৭ সালে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ (Golden Lion) পুরস্কার অর্জন করেছিল। সত্যজিৎ রায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমাদের কথা’ ও বিভিন্ন লেখায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন:

“ভেনিসে ‘অপরাজিত’ যখন গোল্ডেন লায়ন পেল, তখন আন্তর্জাতিক সমালোচকরা বিশেষ করে প্রশংসা করেছিলেন এর দৃশ্যগত গভীরতা ও ছবির সংযত আবেগের।”

অপরাজিত ছবিটি টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহর সমষ্টি। এই ছবিতে অপু পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং আংশিক ভাবে সর্বজয়া। ‘পথের পাঁচালী’র বিষয়বস্তুকে যেমন অল্প কথায় বোঝানো সম্ভব নয় তেমনি ‘অপরাজিত’ ছবির বিষয়বস্তু কিন্তু সুস্পষ্ট। আর সেটি হচ্ছে অপুর সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে সে অপরাজিত। ফলে বক্তব্যের গভীরতায় ‘অপরাজিত’ ছবি ও পথের পাঁচালীর মতন অতুলনীয়।

যেহেতু অপরাজিত ছবি টুকরো টুকরো ঘটনা প্রবাহে বিভক্ত যার ভিত্তিতে ছবিটিকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করে নিতে পারি যেমন, কাশী, মনসাপোতা এবং কলকাতা-মনসাপোতাপর্ব । এবং এই তিনটি পর্বের প্রেক্ষাপটে আমরা অপুকে দেখি তিনভাবে । তাই এই ছবিতে সঙ্গীতও এসেছে বিভিন্ন ভাবে যদিও কোনো একটি বিশেষ সঙ্গীত বার বার ফিরে এসেছে ঘটনাপ্রবাহ কে এক সূত্রে ধরে রাখার জন্য যেমন করেছে সর্বজয়ার চরিত্রটি ।

‘পথের পাঁচালী’র অভাবনীয় সাফল্য সত্যজিৎ-এর আত্মবিশ্বাসে যোগ করেছিল এক বাড়তি প্রত্যয় । ফলে প্রথম ছবির তুলনায় দ্বিতীয় ছবিটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ । ফলে সত্যজিৎ প্রতিটি বিষয়ের ওপর বেশি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন । ‘পথের পাঁচালী’তে তড়িঘড়ি করে সঙ্গীত সংযোজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন সঙ্গীত-পরিচালক রবিশঙ্করের ব্যস্ততার কারণে । অপরাজিত ছবির সময় রবিশঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগের প্রশস্ত হয়েছিল অনেকটাই । ফলে ‘পথের পাঁচালী’তে যেমন একটা সরল সাদামাটা-একমুখীন বা সরল রৈখিক সঙ্গীত ছিল অপরাজিত ছবিতে সঙ্গীত অনেক জটিল যার প্রমাণ মেলে প্রথম থেকেই । ছবির টাইটেল মিউজিকেই রয়েছে এই জটিলতার সঙ্কেত । রবিশঙ্করের অর্কেস্ট্রেশনের অনুরাগী ছিলেন সত্যজিৎ । এই ছবির টাইটেল মিউজিকে অর্কেস্ট্রেশন বা বাদ্য বৃন্দের পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন ছবিটির বিষয়বস্তু বা থিম ধরে রাখার চেষ্টা করেছে । দুমিনিট কুড়ি সেকেন্ডের এই সঙ্গীত বেশ কয়েকটি পর্যায়ে বিন্যস্ত । সঙ্গীতটি প্রচলিত সকালের রাগ ‘ভাটিয়ারের’ ওপর রচিত । কিন্তু কেন রাগ ভাটিয়ার? কারণ ভাটিয়ার রাগ কেদার ও মারোয়ার মিশ্রণে তৈরি । কিছু কিছু জায়গায় মাণ্ড রাগের ছোঁয়া বা আভাস পাওয়া যায় । কেদার বা মারোয়া গম্ভীর রাগ হলেও দুটি রাগের রূপ ও চরিত্র আলাদা । কেদারায় কোমল মধ্যম (শুদ্ধ মধ্যম) ও তীব্র মধ্যম ও পঞ্চমের প্রয়োগ হয় । মারোয়াতে কেবল তীব্র মধ্যমের ব্যবহার হয় । তীব্র মধ্যমের ভেতর একটা তীক্ষ্ণ ভাব আছে সেটা যখন কোমল মধ্যম এবং পঞ্চমের সঙ্গে মেলে তখন সেই তীক্ষ্ণতাটা কেটে যায়, একটা নরম ভাবের উদয় হয় । যেহেতু ভাটিয়ার রাগে এই সব কটা স্বরই লাগে । ফলে একটা ছায়া মাখা সুরের সৃষ্টি হয় । তাছাড়া ভাটিয়ার রাগের চলন বক্র ও জটিল যা এই ছবির একটা প্রধান উপাদান । ভাটিয়ার রাগের চলন হলো সমগপক্ষধস-ঋনধ পধমপগপ গঋস । আরোহণে রাগটা লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে আর তার সঙ্গে অপু-র জীবনের ঘটনা প্রবাহের মিল আছে ।

সঙ্গীতায়োজন ও প্রযুক্তিগত দিক:  পণ্ডিত রবিশঙ্কর ‘অপরাজিত’ ছবির আবহ সঙ্গীত রেকর্ড করেছিলেন কলকাতার টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ গ্রন্থে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সুরসৃষ্টি ও সিনেমার মেজাজের মেলবন্ধন সম্পর্কে লিখেছেন:

“চলচ্চিত্রের সুর রূপায়ণে রবিশঙ্করের মতো প্রতিভার স্পর্শ ছবিটিকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। দৃশ্যের অন্তর্নিহিত মেজাজকে সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর ছিল।”

আবহ সঙ্গীত শুরু হচ্ছে পাখোয়াজ এ একটা রেলা বা রোলিং দিয়ে । সেটার রেশ কাটতে না কাটতেই বাঁশিতে ভাটিয়ার রাগের একটা বিস্তার পেছনে তবলা ও যন্ত্রের একটা সমর্থন যাতে হালকা করে সানাই ও আছে । এই জায়গার সঙ্গীতে অজানা পরিবেশে নতুন ঘটনা প্রবাহের মুখোমুখি হওয়ার একটা প্রস্তুতিও যেন মিশে আছে । এরপর শুরু হচ্ছে বাঁশি ও সেতারের যুগলবন্দিতে ভাটিয়ার এর বিস্তার । বাঁশি মনে করিয়ে দেয় হরিহর পরিবারের নিশ্চিন্দিপুরের সুবাস, সেতার প্রাণচাঞ্চল্যের । সুরটি সাত মাত্রায় বিভক্ত । যেহেতু সঙ্গীতটা ট্রেন চলার দৃশ্যের ওপর ফেলা হয়েছে ফলে, ট্রেনের গতির সঙ্গে সুর ও ছন্দও বেড়েছে । যার ভেতর ভোরের বা নতুন আশার সংকেত আবার একটা অন্তহীন বিষণ্ণতার ভাবও ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে । গতি বৃদ্ধিকে মাথায় রেখে সেতারের লয়কেও বাড়ানো হয়েছে ঝালার মাধ্যমে । এই জায়গায় রবিশঙ্কর নিপুণ ভাবে তীব্র ঋষভ (শুদ্ধ রে) এর ব্যবহার করে মাণ্ড রাগের একটা ছায়া এনেছেন যেটা একটা নরম মিষ্টি পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে । পুরো টাইটেল মিউজিকটা মূলতঃ স… ম/পধপম/প গ/প গঋস/ এই স্বর সমষ্টির ওপর ভিত্তি করে বেজেছে ।

টাইটেল মিউজিকে তৃতীয় পর্যায়ে মিশেছে তবলা তরঙ্গ বাঁশির সাথে অপুর চোখে কৌতূহল, ভয়, নতুন কিছু দেখবার আগ্রহ আবার সর্বজয়ার মনে আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব-সত্যিই দিন বদলাবে নাকি আবার জড়িয়ে পড়তে হবে নতুন সমস্যার জালে আবার হরিহরের মনে করছে এবার সুদিন আসবে । বিভিন্ন সুরে বাঁধা তবলার চাঁটি বাঁশির সঙ্গে পারম্পর্য রেখে রেখে ছুঁয়ে দিতে চায় এই বিভিন্ন সুরের চিন্তা তরঙ্গ । টাইটেল মিউজিক শেষ হয় বাঁশি, তবলাতরঙ্গ সেতার তার বেহালা, সানাই ও বাদ্যবৃন্দের এক সম্মেলনের । যেহেতু সহজ সরল অনাড়ম্বর গ্রামের জীবন থেকে কাশীর জনবহুল ভিড়ে নানা জটিলতা প্রকাশ করার জন্য তাই আবহ সঙ্গীতে কোনো একটি বিশেষ যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে তার বদলে রূপ পায় ঐকতান বাদনে ।

এই টাইটেল মিউজিকে বা আবহ সঙ্গীতে নানান ভারতীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করে রবিশঙ্কর দারুণ অর্থবহ করে তুলেছেন । পাখোয়াজ শুনলেই মনে হয় যেন সময় এগিয়ে চলেছে, পাখোয়াজ কালের প্রতীক । সেতারে প্রাণচাঞ্চল্যের একটি ব্যক্তিগত স্পর্শ বাঁশি গ্রামীন জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয় । তাই এই প্রসঙ্গে রবিশঙ্কর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ‘ভারতীয় সঙ্গীতে যে কোনো তাল বাদ্যই তো টাইমের প্রতীক । তাই পাখোয়াজ ও তাল সামনে নিয়ত আবর্তিত চক্র । সেতারের মূর্ছনায় তাই প্রাণের উচ্ছ্বাস, বাঁশিতে গ্রামীন জীবনের হাতছানি । এইভাবে প্রত্যেক যন্ত্রের ধ্বনিতে বিশিষ্টতা আছে আর বিশেষত্ব আছে বলেই এক একটা যন্ত্র শুনলে একএকধরণের কথা মনে এসে যায় । আলাদা আলাদা যন্ত্র আলাদা আলাদা ভাবনার জন্ম দেয় । …. তবে একটা ব্যাপারে আমাদের ভাগ্য যে খুব ভালো ছিল সেটা মানতেই হবে । যন্ত্রীরা সবাই নিজের বাজনায় এতই দক্ষ ছিলেন যে রেকর্ডিংএর সময় কাজটা খুব সহজে হয়েগিয়ে ছিল । যেমন দক্ষিণা মোহনের তারসানাই, অলোকনাথের বাঁশি শিশির শোভনের পাখোয়াজ…. (মুখোমুখি রবিশঙ্কর, অতনু চক্রবর্তী, প্রতিভাস, ২০১২, পৃ ৯২)’ ।

কম বেশি মিলিয়ে অপরাজিত ছবিতে প্রায় সাতচল্লিশটি দৃশ্যে সঙ্গীতের ব্যবহার আছে হালকা গান সহ যে গুলোর সময়সীমা খুব বেশি নয় সেই সব দৃশ্যে রবিশঙ্কর বিভিন্ন দৃশ্যে বিভিন্ন রকম যন্ত্রে যে কটি রাগ ব্যবহার করেছেন সেগুলো হল, মারোয়া, ভাটিয়ার ললিত ও পটদীপ । কাকতালীয় ভাবে মারোয়ায় তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ ভাটিয়ারে ও ললিতে কোমল ও তীব্র মধ্যমের ব্যবহার দৃশ্য ভিন্ন হলেও একটা পারষ্পরিকতা পরিষ্কার বজায় রেখেছে । ‘কাকতালীয়ভাবে’ কথাটি ব্যবহার করলাম খানিকটা আন্দাজে কারন রবিশঙ্কর তাঁর কোনো সাক্ষাৎকার বা লেখায় এই নিয়ে বিশদে কিছু বলেননি তবে একটা কথা বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে: ‘আর একটা জরুরি কথা হলো, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে দেখেছি কোনো ভাবনা বা দৃশ্য নিয়ে মিউজিক করতে গিয়ে ইন্সট্যান্ট যে বাজনাটা আসে, সেটাই সেরা হয়।’ (তদেব, পৃ ৯১) ।

সত্যজিৎ এর ছবিতে মৃত্যুদৃশ্যের সঙ্গীত নিয়ে আলাদা-ভাবে আলোচনা করলে তার সুরশৈলীর অসাধারণত্ব প্রমাণ হবে । জীবনের প্রগতির পাশাপাশি অনিবার্যভাবেই বারংবার মৃত্যু এসে হানা দিয়েছে ‘অপুট্রিলজির’ বিস্তৃত ক্যানভাসে । যেমন ইন্দির ঠাকুরনের মৃত্যু ছড়িয়ে দেয় একধরনের দার্শনিক বিষণ্ণতা, অথচ দুর্গার মৃত্যু এক মর্মবিদারক শূন্যতা, কাঁটার মতো তা বেঁধে থাকে বুকে হরিহরের মৃত্যু কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় । সর্বজয়ার মৃত্যু অসহায় দুঃখবোধের আবহ গড়ে দেয় । এই সব দৃশ্যের জন্য রবিশঙ্কর, তারসানাই, বাঁশি, সরোদ এইসব যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন । দুর্গার আকস্মিক ওunexpected মৃত্যু ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন । ওই দৃশ্যে তারসানাইতে বাজানো রাগ পটদীপ সিনেমা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে । ঐ একই সুর আবার রবিশঙ্কর নাকি সত্যজিৎ ব্যবহার করেছিলেন অপরাজিতর সেই দৃশ্যে যেখানে অপু সর্বজয়াকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘মা পয়সা নেই?’ এখানে ‘নাকি’ শব্দটা ব্যবহার করলাম এই কারণে যে অপরাজিত ছবির বেশ কিছু জায়গায় ‘পথের পাঁচালী’ ছবির সঙ্গীতের পুনঃব্যবহার হয়েছে । যেমন সর্বজয়া যখন অপু-কে নিয়ে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরছে তখন ‘পথের পাঁচালী’র বাঁশিতে বাজানো থিম মিউজিকটা বেজে উঠছে । [পধপসনপধ] মধপ, মপগ, সর পমপগ সরস স-এই সুর তুলে ধরে অথবা তুলে আনে সেখানকার পাত্র-পাত্রীদের বা সংশ্লিস্ট স্মৃতি মেদুরতার মুহূর্ত পরিচালক এই সঙ্গীতে সেই পটভূমির খেইটা ধরে দেন ।

এই প্রসঙ্গে রবিশঙ্কর তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন: পুরোনো সুরকে ফিরিয়ে আনার পেছনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না । ছবির নানা দৃশ্য দেখে দেখে আলাদা আলাদা ছোট ছোট সঙ্গীত রেকর্ড করে দেওয়ার পর পরিচালক তাঁর ইচ্ছেমতো সেই সুরকে ব্যবহার করতে পারেন।…. ছবির চূড়ান্ত বা ফিনিশিং পর্যায়ে কোথাও কোথাও ফাঁক-ফোকর দেখা দিতে পারে । তখন তো এটা করে নিতেই হয় । প্রথমত, আমি হাতের কাছে থাকতাম না । দ্বিতীয়ত, সত্যজিৎ বাবুর সঙ্গীত বোধ ছিল গভীর । কাজেই, তেমন সংযোজন করে নেওয়া তার পক্ষে কোনো অসাধ্য কাজ নয়।’ (তদেব পৃ ৯৫-৯৬) ।

অপরাজিত তে হরিহরের মৃত্যু সময় রবিশঙ্কর বাঁশের ছোট বাঁশিতে তীক্ষ্ম স্বরপ্রয়োগ করেছেন । তারসপ্তকের পঞ্চম স্বর থেকে অনেকটা ক্রোমাটিক ক্রমে বাঁশির সুর থামতে থামতে, নামতে নামতে এসে দাঁড়ায় ষড়জে এক্ষেত্রে দুর্গার মৃত্যুর সময়ে তারসানাইতে বাজানো পটদীপ অনায়াসে ব্যবহার করা যেত । কিন্তু দুটো মৃত্যু ছিল দুরকম । দুর্গার মৃত্যুর খবর হরিহরকে সরাসরি জানাতে পারার গুমরানি ও অব্যক্ত যন্ত্রণাতে আঘাতের তীব্রতা আছে সরাসরি ব্যবহার না করে কিন্তু হরিহরের মৃত্যু দুর্গার মৃত্যুর মতন অপ্রত্যাশিত নয় । হরিহরের বয়স ও তার ক্রমিক অসুস্থতা সর্বজয়াকে ভিতরে ভেতরে এই ঘটনার জন্য সামান্য হলেও প্রস্তুতির অবকাশ দিয়েছে । তাই বাঁশিতে করুণসুর বা প্রচলিত সারেঙ্গী, বেহালা বা চেলো যন্ত্র ব্যবহার করে রবিশঙ্কর তারসানাই ব্যবহার করে তাঁর সৃজনশীলতার এক অমোঘ পরিচয় দিয়েছেন ।

তাঁর ভাষায়:’ তারসানাইয়ের আওয়াজের মধ্যে তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করার একটা ক্ষমতা আছে । আমার মনে হয়েছিল, ওই তীক্ষ্ণতাই দর্শকের হৃদয়কে হঠাৎ কাঁদিয়ে দেবে; সন্তানের মৃত্যু যে মা বাবার কাছে কতটা তীব্র যন্ত্রণার কারণ হতে পারে-সেই সত্যটাকেই দর্শকদের অনুভূতির মধ্যে নিয়ে আসবো । বেহালা বা সারেঙ্গীতে ওই তীক্ষ্ণতা একটু কম।’ (তদেব পৃঃ ৯২-৯৩) ।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গীত ভাবনা:  হরিহরের মৃত্যুর দৃশ্যে কাশীর ঘাটে ডানা ঝাপটে ওঠা পায়রাদের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যের সাথে শাস্ত্রীয় সুরের যে করুণ আবহ তৈরি করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘Deep Focus’ প্রবন্ধ সংকলনে লিখেছেন:

“In film making, the visual and the aural are inextricably linked. Music does not merely accompany the image; it highlights the emotional truth that words fail to express.” > (অর্থ: চলচ্চিত্রে দৃশ্য ও শ্রব্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সঙ্গীত কেবল দৃশ্যের সঙ্গী নয়, এটি সেই আবেগঘন সত্যকে ফুটিয়ে তোলে যা শব্দ ব্যক্ত করতে ব্যর্থ হয়।)

আগে জানিয়েছি ‘অপরাজিত’ ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে বিভিন্ন সঙ্গীতের ব্যবহার হয়েছে তার বেশীর ভাগটাই স্বল্প সময়ের । প্রধান যে সঙ্গীতগুলি অর্থাৎ কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী সেগুলোকে নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করলাম । সত্যজিৎবাবু বা রবিশঙ্করজী তাঁদের কোনো লেখা বা সাক্ষাৎকারে অপুট্রিলজির সঙ্গীত নির্মাণ সম্বন্ধে খুব বিশদে কিছু আলোচনা করেননি ফলে বারবার ছবি দেখে এবং যতটুকু প্রাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে এই লেখা । আজকের দর্শকরা এনাদের কাজকে বিশ্লেষণ করবেন নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ দিয়ে । সেই নতুন দৃষ্টিকোণ আসলে নতুন প্রজন্মের অন্যরকম মেধার ফল । ওঁনাদের পুরোনো কাজ থেকে নানারকম নতুন অর্থ, নতুন ব্যঞ্জনা আবিষ্কার করা সম্ভব । মহৎ শিল্পের বেলায় এটা ঘটবে । ফলে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ চলতেই থাকবে ।

সমালোচকদের মন্তব্য:  বিখ্যাত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক রবিন উড (Robin Wood) তাঁর ‘The Apu Trilogy’ গ্রন্থে অপরাজিত-র আবহ সঙ্গীত ও সম্পাদনার প্রশংসা করে লিখেছিলেন:

“The tragic depth of Aparajito is immensely heightened by Ravi Shankar’s score, which acts as a silent mirror to Sarbajaya’s loneliness and Apu’s inevitable growth.”

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়

তথ্যসূত্রসমূহ (References)

  1. ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি ও ‘আমাদের কথা’:

রায়, সত্যজিৎ। আমাদের কথা। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

Aparajito (1956) – Awards & Honors, Venice Film Festival Archives (Golden Lion Award, 1957).

টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও ও রবিশঙ্করের সুরকৌশল:

রায়, সত্যজিৎ। বিষয় চলচ্চিত্র। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৭৬)।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাক্ষাৎকার:

চক্রবর্তী, অতনু (সম্পাদিত)। মুখোমুখি রবিশঙ্কর। প্রতিভাস প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১২, পৃষ্ঠা: ৯১–৯৬।

চলচ্চিত্রে দৃশ্য ও শ্রব্যের মেলবন্ধন (Deep Focus):

Ray, Satyajit. Deep Focus: Reflections on Cinema (Edited by Sandip Ray). HarperCollins India, 2011.

অপরাজিত চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ও বিশ্ব সমালোচনা:

Wood, Robin. The Apu Trilogy. Praeger Publishers / Movie Paperbacks, 1971.

Banerjee, Surabhi. Satyajit Ray: Beyond the Frame. Allied Publishers, 1996.