Women, Ritual, and Emotion in the Muslim Wedding Songs of Bengal

Dr. Srabani Sen

                               Associate Professor, Department of Music, Tarakeswar Degree College

e-mail-dr.ssen8693 @gmail.com  Mobile no- 6290855102

Muslim wedding songs Particularly in Bengal Islamic devotion with local regional culture.These Songs are performed by women and serve as a medium for preserving communal identity, expressing emotions and documenting social life.The influence of Bengali culture has shaped a distinct tradition of folk wedding songs known as Muslim biyer geet.The lyrics of the songs cover the emotional experiences like joy, anxity and the sorrow of a daughter leaving her home.The songs are viewed as a form of cultural witness that demonstrates the creative strength and adaptation of the community.

ঐতিহ্যবাহী মুসলিম বিয়ের গীত্

বাঙালি সংস্কৃতিতে লোকসঙ্গীতের যে কটি ধারা লোকসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে তার মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিয়ের গীত অন্যতম। এসব গীত লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। দীর্ঘকাল ধরে প্রায় সব মুসলিম পরিবারের বিভিন্ন উৎসব-আনন্দে সঙ্গীত সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বস্তুত পক্ষে বিবাহের সূচনা থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত স্ত্রী আচার অনুষ্ঠিত হয় আর তার অঙ্গস্বরূপ বিষয়ানুরূপ সঙ্গীত গীত হয়। মুসলমান সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং বলা চলে মুসলমান সমাজে বিবাহ গীতের চল বেশী। এই বিয়ের গান গুলোতে শুধু কিছু লোকাচার সম্পর্কে আমাদের ধারনা হয় তা নয়, গোটা মুসলিম জীবন ও সমাজ আমাদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বিবাহের অনুষঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা রীতি ও লোকাচার । বিশেষ করে বিবাহে নারীদের একটি বিশেষ ভূমিকা পালনে সক্রিয় হতে দেখা যায়- সেটি হল গান।  

ঐতিহ্যগতভাবে  বাঙালি মুসলিম পরিবারে, পরিবারের কর্তা প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং ‘বিয়ে গাউনি’ সম্প্রদায়ের মহিলাদের বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এবং গীত পরিবেশন করার জন্য আমন্ত্রন জানাতেন। তাদের পরিবেশনার মধ্যে গান, নাচ এবং হাস্যরসাত্মক অভিনয় (কাপ) অন্তর্ভুক্ত থাকত। এই ঐতিহ্যের একমাত্র অনুশীলনকারী হলেন মহিলারাই। এগুলো আংশিকভাবে সাংস্কৃতিক আচারের গান ছিল কিন্তু  গানগুলোর বিষয়বস্তু শুধু বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি একজন সাধারণ বাঙালি মুসলিম মহিলার দৈনন্দিন বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত।  মৌখিকভাবে রচিত এই গানগুলো একটা বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট উন্মোচন করে, যা পরিবার ও সম্প্রদায়ের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ একজন মহিলার মনে প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী আচারটি মূলত পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামে প্রচলিত আছে।

বিবাহে দুধরনের আচার মূলত লক্ষ্য করা যায় – একটি  শাস্ত্রীয় ও অপরটি লৌকিক। আচারটি  সম্পন্ন হয় ব্রাহ্মণ পুরোহিত দ্বারা, সীমাবদ্ধ থাকে নারীদের মধ্যে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে লৌকিক আচারটিই বিবাহের অঙ্গরূপে গৃহীত হয়। বিবাহের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ যেমন লোকাচার, স্ত্রী আচার তেমনি গান। লৌকিক  বিবাহাচার সংগীতসহ অনুসৃত হয়। মেয়েলি গীতই স্ত্রী আচারের মন্ত্র স্বরূপ।  মাড়োয়ার গীত, ফোরোন ডুসর  গীত্, উমালী পড়ার গীত্, মেহেন্দী তোলার গীত্,  হলদি কোটা, কোনে বিদায়, বর-কনের কথোপকথন, বরের ক্ষৌরিকর্মের সময়কার গীত  – এরকম নানা ধরণের গান মুসলিম বিবাহের অনিবার্য অঙ্গ। বিবাহে স্ত্রী-আচাররূপে এসব গান গাওয়া হয়, তা শুধু আনন্দ বিনোদনের সামগ্রী নয় – সে গান জীবনেরই অঙ্গস্বরূপ।  বিবাহের পূর্বে ধান ভেঙ্গে চাল তৈরি করার রীতি আছে – ওই চাল দিয়ে ক্ষীর প্রস্তুত করে ছেলে কিংবা মেয়েকে খাওয়ানোর অনুষ্ঠানে যে গানটি গাওয়া হয়-

       কুসুম কাঠের ঢেঁকি বানানো রে

ধুতুরা কাঠের দুটি পায়া

           ছ’কুড়ি ছটি মশকুল কাঠের থুপানা

কুলোর আগায় থুইয়ো।

               এ গায়ের হালসানা যায় সরান বইয়ে রে

কুলোর ঝনঝ্নি শুইনা

   আগে যায় চাল বাজানেরা

         পিছনে যায় বাছার বিহি। ১

ছেলের খুবরো খাওয়ার ক্ষীরের গান-

                   মায়ে রান্ধিল ক্ষীর বাপে তো ঢালি দিল দুধরে,

 খাওরে আনন্দবাসীর ক্ষীর।

 এতরাতে কার বা বিহি যায়

       হাওয়ালে হওয়ালে বাঁশীরে বাজায়

                             দাদীকে সাজাতে দাদাকে বোঝাতে এত রাতি হয় ।…….২

     এই বিয়ের গান একান্তভাবেই পরম্পরা ও ঐতিহ্যাশ্রিত যা আমাদের লোকসংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ। বঙ্গ-সংস্কৃতিতে বিবাহে মেয়েদের গানের চল সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের সমাজেই কমবেশি স্বীকৃত। মুসলিম  বিবাহে যারা গানের ভূমিকা পালন করে, তারা মহিলা। অনেক ক্ষেত্রে গানগুলো কাব্যগুণ বিবর্জিত। পুনরাবৃত্তি গান গুলোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কথোপকথনের ভঙ্গি অনেক গানেই পাওয়া যায়। কিন্তু মেহেন্দি, গাত্রহরিদ্রা, প্রভৃতির ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদেরই বড় ভূমিকা থাকে। 

 বাঙালি মুসলমান নারী  সমাজ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে  থেকেও জীবনের প্রাণময়তাকে ধরে রখেছেন। তাদের গ্রামীণ জীবনে পুরুষের আরোপিত রক্ষণশীলতা ও বাধা-বিপত্তিকে নস্যাৎ করেছেন। বিয়ের আসরে শাস্ত্রীয় ক্রিয়া কাণ্ডে নারীর ভূমিকা না থাকলেও বিয়ের লোকাচারকে কেন্দ্র করে  মুসলমান নারী তার হৃদয়ের উচ্ছ্বাসকে যেমন প্রবাহিত নদীর মতো প্রকাশ করেছেন, তেমনি বিয়ের গানের মাধ্যমে গীতিময়তাকে অন্যমাত্রায় উত্তীর্ণ করেছেন। বিয়ের গান মুসলিম মেয়েদের জীবনের গান। মুসলিম সমাজের জীবন ও যাপনের গান, জীবন থেকে জীবনে  উত্তরণের গান। এর মধ্যে দিয়ে নারী মনের সমস্ত সুখ-দুঃখ বেদনা, যন্ত্রনা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। হিন্দুদেরও বিয়ের গান একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল, আজ অসমের বরাক উপত্যকা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে তার চল খুবই সীমিত। বাঙালি মুসলমান নারী কিন্তু বিয়ের গানের সেই মহান ঐতিহ্যকে আজও বহমান রেখেছে।

ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিবাহে গান যেমন একটি প্রধান বিষয়, মুসলিম বিবাহের গান একটি বিশিষ্ট বিষয় হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। তবে মুসলিম ধর্মীয় গ্রন্থ হাদিসেও বিয়ের গানের প্রসঙ্গ রয়েছে। হাদিসের নির্দেশানুসারে বিবাহের রীতিসম্মত গান গাওয়া কোন দোষের বিষয় নয়।, মুসলিম বিবাহের আসরে বয়স্ক মহিলারা যে গান পরিবেশন করেন, তার মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অনুশীলন নেই, বরং ঐতিহ্য পরম্পরাকে স্বীকার করেই অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা যেমন গান বাঁধেন, তেমন নিজেরাই সেই গান করেন।

 মুসলিম বিবাহের গান মূলত অন্দরমহলের গান। এগানের কুশীলব মহিলারাই, তারাই গীতিকার, তারাই সুরকার, তারাই দর্শক, তারাই শ্রোতা। তাদের গানের মূল বিষয় নারীজীবনের ভূত- ভবিষ্যৎকে অবলম্বন করে। মুসলিম বিবাহের গানকে ‘বিয়েরগীত’ বা ‘আলসতলারগীত’বলা হয়। গানের বিষয় ঘরের ছেলে মেয়ে অর্থাৎ বরকনের প্রসঙ্গ থাকে গানের মধ্যে। অনেক গানে যেমন ধর্মীয় মাহাত্ম্যসূচক বিষয় রয়েছে তেমনি সামাজিক বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। বিবাহের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গানগুলো গাওয়া হয়। যেমন- গাত্রহরিদ্রা, ক্ষীর খিলানি, বাসর ঘর, কন্যা বিদায়, বধূবরণ, ফুলশয্যা, অষ্টমঙ্গলা, হলদিমুখ ধোয়া, কন্যা বিরহ, মাতা-পিতার বিরহের গান ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও মুসলিম বিবাহের গানে রাজনীতি, আর্থ- সমাজ ব্যবস্থাসহ স্থানীয় ঘটনা, রটনা, রংতামাশা- রঙ্গ, প্রেম-পিরীতি, মান-অভিমান, বঞ্চনা- গঞ্জনার মত বিষয়ও লক্ষ্য করা যায়।

 উদাহরণ স্বরূপ বিয়ে করতে যাওয়ার পূর্বের একটি গান-

ফুলেরই আচি ফুলেরই পাচী

    ফুলেই সাজিয়া দেব বালির সিন্দুর

        মকমক ঝমঝম গিলাস ভরে পানি। ৩

বিয়ের দিনে ‘দামান’ অর্থাৎ বর আসার আগের মুহূর্তে পাড়া-প্রতিবেশী ও কন্যার মায়ের কথোপকথন ধর পড়ে গানে –

কি কর দুলাপ্যের মা লো বিভাবনায় বসিয়া

       আসত্যাছে বেটির দামান ফুলপাগড়ি উড়ায়া না রে।

পাড়া-প্রতিবেশীদের কথার প্রতিউত্তরে কন্যার মা জবাব দেয়-

   আসুক আসুক বেটির দামান কিছুর চিন্তা নাই রে,

      আমার দরজায় বিছায়া থুইছি কামরাঙা পার্টি না রে।

সেই ঘরেতে লাগায়া থুইছি মোমের সহস্র বাতি,

    বাইরবাড়ি বান্দিয়া থুইছি গজমতি হাতি না রে।৪

 এভাবেই নানা কথায় নানা ঢঙে এগিয়ে চলে বিয়ের গীত। আবার অন্য একটি গানে শোনা যায় বর আসার পরে কন্যার মাকে বর দেখার আহ্বান জানিয়ে, বিভিন্ন উপমা প্রয়োগ করে গীত পরিবেশন করা হয়। যেমন-

     কই গেলায় গো কইন্যার মা

দামান দেখো আইয়া

  কইন্যার দাদি যে যাইন

মিষ্টি আতো লইয়া।।

চোখ বালা দামান্দের

টলমল টলমল করে

  আসমানের তারা যেমন

        ঝিলমিল ঝিলমিল করে।।….৫

 গীত্-গাউনির দল রঙ্গ- তামাশায়, গানের সুরে- বলে, শুষ্ক জমিকেও সরেস করে তোলে। ঢোলের আওয়াজ আর খোলা গলার সুরের খেলা আশপাশের সকলকে বুঝিয়ে দেয় উৎসবের এখনো রেশ হয়ে যায়নি।

বরের রূপ বর্ণনার পাশাপাশি বিয়ের পর্বকে কেন্দ্র করে পাওয়া যায় নানা ধরনের গীত। নববধূ আর বরকে নিয়ে নানা হাস্যরসের গানও পাওয়া যায় –

ও কন্যা আতরজান

অত সুন্দর গতরখান

          দুধে আলতা দিয়া করলায় লাল

          বাজে ঢোলক বাজে রে করতাল।।

বিয়া বাড়ি হইচই

  নাচে গায় সখি- সই

       হলদি পিষতে কে লাগাইল ঝাল

          বাজে ঢোলক বাজে রে করতাল।।

হাতে চুড়ি পিন্দিয়া

   ডিজাইন শাড়ি কান্দিয়া

  দুলা মিয়ার ফুলা কেনে গাল

        বাজে ঢোলক বাজে রে করতাল।।….৬

শ্রুতি মধুর এই সব গানের মাধ্যমে অতীতে বিয়ের বর-কন্যাকে বরণ করে নেয়া হোত। এছাড়াও বেশীরভাগ গানই সামাজিক সমস্যা, প্রেম, দুঃখ, হাস্যরস ও চলমান জীবনের নানা কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে।বৃহত্তর মুসলিম সমাজে যুগ যুগ ধরে বিয়ের গীত অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে এসেছে।

বিয়ের গীতের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ভক্তি-প্রেম-নিষ্ঠার কথা। যেমন – আট মঙ্গলার দিনেই গীত্-গাউনিরা ঢোলবাজিয়ে রঙ্গরসের গান গাইতে গাইতে ভক্তি রসের সাগরে ডুবে যায়।

একশো একটি পানে খিলি গো

আমি সাজায়ে ফেলেছি

পানের বাটা লাটাপাটাগো কুনেবালি

আমি গুছোয়ে ফেলেছি।

কেঁদো না কেঁদো না কুনে বালি গো

তোমাকে শাদী করেছি

তোমার আব্বার মত লিয়েই না

       আমার লৌকো ছেড়েছি।।…..৭

আনন্দের সাথে জামাই আপ্যায়নের ব্যবস্থাপনায় রচিত গান-

জামাই বসাতে আনোগা বিছেন ফুলতলা সুজুনী গো

                    নাস্তায় বসিবেন জামাই গো-

নাস্তায় লেগে আনুগা সোন্দকের চিনিরো বাসনো গো

                     নাস্তায় বসিবেন জামাই গো-

বদনা আনো শিলিপ্চি আনো, হাত ধুবার সাবুনো গো

                                 নাস্তায় বসিবেন জামাই গো- …….৮

আরও একটি গানে ফুটে ওঠে জামাইয়ের পাতে ইলিশ মাছ পরিবেশনের দেদার আনন্দ, পরিবারের আভিজাত্য –                    

                               ও মাছ ইলশা রে

               তোর রূপেতে চোখ ধান্দায় রে।। (ধুয়া)

                              ওরে তোর গা ভরা হীরা

   তোরে রাইন্ধতে লাগে বিশ মন জিরা –

                              ও মাছ ইলশা রে

        তোর রূপেতে চোখ ধান্দায় রে।।

                              ওরে তোরে কিসে কাটি

       তোরে কাইটতে লাগে কাঞ্চননগরের বঁটি-

                              ও মাছ ইলশা রে

                       তোর ঘেরানে নাক শুলায় রে।। …..৯

কোন বিশেষ বিষয়বস্তু ধরে গান যেমন হয়, তেমনি যেমন মনে পড়ে তেমন পরিবেশন করেন গীত-গাউনিরা। গানের কোনো সংখ্যা নেই, একের পর এক গান গেয়ে যান তারা স্মৃতি থেকে- স্মরণ থেকে। সুর-তাল-লয় ঠিক রেখে একের পর এক নিরবিচ্ছিন্ন গেয়ে যান এরা বংশ পরম্পরায় শেখা অসংখ্য বিয়ের গীত-

আমি আম গাছিতে দেখে এলাম গাছি ভরা পাতা

রাজার ব্যাটা যায় কোথা?

আমার যে পাড়ায় তার দুশমন আছে

সেই পাড়াতেই বাসা,

রাজার বেটা যায় কোথা?

আমার আলবেট করা চুলের উপর

মানান্ টেরি খাসা

      রাজার ব্যাটা যায় কোথা?…….১০

এমনিভাবে নতুন জামা- কাপড়-ছাতা-জুতো-রুমাল-টুপি ইত্যাদি উপহার দিয়ে ‘হলদি মুখ ধোওয়া’ পর্ব শেষ করে নতুন জামাইকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিদায় দেওয়ার প্রথা। আদরে-আপ্যায়নে, হাসিতে- খুশিতে, ভাবে-ভালবাসায় দিনকতক কাটিয়ে, প্রথাগতভাবে ‘হলদি মুখ ধোওয়া’ নামক বিবাহের অন্তিম লোকাচারটি পালন করার পর নবদম্পতি রওনা হয়ে যায় নিজেদের আপন গৃহে। সেখানে রচিত হবে বিবাহোত্তর জীবনের অন্য এক কথামালা।

 অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক এই সমস্ত গান ধর্মের প্রান্তে এবং সমান্তরালে বয়ে চলে। ধর্মে ভিন্ন হলেও উচ্চ নিম্নবর্গের হিন্দু, আদিবাসীদের মধ্যেও আছে মেয়েলি বিয়ের গান, মেয়েলি আচার। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ইসলামি এবং অন্যান্য বিয়ের গান সংগ্রহ করলে আমরা এক সমন্বয় সংস্কৃতির সন্ধান পাব। ধর্মবিশ্বাসে এবং ধর্মাচরণে বিভিন্নতা থাকলেও যে সংস্কৃতির পরম্পরিত ঐতিহ্যের সমস্ত বাঙালি সমাজিক একটা জায়গায় পরস্পরের পরমাত্মীয়, ধর্মের পার্থক্য সেখানে প্রাচীর গড়ে তোলেনি। এই গানগুলোর মধ্যে যে নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা আছে, তা সৌন্দর্যতত্ত্বের  নিরিখে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই বিয়ের গীতগুলোর মাধ্যমে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার এক নান্দনিকতা প্রকাশিত হয়, যাকে ‘ফোক এস্থেটিক্স’ বা  লৌকিক নন্দনতত্ত্ব বলা চলে। আবার এই বিয়ের গানগুলোর মধ্যে দিয়ে আমাদের বৃহত্তর সমাজের ও পরিবারের বাস্তবতার দিকগুলো প্রতিবিম্বিত হয়েছে সুন্দরভাবে। বিয়ের গীত শুধু বিয়ে সম্পর্কিত কথাবার্তা অনুষঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এসব  গীতের রচয়িতারা  গানের পংক্তিতে সমাজের সকল স্তরের অসঙ্গতি, দুর্ভোগ, ভালো মন্দ, এবং সমাজ বিবর্তনের নানা চিত্রকে তুলে ধরেছেন নিজস্ব ভাষায়। তাই তাদের প্রণীত গীতগুলো হয়ে উঠেছে বাংলা সমাজ-সংস্কৃতির অন্যতম দর্পণ।

তথ্যসূত্র

১।মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-৫২২

২। মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-৫২২

৩। মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-৪

৫।বাংলার লোকসাহিত্য, পৃঃ-৪৭০

৬। মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-১০

৭। বিবাহের লোকাচার, পৃঃ-২০

৮। মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-৭

৯। বিবাহের লোকাচার, পৃঃ-২০

১০। মুসলিম বিয়ের গীত, পৃঃ-৯

১১। বিবাহের লোকাচার, পৃঃ-১২

সহায়ক গ্রন্থ

১। রশীদ রত্না – মুসলিম বিয়ের গীত, পদ্মা-গঙ্গা পাবলিকেশন, কলকাতা ৭০০১০০, প্রথম প্রকাশ- ২৫-এ ডিসেম্বর, ২০২৫

২। সরকার দীনেন্দ্রনাথ-বিবাহের লোকাচার

৩। চক্রবর্তী সুধীর – লোকায়ত বাংলা, কলকাতা ১, ১৯৬৯

৪। চক্রবর্তী চিন্তাহরণ- হিন্দুর আচার অনুষ্ঠান, কলকাতা, ১৯৭৫

৫। চক্রবর্তী বরুণ কুমার –বাংলা লোকসংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস, কলকাতা,২০০৩