বাংলার জনশিক্ষা ও সাক্ষরতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে ক’জন মানুষ আজীবন নিরলস নিষ্ঠা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শক্তি মণ্ডল। তিনি শুধু একজন লেখক বা প্রাবন্ধিক নন, ছিলেন এক সমাজমনস্ক চিন্তক, সংগঠক এবং গণশিক্ষা আন্দোলনের অক্লান্ত কর্মী। আধুনিক সাক্ষরতা আন্দোলনের পথিকৃৎ সত্যেন মৈত্র ও ড. ফুলরেণু গুহ-র উত্তরসূরি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে তিনি জনশিক্ষা আন্দোলনকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন।
১৯৪৮ সালের ১ অক্টোবর মেদিনীপুর-হুগলি-বাঁকুড়া জেলার সীমান্তবর্তী কাদড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শক্তি মণ্ডল ছোটবেলা থেকেই সমাজ ও মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সক্রিয়। গড়বেতা কলেজ এবং পরে মেদিনীপুর কলেজে পড়াশোনার সময় থেকেই জনসেবা ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সায়েন্স কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই তিনি কৃষক ও ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। “লাঙ্গল যার জমি তার” — এই স্লোগানভিত্তিক কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য সত্তরের দশকে তাঁকে বিনা বিচারে কারাবন্দি করা হয়। কিন্তু জেলেও তিনি থেমে থাকেননি; বন্দিদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তুলে সমাজ পরিবর্তনের চেতনা জাগানোর কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর এই আপসহীন মানসিকতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল।
কর্মজীবনে শক্তি মণ্ডলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন জনশিক্ষা সংগঠক। বেঙ্গল সোস্যাল সার্ভিস লিগ-এ যোগদানের পর তাঁর কর্মজীবন নতুন দিশা পায়। বারাসাত-ব্যারাকপুর গ্রামীণ শিক্ষা প্রকল্পে তাঁর দক্ষ পরিকল্পনা ও পরিচালনায় এমন এক মডেল তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে সারা দেশে প্রশংসিত হয়। বয়স্ক শিক্ষা, সাক্ষরতা ও জনশিক্ষাকে তিনি শুধু শিক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে দেখেননি; তিনি একে সামাজিক মুক্তি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করতেন।
শক্তি মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে—ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়, আসাম, সিকিম, ঝাড়খণ্ড প্রভৃতিতে—সাক্ষরতা আন্দোলনের প্রশিক্ষক ও সংগঠকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা “ব্যবহারিক ও আর্থিক সাক্ষরতা প্রকল্প-২০১৫” ছিল সময়োপযোগী ও অত্যন্ত কার্যকরী এক প্রয়াস। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, আর্থিক সচেতনতা ও ব্যবহারিক শিক্ষাও মানুষের জীবনের উন্নয়নের জন্য সমান জরুরি।
একাধারে তিনি ছিলেন প্রখর লেখক ও চিন্তক। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থগুলির মধ্যে “গণ সাক্ষরতা : ধারণা ও রূপায়ণ”, “বয়স্ক শিক্ষা কি ও কেন”, “জনশিক্ষার গান”, “আদর্শ মানুষ বিদ্যাসাগর”, “প্রতিদিনের বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা” প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখায় যেমন সমাজচেতনা ছিল, তেমনি ছিল ইতিহাস, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়। বিভিন্ন সাময়িকী ও পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রায় তিন শতাধিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর জীবন ও আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। নিরক্ষর, প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের উন্নয়নে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিক্ষাই মানুষের মুক্তির প্রধান হাতিয়ার।
২০০৮ সালে “ড. সুশীলা নায়ার লিটারেসি অ্যাওয়ার্ড” প্রাপ্তি তাঁর কাজের জাতীয় স্বীকৃতি এনে দেয়। কিন্তু তাঁর নিজের কথায়, জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মান ছিল সেই সাধারণ মানুষদের ভালোবাসা, যাঁরা তাঁর সাক্ষরতা প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন জীবনবোধ ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিলেন।
২০২১ সালের ৬ মে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কোনও সমাপ্তি নয়; বরং জনশিক্ষা ও মানবমুক্তির আন্দোলনে তাঁর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আগামী প্রজন্মের কর্মীদের পথ দেখাবে দীর্ঘদিন।
শক্তি মণ্ডল ছিলেন এক নীরব বিপ্লবী—যিনি কলম, শিক্ষা ও সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইকে আজীবন এগিয়ে নিয়ে গেছেন।