ভোটের প্রচারে দেওয়াল লিখনের ইতিবৃত্ত ও ভাষা-কৃষ্ণময় দাস

গবেষক, বাংলা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়মেইল-krishnamoydas@gmail.com

Abstract

Language plays a crucial role in politics. Wall writings, posters, songs, and poems used for election campaigns give a new dimension to the Bengali language. The political language demonstrates how short words can be used to construct a sentence effectively. Many regional words are also used in political discourse. These characteristics make political campaigns more appealing to people. The language of contemporary politics is different from that of the past, and in many cases, it crosses the boundaries of decency. In modern times, various mediums of political campaigning, such as wall writings, posters, slogans in processions, and political songs, all feature the use of various satirical words. Politics has taken on a different dimension in contemporary songs and poems. Political parties are constantly busy expressing their grievances against opposing political parties. Through songs and poems, political parties convey their messages to the people. The word choices in these songs and poems are quite striking. The same is true for wall writings. The main objective of this essay is to highlight the continuous use of striking words, satirical attacks, and counter-responses in political campaigns.

Keywords: Wall writing, new words, counter-response, satirical words, protest, awareness

ভূমিকা

আমরা জানি বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। বাঙালির আর পাঁচটা পার্বণের মতো ভোট যেন একটি পার্বণ হয়ে উঠেছে। কথায় আছে বাঙালি একটি হুজুগে জাতি, যেখানেই যাবে সেখানেই হৈ হৈ, রই রই চলতে থাকবে। শোনা যায় রাজনীতি নিয়ে বাঙালি তথা পশ্চিমবঙ্গের মত এত মাতামাতি আর কোথাও নেই। অনেক রাজ্যের কিছু মানুষ আবার এমনও দাবি করেন তারা নাকি কবে ভোট সেটাই জানেন না। আর জানবেনই বা কেমন করে বলুন তারা তো আর পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন না। ভোটের আগের দিন নাকি তাদেরকে জানানো হয়। তাহলে ওই যে প্রথমেই বলেছিলাম বাঙালি একটি হুজুগে জাতি; মিলল তো। বাঙালি অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন জাতি, বাঙালি আর রাজনীতি দুটোকে কোনোদিন আলাদা করা যাবে না। ভোটের মরশুমে আমজনতার চেতনায় কড়া নাড়া দিয়ে ‘অবনী বাড়ি আছো’ বলার জন্য দলগুলি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। দলগুলির ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যে পন্থা অবলম্বন করে তাদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী পন্থা হল রাজনৈতিক স্লোগান, বক্তৃতা, দেওয়ালচিত্র ও গণসঙ্গীত প্রভৃতি। অভিনব দেওয়ালচিত্র, ব্যঙ্গচিত্র, ভাষা, শব্দ, ছড়া, গানের ব্যবহার ছাড়া আমাদের ভোট উৎসব অসম্পূর্ণ। শিল্পচেতনার জন্য বাঙালিদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া, নির্বাচনীর প্রচারেও তা বাদ পরে না। বাঙালি যাই করে, তার মধ্যে থাকে শিল্পগুণ। যতই সোশ্যাল মিডিয়া আসুক না কেন আজও ভোট উৎসবে দেওয়ালচিত্র সমান প্রাসঙ্গিক। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথমবার ভোট হয়। তখন কাগজের প্রচুর দাম হওয়ায়, নির্বাচনী খরচ বাঁচাতে দলগুলি নিজেদের বক্তব্য আমজনতার সামনে তুলে ধরতে রাজনৈতিক দেওয়াল লিখন শুরু করেন। আর সেই থেকে রসবোধে পরিপূর্ণ দেওয়াল লিখন ও ব্যঙ্গচিত্র বাংলার ভোটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলার প্রাক্তন মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় একসময় বলেছিলেন—

“দেওয়াল লিখন আর ব্যঙ্গচিত্র বাংলার নির্বাচনী প্রচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেওয়াল লিখন ছাড়া ভোট অসম্পূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু মানুষের কাছে একসঙ্গে কম সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু দেওয়াল লিখনের ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্টকে অস্বীকার করার উপায় নেই।”

লেখক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের কথায়—

“আজ যেভাবে দেওয়াল লিখন ছড়িয়ে পড়েছে, তা মূলত শুরু হয় ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে। একে দারুণ ভাবে কাজে লাগিয়েছিল নকশালরা।”

বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সেকাল থেকে একাল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিন্তু ভোট প্রচারে দেওয়াল লিখনে সেই ধারা এখনো বর্তমান রেখে গেছে। কোথাও ব্যঙ্গচিত্র, আবার কোথাও তথ্যবহুল দেওয়াল লিখনের সমাবেশ আজও আমরা দেখতে পাই। মানুষের যেমন কান, মুখ আছে দেওয়াল তার ব্যতিক্রম নয়। নইলে বলুন তো কানে শোনা কথা দেওয়াল কীভাবে অপরের কাছে পাচার করে দেয়? আর এই দেওয়ালের জামা হচ্ছে বিজ্ঞাপনের পাতলা কাগজ বা পোস্টার। এছাড়াও দেওয়ালের গায়ে মিশে যায় বিভিন্ন রাজনীতির রং। দেওয়ালের গায়ে যেন সে সমস্ত কিছু ট্যাটুর মত ফুটে ওঠে।

তবে সেকালে বামপন্থী দল দেওয়াল লিখনে নজর কাড়লেও এ কালে কিন্তু কোন দলই পিছিয়ে নেই। সবটাই যেন এক প্রতিযোগিতা। কে কতটা নজর কাড়তে পারে মানুষের কাছে দেওয়াল লিখনে তারই তোড়জোড়। তবে এ কথা মানতে হবে যতই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক কম সময়ে মানুষের মধ্যে অনেক তথ্য পৌঁছে যাক না কেন, ভোট প্রচারে দেওয়াল লিখনের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য।

বর্তমানে দেওয়াল লিখন যেমন ভোট প্রচারে নজর কাড়ে তেমনি দেওয়াল লিখনের ভাষা অনেক বেশি চমকপ্রদ হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার হাস্য রসাত্মক, ব্যঙ্গাত্মক শব্দের ব্যবহার দেওয়াল লিখনে দেখা যায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকে সরাসরি আক্রমণ করা হয় শব্দের দ্বারা। দাঙ্গাবাজ, চোর এই জাতীয় শব্দ যেমন দেওয়াল লিখনে স্থান পেয়েছে তেমনি বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, এই জাতীয় বহু প্রচলিত ইংরেজি শব্দ দেওয়াল লিখনে স্থান করে নিয়েছে। যতই সোশ্যাল মিডিয়া আসুক না কেন আজও ভোটের রঙে বাংলাকে শাসন করে দেওয়াল চিত্রই। আপনার চোখ দেওয়ালে পড়বেই। দেওয়াল আপনার সামনে তুলে ধরবে রাজনীতির রঙ, রাজনীতির ভাষা।

সত্যি কথা বলতে দোষ নেই; বাঙালি জাতি কিছুটা কলহপ্রিয় এবং কৌতুকপ্রিয়। সোজা ভাষায় বাঙালি জাতি উত্তর-প্রত্যুত্তরে খুব সহজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। তার প্রভাব আমরা দেওয়াল লিখনে দেখতে পাই, যা আমাদের নজর কাড়ে এবং হাসির খোরাক যোগায়। আমরা দেখতে পাই একই দেওয়ালে চলছে উত্তর-প্রত্যুত্তরের পালা। দেখা যায় কোন রাজনৈতিক দল তাদের স্বপক্ষে কোন মতামত দেওয়ালে লিখলে, সেটি দেখে বিরোধীদল সেই দেওয়ালেই তার বিরুদ্ধে ব্যাঙ্গাত্মক কোন মন্তব্য লিখে মানুষের সামনে তুলে ধরত। সেকালে কংগ্রেস পার্টির চিহ্ন ছিল জোড়া বলদ আর একালে হাত। পূর্বে দেখা যায় কংগ্রেস পার্টি তাদের সমর্থনে দেওয়ালে লিখেছিল—

“ভোট দেবেন কোথায়, জোড়া বলদ যেথায়”

প্রত্যুত্তরে সিপিএম কংগ্রেসের এই দাবির বিরুদ্ধে উত্তর দিয়ে জানিয়েছিল—

“জোড়া বলদ এর দুধ নেই, কংগ্রেসের ভোট নেই”

কংগ্রেস বনাম সি.পি.আই.এম দেয়াল লিখন যুদ্ধে একবার কংগ্রেস লিখেছিল—

“চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায় কে? হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে জ্যোতিবাবুর বে।”

এর উত্তরে সিপিএমরা লিখেছিল—

“ঠিক বলেছিস ঠিক বলেছিস ঠিক বলেছিস ভাই। ইন্দিরাকে ছাদনাতলায় সাজিয়ে আনা চাই।”

একালেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে আমরা উত্তর-প্রত্যুত্তর মূলক দেওয়াল লিখন দেখেছি। ‘বঙ্গে আসছে ঝড়, ভাঙবে মোদির ঘর’ তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি তাদের স্বপক্ষে এই মতামতগুলি দেওয়ালে লিখেছিল। আবার তার ঠিক পাশেই দেওয়ালে বিজেপি পার্টি তৃণমূল কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে লিখেছে “মিথ্যে বলছে মমতা, জেনে গেছে জনতা”। এইরূপ উত্তর প্রত্যুত্তরের পালা ক্রমশ চলতেই থাকে দেওয়াল লিখনে এবং তা কখন যে শালীনতার সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়ে ওঠে সে বিষয়ে কোনো দলই সচেতন থাকে না। দেওয়াল লিখনে রাজনৈতিক দলের কোনো নেতার নাম উল্লেখ করে সরাসরি কোন মন্তব্য অর্থাৎ ব্যক্তি আক্রমণ প্রমাণ ভুরি ভুরি। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের পরাজয় হয়। তারপর ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গান্ধী জিতলেন। তখন উজ্জীবিত কংগ্রেস লিখেছিল—

“রায়বেরিলি ভুল করিলি, চিকমাগানুর করেনি; সি.পি.আই.এম মনে রেখো ইন্দিরাজী মরেনি।”

ইন্দিরা গান্ধীর এই পুনরুত্থানের পিছনে ছিল তার কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধী। ইন্দিরাকে কটাক্ষ করে বামফ্রন্টের লেখা—

“বড়লোকের বিটিলো সাদাকালো চুল, তার বাপের কোটে গোজা ছিল, লাল গোলাপ ফুল; সেই বিটির বেটা লো-পাতলা পাতলা চুল, সব্বাইকে দেখিয়ে দিল চোখে সর্ষে ফুল”

রাজীব গান্ধীর সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষাকে শক্ত করার জন্য বিদেশ থেকে বোফর্স কামান কেনা হয়েছিল। বিরোধীরা এর মধ্যে দুর্নীতির আঁচ পেয়ে সেই সময় লিখেছিল—

“অলিগলি মে শোর হ্যায় রাজিব গান্ধী চোর হ্যায়”

আবার কেউ কেউ সরাসরি লিখেছিল—

“জহর দাদুর নাতি তুমি ইন্দু মাসির ছেলে; বোফর্স কামান বেচার টাকা কোথায় রেখে এলে?”

ছয়ের দশকের জনপ্রিয় কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষের একটি চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সেই আংশিক দৃষ্টিহীনতাকে ব্যঙ্গ করে ব্যক্তিগত আক্রমণে শান দিয়ে ছড়া বাঁধা হয়েছিল—

“জলের শত্রু কচুরিপানা, দেশের শত্রু অতুল্য কানা”।

এই ভাষাই বুঝিয়ে দেয় আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়াতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রেই শালীনতার সীমা অতিক্রম করে। পশ্চিমবঙ্গে ভোট মানে মারামারি, দাঙ্গা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এটির সঙ্গে ভালই পরিচিত। আর রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য দাঙ্গা বাধাতে একবারও পিছুপা হন না। তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে তারা সেই দাঙ্গার একজন। রাজনৈতিক দলে নেতারা সেই দাঙ্গার ত্রি-সীমানার কাছে যান না। তারা শুধু পিছনে থাকেন, অনেকটা ওই গাছে তুলে মই কেড়ে নেবার মত। রাজনৈতিক দলে নেতারা এই ভূমিকাটি পালন করতে বেশ ভালোই পারদর্শী। সেই জন্যেই অনেক সমাজসচেতন ব্যক্তি এই ধরণের বিভিন্ন মেসেজ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য দেওয়ালকে ব্যবহার করেন। সরাসরি এখানে মানুষকে মারামারি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। দেওয়াল লিখনে সমাজসচেতনমূলক বিভিন্ন বার্তাও আমরা দেখতে পাব।

“ভোট আসবে, ভোট যাবে

আপনার প্রাণ গেলে আর ফিরবে না

নেতা বাবু কিন্তু সুখেই থাকবে”

 

ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ছবি সহ রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনের প্রচলন ছিল। এর পাশাপাশি ভাষার কারুকার্য, গান, কবিতা ছড়ার ব্যবহার করতেও দেখা যায়। ছবি বিশ্বাস অভিনীত ‘দাদাঠাকুর’ সিনেমার ‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিনু- ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে’ অথবা সিনেমার আইকনিক গান ‘আয় ভোটার আয় ভোট দিয়ে যা’-আমরা কেউ ভুলিনি। বিখ্যাত গান-কবিতা-ছড়ার কিছু শব্দ পরিবর্তন করে বা ছন্দ ব্যবহার করে লেখার মধ্যে চমক আনার চেষ্টা দেখা যায়। দেওয়াল লিখনে ছড়া বা গানের ব্যবহারের অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন- কংগ্রেসরা একবার বহুল প্রচলিত বাংলা ছড়াকে হাতিয়ার করে লিখেছিল—

“চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায় কে? হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে জ্যোতিবাবুর বে।”

বামপন্থীরা চুপ থাকার পাত্র ছিল না তার যথাযথ উত্তর দেওয়াল লিখনের দ্বারা দিয়েছিল, সে বিষয়টি আমি যথাযথ স্থানে উল্লেখ করেছি। তবে কমিউনিস্টরাও বাংলা কবির কবিতা ধার করে জোর করে ছন্দ মিলিয়ে লিখেছিল—

“শোন রে মজুতদার ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ করবো তোকে এবার।”

আবার অনেক সময় অন্তমিল যুক্ত বিভিন্ন শব্দ বন্ধের ব্যবহার দেওয়াল লিখনে হয়েছিল। কংগ্রেস দলের নেতারা সিপিএমের বিরুদ্ধে ভোট প্রচারের জন্য দেওয়াল লিখনে অন্তমিলের প্রয়োগ করেছিল। সেকালের একটি দেওয়ালের বিষয়বস্তু এখানে দেখানো হলো—

“চীনের হাতুড়ি

পাকিস্তানের তারা

এই বাড়িতে বুঝে নিন

দেশের শত্রু কারা”

আমরা ছোটোবেলাই ‘আতা গাছে তোতাপাখি’ ছড়াটি সবাই পড়েছি। বাঙালির মুখে মুখে প্রচলিত এই ছড়াটিও রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনে স্থান করে নিয়েছে। ভোট প্রচারে তৃণমূল কংগ্রেস লিখেছিল—

“আতাগাছে তোতাপাখি

ডালিমগাছে মৌ

এই বি.জে.পিকে ভোট দেবেনা

গাধা ছাড়া আর কেউ”

২০১১ সালে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল হয়। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের পরিসমাপ্তি পর শুরু হয় নুতন অধ্যায়। এই সময় বেশকিছু চমৎকার প্রত্যয়পূর্ণ শ্লোগান আমরা দেখতে পেয়েছিলাম দেওয়াল লিখনে, এ যেন কোনো ভবিষ্যৎ বক্তার বাণী—

“১৯৭৭ নং বামফ্রন্ট ডাউন লোকাল ৩৪ নং প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে; ২০১১ নং মা মাটি মানুষ এক্সপ্রেস ঐ প্ল্যাটফর্মে আসছে”

রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনে বিভিন্ন ব্যাঙ্গচিত্র ও ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ব্যবহার করা হয়। এই ব্যঙ্গ আমাদের সহজে নজর কাড়ে এবং হাসির খোরাক যোগায়। এই রকম দুষ্টু-মিষ্টি কথা, স্লোগান ভোট উৎসবে দেওয়ালের মুখে এবং আমজনতার মুখে হাসি ফোটায়। যেমন—

“মোদি, তুমি দুষ্টু লোক, তোমার চুল দাড়িতে উকুন হোক”

বিজেপি দলের সুপ্রিমোর ‘চুল দাড়িতে উকুন হোক’ এই রূপ মন্তব্য বিরোধীদলের নেতারা দেওয়াল লিখনে ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছে। এভাবে বিরোধীদলের ওই নেতাকে আমাদের সামনে ছোটো করে দেখানো হচ্ছে।

আমাদের রাজ্যের শিল্পের খারাপ অবস্থা সর্ম্পকে আমরা সকলে অবগত। টাটা চলে যাওয়ার পরে কোনো বড় শিল্প বাংলায় আসেনি। অন্যদিকে রাজ্যের সরকারি নিয়োগ প্রায় কমে এসেছে এমত অবস্থায় আমাদের রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জ্জী একবার যুব সম্প্রদায়কে বলেছিলেন চাকরির আশায় বসে না থেকে তেলেভাজার দোকান করে উপার্জন করতে। বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। বিরোধীরা সুযোগের সৎ ব্যবহার করেন এবং বিষয়টি ভোটের প্রচারে ব্যবহার করেন। প্রচার দেওয়ালে লিখলেন—

“চপ আমাদের শিল্প

অন্ধকার আমদের ভবিষ্যৎ”

বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে হিন্দুত্ববাদকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনী দিয়ে প্রচার মঞ্চ মুখরিত হয়ে ওঠে। রাজনীতিতে রামের ব্যবহার বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা প্রচার দেওয়াল ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন।

প্রচার দেওয়াল গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, হাসি-ঠাট্টা, গান-কবিতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে যেমন ফুটে ওঠে তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কথাও বলে, নারী নির্যাতনের কথা বলে। আম জনতা, খেটে খাওয়া মানুষের সকল দুঃখ-যন্ত্রণা অভাব-অভিযোগ চিত্রিত হয় দেওয়াল লিখনে। বেকার যুবকদের বেকারত্বের কথা ফুটে ওঠে। গরীব কৃষকদের হতাশা, কোটিপতি ব্যবসায়ীদের ফুলে-ফেঁপে ওঠার কথা প্রচার দেওয়াল আমাদের গলা ফাটিয়ে বলে—

“কাজ পায় না শহর গ্রাম

মোদী-মমতা দুই সমান”

“মরছে কৃষক কাঁদছে মা

এই বি.জে.পি আর না”

“কৃষক মরে শ্রমিক মরে

প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ঘোরে”

দেশে ঘটে যাওয়া বিশেষ বিশেষ ঘটনা আমাদের দেশকে আলোড়িত করে এবং তার প্রভাব রাজনীতি তথা রাজনৈতিক প্রচারকে প্রভাবিত করে। যেমন, রাম মন্দিরের হুজুগের সময় বেশ কিছু চমকপ্রদ দেওয়াল লিখনের সঙ্গেও আমরা পরিচিত হয়েছি। যেমন সিপিএম পার্টি বিজেপি পার্টির বিরুদ্ধে ভোট প্রচারের জন্য দেওয়ালে রাম মন্দির সংক্রান্ত প্যারেডি ব্যবহার করেছিল—

“রাম সেজেছেন আদবানী

দেখে করি অনুমান

বিজেপি ক্ষমতায় এলে

দেশ চালাবে হনুমান”

আমাদের রাজ্যে শাসক দলের বড় বড় নেতার নাম নানা রকম দুর্ণীতির সাথে জড়িয়ে পরে। কয়লা চুরি, বালি চুরি, গরু পাচার, একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনা প্রভৃতি দুর্ণীতি নিয়ে বর্তমান শাসকদল এখন বিভ্রান্ত। এর প্রভাব দেওয়াল লিখনে পড়েছে। এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে দেখা যায় দেওয়াল লিখন। ১৯৭৭ সালে সি.পি.আই আর কংগ্রেসের জোট হয়, আমাদের গোটা রাজ্যে আলোড়ন ফেলেছিল। এই ঐক্যকে ব্যঙ্গ করে দেওয়ালে লেখা হয়—

“দিল্লি থেকে এলো গাই সঙ্গে বাছুর সি.পি.আই”

দেওয়াল লিখনে সবসময় যে সরাসরি আক্রমণ করা হয় এমনটা নয়। অনেক সময় রূপক বা তির্যক শব্দের ব্যবহার করা হয়, সরাসরি ব্যক্তি বা দলকে আক্রমণ করা হয় না। যেমন—

“পদ্মফুলে দিলে ছাপ / ঘরে ঢুকবে কেউটে সাপ”

এখানে বিরোধী পার্টি বিজেপি পার্টিকে তির্যকভাবে কেউটে সাপের সঙ্গে তুলনা করেছে। আসলে বিজেপি পার্টির ক্ষতিকারক দিক বোঝানোর জন্যই বিরোধী পার্টির এই তীর্যক শব্দের ব্যবহার। এগুলির আরো নানারকম দৃষ্টান্ত আছে। যেমন—

আরেকটি হলো  “পাড়ায়-পাড়ায় আওয়াজ তোলো / হাওয়াই চটি বদলে ফেলো”

আমরা সকলেই জানি যে আমাদের রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি হাওয়াই চটি ব্যবহার করেন অথচ হাতে তার আইফোন। ভোট প্রচারের সময় বিরোধী পার্টি ‘হাওয়াই চটি’ শব্দটি  বাক্যে ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছে। এখানে বিরোধী পার্টি আসলে মমতা ব্যানার্জির নাম না করে তির্যকভাবে ‘হাওয়াই চটি বদলে ফেলো’ শব্দবন্ধ দ্বারা মমতা ব্যানার্জির পালাবদলের কথায় তুলে ধরেছেন। আবার সি.পি.আই.এমের একটি প্রচার দেওয়ালে লেখা হয়েছে—

“পথ চিনতে করলে ভুল

দিতে হবে বড় মাসুল

তাই আর নয় কোনো ভুল

সরাতে হবে দুই ফুল”

এখানে সরাসরি কোনো দলের নাম নেওয়া হয়নি অথচ আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে ‘দুই ফুল’ বলতে কি বোঝানো হয়েছে।

রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনে অনেক নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার করা হয় যা আমরা অভিধানে খুঁজে পাই না। এই নতুন সৃষ্ট শব্দগুলি গড়ে ওঠে কোনো না কোনো রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের মুখে স্থান পাই। অন্যভাবে বলা যায় রাজনীতি আমাদের শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রচারে একটি শব্দ বেশ জনপ্রিয় সেটি হল ‘খেলা হবে’। আমরা সকলেই খেলা সম্পর্কে বেশ অবগত। তবে রাজনীতিও যে খেলা হতে পারে, সেটি এই রাজনীতি আমাদের শিখিয়েছে। এখানে রাজনৈতিক হার-জিতকে বা রাজনীতিকে খেলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আর এই ‘খেলা হবে’ শব্দটি দেওয়ালে মাঝে মধ্যেই আমাদের চোখ পড়ে।

রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনে শব্দের প্রচলিত অর্থকে বাদ দিয়ে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করতে দেখি। এইভাবে শব্দের অর্থ পরিবর্তন হয় এবং জনসমাজে প্রচলিত হয়ে পরে। এইরকম একটি বহুল প্রচলিত শব্দ হল ‘কাটমানি’। ১৮ এবং ১৯ শতকের গোড়ার দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে এবং আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের কিছু অংশে প্রচলন করা একটি মুদ্রাকে ‘Cut Money’ বলা হত। বিনিময় প্রথার সুবিধার জন্য স্প্যানিশ আমেরিকান মুদ্রাকে অর্ধেক, চতুর্থাংশ বা অষ্টম ভাগে ভাগ করা হত, মুদ্রার এই কাটা অংশগুলোকে ‘Cut money’ বলা হত। কিন্তু বর্তমানে ‘কাটমানি’র অর্থ দাড়িয়েছে ঘুষ। কোনোরকম সরকারি সুবিধা পেতে হলে শাসক পক্ষকে কিছু অর্থ দিতে হয়, তাকে এখন ‘কাটমানি’ বলা হচ্ছে। আবার ভোটের আগে নেতাদের দল বদলানোর হিড়িক পরে যায়। এই দল বদলানো কারণ নিজেদের সুবিধা চরিতার্থ করা। তাই এই দল বদলু নেতাদের(Leader) ব্যঙ্গ করে Leader না বলে Ladder(মই) বলা হয়েছে দেওয়াল লিখনে।

রাজনৈতিক দেওয়াল লিখন দেখতে দেখতে একটি দেওয়ালে দেখলাম লেখা আছে— বিজেপি মানে ‘ব্যাংক ঝাড়া পার্টি’। এই বিষয়টি আমার নতুন সংযোজন মনে হয়েছে। দেওয়াল লিখনের সময় স্থানাভাবে সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করা হয়। যেমন- টি.এম.সি (তৃনমূল কংগ্রেস) সি.পি.আই.এম (কমিউনিষ্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মার্কসিষ্ট) বি.জে.পি (ভারতীয় জনতা পার্টি) কিন্তু ভোট প্রচারে দেওয়াল লিখনে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ করা হয়েছে। আবার কোথাও চোখে পড়ল টিএমসি মানে তোলা মূল কর্পোরেশন ইত্যাদি।

অনেক সময় দেখা যায় দেওয়ালে ভোট প্রচারের জন্য যে শব্দগুলি লেখা হয় সেগুলির অনেক শব্দই ভুল বানান দোষে দুষ্ট বা বাক্য বন্ধন সঠিক নয়। আবার অনেক সময় শব্দ বা বাক্যগুলি এমনভাবে লেখা হয় যে সেগুলি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ সৃষ্টি করে। রাস্তায়, গলির মোড়ে  প্রাচীরগুলি ভোটের সময় মনে হয় যেন রাজনৈতিক প্রচারের জন্যই বুক থাকে। সেখানে আর অন্য কিছুর স্থান নেই। সেখানে লেখা থাকে অমুক প্রার্থীকে ভোট দিন বা তমুক প্রার্থীকে ভোট দিন। তবে অনেক সময় দেখা যায় ‘প্রার্থী’ আর ‘কে’ এই দুটি শব্দ একসঙ্গে না লিখে আলাদা করে লেখা হচ্ছে। এর ফলে যা বলতে চাওয়া হচ্ছে সেটি না হয়ে সে বাক্যের অন্য অর্থ তৈরি হচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রার্থীর নাম এখানে বলা হচ্ছে না এখানে প্রার্থী আসলে কে সেটি জানতে চাওয়া হচ্ছে। বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে যে ‘কে’ যুক্ত হয় সেটি হল বিভক্তি। আর এই ‘কে’ বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবার নিয়ম নেই। কিন্তু এই নিয়মের ব্যতিক্রম খুব অবলীলায় ঘটে চলে। আসলে যারা দেওয়াল লিখনের কাজ করেন তারা ব্যাকরণের এই নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন। তবে বিষয়টি এমন নয় যে সমস্ত জায়গাতেই বানান সংক্রান্ত বা বাক্য সংক্রান্ত কোন ভুল থাকে। তবে অবশ্যই বাংলাতে দেওয়াল লিখনের আগে বাংলা ব্যাকরণের সঠিক নিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত।

উপসংহার

ভোট আসে আবার চলেও যায়। এক ভোটের স্লোগান অন্য ভোটে গিয়ে ‘বাসি’। চোখের সামনে জেগে থাকা দেওয়াল লিখন, মুছে গিয়ে অন্য ভাষ্য ফুটে ওঠে। সত্যি কি ভোটারদের মধ্যে বিরাট প্রভাব ফেলে এই সব ভোটরঙ্গ? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের হিসেব অনেক জটিল। নানা ফ্যাক্টর সেখানে জালের মতো ছড়িয়ে থাকে। নিছক চোখ ধাঁধানো কোনও স্লোগান কিংবা মুচকি কার্টুনের সপাট মোচড় ভোট ব্যাংকে প্রভাব ফেলে না। তবে এর বিনোদন মূল্যকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। তাছাড়া এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া সহজ। সেটাকেই কাজে লাগায় দলগুলি। তৈরি হতে থাকে নিত্যনতুন সব গান। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হয়ে যায় কত অদ্ভুত সব স্লোগান। প্রতিটি নির্বাচনের স্মৃতির সঙ্গে যা মিশে যায় ওতপ্রোতভাবে।

তথ্যসূত্র

১. truth of Bengal, ২৪ মার্চ ২০২৪

২. দে বিশ্বদীপ, সংবাদ প্রতিদিন, ২০ মার্চ ২০২৪, কলকাতা,