বুদ্ধদেব গুহর ‘সাসানডিরি’ উপন্যাসে মুণ্ডা জনজীবন ও সংস্কৃতি -গনেশ কর্মকার

গবেষক, বাংলা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়,   Gmail- ganeshkarmakar503@gmail.com

Mob-8116275987

 

সারসংক্ষেপ:- বাংলা কথাসাহিত্যে একটি বহুল চর্চিত বিষয় অন্ত্যজশ্রেণির মানুষদের জীবন সংগ্রাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ছোটগল্পে প্রথম এই অন্ত্যজশ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রযুগ থেকে বাংলা কথাসাহিত্যে অন্ত্যজশ্রেণির মানুষেরা স্থান করে নিয়েছেন। বাঙালী লেখকদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমজীবি মানুষ, অন্ত্যজশ্রেণির মানুষদের তাঁদের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ তাঁদের মধ্যে একজন। বুদ্ধদেব গুহর জন্ম কলকাতার শিশুমঙ্গল সেবা প্রতিষ্ঠানে ১৯৩৬ সালের ২৯ জুন। তবে শৈশবের অনেকটা সময় কাটে রংপুরের বরিশালের কাঁচাবালিয়া গ্রামে। বুদ্ধদেব গুহর বাবা ছিলেন শচীন্দ্রনাথ গুহ , মাতা ছিলেন মঞ্জুলিকা দেবী। লেখক দশ বছর বয়স থেকেই তাঁর বাবার সাথে শিকারে যেতেন। জঙ্গলের আদিবাসী জনজাতিদের সাথে পরিচয় হয় খুব ছোট থেকেই। বুদ্ধদেব গুহ পেশায় ছিলেন একজন চার্টাড অ্যাকাউন্টটেন্ট। চাকরি সুত্রে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন বিহার, ঝাড়খণ্ড, আসাম, উড়িষ্যা সেখানকার দরিদ্র, শ্রমজীবি, আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছেন। তাঁদের জীবন-যাপন ও সংস্কৃতিকে তাঁর সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। বুদ্ধদেব গুহ ওঁরাওদের নিয়ে লিখেছেন, কন্দ উপজাতিদের নিয়ে লিখেছেন, আফ্রিকার মাসাই উপজাতিদের নিয়ে লিখেছেন, মুণ্ডাদের নিয়ে লিখেছেন। মুন্ডাদের নিয়ে লেখা সাসান্‌ডিরি উপন্যাস। মুণ্ডারী ভাষায় সাসান্‌ডিরি শব্দটির মানে হল ‘কবরভূমি’। লোভই যে মানুষের সবচেয়ে বড় নাশক তা তিনি এই উপন্যাসে মুণ্ডাদের রূপকথা এবং খণ্ডিত জীবনযাত্রার মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছেন।

 

সূচক শুব্দ:– অন্ত্যজশ্রেণি, বুদ্ধদেব গুহ, সাসান্‌ডিরি, মুণ্ডা, সিঙবোঙা, বিরিসামুণ্ডা, চাটান মুণ্ডা,

 

মূল আলোচনা:- ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে আমাদের দেশে যে সব সাহিত্য গড়ে উঠেছে তার মধ্যে উপন্যাসই প্রধান। উপন্যাস বলতে আমরা যা বুঝি তা একান্ত আধুনিক যুগের। তবে প্রাচীন সাহিত্যের মধ্যেও উপন্যাসের লক্ষণ ও উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। কাব্যে, ধর্ম-গ্রন্থে, আখ্যায়িকায় ও নাটকে সমাজের বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হত, সমাজের মানুষের সম্পর্ক ও সংঘাত ফুটে উঠত। বাংলা কথাসাহিত্যের যাত্রা শুরু হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। উপন্যাসের সূচনা হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে আর ছোটগল্পের সূচনা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। বাংলা কথাসাহিত্যে অন্ত্যজশ্রেণি একটি বহুল চর্চিত বিষয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে এই অন্ত্যজশ্রেণির মানুষের কথা না থাকলেও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে প্রথম অন্ত্যজশ্রেণির মানুষের কথা পাওয়া যায়। সমাজের নিম্নবিত্ত এবং অন্ত্যজশ্রেণির মানুষ রবীন্দ্রযুগ থেকে বাংলা ছোটগল্পে স্থান করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ ছোটগল্পটি তাঁর প্রমাণ। এই গল্পে দেখা যায় ছিদাম রুইদাস ও দুখীরাম রুইদাস এই দুই ভাইয়ের স্বাভাবিক জীবন তাদের দুই বউয়ের দৈনন্দিন কলহ। এখানে বড়োভাইয়ের বউ রাধার খুন হয়ে যাওয়া এবং ছোট বউ চন্দরার স্বামীর প্রতি ক্ষমাহীন প্রতিহিংসা গ্রহণ একেবারে সমাজের অন্ত্যজশ্রেণির মানুষের নিখুঁত জীবন চিত্রকে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ ও ‘অভাগীর স্বর্গ’ ছোটগল্পের মধ্যেও অন্ত্যজ জীবনের উপস্থিতি দেখতে পাই। এরপর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, সমরেশ বসু, সুবোধ ঘোষ, নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাশ্বেতাদেবী, বুদ্ধদেব গুহ, ভগীরথ মিশ্র প্রভৃতি কথা সাহিত্যিকদের হাতে অন্ত্যজ মানুষেরা তাদের সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছেন। অনেকেই আবার বহির বঙ্গের অন্ত্যজ মানুষদেরকে তাদের কথাসাহিত্যের মধ্যে রেখেছেন। তাদের মধ্যে বুদ্ধদেব গুহ অন্যতম।

বুদ্ধদেব গুহ বাংলা সাহিত্যে একজন বুহুমুখী বর্ণময় কথা সাহিত্যিক। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় যোগ তা তিনি সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় উঠে এসেছে জঙ্গল, পাহাড় ও সেখানকার নরনারীরা। বুদ্ধদেব গুহর জন্ম কলকাতার শিশুমঙ্গল সেবা প্রতিষ্ঠানে। সময়টি ১৯৩৬ সালের ২৯ জুন এক শনিবারের বর্ষার রাত। বুদ্ধদেব গুহর বাবা ছিলেন শচীন্দ্রনাথ গুহ আর মা ছিলেন মঞ্জুলিকা দেবী। বুদ্ধদেব গুহর বাংলা সাহিত্যে পথচলা শুরু তাঁর বড়োমামা সুনির্মল বসুর হাত ধরে। বড়োমামা ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। বুদ্ধদেব গুহ ছিলেন প্রকৃতি প্রেমিক, ভ্রমণপিপাসু, ভোজনরসিক, ক্রীড়াবিদ, শিকারী। বুদ্ধদেব গুহ দশ বছর বয়স থেকেই তাঁর বাবার সাথে শিকারে যেতেন। বুদ্ধদেব গুহর কাছে শিকার ছিল নিছকই বাহানা আসলে প্রকৃতির কোলে নিজে হারিয়ে ফেলা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসায় ছিল তাঁর আসল উদ্দ্যেশ। বুদ্ধদেব গুহর ডাক নাম ছিল লালাদা। আর ঋজুদা ছিল তাঁর গোয়েন্দা চরিত্রের শ্রষ্টা। বুদ্ধদেব গুহর পুর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল বরিশালের কাঁচাবালিয়া গ্রামে। তারপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফরিদপুরে চলে আসেন। এই ফরিদপুরেই লক্ষীপুর গ্রামের জমিদার হন গুহ পরিবার। পরে পদ্মার ভাঙনে লক্ষীপুর নদীর গর্ভে চলে যায় সেখান থেকে গুহ পরিবার রংপুরে চলে আসেন। বুদ্ধদেব গুহর মা ও বাবা ছিলেন ধর্ম ও জাত পাতের ঘোর বিরোধী। বুদ্ধদেব গুহ শৈশব থেকেই দেখে আসছেন যে তাঁর বাবা শচীন্দ্রনাথ গ্রামের অন্ত্যজশ্রেণির মানুষদের প্রতি ভালোবাসা। ঢাকুরিয়া লেকের কাছে যেদিন গুহ পরিবারের গৃহ প্রবেশ করেন সেইদিনই শচীন্দ্রনাথ গুহ যারা বাড়ি বানিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রি, ছুতোর, মুটো-মজুর প্রত্যেককেই নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তাদের মহাসমারোহে অন্য অতিথিদের সঙ্গে এক আসনে বসিয়ে খাইয়েছিলেন। তারফলে অনুষ্ঠানে আসা তথাসম্পন্ন অথিতিরা অপমানিত বোধ করলে শচীন্দ্রনাথ তাদের বলেছিলেন—

“যারা তিল তিল করে দিনের পর দিন গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে মাটি খুঁড়ে, ইট বয়ে, বাঁশের ভারার ওপর প্রাণ হাতে করে বসে বাড়িটা বানাল। আজ তারাই আমার সবচেয়ে বড়ো অতিথি। আপনারা অপমানিত বোধ করলে না খেয়েই চলে যেতে পারেন।”

বুদ্ধদেব গুহ ছোট থেকেই শিখেছেন সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষদের কিভাবে ভালোবাসতে হয়। লেখক কৈশোর থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছেন। প্রকৃতিকে কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন। সেখানকার নিম্নশ্রেণির মানুষদের নিয়ে লেখালেখি করেছেন। বিহার, ঝাড়খণ্ড, আসাম, নাগাল্যাণ্ড ত্রিপুরা, মেঘালয়, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িষ্যার বিভিন্ন রাজ্যের অনেক অঞ্চল নিয়ে লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের হাজারীবাগের পটভূমি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উপন্যাস লিখেছেন। সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, কলহো, খন্দ, ইত্যাদি জনজাতিদের নিয়ে লিখেছেন। বুদ্ধদেব গুহ নিজেই বলেছেন—

“প্রথম কৈশোরের থেকে শিকারের শখ থাকায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরে গ্রাম ও ছোট ছোট জনপদে অনেকবার গিয়েছি এবং থেকেছি বিশেষ করে পুর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। সেইসব অনামা অখ্যাত জায়গায় সাধারণ ভারতবাসীর জীবনযাত্রা, তাদের অবিশ্বাস্য দরিদ্র, তাদের হতাশা, অসহায়তার সঙ্গে তাদের ভাগ্যকে মেনে নেবার নীরব দুর্মর অভ্যাস আমাকে যৌবনের দিনগুলি থেকে বড়ই ব্যথিত করেছে। তাদের সমব্যথী করে তুলেছে নিজেরই অজানিতে।”

ঝাড়খণ্ডের খুঁটি জেলায় একটি জায়গা হল মুরহু। সেখানে অবস্থিত লাহির কারখানা। এই লাহির মানে হল লাক্ষা। ইংরেজিতে যাকে বলে শেল্যাক। সেই কারখানাতে কাজ করেন সেখানে বসবাসকারী মুণ্ডা জনজাতিরা। উপন্যাসের দেখি বুজুবাবু নামে একজন যার কৈশোর কেটেছে কলকাতার কর্ণওয়ালিসস্ট্রিটে। তিনি চাকরি সূত্রে ঝাড়খণ্ডের মুরহুতে আসেন এখানের লাহি কোম্পানিতে। লাহি কোম্পানিতে কাজ করতে আসা এক মুণ্ডারী মেয়ে মুঙ্গরীর প্রেমে পড়েন বুজুবাবু। এরফলে মুঙ্গরীদের সমাজ ব্যবস্থা, তাদের জীবন-যাপন সম্পর্কে বুজুবাবুর জানার ইচ্ছে হয়। এই কোম্পানিতে লেজার কীপারের কাজ করেন দিলধড়কান বাবু তিনি মুণ্ডাদের সম্পর্কে সব কিছু জানেন। উপন্যাসে আরেকটি চরিত্র সিরকা মুণ্ডা তিনি ছিলেন মুঙ্গরীর দাদু। সিরকা মুণ্ডার আরেকটি পরিচয় আছে তিনি ছিলেন মুণ্ডা সমাজে পাঁচজন মুখ্যার মধ্যে একজন। লেখক বুদ্ধদেব গুহ অত্যন্ত সুকৌশলে দিলধড়কান পাণ্ডে ও সিরকামুণ্ডার মুখ দিয়ে মুণ্ডা সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রকাশ করান এই উপন্যাসে।

এই সাসানডিরি উপন্যাসটি মুণ্ডাদের জীবন ও সংস্কৃতি, খাদ্য ও পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছেদ, সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস ও সংস্কার, ধর্মবোধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখা। ‘সাসানডিরি’ শব্দটির অর্থ হল ‘কবরভূমি’। ‘সাসানডিরি’ শব্দটি মুণ্ডারি ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে। লোভ যে মানুষের সবচেয়ে বড় নাশক তাই  লেখক বুদ্ধদেব গুহ এই উপন্যাসে মুণ্ডাদের রুপকথা এবং খণ্ডিত জীবন যাত্রার মধ্যদিয়ে বলতে চেয়েছেন। যে সত্য মুণ্ডা জগতে সত্য সেই সত্য আজ শহরের শিক্ষিত মানুষদের জীবনেও সত্য। বিরিসা মুণ্ডার দেশের মুরহু আর টেরো, খুঁটি থেকে সুকানবুড়ু ও তামারের মানুষজন বড় জীবন্ত হয়ে প্রতিভাত হয়েছে এই উপন্যাসে।

মুণ্ডাদের সমাজ ব্যবস্থা- সাসানডিরি উপন্যাসে মুণ্ডা জনজাতিদের সমাজের মাথার উপরে থাকেন সিঙবোঙা আর তাঁর নীচে থাকেন পাঁচজন মানুষের পঞ্চায়েত। মুণ্ডাদের সমাজে সিঙবোঙা কিছু নিয়ম কানুনের আল তৈরি করে রেখেছেন ঠিক যেমন চাষের ক্ষেতে আল্‌ থাকে সেইরকম। সমাজে জন্ম-বিবাহ-মৃত্যু এই সব রীতি এই আল্‌ঘেরা সমাজের মধ্যেই করতে হয়। মুণ্ডাদের মধ্যে কেউ যদি এই আল বা নিয়ম ভাঙে তাকে তাঁর শাস্তিও প্রদান করা হয়। মুণ্ডা সমাজে সিঙবোঙার নীচে পাঁচজন মানুষের পঞ্চায়েত থাকেন। সিঙবোঙা অন্যত্র থাকলে পঞ্চায়েতের এই পাঁচজন সিঙবোঙার কাজ করেন। তাদের সিদ্ধান্ত যতখানি সামাজিক ততখানি ধার্মিক। মুণ্ডা সমাজে সমাজ বিরোধী যে কোন কাজ সিঙবোঙা-বিরোধী কাজ। যা কিছু সিঙবোঙাকে আহত করে তা মুণ্ডা প্রজাতিকেও আহত করে। তবে কোনো খারাপ কাজ করলেই যে মুণ্ডা সমাজের আল ভাঙা হয় তা নয়। মুণ্ডাদের অসুর রূপকথাতে আছে মানুষের সবচেয়ে বড় পাপ হচ্ছে লোভ। চোরকেও মুণ্ডা সমাজ অত ছোট চোখে দেখেনা যেমন দেখে লোভীকে। এই সিঙবোঙা মুণ্ডা সমাজকে শুধুই তৈরিই করেননি তাঁর পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন। মুণ্ডা সমাজে নিজের রক্ত যাদের শরীরে বইছে তাদের সঙ্গে যৌণ সংসর্গ মহাপাপ। এই পাপ কেউ করলে মুণ্ডা সমাজ তাকে বহিস্কৃত করেন। এছাড়া নিজেদের ‘কিলি’ বা গোষ্ঠীর মধ্যে কেউ যৌণ- সংসর্গ করলে তাঁর গায়ে ছাই আর জল ছুড়ে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়।

জন্মপ্রথা- মুণ্ডা সমাজে মুণ্ডা শিশু জন্মের পর পরই মুণ্ডা হয়না। তাকে চাট্টির মধ্য দিয়ে, আগুনের ঝালর ভেদ করে সব অশুদ্ধি করে নিয়ে তারপরই মুণ্ডা সমাজ তাকে তাদের একজন করে নেয়। মুণ্ডাদের শিশুদের চন্দ্রমাসের ন’ দিনে এই চাট্টি অনুষ্ঠান হয়। চাট্টি উৎসবে শুধু শিশুকেই যে পবিত্র করে নেওয়া হয় তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মাকেও পবিত্র করে নেওয়া হয়। সকলে নখ কাটেন, আর যে মাদুরে শিশু ভুমিষ্ঠ হয় তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর মা ও শিশু দুজনকেই মুণ্ডা সমাজ গ্রহণ করেন। শিশুর মাকে নতুন করে ও শিশুকে প্রথম বার গ্রহণ করেন। মুণ্ডা সমাজে জন্ম ও মৃত্যু তে আগুনের খুব ভূমিকা থাকে। চাট্টি অনুষ্ঠান সম্পর্কে—

“ছাট্টিকিয়াটা খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার আর চাট্টি উৎসব।ছাট্টিকিয়া হয় বাচ্চা হওয়ার ন’দিন পরে। গ্রামের সকলের নখ কাটতে, চুল কাটতে হয়। মেয়েরা আলতা পড়ে। কুয়োর বা জলের পাশে গিয়ে নতুন বাচ্চার মা শুদ্ধু, কুঁইয়েতে তেল-সিঁদুর লাগিয়ে তারপর সকলে হলুদ খেলে। সিঁদুরও খেলে। ”

বিবাহ প্রথা- মুণ্ডা সমাজে নারী-পুরুষের মেলা মেশাতে কোনো দোষ থাকেনা। তারা যদি সমাজের মান মর্যাদা বাচিয়ে একে অপরকে ভালোবাসে, মেলামেশা করে তাহলে মুণ্ডা সমাজে কোনো দোষ থাকেনা। মুণ্ডা সমাজে নারী পুরুষ একে অপরকে ভালো বাসলে তারা বিয়ে করেন। মুণ্ডাদের মধ্যে স্বাধীনতা ও খুশিটাই বড় কথা। মুণ্ডাদের কোনো মেয়ে যদি বিয়েতে রাজী না থাকে তাহলে সেই বিয়ে হয় না। মুণ্ডা সমাজে মেয়েদের স্বাধীনতা পুরোপুরিই থাকে। মুণ্ডাদের মধ্যে ছেলেদের মেয়েদের বাপকে পণ দিতে হয়। ছেলেকে দিতে হয় দুটো বলদ, বারোটা শাড়ী। তারমধ্যে চারটে ভালো ও আটটা আটপৌরে। ভোজ খাওয়াতে হয় সবাইকে। আর তাঁর সাথে হাঁড়িয়া। মুণ্ডাদের হাঁড়িয়ায় হল প্রধান পানীয়। বিয়ে, শ্রাদ্ধ যা কিছুই হোক না কেন সকলকে হাঁড়িয়া খাওয়াতে হয়। মুণ্ডা সমাজে কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে না করে তাহলে বক্‌রী-মুরগী এইসব খেসারত দিতে হয় মেয়েকে। এইসব মুণ্ডা সমাজের পাহান বা ভগত্‌রা ঠিক করে দেন। মুণ্ডাদের যখন বিবাহ বিচ্ছেদ হয় তখন মুণ্ডাদের পঞ্চায়েতে গিয়ে স্বামী ও স্ত্রী কে ‘সাকামচারী’ দিতে হয়। মুণ্ডাসমাজে প্রচলিত আছে—

“মুণ্ডাদের পঞ্চায়েত যখন সাকামচারী বিবেচনা করে তখন তারা দুটি কথাতেই বুঝে যায় যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সে দম্পত্তির আছে না নেই! ‘নেই’ বুঝলেই সাকামচারী দিয়ে দেয় পঞ্চায়েত। শালগাছে পাতা ছিঁড়ে ফেলেই সম্পর্ক শেষ করে দেওয়া হয়।”

মৃত্যু প্রথা-  মুণ্ডাসমাজে কেউ মারা গেলে ভগত মন্ত্র পড়ে বলেন হারাম আমাদের সকলকেই একটি করে যথেষ্ট বড় যাম্‌-সাকাম দিয়েছেন। শালপাতার দোনা দিয়েছেন। যেটাতে আমরা সকলে খাই। যখন যারই যাম-সাকাম ফুরিয়ে আসে তখন তাকেই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়। মুণ্ডাদের মৃত্যুর সময় কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। মুণ্ডাদের কেউ মারা গেলে তাকে ‘শ্মশান’ নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়া হয়। মুণ্ডারী ভাষায় শ্মশান কে বলে সাসান। কবর দেওয়ার সময় আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্র পড়ে তাকে কবরে শুইয়ে দেওয়া হয়। মুণ্ডাদের জন্মের পর হোক বা বিবাহের পর বা মৃত্যুর পড়ে আগুনের পর্দা পেরিয়ে অদৃশ্য লোকে চলে যাবার সময় ও আগুনের পর্দা ভেদ করতে হয়। মুণ্ডারা মনে করেন যে মৃত্যুর পরেও তাঁর আত্মা বেঁচে থাকে। তাই তারা মৃতদেহকে কবরে শুইয়ে রেখে তাঁর ছায়াকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই বাড়ির পাশে ছোট্ট চালা বানিয়ে সেখানে তাকে থাকতে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে সেই চালাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেই মৃত ব্যক্তির নাম ধরে তিনবার বলা হয়—

“পালাও! পালাও! তোমার ঘরে আগুন লেগেছে।”

এর পর এই ছায়া বা আত্মাকে খাবার, জল, হাঁড়িয়া সব দেওয়া হয়।

খাদ্য ও পানীয়- মুণ্ডাদের খাদ্যের মধ্যে ভাত খুব একটা খাওয়া হয়না তারা ফাল্গুন মাস থেকে কিঁওন্দ্‌ গোল গোল একরমের হলুদ রঙা ফল মিষ্টি খেতে, পেয়ারার মতো, জঙ্গলে হয় সেটি খায়। ভেলোয়া খায়, চিরাঞ্জীদানা খায়। ডুমুর খায়, কুসুম ফল খায়, মহুয়ার ফল খায়। মহুয়া হলো তাদের কাছে দুঃখের দিনের সাহারা। তাই মুণ্ডারা প্রতিটি মহুয়া গাছের তলাতে পাহারা বসিয়ে রাখে রাতে দিনে। মহুয়া শুকনো করে রাখে। যখনই প্রয়োজন হয় তখনই সিদ্ধ করে খায়। এছাড়া শালগাছের ফলও মহুয়ার মতো করে থেতো করে সিদ্ধ করে শুকিয়ে রাখে। কাঁটালের ভূতিকে গাই-বয়েল-বক্‌রী-মুরগী দিয়ে হাঁড়িতে সিদ্ধ করে নুন দিয়ে খায়। এই কাটাল খায় প্রায় তিন মাস। তবে কাটাল কাঁচা ও পাকা দুইরকমই খায়। চৈত্র থেকে আষাঢ় পর্যন্ত এই কাটাল খেয়ে থাকেন। এছাড়া জঙ্গলে নানারকমের শাক হয় তাঁর নাম কয়নার। গরমের সময়ে শাক দশ ফিট মতো লম্বা গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে নুন লঙ্কা পেঁয়াজ রসুন দিয়ে খায়। কুলও খায় কাঁচা পাকা দুই রকমের। পুটকাল শাক, কুদরুম শাক, সান্নাই ফুল, উরিত ডাল, কাড়ুয়া, বাজরাররুটি ইত্যাদি খেয়ে থাকেন এইখানকার মুণ্ডারা। তবে উৎসবের ভাত জোটে সকলের। এছাড়া ভাদ্র থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত মাড়ুয়ারুটিও খায়। আর পানীয় বলতে হাঁড়িয়া, মহুয়ার মদ। তবে বেশির ভাগ হাঁড়িয়ায় খাই। নারী পুরুষ উভয়েই। মুণ্ডাদের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ সবেতেই হাঁড়িয়া লাগে।

বিশ্বাস ও সংস্কার- মুণ্ডারা মনে করেন যে তারা যে স্বপ্ন দেখেন তা সত্যি হয়। তাদের কাছে স্বপ্ন ব্যাপারটা অনেক গভীর ও গোলমেলেও। স্বপ্ন দেখার সময়ের কিছু ভাগ আছে। তাতে সুখবর ও দুঃখের খবর রয়েছে। রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে মানুষে তাঁর প্রভাব সুদূর প্রসারী, সেই স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। মুণ্ডা সমাজের স্বপ্নের মধ্যে অনেক সংকেত পাওয়া যায়। যেমন মুণ্ডাদের কোনো শিশু জন্মাবে তাঁর আগে যদি স্বপ্ন দেখে তাঁর আপনজনে যে, একটি নদনদে পাকা কাটাল ফেটে গিয়ে আপনা থেকেই তাঁর কোয়া গুলো বেরিয়ে পড়লো, তবে বুঝতে হবে স্বাভাবিক প্রসব। আবার যদি কেউ দেখে যে একটি এঁচোড়কে মধ্য দিয়ে চেরা হয়েছে তাহলে বুঝতে হবে যে গর্ভপাত হবে। কেউ যদি স্বপ্নে দেখে যে কোনো নদী পার হয়ে চলেছে বা কোনো মেয়ে জলের ঘড়া নিয়ে হেটে যাচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে ভাগ্য নাকি প্রসন্ন। স্বপ্নে পরিষ্কার জল মানে চোখের জলও হতে পারে। যদি কেউ নতুন কাপড়-চোপড় পাওয়ার স্বপ্ন দেখে তাহলে সেই স্বপ্নের মানে হতে পারে যে সে সাসানডিরিতে গিয়ে নতুন জামাকাপড় পড়ে কবরের মধ্যে শোওয়ার সময় এসে গেছে। যদি কেউ ফুল পাঠায় তবে এই স্বপ্নের খারাপ দিক কেটে যায়। চাটান মুণ্ডা যে স্বপ্ন দেখেছিল তাঁর নাম ‘কুমু-সিতিরকাড’ স্বপ্ন। সে শুকনো জঙ্গলের মধ্যে অনেকখানি হেটে গিয়ে একজন মানুষের দেখা পেয়েছিলো। সেই মানুষটির চোখের দৃষ্টি অসাধারণ তীক্ষ্ণ। চাটান স্বপ্নের মধ্যে সোনার কথা জেনেছিল। চাটান দেখেছিল দুমুঠি ভরা সোনা। মুণ্ডারা স্বপ্নে বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে রোয়াতে এবং সিঙ বোঙাতে।

মুণ্ডারা ভুতের বিশ্বাস করেন। তাদের কাছে অনেকরকম ভূতের নাম রয়েছে। চাণ্ডি-চুরিণ এর ভূত। চাণ্ডি হচ্ছে পুরুষ ভূত আর চুরিণ হচ্ছে মেয়ে ভূত। ওরা গাছে থাকে। এছাড়াও রয়েছে খুটকাট্টি ভূত, বুড়ুবোঙ্গা, ইকিরবোঙ্গা, মায়াভূত ইত্যাদি। তবে এই ভূতের নাম অনুযায়ী যাদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় মানে বাঘে খায় বা আগুনে পুড়ে মরে তাদের মুণ্ডারী ভাষাতে বলে মূয়া – মোসাঙ্কা। আবার যদি কোনো গর্ভবতী মেয়ে আগুনে পুড়ে বা দুর্ঘটনায় মারা যায় তবে তাঁর আত্মাও মূয়া মোসাঙ্কা হয়ে যায়।

ধর্মবোধ- ঝাড়খণ্ডের মুণ্ডা জনজাতিরা ছিলেন ধর্ম ভীরু তদের দেবতা ছিল হারাম। তারা ভগবান হারামের পূজা করেন। মুণ্ডাদের প্রভু হারামকে নিয়ে কবিতা—

“নেতালাং সিঙবোঙা দৈবী রাজা

তোয়ালেকাম্‌ তুর্‌তানা, দাইলেকাম্‌ হাসুর্‌তানা

আমগে আঙ্গ-মারাঙ্গলেনা, আম্‌গে তুর-মারাঙ্গলেনা,

ভিরিলেকা কুরাম্‌টেমা, পারাঙ্গলেকা সুপুটেমা,

হুন্দিবা ডাটাটেমা, উপল্‌-বা-কিউয়াটেমা।”

 

যার মানে হলো, ও সিঙবোঙা, তুমি দৈবী-রাজা। পরম সখা। তুমি দুধের মতো উদিত হও আর দইয়ের মতো অস্তমিত। তুমিই প্রথম ঊষা, তুমিই প্রথম ঘুম-ভাঙা প্রাণ, তোমার বুক হলো পাথরের মতো, তোমার বাহু অনেক গাছের ডালের সমষ্টির মতো, তোমার দাঁতগুলি সব জুঁইফুল, আর পদ্মফুলের মতো তোমার চিবুক। তোমার কান দুটি হাতির পত্‌পতানো কানের মতো বড় বড়। একটি নীল সুতো বেয়ে তুমি ওপরে উঠে যাও আর প্যাঁচ খুলে-খুলে আবার নেমে আসো, হে সিঙবোঙা।

মুণ্ডারা মনে করতো হারাম প্রভুই তাদের সব দিয়েছেন। আকাশে মেঘ দিয়েছেন, বৃষ্টি দিয়েছেন, বলদ আর মোষ দিয়েছেন। লাঙল আর বীজ দিয়ে চমৎকার ফসল দিয়েছেন। তবে মুণ্ডারা বিরিসা মুণ্ডাকেও ভগবান মনে করেন। বিরিসা মুণ্ডাকে নিয়ে তাদের অনেক গানও রয়েছে। মুণ্ডারা ভূতের খুব ভয় করতেন তাই তারা বুড়ুবোঙ্গা, ইকিরবোঙ্গা, চাণ্ডি-চুরিণ, মূয়াভূত এবং জলের ভূত নাগেবোঙ্গার পুজো দিতেন।

ঔষধ- মুণ্ডাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অত উন্নত ছিলনা। তারা কিছু ভেষজ ঔষূধের ব্যবহার করতেন। যেমন পেট খারাপ হলে আমের পসরা বা শিমুল গাছের ছিলকা ছেঁচে রসকরে খেতেন। হজম না হলে কালমেঘ এর রস খেতেন। ঠাণ্ডা লাগলে বা জ্বর হলে গোল মরিচ আর রসুন সর্ষের তেলের সঙ্গে গরম করে শরিরে মালিশ করতেন। মাথা ব্যাথা করলে বাঁশপাতা, পেয়রার পাতা, গোড়বাজ ঘাস একসঙ্গে বেটে নিয়ে কপালে ন্যাকড়ার ফালি দিয়ে বাধতেন। হাত-পা মচকে গেলে হাড়কাঙ্গালির ছাল ও কাড়ুয়ার তেল গরম করে শালের পাতায় দিয়ে ন্যাকড়া দিয়ে বাধতেন।

উপন্যাসে চাটান মুণ্ডা সমাজের কোনো কিছুই মানেনি। সে ভালোবেসেছে মুঙ্গরীকে, মুঙ্গরী সম্পর্কে তাঁদেরই রক্তের মধ্যে। চাটান তাঁদের সমাজের আল ভেঙ্গেছে। চাটান স্বপ্নে সোনা পেয়েছে। বাস্তবে সেই সোনার সন্ধানে গিয়ে সত্যি সে সোনা পাই। মুঙ্গরীর সাথে সেই সোনা নিয়ে অন্য কোথাও সংসার পাতার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু মুণ্ডা সমাজে লোভ সবথেকে বড়ো পাপ। তাই জঙ্গলের মধ্যে সোনা উদ্ধার করতে গিয়ে দাবানলের মুখে পড়ে তাঁদের মৃত্যু হয়।

 

 

 

 

তথ্যসূত্র:-

১। গুহ, বুদ্ধদেব, ‘ঋভু’ চারপর্বে একত্রে, দেজ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ: কলকাতা পুস্তকমেলা, জানুয়ারি ২০০৬, মাঘ ১৪১২, পৃষ্ঠা.৩৩৭

২। গুহ, বুদ্ধদেব, ‘ভাবার সময়’, পরিবেশক দে বুক স্টোর, ১৩, বঙ্কিম চার্টাজী, কলকাতা-৭৩, প্রথম প্রকাশ ১লা বৈশাখ ১৩৬৮, পৃষ্ঠা.১০৮

৩। গুহ, বুদ্ধদেব, ‘সাসান্‌ডিরি’, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, বেনিয়াটোলা লেন কলকাতা ৭০০০০৯, প্রথম   সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৯০, পৃষ্ঠা.৩৩

৪। তদেব, পৃষ্ঠা.৭১

৫। তদেব, পৃষ্ঠা.১১০

৬। তদেব, পৃষ্ঠা.৬০