Associate Professor, Department of Music, Tarakeswar Degree College
e-mail-dr.ssen8693 @gmail.com Mobile no- 6290855102
Abstract
Amritalal Basu (1853–1929) occupies a significant place in the history of nineteenth- and early twentieth-century Bengali theatre as an accomplished actor, playwright, director, theatre administrator, and dramatist of remarkable versatility. As one of the pioneering figures associated with the development and reform of the public stage in Bengal, he contributed substantially to the growth of modern Bengali theatre. Though a disciple of Girish Chandra Ghosh, Basu developed an independent dramatic voice, particularly distinguished by his mastery of satire, farce, and comic drama.
His dramatic corpus encompasses historical, mythological, romantic, and social plays; however, his enduring reputation rests primarily on his satirical farces that targeted contemporary socio-political hypocrisy, pseudo-reformism, blind imitation of the West, religious dogmatism, and opportunistic nationalism. Through sharp wit, musical interludes, multilingual songs (Bengali, Hindi, and English), and structurally innovative dramaturgy—often revealing thematic intent through prologues and songs—Basu transformed farce into a powerful vehicle of social critique.
His adaptations of Bankimchandra Chattopadhyay’s novels and his incorporation of song as an essential dramatic device further expanded the aesthetic scope of Bengali theatre. Honoured with the epithet “Rasaraj” (King of Humour), Amritalal Basu’s works transcend the immediate concerns of his time and continue to illuminate the dynamics of satire, nationalism, and theatrical modernity in colonial Bengal.
Keywords
Amritalal Basu; Bengali Theatre; Satire; Farce; Colonial Bengal; Girish Chandra Ghosh; Social Reform; Nationalism; Musical Drama; Dramatic Adaptation; Rasaraj; Nineteenth-Century Drama.
নট ও নাট্যকার অমৃতলাল বসু : ঊনবিংশ শতকের বাংলা নাট্যমঞ্চে ব্যঙ্গ-রসের স্বতন্ত্র ধারা
বাংলা নাটকের ইতিহাস যে সব নট ও নাট্যকারদের ছাড়া অসম্পূর্ণ তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অমৃতলাল বসু (Amrita Lal Basu)। নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালকের ভূমিকায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা বাংলা থিয়েটারকে প্রভূত সমৃদ্ধ করেছিল। ঊনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকের গোড়ায় নাটক ও নাট্যশালার ইতিহাসে অমৃতলালের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সাধারণ রঙ্গালয়ের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং রঙ্গালয়ের সংস্কার ও উন্নতির একনিষ্ঠ পোষক। রঙ্গালয়ের দক্ষ অধ্যক্ষ ও যোগ্য নাট্যশিক্ষকরূপেও তাঁর কৃতিত্ব ছিল অসামান্য। তিনি যে কেবল নট ও নাট্যকার ছিলেন এমন নয়, কবি ও গল্পলেখক, উপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক, বাগ্মী ও সামাজিক এবং শিক্ষানুরাগী ও দেশপ্রেমিকরূপেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। তাঁর বিভিন্নমুখী প্রতিভায় ও বিচিত্র ব্যক্তিত্বে সমাজের সকল স্তরের জ্ঞানী ও গুণীব্যক্তি সকলেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন। একালের বাঙালি পাঠকের কাছে তিনি বিশেষ করে প্রহসন-রচয়িতা রূপেই পরিচিত।
যে সমস্ত অভিনেতা নটগুরু গিরিশচন্দ্রের সংস্পর্শে এসে তাঁর শিষ্যত্ব স্বীকার করেছিলেন অমৃতলাল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। গিরিশচন্দ্রের শিষ্য হলেও নাটক রচনা বিষয়ে অমৃতলাল স্বতন্ত্র পথ অবলম্বন করেছিলেন। গিরিশচন্দ্রের ভাবনিষ্ঠ, তত্ত্বসন্ধানী দৃষ্টি জীবনের গূঢ় এবং গভীর বিষয়ে নিবিষ্ট থাকত। কিন্তু তরল ও হালকা জীবনের বিপর্যয় এবং বিকৃতির দিকে অমৃতলালের তীক্ষ্ণ এবং বক্র দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, তার প্রতিভার উৎস হচ্ছে হাস্যরস। এই উৎস থেকে অজস্র ধারা নির্গত হয়ে তার রচনাবলীকে স্নিগ্ধ ও সিক্ত করে রেখেছে। অমৃতলাল বসু ‘নবযৌবন’ ‘ব্যাপিকাবিদায়’-এর মতো রোমান্টিক নাটক কিংবা ‘তরুবালা’, ‘হরিশ্চন্দ্র’, ‘যাজ্ঞসেনী’ প্রভৃতি পৌরাণিক নাটক, কখনও বা পারিবারিক নানা স্বাদের নাটক রচনা করলেও তাঁর আসল পরিচয় মূলত ব্যঙ্গ নাটক, রঙ্গ-কৌতুক, প্রহসন রচনায়। রসরাজ অমৃতলাল বসু নাট্যকর্মে হাস্যরসকে উচ্ছলিত করে তুলেছিলেন। ‘বাবু’ নাটকে বিধবা বিবাহ, বিধবা – বিবাহার্যে নিতান্ত একটি হাস্যকর অসঙ্গত ব্যাপার তাকেই দেখাতে চেয়েছেন। ‘তরুবালা’ নাটকে অমৃতলাল বাল্যবিধবার ব্রহ্মচর্য ও কৃচ্ছতাকে গৌরবান্বিত করেছেন। তার নিষ্ঠুর রক্ষণশীলতার সর্বাপেক্ষা শোচনীয় দৃষ্টান্ত ‘একাকার’ প্রহসন। গিরিশ ঘোষের মতোই তিনি একাধিক উপন্যাসের নাট্যরূপ দান করেছিলেন। অমৃত লাল বসু ব্যাঙ্গার্ত নাটক রচনার মাধ্যমে বাঙালি শ্রোতা দর্শককে হাস্যরস দান করতে ব্রতী হয়েছিলেন।
সমকালীন সমাজের বিশিষ্ট পুরুষদের বিদ্রুপ করবার দুঃসাহসে অ্যারিস্টো ফেনিসের সাথে তার তুলনা চলে। অ্যারিস্টোফেনিস যেমন আক্রমণ করেছিলেন শক্তিধর ক্লেওনকে, বিদ্রুপে বিপর্যস্ত করেছিলেন বন্ধু সক্রেটিসকে, শান্ত কৌতুকের খোঁচা দিয়েছিলেন নাট্যকার ইউরিপিডিসকে -অমৃতলালও তেমনি রঙ্গে-ব্যঙ্গে–আঘাতে জর্জরিত করেছিলেন সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সমাজপতিও ধর্মব্যবসায়ীদের। অমৃতলালের ব্যঙ্গের আঘাত ও রসিকতার রস নিজের যুগেই আবদ্ধ নয় তা যুগের শঠতা, ভণ্ডামি ও পরিণামবুদ্ধিহীন নির্বোধ ক্রিয়াকলাপকেও স্পর্শ করেছে। রঙ্গালয়ের সদাব্যস্ত অধ্যক্ষ, নট, নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক হয়েও সাহিত্যের সব বিভাগেই তিনি তাঁর কুশলী লেখনী চালনা করেছিলেন। দেশব্যাপী তাঁকে ‘রসরাজ’ আখ্যা দিয়েছিলেন রসাস্বাদ করে।
প্রহসন রচয়িতা রূপে সমাধিক পরিচিত হয়েও ‘রসরাজ’ আখ্যা লাভ করলেও অমৃতলাল কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটকও রচনা করেছিলেন। তার সাতটি নাটক গ্রন্থাকারে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই সাতটি নাটক রচনা রীতিতে একটি অপরটি থেকে স্বতন্ত্র। হীরকচূর্ণ( ১৮৭৫), হরিশচন্দ্র(১৮৯৯), যাজ্ঞসেনী (১৯১৮), তরুবালা( ১৮৯১), বিজয় বসন্ত( , ১৮৯৩), আদর্শ বন্ধু( ১৯০০),‘নবযৌবনে’( ১৯১৪) প্রভৃতি এই শ্রেণীর নাটক। ‘হীরক চূর্ণ’ নাটক সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে রচিত, ‘তরুবালা’ ও ‘খাস দখল’ নাটকে সমাজচিত্র অঙ্কিত হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য ভিন্ন , ‘বিমাতা বা বিজয় বসন্ত’ নাটকের বিষয়বস্তু রূপকথা থেকে গৃহীত, ‘আদর্শ বন্ধু’ গ্রীক উপাখ্যানের ছায়ায় জল্পিত, ‘নবযৌবনে’ রোমান্টিক সমাজচিত্র প্রতিফলিত এবং পৌরাণিক নাটক ‘যাজ্ঞসেনী’ মহাভারত অবলম্বনে রচিত। নাটকে গান সংযোজনা করে তিনি নাটকের মাত্রা বৃদ্ধি করেছিলেন।
রঙ্গালয়ের অধ্যক্ষ হয়েই তিনি নাটক রচনায় মন দেন । গ্রেট ন্যাশনালে অমৃতলালের প্রথম প্রহসন ‘চোরের উপর বাটপাড়ি অভিনীত হয়’ । অমৃতলাল এই প্রহসনে কর্তার ভূমিকায় অভিনয় করেন। তাঁর অধিকাংশ প্রহসনেরই প্রতিপাদ্য পূর্বেই ‘প্রস্তাবনা’,‘নান্দী’, অথবা ‘সূচনা’র গানে জানিয়ে দেওয়ার রীতি দেখা যায়। তার অধিকাংশ প্রহসন সমসাময়িক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত, গল্প গৌণ, চরিত্রই প্রধান হলেও অমৃতলালের হাস্যরস তীব্র তীক্ষ্ণ চাবুকের মতো আমাদেরকে আঘাত করে, আঘাতের বেদনায় আমাদের স্বাভাবিক আনন্দময় হাসি কাষ্ঠহাসিতে পরিণত হয়। ইংরেজিতে যাকে Satier বলে তার বেশিরভাগই প্রহসন – এই শ্রেণীভুক্ত। হীরক চূর্ণ অভিনীত হওয়ার পর অমৃতলালের অধ্যক্ষতায় একে একে ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’, ‘শরৎ সরোজিনী’, ‘প্রকৃত বন্ধু’, ‘ সরোজিনী’ প্রভৃতি নাটক অভিনীত হয়। বেঙ্গল থিয়েটারে থাকাকালীন ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর অমৃতলাল এর ‘ ডিসমিস’ প্রহসনটি অভিনীত হয় । অমৃত লাল কৃষ্ণনাথ বাবুর ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে তার ‘ব্রজলীলা’ (নাট্যরাসক) বেঙ্গল থিয়েটারে সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়।
স্বার্থান্বেষী দেশনেতা, বাকসর্বস্ব ‘ভারত সন্তান’, সদাচার ভ্রষ্টা ইংরেজি শিক্ষিতা নারী, জাতিগত-বৃত্তি পরিত্যাগকারী, ভন্ড সমাজসংস্কারক, ভন্ড ধার্মিক, হুজুগপ্রিয় যুবক সকলেই তার বিদ্রুপের লক্ষ্য। ‘অমৃতবাজার’, ‘সাধারণী’ প্রভৃতি জাতীয় পত্রিকায় তাঁর স্বদেশী মনোভাব তীব্র ভাষায় ধ্বনিত হয়েছে। অমৃতলালের লেখায় গানের বাহুল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাঙালি দর্শকের চাহিদা অনুসারেই তিনি এত বেশী গীত সন্নিবেশিত করেছেন। মাঝে মাঝে ছড়ার আকারে পদ্য রচনা, গান এবং ছড়া রচনা সরসতা বৃদ্ধির জন্যই ব্যবহার হয়েছে।
বাইশ বছর বয়সের লেখা অমৃতলালের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘হীরক চূর্ণ’। অমৃতলাল সমসাময়িক পত্রিকা থেকে নাটকের উপকরণ সংগ্রহ করে এবং কয়েকটি কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করে ‘হীরক চূর্ণ’ নাটক রচনা করেন। নাটকটি সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে রচিত। নাটকে অমৃত লাল অবতীর্ণ হন এডভোকেট জেনারেল মিঃ স্কোবলের ভূমিকায়। নাটকে জনৈক উদাসীকে দিয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি’ গানটি গাওয়ানো হয়েছে। অমৃতলালের পৌরাণিক নাটকে গান কম। অমৃতলাল বসু তিনটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন। ব্রজলীলা, কলঙ্কভঞ্জন গীতিনাট্য দুটিতে ব্যবহৃত গানে বৈষ্ণবপদসংগীতের মাধুর্য লক্ষ্য করা যায়। এই গীতিনাট্যের গান সেকালে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
রূপকথার কাহিনীর উপর ভিত্তি করে রচিত নাটক ‘বিজয় বসন্ত’। কামান্ধা প্রতিহিংসাময়ী বিমাতা দুর্জয়ময়ীর চরিত্র তীব্র বাস্তবতাপূর্ণ। সপত্নীপুত্রের প্রতি তার প্রেম-নিবেদন নাটকটি গিরিশচন্দ্রের ‘পূর্ণচন্দ্র’ নাটকের প্রভাবে রচিত। নাটকের অনেকগুলি গান, যেগুলি বিজয় ও বসন্তের। এই গানগুলো তাদের বয়স ও স্বভাবের উপযোগী ভাষাতেই রচিত। দুর্লতার একটি গানে ‘আমার আল্লাদে প্রাণ আটখানা’ কিছুটা আসলে সৃষ্টি করেছে। দুর্বুদ্ধি ও তার মোসাহেবদের হিন্দি গানটিতে অমৃতলালের হিন্দি ভাষায় অধিকারের পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ দৃশ্যে তপোবনে সুললিত সংস্কৃত ভাষায় রচিত গীতটিতে গীতগোবিন্দের মত অনুপ্রাসের ঝঙ্কারও লক্ষ্য করা যায় ।
‘আদর্শ বন্ধু’ গিরিশ চন্দ্রের আদর্শে রচিত নাটক। অমৃতলাল এই নাটকে গৈরিশছন্দ ব্যবহার করেছেন, তাঁর নাট্যগুরুকে অনুকরণ করে তিনি এক অতিবিকৃত, কৃত্রিম এক হাস্যকর ছন্দ উপস্থাপন করেছেন। নাটকের মূল ভাবটি বিদেশি সাহিত্য থেকে সংগৃহীত হলেও, যেভাবে ভারতীয় পটভূমিতে ‘ভায়াত’ ও স্বৈরাচারের দ্বন্দ্বে ঘটনাবলী স্পষ্ট হয়েছে এবং যেভাবে বিভিন্ন চরিত্রের রূপায়ণ হয়েছে তাতে নাটকটি এক প্রকার মৌলিক রূপ লাভ করেছে। ‘আদর্শ বন্ধু’ নাটকের অমৃতলাল যখন প্রজাতন্ত্রের প্রাধান্য দেখিয়েছিলেন তখন স্বরাজ-আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাতের পূর্বে সাহিত্যে জাতীয়তাবোধের প্রতিফলন, তার ইতিহাসও নাটকটিতে পাওয়া যায়।
‘খাস দখল’ তরুবালার মতই একটি উদ্দেশ্যমূলক সামাজিক নাটক। ‘খাস দখলে’র মধ্যে সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ থাকলেও এতে কাহিনীর আগ্রহোদ্দীপকতা ও চমৎকারিত্ব অক্ষুণ্ণভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অটুট। ঘরের বউ লেখাপড়া শিখে এক অদ্ভুত রোমান্টিক প্রকৃতি আয়ত্ত করে – মোক্ষদা তারই উদাহরণ। নাটকে পত্নীত্যাগী কাব্য বিলাসী মোহিতকে ও বিধবা-বিবাহের পক্ষপাতীদের উপহাস্য চরিত্ররূপে সৃষ্টি করা হয়েছে, নাটকে চিকিৎসকের সম্পর্কে বিদ্রুপ করা হয়েছে। আবার মোক্ষদার কাহিনীর পাশে কুসুমকোমলা গিরিবালার রহস্যময় আখ্যান মৃদু সৌরভের মত অগোচরে প্রাণে আনন্দের সঞ্চার করে। ‘কলির প্রধান রাজ্য কলকাতায়’ দেশহিতৈষণার নামে শিক্ষিতদের যে ভন্ডামি চলছিল তার ব্যাঙ্গোজ্জ্বল রূপ দেখতে পাওয়া যায় নাটকের ‘পূর্বরঙ্গে’। কলিকামিনীগণের গীতটিতেও নাট্যকারের অভিপ্রেত শ্লেষ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
১৩৩৯ সালের ‘নাট্য মন্দির’ পত্রিকায় অমৃতলালের ‘আশার নেশা’ নামে যে নাটকের সূত্রপাত হয়েছিল, তা ১৩২০ সালে ‘নবযৌবন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ‘নবযৌবন’ একটি উচ্ছ্বল প্রাণময় সরস কৌতুকোজ্জ্বল রোমান্টিক কমেডি। কাহিনীগত রহস্য নাটকের পরিণতি পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। এতে মধুর প্রণয়লীলার কোমল বারিপ্রবাহের উপর বিদগ্ধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসের আলোকসম্পাত হওয়াতে বিশেষ চমৎকারিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সুকুমার-তিলকচাঁদ ও অলকা-বসন্তকুমারের পরস্পর–সংলগ্ন কাহিনীদ্বয় নাটকের আকর্ষণ উপভোগ্যতা বাড়িয়েছে। দুটি অভিন্নমুখী ধারা এই নাটকের কাহিনীর মধ্যে বৈচিত্র্য এনেছে। এই নাটকেও গান ব্যবহৃত হয়েছে। নাটকে গানের সংখ্যা চব্বিশ। নাটকের সংস্কৃত শ্লোকগুলো সুপ্রযুক্ত। গানগুলো অধিকাংশই লঘু ও কৌতুক-তরল। যেমন ভজনলালের একটি গান-
মেয়েটি কিছু মদ্দ মদ্দ।
যেন ফুলের মধ্যে রাধা পদ্ম।।
রংটা কিছু চড়া চড়া, গন্ধ কিছু কড়া কড়া,
পাপড়ী কিছু ছাড়া ছাড়া, যেন ফুটতে ফুটতে বদ্ধ।। ১
অমৃতলালের পরিচালনায় ‘নবযৌবন’ সুঅভিনীত হয়ে দর্শক সমাজে সমাদৃত হয়েছিল।
১৩৩৫ সালে অমৃতলালের শেষ নাটক ‘যাজ্ঞসেনী’ প্রকাশিত হয়। মিনার্ভা থিয়েটার (২২ শে বৈশাখ ১৩৩৫) ‘যাজ্ঞসেনী’ প্রথম অভিনীত হয়।‘যাজ্ঞসেনী’ গিরিশচন্দ্রের পৌরাণিক নাটকের অনুরূপ পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে লিখিত নাটক। গিরিশচন্দ্রের মত অমৃতলালও গদ্য, পদ্য, উভয় ভাষাই ব্যবহার করেছেন। মহাভারতের অনুকরণে লেখা কৌরব ও পাণ্ডবগণের বিবাদমূলক কাহিনী সম্বলিত নাটক ‘যাজ্ঞসেনী’। মহাভারতের চিরপুরাতন চিরমধুর কাহিনীটি নাটকের মধ্যে দিয়ে নতুন রূপে ফুটে উঠেছে। দর্শক সমাজে ‘যাজ্ঞসেনী’ বিশেষ সমাদৃত হয়েছিল। কৃষ্ণের চরিত্রের উপর বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ কৃষ্ণচরিত্র’ ও নবীন সেনের কৃষ্ণের প্রভাব রয়েছে।
‘চোরের উপর বাটপারি’( ১৮৭৬), ‘ডিসমিস’( ১৮৮২), ‘তাজ্জব ব্যাপার’( ১৮৯০), ‘চাটুজ্যে ও বারুজ্যে’তে গান নেই। ‘ডিসমিস’এ একটি মাত্র নেপথ্য সংগীত আছে। ‘চোরের উপর বাটপারি’তে গান আছে তিনটি। ‘কৃপণের ধন’-এ গান আছে চারটি। ‘তাজ্জব ব্যাপার’এ গান আছে এগারোটি। নাট্যকার এটিকে গীতিরঙ্গ বলেছেন। এখানে নারী স্বাধীনতা নিয়ে রঙ্গ করা হয়েছে।
অমৃতলাল বসুর বিদ্রুপাত্মক প্রহসনের মধ্যে রয়েছে ‘তিলতর্পণ’( ১৮৮১),’সম্মতি সংকট’ 1891), ‘রাজা বাহাদুর’( 1891), ‘অবতার’( ১৯০১), ‘ব্যপিকা বিদায়’( ১৯১৬), ‘দ্বন্দ্বে মাতনম’(১৯২৬), ‘বাহবা বাতিক’ প্রভৃতি। এই সব নাটকে স্ত্রীস্বাধীনতা, স্ত্রী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ, ব্রাহ্মসমাজ প্রভৃতি নানা বিষয়ে চিত্তাকর্ষকভাবে বিদ্রুপ করা হয়েছে। এসব রচনায় গদ্য সংলাপের পাশাপাশি বিশেষভাবে গান ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি মিশ্রণে রচিত গানের ব্যবহার নাটকে লক্ষ্য করা যায়। ‘কালাপানি’ নাটকে বিলেত যাত্রাকে ব্যঙ্গ করে রচিত গানের মধ্যে অমৃতলালের একটি গান জনপ্রিয় হয়েছিল-
আমাদের আর সাহেব হবার বাকি কি
বাবারা সব চলল বিলাত
আমরা শিখি এ বি সি।
ফুট ফাট গড়ের মাঠ হেট কোট পেন্টেল আঁট
চট করে চাঁদপাল ঘাট টলে টলে টলেছি।
খেলে মুরগি ভাতে ভাত
আর যাবে না কো জাত
দাদারা সব ক্ষুদে সাহেব, দিদিমণি বিবিটি।
জাহাজেতে করবো পূজো, ইংরেজি মা দশভুজো
সাহেব কেষ্ট সাহেব বিষ্নু বোম ভোলানাথ বিলাতী
সাহেব হব হিন্দু রব বাবাদের কি বুজরুকি। ২
‘সাবাস আটাশ’ (১৮৯৯), ‘নবজীবন’(১৯০১), ‘সাবাস বাঙালি’(১৯০৫), অমৃতলালের স্বদেশী নকশা নাটকেও গানের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সাবাস বাঙালি নকশায় স্বদেশী আন্দোলনের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন দেখা যায়। বিদেশি বর্জনের প্রবল অভিপ্রায় ধ্বনিত হয়েছে এই গানটিতে-
পাঁশ চাপা দাও পাশ করাতে
পুড়িয়ে ফেল কেতাব
দায় পড়া রায় বাহাদুর বুড়িয়ে দাও খেতাব
আর পরের পোশাক পরে
করোনা মুখ কালা ।
ধিক ধিক ধিক বি-এ এম -এ পাশ
ডবল সেলাম দিয়ে গোলামীর আশ
ধিক সে মামলা ধিক সে সামলা
ধিক সে আমলা – দেশের জঞ্জাল জ্বালা।
পেয়ে বড় ব্যথা ফিরেছ গো ঘরে
ঘরে নিতে চাই বড় গো আদরে
চিরদাসী মোরা, স্নেহ প্রাণ ভরা
ঘর করে দেব আলা
নেব দেশীটুকু বারাণসী বোলে
গাব বঙ্গ মাতার জয়, জয় বাঙলা। ৩
অমৃতলালের বেশিরভাগ প্রহসনকেই আপাতদৃষ্টিতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের সমষ্টি মনে হলেও দৃশ্যগুলোর মধ্যে এমন একটি সূক্ষ্ম সূত্রের যোগ আছে যে, শেষ দৃশ্যে এসে সামগ্রিক বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। অনেক সময় একটি মাত্র গানই একটি দৃশ্য। কিন্তু সেই গানেও প্রহসনের মূল সুর ধ্বনিত হয়েছে। এই বিশিষ্ট রীতি অন্য কারো প্রহসনে লক্ষ্য করা যায় না। তাঁর অধিকাংশ প্রহসনেরই প্রতিপাদ্য পূর্বেই ‘প্রস্তাবনা’, ‘নান্দী’, অথবা ‘সূচনা’র গানে জানিয়ে দেওয়ার রীতি দেখা যায়। তার অধিকাংশ প্রহসন সমসাময়িক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত বলে গল্প গৌণ, চরিত্রই প্রধান। স্বার্থান্বেষী দেশনেতা, বাকসর্বস্ব ‘ভারত সন্তান’ সদাচার ভ্রষ্টা ইংরেজি শিক্ষিতা নারী, জাতিগত-বৃত্তি পরিত্যাগকারী, ভন্ড সমাজসংস্কারক, ভন্ড ধার্মিক, হুজুগপ্রিয় যুবক, বেকার ভোটভিক্ষু ইত্যাদি সকলেই তার বিদ্রুপের লক্ষ্য। অমৃতলালের নাটক প্রহসনে বিদেশী প্রভাব আছে যা কৃতিত্বপূর্ণ বিশ্বাসযোগ্যতায় আপন সমাজের অঙ্গীভূত হয়েছে।
উপন্যাসের নাট্যরূপ দানেও অমৃত লাল কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। তিনি মোট চারটি উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিলেন- ‘স্বর্ণলতা’( ১৮৮৮), ‘চন্দ্রশেখর’( ১৮৯৪), ‘রাজসিংহ’(১৮৯৬),‘বিষবৃক্ষ’ (১৯০৪)। পৌরাণিক নাটক দর্শনে অভ্যস্ত বাঙালি সমাজকে ‘সরলা’র অভিনয়ের মাধ্যমে গার্হস্থ্য জীবনের বাস্তব সুখ দুঃখের সমস্যার সঙ্গে পরিচিত করে। অমৃত লাল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের( ১৮৭৫) নাট্যরূপ দান করেন ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে নাটকটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। নাটকটি পঞ্চাঙ্ক। নাটকের আখ্যানবিন্যাসে ও সংলাপ রচনায় উপন্যাসের ধারা অনুসৃত হয়েছে। উপন্যাসের সকল চরিত্রই নাটকে যথাযথভাবে চিত্রিত। নাটকের গান আছে কয়েকটি। তার মধ্যে দলনীর ‘আজু কাহা মেরি হৃদয়কি রাজা’ ও ‘কেন কেন কেন’ গান দুটিতে অমৃতলালের বিশিষ্টতা ফুটে উঠেছে। নাটকের প্রথম গানটি বঙ্কিমের বর্ণনা অনুযায়ী রচিত। শৈবলিন ও সন্তরণের বর্ণনা প্রসঙ্গে ভীমা পুষ্করিণীর জলের ‘তালে তালে নাচ’, ‘ঘন ঘন তালগাছের সারি, ‘ধাতুকলসি হস্তে জলের সঙ্গে ক্রীড়া’,‘সন্তরণ কুতুহলী ক্ষুদ্র বিহঙ্গম’, ‘বাহু বিলম্বিত অলংকার- শিঞ্জিত’ প্রভৃতি বিষয়গুলো গানে সার্থকভাবে প্রযুক্ত হয়েছে ।
অমৃত লাল বসু ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের (১৮৮১) নাট্য রূপদান করেন ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে। নাটকের পাঁচটি অঙ্ক ও নাটকে গান আছে সাতটি। তার মধ্যে দরিয়ার ও পানওয়ালীর গানে অমৃতলালের রচনারীতির ছাপ স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে।
অমৃতলাল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের নাট্যদান করেন ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে। নাটকটি পঞ্চাঙ্ক। নাটকে বঙ্কিমচন্দ্র রচিত গানগুলো ছাড়াও আরো ছটি গান আছে। তিনটি দেবেন্দ্র তিনটি হীরা গিয়েছে। হীরার গানে দেবেন্দ্রের প্রতি আসক্তি এবং দেবেন্দ্রের গানে মাতালের বাগভঙ্গি সার্থক অভিব্যক্তি লাভ করেছে। অমৃতলাল অনেক গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন, অনেক নাটক আদ্যন্ত সংস্কার করেছেন, প্রয়োজনে অন্যের নাটকে গান রচনা করেছেন । হরিশচন্দ্রের গানেও অমৃতলালের অনুপ্রাস লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
‘জানি জানি হে অনঙ্গ ,নারী প্রাণে তব অঙ্গ,
করে বালিকার ব্রত ভঙ্গ ঘুচাও তার অভিমান।’
কিংবা,
‘ভালা দুলাই দুলাইন,আঁখে আঁখে ভুলাইন,
যুবন মিলাইন রঙ্গত সঙ্গত সুহাগে গলাই।।’ ৪
ভাব, ভাষা ও ছন্দের সহজ প্রকাশে, ব্যঙ্গের আঘাত ও রসিকতার রসে অমৃতলালের নাটক হয়ে ওঠে হৃদয়স্পর্শী । বাঙালি তাঁর ‘রসরাজ’ উপাধির মধ্যে দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে, তাঁর কীর্তিকে স্মরণ করে। এখানেই তাঁর রসরাজ সৃষ্টির সার্থকতা, যা শুধু উপাধি নয়, একপ্রকার সম্মাননা।
তথ্যসূত্র
১। অমৃতলাল বসুর জীবনী ও সাহিত্য, পৃঃ-২০৬
২। বাংলা নাটকের গান, পৃঃ-২০৭
৩। বাংলা নাটকের গান, পৃঃ-২১০
৪। অমৃতলাল বসুর জীবনী ও সাহিত্য, পৃঃ-২১২
সহায়ক গ্রন্থ
১। ড. অরুণকুমার মিত্র – অমৃতলাল বসুর জীবনী ও সাহিত্য, নাভানা, ৪৭ গণেশচন্দ্র আ্যভিনিউ, কলকাতা ১৩
২। প্রভাতকুমার গোস্বামী – বাংলা নাটকে গান, ক্লাসিক প্রেস, কলকাতা, ১৯৭১।
৩। ড. অজিতকুমার ঘোষ –বাংলা নাটকের ইতিহাস, জানুয়রি, ২০০৫, প্রকাশক দে’জ পাবলিশিং
৪। অমৃতলাল বসু –অমৃত গ্রন্থাবলী (১ম ভাগ), বসুমতী সাহিত্য মন্দির, ১৬৬ বউবাজার স্ট্রীট, কলকাতা ১২ , ১৩৫৭