March 1, 2022

তোমার সুরে ভরিয়ে নিয়ে চিত্ত যাব যেথায় বেসুর বাজে নিত্য : আমার গুরুপ্রণাম

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য , বেঙ্গল মিউজিক কলেজ

শিল্পীজীবনের গোড়ার কথাটি শিক্ষা; শিল্পবিষয়টিকে ভালো করে জানতে বুঝতে শেখা, তার মূল ভাবের অধিগ্রহণ। সেই শিক্ষার ভিত্তি শৈশবেই। মনের নরম মাটি গড়েপিটে তোলেন প্রণম্য শিক্ষকগণ। লেখাপড়া শেখানোর পাশে পাশে তাদের জন্যে “নানা বিদ্যার আয়োজন” (জীবনস্মৃতি/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বিশ্বভারতী)— শিল্পীর জীবনগঠনে শিক্ষাগুরুর অবদান ভোলার নয়। এ কথা মনে করেই আজ আমার মতো এক অর্বাচীন শিক্ষার্থীর গুরুবন্দনার দিন। গুরুকে স্মরণের পুণ্যলগ্ন।

অগ্রেতে বন্দনা করি গুরুর চরণ ।। (লোকায়ত সংগ্ৰহ)

সবার আগে প্রণাম নিও বিদ্যাসাগর মশাই । প্রণাম নিও বেথুন সাহেব । প্রণাম নিও সে যুগের পিতৃ-প্রতিম সকল গুণীজন। আর প্রণাম নিও সকল কালের বাংলার মায়েরা।

তোমাদেরই জন্যে আজ এত স্পর্ধাভরে’ দু চার কথা লিখতে বলতে পারার সাহস আর শক্তি অর্জন করেছি, কলমে দু কথার যোগান এসেছে। নইলে, কবেই সতী হয়ে শেষ হতুম।

(প্রসঙ্গ সূত্র : করুণাসাগর বিদ্যাসাগর/ ইন্দ্র মিত্র/ আনন্দ পাবলিশার)

এ আমার একার কথা নয়। ১৭৫ বছরের একটা স্কুল। সম্মানের শ্রদ্ধার আর প্রাণ ভরা ভালোবাসার বেথুন স্কুল। তার অগণিত প্রাক্তন ছাত্রী। আমিও প্রাক্তনী। তাদের সকলের প্রতিনিধি হয়ে এই কথা আজ আমি বলছি । আমার স্কুলের এখনকার শিক্ষিকারা সেই মান দিয়েছেন আমাদের প্রাক্তনীদের। সেই ভালোবাসায় ডেকে নিয়েছেন। আমাদের কথা বলার জায়গা করে দিয়েছেন। তাঁদের প্রণাম জানাই। জানাই আন্তরিক শুভকামনা।।

এই ১৭৫ বছরে এত মেয়েদের স্কুলজীবন কাটানোর অনুভবগুলি মনে হয় অনেকটা একই রকম। মূল অনুভবগুলির রঙে রঙে অনেক মিল। একসঙ্গে পড়া, পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ার ছুটি, বিচিত্র সব হইচই, টিফিন বেলার খেলা, ভাগ করে টিফিন খাওয়া, প্রকৃতির মধ্যে প্রতিদিনের আনন্দযাপন, আর এমনি করে কবে যেন নিজের অজান্তেই ছোট্ট মেয়েটি থেকে কিশোরবেলা পেরিয়ে তরুণ যুবা হয়ে ওঠার গৌরব–  এ মনে হয় আমাদের সকলেরই কথা।

“আমারও আহ্বান ছিল যবনিকা সরাবার কাজে,

এ আমার পরম বিস্ময়।”

(জন্মদিনে-৫ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বিশ্বভারতী)

পরম গৌরবও তো! নিজমুখে নিজের কথা বলতে ভালো পারি না। কিন্তু স্কুলের কথা বলতে বসলে মুখের ভাষা ফুরোয় না। আমার সম্পূর্ণ স্কুলজীবন কেটেছে এই বেথুন কলেজিয়েট স্কুলে। এখানে আমি প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ১২ বছর সবটুকুই পড়েছি। একজন মানুষ তার জীবনের ৬ বছর বয়স থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময়পর্বে যেভাবে যেখানে গড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে সেই স্থান সেই পরিবেশই তো তার জীবনদর্শন তৈরী করে দেয়। বেথুন স্কুল সেই ভাবে আমাকে গড়ে তুলতে চেয়েছে।

জীবনব্যাপী এই বিস্তারের সূচনায় আছে  স্কুলের ওই বিশাল গেটখানা। প্রথম শ্রেণীর সেই ছোট্ট মেয়েটি গগনচুম্বী ওই তোরণদ্বারের উর্ধ্বসীমা মাথা উঁচু করে করেও দেখতে পেত না। বাবার হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে যাওয়া ভোরবেলায়…. গেট তখনো বন্ধ থাকতো। চারপাশে আরো অনেক ছোট মেয়ে ও তাদের অভিভাবকের দল অপেক্ষারত। একসময় দরজা খুলে যেত। তখন বুঝতে পারতাম না, এখন ভাবতে ভালো লাগে চোখের সামনে মহাবিশ্বের একটা উন্মোচন ঘটে যেত যেন। হয়তো বলতে ইচ্ছে করতো,

‘মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে

তোমার বিশ্বের সভাতে

আজি এ মঙ্গল প্রভাতে..’ (গীতবিতান/ বিশ্বভারতী)

সত্যিই চোখের সামনে পথ চলে গেল যেন অনির্দেশ্য সুদূরে, এক অপরূপ বনবীথি আশ্রয় করে। দুপাশ জুড়ে সুদীর্ঘ বৃক্ষরাজি অরণ্যের বিস্তার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনকে সর্বতোভাবে আকর্ষণ করে নিত এই স্কুলপ্রাঙ্গণ। আজকের ছাত্রীরাও নিশ্চয়ই সেই ভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে স্কুলের ভেতর!

কলকাতায় জন্ম এবং বেড়ে ওঠা আমার। তাই প্রকৃতির মাঝে নিজেকে পাওয়ার পরিবেশ বাইরে তেমন ছিল না। এই বেথুন স্কুল সেই বিশেষ সুযোগটি আমার কাছে এনে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের নানা ক্লাসে তো বটেই, ক্লাসের বাইরেও আপন মনে স্কুলপ্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ানো বা বসে  দাঁড়িয়ে গাছগুলির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কল্পনার নানা জগতে নিজেকে একেবারে ছেড়ে দেওয়া.. বৃক্ষশ্রেণীর এই সান্নিধ্য আমার মনকে পুষ্ট করেছিল। বটগাছে আমারও একটা নিজস্ব কোটর ছিল! সেই যে বাংলার ব্রতকথায় শুনেছিলুম প্যাঁচার ছানাগুলোকে আস্তে আস্তে ক্ষীর খাইয়ে দেবার গল্প…আমারও কল্পনার পাখিরা ওই কোটরে থাকতো! ক্ষীর খেত! গাছের আড়াল ধরে ধরে হারিয়ে যাওয়া যেত। মনে মনে গাছের ডালে ডালে নানা রঙে রঙিন কাপড় ঝুলিয়ে আপনমনেই মঞ্চ বাঁধা যেত! বন্ধুরা মিলে খেলাধুলো করা যেত।  গান বা গানের বাইরে আজও যখন প্রকৃতিচারণার কথা বলি, চোখ বন্ধ করলেই এই বেথুন স্কুলের গাছপালাকেই চোখের সামনে দেখি আজও। উত্তর কলকাতার কঠিন ট্রাম রাস্তার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্কুলটিকে দেখে সব সময়ে মনে হয়েছে

‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা

হেঁটে দেখতে শিখুন’।

(বাবুমশাই/ বাবরের প্রার্থনা/ শঙ্খ ঘোষ/ দেজ পাবলিশিং)

প্রতিদিনের স্কুলের পাঠ শুরু হতো প্রার্থনাসভা দিয়ে। সেই সময়কার প্রার্থনাসভার কথা ভাবতে ইচ্ছে করে। স্কুলের গাড়িবারান্দার সিঁড়িতে শ্রেণী অনুযায়ী বিন্যস্ত হয়ে সমস্ত শিক্ষিকার উপস্থিতিতে হতো প্রাথমিক বিভাগের প্রার্থনা। ‘ওম্ পিতা নোহ্সি’ এই বেদমন্ত্রে পরম পিতাকে প্রণাম জানিয়ে তারপর দিন-অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রার্থনা-গীতি গাওয়া হত। মনে পড়ে যায় কাজরীদি, শান্তিদি, অশোকাদি, তারাদি, ইন্দ্রাণীদি এবং অমিয়াদি সহ আরো সব শ্রদ্ধেয়া দিদিদের কথা। তাঁদের সকলকে আমার প্রণাম। দিবাবিভাগের প্রার্থনাসভা হত তৎকালীন ড্রিলশেডে। সেই প্রার্থনা ছিল অসাধারণ শিক্ষামূলক এক সভা। ছাত্রীরাই শ্রেণী অনুযায়ী পরিচালনা করতো সেই সভা। অবশ্যই, শিক্ষিকারাও থাকতেন। প্রতিদিন সভার বোর্ডে মহাপুরুষের বাণী লেখা হত। সপ্তাহের ছয় দিনের জন্য ছিল ছয়টি আলাদা বাণী। এভাবে সারা বছরের প্রায় ২৫০টি বাণী পেয়েছি আমরা। নকশা চিত্রিত করা হতো সেই বাণীকে ঘিরে। প্রার্থনার গান এককভাবে পরিচালনা করতো কোনো একজন ছাত্রী। তারপর সমবেত কন্ঠে সমস্ত স্কুল সেই গান গলায় তুলে নিত। তারপর ওই বাণীটি পাঠ করত আর একজন ছাত্রী। স্কুলের বড়দি প্রতিদিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যেকের পোশাক এবং সর্ববিধ পরিচ্ছন্নতা নজর করতেন। এই সুশৃঙ্খলচারণা গভীর প্রভাব ফেলেছে পরবর্তী জীবনে।

স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তার সামগ্রিক নান্দনিক আবহ, তার সাংগীতিক চর্চার সুযোগ আমার মত বহু মেয়েকেই প্রভাবিত করেছে। বৃক্ষরোপণ, বেথুন-দিবস পালন, শিক্ষক-দিবস পালন, বাৎসরিক পুরস্কার-বিতরণী সভা এবং তৎসংলগ্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এইসব বিচিত্র কর্মকাণ্ডে আমাদের মনের তারটি ছিল ঐকতানে বাঁধা। সব অনুষ্ঠান স্কুলেই পালিত হতো। স্কুলের মাঠে মঞ্চ বেঁধে বার্ষিক অনুষ্ঠান হতো। ড্রিলশেডে পালিত হতো বৃক্ষরোপণ। আর অন্য সব অনুষ্ঠান হতো হল-ঘরে। নবীন-বরণ, বিদায়-সংবর্ধনা, বর্ষবরণ, বিদায়ী শিক্ষিকাদের সম্মান জ্ঞাপন, মনীষীদের জন্মদিবস পালন, কোনো বিশেষ মানুষের প্রয়াণে তাঁর উদ্দেশে স্মরণসভা, স্কুলের জন্মদিন … এমন আরো কত! চেনা পরিচিত জায়গাগুলি নতুন রঙে রূপে সেজে উঠতো বার বার।

প্রাথমিক শ্রেণীতে পড়াকালীন এইসব অনুষ্ঠানে আমি নাচের দলেই অংশ নিতাম বেশি। পরে উচ্চতর শ্রেণীতে দিবাবিভাগে এসে ভূমিকা বদল হয়ে গেল। ঠাঁই পেলাম গানের দলে।

একটা স্বীকৃতি রাখি আজ। গানই জীবনে আমার সর্বপ্রথম সত্য। গানই বোধহয় আমার অস্তিত্ব তৈরি করেছে। এই গানের জীবনে বিশেষভাবে আসার পিছনে অবশ্যই আমার স্কুলের কাছে গুরুঋণ। স্কুলের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে’ স্বীকার করি আজ। এ কথা ঠিক যে আমি পারিবারিকভাবেই সংগীতচর্চার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছি। তাই গান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা এবং প্রবণতা জন্মগতই ছিল আমার। তবু বেথুন স্কুলের পাঠ, গানের শিক্ষাদানের পদ্ধতি, প্রথা আমার সেই প্রবণতাকে উদ্দীপিত করেছে। প্রাথমিক বিভাগে ইন্দ্রাণীদির গানের ক্লাসের কথা ভোলার নয়। কত ধরনের কত গান যে শিখেছি আর গেয়েছি ক্লাসে বসে সবাই মিলে– ভাবলে অবাকই লাগে। মাধ্যমিক পর্যায়ে দিবা বিভাগের গানের ক্লাসের দায়িত্ব ছিল মিলুদির উপর। এত যত্নশীল পরিশ্রমী মানুষ এবং শিক্ষক বড় একটা দেখা যায় না, যেমন দেখেছি মিলুদিকে। শ্রদ্ধা করেছি যত, ছোটবেলায় ভয় পেয়েছি তার অনেক বেশি। কিন্তু স্নেহে শাসনে ধমকে আর যত্নে আমাদের মানুষ করেছেন তিনি। সহবত শিক্ষা দিয়েছেন। গান তো শিখিয়েছেন অবশ্যই। একটা একটা করে গান গলায় উঠিয়ে দিয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন কোন্ গান কেমন ভাবে গাইতে হবে, শিখতে হবে, ভুল হবেনা উচ্চারণে, ভুল হবেনা নিবেদনে, ভুল হবেনা শিক্ষাগত জায়গায়। আর ছিলেন আমাদের মাস্টারমশাই মহানন্দবাবু। তাঁর তবলার সঙ্গত এত স্পষ্ট এবং পরিষ্কার ছিল যে গানের ক্ষেত্রে সঙ্গতের কী ভূমিকা যেন খুব সহজেই বুঝতে পারতাম। এমন ভাবে বাজাতেন, তবলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই গানের সম্  খুঁজে পেয়ে যেতাম। অনুষ্ঠানগুলির চিরকালীন নাচের মাস্টারমশাই ছিলেন কানাইবাবু। বার্ষিক অনুষ্ঠানের আগে আগে তাঁকে দেখতে পেতাম স্কুল চত্বরে। জমজমাট রিহার্সাল হত। নাচ তুলিয়ে দিতেন সকলকে। প্রয়োজনে বকতেন। ভালবাসতেন তার চেয়ে অনেক বেশি। এত ভালো ভালো কম্পোজিশন হয়েছে আমাদের স্কুলের নাচ গানের অনুষ্ঠানে, সেগুলো যদি ধরে রাখা যেত..  আজ তার মূল্য বোঝা যেত। সবই ধরা আছে আমার বা আমার মত আরও অনেকের স্মৃতিতে। নান্দনিক রুচিমান সব অনুষ্ঠানের মোড়কে আমাদের অন্তরের সৌন্দর্যবোধ ভালো কিছু গড়ে তোলার বোধ শিখিয়ে দিয়েছেন আমাদের শ্রদ্ধেয়া শিক্ষিকারা সবাই।

পুরস্কার-বিতরণী অনুষ্ঠানে টেবিলে সাজানো পুরস্কারগুলি দেখে, বলাই বাহুল্য, খুব ইচ্ছে হত ওগুলির মধ্যে থেকে কোনো শীল্ড, কোনো একটা মেডেল বা বইয়ের মোড়ক আমিও যদি পেতাম! অথবা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়…!! নাম দিয়েছি। দৌড়েছি সব খেলাতেই। সাধ জেগেছে ভিক্ট্রিস্ট্যান্ডে উঠে দাঁড়ানোর জন্য, তবু হয়নি।  আমার ভূমিকা ছিল খেলার মাঠে চুনের দাগ কাটার জন্যই যেন শুধু। অতএব, সেখানেও থরে থরে সাজানো রঙিন পুরস্কারগুলির দিকে সজল নয়নে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

সেই পুরস্কার বা স্বীকৃতি স্কুলে প্রথম এল গানের হাত ধরেই। প্রতিবছর স্কুলে সংগীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হতো। সেই প্রতিযোগিতায় স্কুলের বাইরে থেকে বিশিষ্ট কোনো শিল্পী বা ব্যক্তিত্ব বিচারক হয়ে আসতেন। এইরকম প্রতিযোগিতাতে প্রথম হয়ে প্রথম পুরস্কারপ্রাপক হলাম আমি। এই প্রথম যেন নিজের জায়গাটা আস্তে আস্তে চিনে সেখানে পৌঁছাতে চাইলাম। আমাদের ছোটবেলার দিনে অভিভাবক বা শিক্ষিকারা আলাদা করে কখনোই প্রশংসা করতেন না, বা বলা ভালো, প্রশংসা লুকিয়ে রাখতেন। ফলে আত্মশ্লাঘা তৈরীর কোন সুযোগও হতো না আমাদের। অবশ্য এতে নিজেদের ঠিকমতো চিনতেও পারিনি হয়তো অনেকেই। দেরি হয়েছে। বেথুন স্কুলের গানের ক্লাস, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দলগত ও এককভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ আর উদার প্রকৃতির মাঝে সুশৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠা  হয়তো আমাকে সংগীতচর্চার জীবনে এগিয়ে দিয়েছে। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শিল্পী সংঘমিত্রা গুপ্ত, পূর্বা দাম, শিবাণী সর্বাধিকারী, আবৃত্তি শিল্পী নীলাদ্রিশেখর বসু ,পার্থ ও গৌরী ঘোষ, অমিতাভ বাগচী এঁদের মতো ব্যক্তিত্বদের সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়তো পরোক্ষে ওই জগতের প্রতি এক দুর্বার আকর্ষণে টেনেছিল আমায়। বাড়িতে প্রতিদিনের রিয়াজ বা গান শেখার ক্ষেত্র ছিলই। কিন্তু স্কুল প্রথম আমার মুখের সামনে এনে দিল মাইক্রোফোন। জীবনের প্রথম বেলায় অনেক মানুষের সামনে নিজের স্বর পরিবেশন এবং নিজের কানেই তা শুনতে পাওয়ার যে রোমাঞ্চকর অনুভব— তা’ এই স্কুলই এনে দিয়েছিল আমার জীবনে। ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়তো এই ভাবেই তৈরি করে দিয়েছিল আমার স্কুল।

প্রকৃতির আবহের কোমল দিকের পাশে এবার প্রকৃতির কঠোর রূপ দেখার পালাও এলো। পরীক্ষা সামনে। স্কুলের সাহেবিয়ানা এখন দেখার মত। কলকাকলি বন্ধ। গাছের পাতা পড়লে শোনা যায়। সব ছাত্রী খাতা কলম স্কেল নিয়ে প্রস্তুত। ঘন্টাগুলো বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটায়। দিদিদের মুখে জজসাহেবের কাঠিন্য। খুব হালকা সবুজ রঙের কাগজে দু পাতা জোড়া প্রশ্নপত্রের বান্ডিল নিয়ে দিদিরা যখন পরীক্ষার হলে ঢুকতেন, মনে হতো স্বয়ং যমরাজ কালদণ্ডটি এবার পাঠিয়ে দিলেন। আবার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর লাগাম ছাড়া খুশি। নতুন ক্লাস, নতুন ঘর, নতুন গাইড বুক, বৈকুণ্ঠ বুক হাউস আর লেবুদার দোকানের বইয়ের গন্ধ পৌষের রোদে খেজুর গুড়ের গন্ধে আর সোয়েটারের গরমের আমেজে মিলেমিশে যেত। নতুন ক্লাসে নতুন বন্ধুরা যোগ দিত। বন্ধুর দল ক্রমশ বড় হয়ে উঠতো। অদিতি সুচন্দ্রা নন্দিনীদের এভাবেই পাওয়া গেল। মৌমিতা ববিতা নাচতো। দেবী রঞ্জা কবিতা বলতো। সোহিনী গাইতো। তপতী সূচিশিল্প করতো। মমতা একাই খেলায় চ্যাম্পিয়ন। গাম্ভীর্য ও সুন্দর আচরণের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতো অপর্ণা ভট্টাচার্য। এই পরিসরে আলাদা করে সকলের নাম তো বলে ওঠা যাবে না, কিন্তু এটুকু বলব, এই বন্ধুরা সবাই সবাইকে বেঁধে বেঁধে রেখেছে সেই স্কুল বেলার দিন থেকে আজও পর্যন্ত। একটু ছোট বা বড় শ্রেণীর মেয়েরাও সবাই মাঝেমাঝে বন্ধুত্বে কাজে খেলায় একাকার হয়ে গেছি।

আমার বাড়ির মেয়েরা কয়েকজন একই সময়ে একই ক্লাসে বা বিভিন্ন ক্লাসে এখানে পড়েছি। দিদি আত্রেয়ী, সমবয়সী পিসি অপর্ণা, ছোট্ট পিসি সুপর্ণা এমন কয়েকজন। বাড়িতে আমাদের ধরন ধারণ ও স্কুলের আচরণ ছিল আশ্চর্য বৈপরীত্যময়! যদিও খুবই মজার এবং যথেষ্ট আনন্দের। তবু, আত্মীয়তা আর বন্ধুত্বে মিশিয়ে ফেলিনি কেউ। বেশ অদ্ভুত লাগতো নিজেদেরকেই। ঘরের বাইরে পা ফেলতে গেলে ঘরের পোশাকটি ঘরেই ছেড়ে এসে বাইরের পোশাকে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। যা নিত্যদিনের ধন তাকে প্রতিদিন নতুন করে পেতে জানতে হয়। এসব শিক্ষা কেউ আমাদের হাতে ধরে বলে দেননি। এই স্কুল জীবনের এগুলিও আমাদের মহৎ প্রাপ্তি।

সত্যিই পৃথিবীকে আর জীবনকে দেখবার চোখ তৈরী করে দিয়েছেন আমাদের শিক্ষিকারা। মনে পড়ে যায়, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ১০ দিন আগে হঠাৎ প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়া আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে অরুণাদি আর শাশ্বতীদি। সব ফেলে তাঁরা আমার বাড়িতে ছুটে এসেছেন! কল্পনাতীত !

এই দিদিরা আমাদের শ্রদ্ধার ভালোবাসার, কিন্তু সম্ভ্রমজনক দূরত্বেরও। এত কাছে তো টানিনি তাঁদের ! তাঁরা কিন্তু সকল দূরত্ব পার করে চলে এলেন। শ্যামলীদি অপর্ণাদির কথা আমি কেন, হয়তো সকলেই আজীবন মনের মণিকোঠায় রেখে দেবে। ইন্দিরাদির মত গভীর ও মরমী মনের মানুষকে পেয়েছি শিক্ষিকা রূপে। তাঁর শিক্ষা মাথায় করে রাখি। দিদি বলে ডেকেছি। মনে মনে মা ডাকতে ইচ্ছে হতো। আমাদের বড়দি। অপর্ণাদি, যাঁর নীরব জ্বলন্ত দৃষ্টি যেন সকল প্রকার ভুল দোষ অন্যায় অমঙ্গল থেকে স্কুলকে রক্ষা করে চলত আর আমরা কেউ ভয়ে তাঁর ত্রিসীমানায় যেতাম না। গলা শুকিয়ে যেত কখনো ডাক পড়লে। সেই বড়দি দশম শ্রেণীতে আমার প্রি-টেস্টের ফল আশানুরূপ না হওয়ায় সস্নেহে ডেকে প্রতিদৈনিক রুটিন তৈরী করে দিলেন। শান্ত গলায় জানতে চাইলেন লিখতে গিয়ে কেন অসুবিধা হচ্ছে। সেই দিনই আমার সব অসুবিধা, সব সমস্যার জাল খসে গেল। বড়দি আমার দিকদর্শন করিয়ে দিলেন।

দিন বয়ে চলে। কতকাল হয়ে গেল স্কুলের জীবন পেরিয়ে গেছে। দূর থেকে সেই ছোটবেলার দিকে তাকাই। পুরনো কথা মাঝে মাঝে ভাবি। সেই পুরনো কালের গল্প শুনতে চেয়েছেন স্কুলের এখনকার দিদিরা, শিক্ষিকাবর্গ। বলেছেন স্কুলবেলায় আমার গানের দিনগুলোর গল্প বলতে। তাই ঘুরে ফিরে সেসব কথায়  বারবার ফিরে আসছি।

আমাকে স্বপ্ন দেখাতো বেথুন স্কুলের ওই হলঘরের অনুষ্ঠানের মহড়াগুলি। প্রাথমিক বিভাগে ইন্দ্রাণীদি এবং মাধ্যমিক বিভাগের মিলুদির নির্দেশনায় গানকে নতুন নতুন করে পাচ্ছিলাম। অতুলপ্রসাদী রজনীকান্তের গান ভজন কীর্তন খেয়াল এইসব গান শিখেছি স্কুলেই। গানগুলি শিখে গানের পরীক্ষাও দিতে হতো সকলকে। আর অনুষ্ঠানে গানের দলে সবাই মিলে একসঙ্গে গাইতাম। মাধ্যমিক স্তরে পড়ার সময় ক্রমশ এলো একক গান পরিবেশনের সুযোগ। অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠান হয়ে চলত আর গানের পর গান শুনতে শুনতে গাইতে গাইতে শেখাও হয়ে যেত। এখানে আরেকটি বিশেষ প্রাপ্তি আছে আমার। স্কুলে তখন নাটক, গীতিনাট্য বা নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণের সুযোগ পেতাম। মহড়া চলত। সেই সূত্রে মুখস্থ হয়ে যেত সেই সব নাটকের সব গান, সব সংলাপ। পরে বড় হয়ে এই সমগ্রতা আমার পড়াশোনা তথা কাজের ক্ষেত্রে বড়ই সহায়ক হয়েছে।

এবারে বলতে চাই আমার এই শিল্পী হয়ে ওঠা জীবনের অন্যতম বড় এক শিক্ষার কথা— যা আমার স্কুল থেকেই পাওয়া। তখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ি। শিক্ষকদিবসের অনুষ্ঠানে আমরা ক্লাসের মেয়েরা মিলে নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ করেছিলাম আমাদের স্কুলের হলঘরে। মূল গায়েন সোহিনী ও আমি। সকলের দারুণ ভালো লেগেছিল। তখন দিদিরা স্থির করলেন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এবার এই চিত্রাঙ্গদা-ই মঞ্চস্থ হবে। বেকার হলে আমাদের ক্লাস ও আরো অনেকে মিলে নিবেদন করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা। মহড়ায় অনেক দায়িত্ব নিয়েছিলাম অবশ্য। একটু একটু বয়সোচিত গর্বও হয়তো বাসা বেঁধেছিল মনের মধ্যে। অনুষ্ঠানে কলাকুশলী হিসেবে আমাদের কারোরই নাম ঘোষণার রীতি না থাকায় সবাই মিলে হয়তো একটু উষ্মা প্রকাশ করে ফেলেছিলাম। সেই কথাটি মিলুদির কানে যেতেই সবার ডাক পড়ল। ভয়ে কেউ সামনে যেতে চায় না। আমি একা নির্ভয়ে চলে গেলাম। অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগে দিদি জানতে চাইলেন, যে কথা কানে এসেছে তা’ সত্যি কিনা। সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লাম আমি। কোনদিন ভুলবো না মিলুদির সেই আহত দৃষ্টি। ভস্ম করে দেওয়ার মতো চাহনি। অসম্ভব ক্ষোভে দিদি সেদিন বলেছিলেন, “এত নামের মোহ? তোমার নাম ঘোষণা করা চাই-ই রাজশ্রী? নামের জন্য গাইছো?”

আজ এই বর্তমান দিনে দাঁড়িয়েও দিদির সেই তিরস্কার কানে বাজে। শিল্পীর প্রথম অভীষ্ট শিল্পকলাকে প্রণাম জানানো। নাম অর্জন নয়। এই চরম শিক্ষাটি এই পথেই এসেছে আমার কাছে, আজ বুঝতে পারি। সেদিনের ঐ তিরস্কার আসলে ছিল পরম পুরস্কার আমার মানসিক গঠন তৈরীতে।

স্কুল থেকে অনেক পেয়েছি, বহু অমূল্য মনিরত্ন, যা পথ চলতে আজও সহায়ক আমার। তার মধ্যে কয়েকটির কথাই কেবল বলতে পারছি এই স্বল্প পরিসরে।

এমনই এক অনস্বীকার্য প্রাপ্তির কথা বলে ইতি টানব আজ। সালটা ছিল ১৯৮৪। ১৯শে জানুয়ারিতে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান হবে বেকার হলে। আমরা সমবেতভাবে বিশ্বকবির নটীর পূজা নিবেদন করব। গানের দলে মুখ্য ভূমিকায় আমিই আছি।

১৮ জানুয়ারি স্টেজ রিহার্সালের সময় হঠাৎই আমার বাবা মা উপস্থিত হলেন বেকার হলে। আমার দাদামশাই তখন মৃত্যুশয্যায় অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায়। আমাদের দেখতে চেয়েছেন। হয়তো সময় বেশি বাকি নেই। যেতেই হবে। অনেক দূরের পথ। অনুষ্ঠানের ঠিক আগের দিন আমাকে মাঝপথে ছাড়তে স্বভাবতই কুন্ঠিত দিদিরা। মা তাঁদের  কথা দিলেন যাই ঘটুক না কেন পরের দিন আমাকে অনুষ্ঠানের মঞ্চে সময় মতই পৌঁছে দেবেন। আমি চলে গেলাম দাদামশায়ের কাছে এবং সেই দিনই তিনি প্রয়াত হলেন। পরের দিন বাবার হাত ধরে যখন অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত হলাম, তখন কানে বাজছে ব্যক্তিগত শোকের উপর দিয়ে আমার মায়ের একান্ত নির্দেশটুকু — ‘তোমার নিবেদনে যেন কোন ত্রুটি না থাকে’। আমি আজও কৃতজ্ঞ আমার মা আমার বাবার কাছে  এবং সেদিন আমার অভিভাবকের কথায় আস্থা রেখে বিশ্বাস করে অনুষ্ঠানের আয়োজন মুলতবি রেখে আমাকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া আমার স্কুলের দিদিদের কাছে। ব্যক্তিগত-শোক-হর্ষের ঊর্ধ্বে,

‘The Show Must Go On’ এই শিক্ষা আমি সেদিন থেকেই পেয়েছি।

এ পর্যন্ত বহু অনুষ্ঠানের সাক্ষী থেকেছি মঞ্চে, বা মঞ্চের বাইরে দর্শক হিসাবে। তবু আজও বিশ্বাস করি, আমার স্কুল যে শিক্ষায় গড়ে তুলেছে আমাকে, আমাদের প্রতিটি মেয়ের প্রবণতা অনুযায়ী তাদের মনের গঠন, এমনটা বুঝি আর কোথাও নেই।

সংগীতশিল্পী– বা গানের অনুগত ছাত্র– নিজেকে যা’ বলেই ভাবি না কেন;  জীবনের পথে প্রতিটি পদক্ষেপ সঠিকভাবে ফেলার নেপথ্যে এই গুরুঋণকে আমি স্বীকার করি। আমার গুরুদের প্রতি প্রণাম জানাই। তাঁদের আশীর্বাদ ও শুভকামনা আমার চলার পথের পাথেয়।