প্রতিবাদী প্রান্তিক : রবীন্দ্রনাথের বলিষ্ঠ কলম
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য
Abstract
This paper examines the protest-oriented and ethically charged dimension of Rabindranath Tagore’s late poetry, with particular focus on Prantik (1938) and related writings composed on the eve of the Second World War. Positioned at the threshold of global catastrophe, Tagore’s poetic voice assumes a bold moral intensity, responding to rising militarism, imperial aggression, and the ethical crisis of modern civilization. The poems “Prantik 17” and “Prantik 18,” written on 25 December 1937, reflect his deep anxiety over Japanese expansionism in China and the broader disintegration of human values. Through prophetic imagery—serpentine poison, demonic forces, and apocalyptic turbulence—Tagore articulates a fierce denunciation of violence while upholding an uncompromising humanism.
The study further contextualizes these poems alongside “Buddhabhakti” from Nabajatak and prose reflections such as “Sabhyatar Sankat” in Kalantar, demonstrating how Tagore’s critique of aggressive nationalism evolves into a universal ethical appeal. His correspondence with Japanese intellectuals and Indian political leaders underscores his refusal to compromise moral truth for political expediency. Even within sacred spaces like Santiniketan’s prayer hall, Tagore called for resistance against barbarity, redefining protest as a higher form of love and responsibility toward humanity.
Thus, the paper argues that Tagore’s late works embody a synthesis of spiritual humanism and political resistance, where compassion does not preclude righteous indignation. His vision affirms that faith in humanity—despite devastation—remains both an ethical imperative and a civilizational hope.
Keywords
Rabindranath Tagore; Prantik; Protest Poetry; Humanism; Anti-Nationalism; Second World War; Japanese Imperialism; Ethical Resistance; Civilization Crisis; Santiniketan.
রবীন্দ্রনাথ মহামানবের সন্ধান করেছেন সারা বিশ্ব জুড়ে, সারা জীবন ধরে— যে মানুষজন স্বাজাতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করতে জানে— ধনগরিমার দম্ভে নয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি চর্চায় একে অপরের যোগ্য হয়ে ওঠার শুভ প্রয়াসে যারা মহৎ, তারাই কবির ভাবনায় মহামানব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপর্বে, জীবনের প্রান্তভাগে পৌঁছে কবি অত্যন্ত দুঃখিত হতাশ হয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী মারণযজ্ঞ, মানুষে মানুষে হানাহানি, মিথ্যাচার, অত্যাচার, কুটিল আচরণে। ‘প্রান্তিক’ কাব্যের কিছু কবিতায় রয়েছে তারই প্রতিফলন; সেই দুশ্চিন্তা এবং চিন্তামুক্তির ভাবনার প্রতিফলন।
“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস..”
১৯৩৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর খ্রীষ্ট-জন্মোৎসবের দিনে কবিতাটি লিখলেন। প্রান্তিক কাব্যের ১৮ সংখ্যক কবিতা। প্রান্তিকের শেষ কবিতা। এর আগের ১৭ সংখ্যক কবিতাটিও একই সঙ্গে একই দিনে লিখেছেন।
আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ্রাসী আগুনের হল্কা তাপ এসে লেগেছে এই কবিতায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক বলেন ১৯৩৭ থেকেই এশিয়ায় এই যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে, যখন চীন আক্রান্ত হয়েছে জাপানের কাছে হেরে গিয়ে। মাঞ্চুরিয়া বিধ্বস্ত। জাপান মাঞ্চুরিয়ার দখল নিয়ে প্রবল উৎপীড়ন চালাচ্ছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন নজির নেই যে তা নয়, যেখানে বিজেতা দল বিজিত দলের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করে; জাপানও তার ব্যতিক্রম হলো না। নৃশংস অত্যাচার চালালো চীনের ওপর, চীনের সাধারণ মানুষের ওপর। নৃশংসতার সব খবর হয়তো তখন আসতো না, কিন্তু যতখানি ভয়ঙ্কর খবরাখবর আসতে থাকছিল, রবীন্দ্রনাথ তাতে অত্যন্ত বিচলিত, বিপন্ন হচ্ছিলেন।
অনেক যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ৭ই জানুয়ারি ১৯৩৮ লিখলেন বুদ্ধভক্তি কবিতা। ‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থে স্থান হলো এই কবিতার। লিখলেন,
“জাপানের কোনো কাগজে পড়েছি, জাপানি সৈনিক
যুদ্ধের সাফল্য কামনা করে বুদ্ধমন্দিরে
পূজা দিতে গিয়েছিল। ওরা শক্তির বাণ মারছে চীনকে,
ভক্তির বাণ বুদ্ধকে।
হুংকৃত যুদ্ধের বাদ্য
সংগ্রহ করিবারে শমনের খাদ্য।
সাজিয়াছে ওরা সবে উৎকটদর্শন,
দন্তে দন্তে ওরা করিতেছে ঘর্ষণ,
হিংসার উষ্মায় দারুণ অধীর
সিদ্ধির বর চায় করুণানিধির–
ওরা তাই স্পর্ধায় চলে
বুদ্ধের মন্দিরতলে।
তূরী ভেরি বেজে ওঠে রোষে গরোগরো,
ধরাতল কেঁপে ওঠে ত্রাসে থরোথরো।
গর্জিয়া প্রার্থনা করে–
আর্তরোদন যেন জাগে ঘরে ঘরে।
আত্মীয়বন্ধন করি দিবে ছিন্ন,
গ্রামপল্লীর রবে ভস্মের চিহ্ন,
হানিবে শূন্য হতে বহ্নি-আঘাত,
বিদ্যার নিকেতন হবে ধূলিসাৎ–
বক্ষ ফুলায়ে বর যাচে
দয়াময় বুদ্ধের কাছে।
তূরী ভেরি বেজে ওঠে রোষে গরোগরো,
ধরাতল কেঁপে ওঠে ত্রাসে থরোথরো।
হত-আহতের গনি সংখ্যা
তালে তালে মন্দ্রিত হবে জয়ডঙ্কা।
নারীর শিশুর যত কাটা-ছেঁড়া অঙ্গ
জাগাবে অট্টহাসে পৈশাচী রঙ্গ,
মিথ্যায় কলুষিবে জনতার বিশ্বাস,
বিষবাষ্পের বাণে রোধি দিবে নিশ্বাস
মুষ্টি উঁচায়ে তাই চলে
বুদ্ধেরে নিতে নিজ দলে।
তূরী ভেরি বেজে ওঠে রোষে গরোগরো,
ধরাতল কেঁপে ওঠে ত্রাসে থরোথরো।”
(বুদ্ধভক্তি। নবজাতক)
সারা জীবনে বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ বারবার জাপানে গেছেন। জাপানকে ভালোবাসেন তিনি। জাপানের বুদ্ধি, সাহস, কর্মক্ষমতা, শিল্পকলা, কবিতা সবের গুণগ্রাহী তিনি। সেই মননগ্রাহিতায় জাপানের গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে চিরস্থায়ী সম্বন্ধ তৈরি করেছেন। কিন্তু এই বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে জাপানের যে পরিবর্তন তিনি দেখছেন খুব কাছ থেকে, তাতে তিনি জাপানকে সাবধান করছেন। বলছেন– জাপানের যে সত্যিকারের দর্শন, সত্যিকারের ক্ষমতা, জ্ঞান, বোধ— সেগুলোকে খানিকটা চাপা দিয়ে আজ যেন জয়ের নেশায় সে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের বিপন্নতা কাটে না। দেশ ও বিদেশের বিশিষ্ট মানুষের অসহিষ্ণু শলা-পরামর্শ তাঁকে আরও ব্যথিত করে। কষ্ট দেয়। বিপর্যস্ত করে।
রাসবিহারী বসু রবীন্দ্রনাথকে একটা চিঠিতে লিখে জানালেন যে তিনি যেন নেহেরুজী গান্ধীজীকে বোঝান যে এই মুহূর্তে জাপানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কিছু প্রতিবাদী রূপ যেন তাঁরা না দেখান। কেন না, জাপান তো শেষ পর্যন্ত ভারতের বন্ধু.. জাপান তো চায় ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ দূর হয়ে যাক… তাই এখন এইরকম প্রতিক্রিয়ামূলক কথা বলা তাদের ঠিক হবে না.. রবীন্দ্রনাথের কথা যেহেতু সবাই মানবেন, তাই রবীন্দ্রনাথ যেন ওঁদের এমন কথা বলতে নিষেধ করেন।
রবীন্দ্রনাথ তার উত্তরে লিখলেন— হয়তো রবীন্দ্রনাথের কথা নেহেরুজী বা গান্ধীজী শুনবেন, আন্দোলন মিছিল বন্ধ করবেন, কিন্তু তিনি এমন কথা বলতে চান না– বলবেন না। কারণ, সারা পৃথিবী জুড়ে চীনের সঙ্গে যে অন্যায় জাপান করছে, রবীন্দ্রনাথ চান, তার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠুক। — স্পষ্ট করে চিঠিতে একথা রাসবিহারী বসুকে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। এমনকি জাপানকে অস্ত্র নামিয়ে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
জাপানি কবি ইয়োনি নোগুচির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অনেক চিঠিপত্র বিনিময় হয়েছে যেখানে নোগুচি প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে জাপানের বিরুদ্ধে এত লেখালেখি করা রবীন্দ্রনাথের উচিৎ হচ্ছে না। জাপান-ভারত মৈত্রী নোগুচির প্রার্থিত। জাপান চায় ইংরেজি বিরুদ্ধে লড়াইতে ভারতকে সহায়তা করতে– রবীন্দ্রনাথ কি তা বুঝছেন না! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সত্যিই একথা বুঝবেন না। তিনি নোগুচিকে বলছেন– জাপান যা করছে ঠিক হচ্ছে না। এবার অদ্ভুত উদ্ধত একটা কথা বলছেন নোগুচি। জাপানের কোনো একজন মন্ত্রীর সঙ্গে নোগুচির কথা হয়েছে যে ভারত যখন স্বাধীন হবে জাপানের সহায়তায়, তখন রবীন্দ্রনাথকে ভারতের রাষ্ট্রপতি করে দেবে জাপান সরকার। ফলে এখন রবীন্দ্রনাথ যেন বেশি বিরুদ্ধ-লেখালেখি না করেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে টলাতে পারলেন না নোগুচি। এক কবি আর এক মন্ত্রীর সহায়তায় ভারতের রাষ্ট্রপতি হবার অদ্ভুত প্রস্তাবকে উপেক্ষা করলেন রবীন্দ্রনাথ। জাপানের ভয়ংকর ঔদ্ধত্যকে স্পষ্ট লক্ষ্য করতে পারছিলেন তিনি। নোগুচি উত্তরোত্তর অপমানজনক আক্রমণ করতে থাকলেন চিঠির মারফত রবীন্দ্রনাথকে। ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ সে অপমান হজম করে নোগুচিকে লিখলেন যে তিনি আন্তরিকভাবে জানাচ্ছেন জাপানকে তিনি সত্যিই ভালোবাসেন। জাপানের মানুষকে ভালোবাসেন। জাপান তথাগত বুদ্ধের দেশ। যতবার তিনি জাপানে গেছেন, প্রশান্তি নিয়েই ফিরেছেন এবং জাপানকে সত্যিকারের ভালবাসেন বলেই এই মুহূর্তে তিনি জাপানের পরাজয় কামনা করেন। পরাস্ত হোক জাপান। যে যুদ্ধজয়ের নেশায় জাপান বেরিয়েছে, তার যে অকল্পনীয় খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে জাপানের জন্য, সেই পরিণতি তিনি চান না। সেই জন্যেই চান এখনই জাপান পরাস্ত হোক।
রবীন্দ্রনাথের এই ভবিষ্যৎবানী যে কতটা সত্যি হয়েছিল পরবর্তীকালে আমরা সবাই তা জেনেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৭-৩৮ সালে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ বলতে পেরেছিলেন জাপান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে এই ছিল রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য বা বক্তব্য।
এই পরিস্থিতিতেই লিখলেন,
“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।”
(প্রান্তিক ১৮)
১৯৩৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিনে শান্তিনিকেতনে বসে লিখলেন এই কবিতা। তাকে স্থান দিলেন প্রান্তিক কাব্যের ১৮ সংখ্যক, শেষতম রচনারূপে।
সেদিনই লিখলেন আরো একটি কবিতা, প্রান্তিক কাব্যের ১৭ সংখ্যক কবিতা:
“যেদিন চৈতন্য মোর মুক্তি পেল লুপ্তিগুহা হতে
নিয়ে এলো দুসসহ বিস্ময়ঝড়ে দারুণ দুর্যোগে
কোন্ নরকাগ্নিগিরিগহ্বরের তটে;
….. দেখিলাম একালের
আত্মঘাতী মূঢ় উন্মত্ততা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার
বিকৃতির কদর্য বিদ্রূপ।…..
.….দানবপক্ষী ক্ষুব্ধ শূন্যে
উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে …..
যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসক্ষুধিত শকুনি,
আকাশের করিল অশুচি। মহাকালসিংহাসনে-
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কন্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী
কুৎসিত বীভৎসা-’পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন……”
(প্রান্তিক ১৭)
শান্তির কথা বলার জায়গা আজকে আর নেই। শান্তিনিকেতনে কাঁচের মন্দিরে আচার্যের বেদীতে বসে ভাষণ দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। নাম দিচ্ছেন ‘প্রলয়ের সৃষ্টি’।
যে আসনে বসে তিনি শান্ত-অদ্বৈত-অনন্ত-ব্রহ্মের উপাসনা করেন; সত্য-মঙ্গল-করুণার-প্রেমের জয়গান করেন ক্ষমাসুন্দর ঋষির প্রশান্তিতে; সেই বেদীতে বসেই ঋষির মতই কঠোর সত্য বাণী উচ্চারণ করেন।
৭ই পৌষের দীক্ষান্ত ভাষণ এই ‘প্রলয়ের সৃষ্টি’, যা সরাসরি রাজনৈতিক। তাঁর মর্মস্পর্শী ভাষণের সার কথাটি এইরকম — হয়তো আজ আমাদের হাতে অস্ত্র নেই , তা’বলে এই বিপুল বর্বরতার বিরুদ্ধে আমাদের কি কিছুই করবার নেই…..! (প্রলয়ের সৃষ্টি। কালান্তর)
ভাবা যায়! মন্দির-বেদীতে উচ্চারণ করছেন আমাদের মেশিনগান নেই সেই আক্ষেপ! আমরা দেখছি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক সত্তা গড়ে উঠেছে। তিনি একটা প্রতিবিধান দিতে চাইছেন। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার যতটুকু সুযোগ আছে সে লিখে হোক বা মুখে বলেই হোক, সেখানেই যেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আমাদের ঘৃণা আমরা প্রকাশ করে যেতে পারি। আশ্চর্য! মন্দিরে বসে ঘৃণার কথা!
বলাই বাহুল্য, এই ঘৃণা শেষপর্যন্ত ভালোবাসার দিকেই নিয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসার প্রেমের সেই ভুবনে পৌঁছতে গেলে আজ সংগ্রামের ডাক দিতেই হবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই লড়াইয়ের ডাক দিলেন খ্রীষ্ট জন্মদিনে; পরম করুণা, পরম প্রেম, পরম শান্তির বার্তা নিয়ে যিনি পৃথিবীতে এসেছেন, তাঁর জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ক্রুদ্ধ কলমে লিখলেন,
“শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস”
ব্যাঙ্গার্থে বললেন।
লালিত্য আর কোমলতা ঘিরে চুপ করে থাকার সময় এখন নয়। প্রকৃত শান্তির পথ চান বলেই আজ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে হবে। এটাই ন্যাশনালিজম জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা যার পরিচয় আমরা কালান্তরের প্রবন্ধগুলিতে পেয়েছি। ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে তো বিশেষভাবেই ধরা আছে এই বক্তব্যের সারবত্তা। সভ্যতার পরিকীর্ণ ভগ্নস্তুপের ভেতর থেকে সত্যের জয়, মঙ্গলের জয়, মানবতার জয়ের সূচনা একদিন হবেই। আর তা’ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। সেই উন্নয়নের দিনের,সেই শান্তির পথের আশা তিনি রাখেন মানবজাতির উদ্দেশ্যে। বলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।”
(সভ্যতার সঙ্কট। কালান্তর)
অনেকদিন আগে যে বাণী তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর কবিতায়, সেখানেও একই প্রত্যয়।
“ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা তোমার আদেশে।”
(নৈবেদ্য ৭০)
আর এক কবিতায় বলেছিলেন,
“…..নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা–
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতের সেই স্বর্গে করো জাগরিত।”
(নৈবেদ্য ৭২)
রবীন্দ্রকাব্যচর্চার ইতিহাসে ধ্যান দিলে আমরা তাঁর জীবনব্যাপী মানবতাবোধের সাধনার এই পরিচয় পেয়ে থাকি।
তথ্যসূত্র
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রান্তিক, কবিতা ১৮, রচনাকাল ২৫ ডিসেম্বর ১৯৩৭, প্রথম প্রকাশ ১৯৩৮।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “বুদ্ধভক্তি”, নবজাতক, রচনাকাল ৭ জানুয়ারি ১৯৩৮।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রান্তিক, কবিতা ১৭, রচনাকাল ২৫ ডিসেম্বর ১৯৩৭।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “প্রলয়ের সৃষ্টি”, কালান্তর, শান্তিনিকেতনে প্রদত্ত ভাষণ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, কালান্তর, ১৯৪১।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নৈবেদ্য, কবিতা ৭০, ১৯০১।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নৈবেদ্য, কবিতা ৭২, ১৯০১।