Nature in Rabindranath Tagore: Songs of Summer and Monsoon
Dr. Rajashree Bhattacharya, Associate Professor, Bengal Music College
Abstract
This paper examines Rabindranath Tagore’s concept of nature as expressed in his seasonal songs, with special reference to the songs of summer (Grīṣma) and monsoon (Barṣā). It explores how Tagore’s engagement with nature evolved across different phases of his creative life and attained a profound, multidimensional depth during his Santiniketan years. Through a close aesthetic and thematic analysis of selected songs, the study highlights the interrelationship between nature, human emotion, and inner consciousness in Tagore’s music.
The songs of summer reveal a complex interplay of austerity, memory, inner contemplation, and subdued lyricism, while the monsoon songs embody a wide spectrum of emotions—anticipation, joy, longing, separation, remembrance, existential solitude, movement, and the aspiration for freedom. In these compositions, nature transcends its descriptive role and emerges as a symbolic medium through which the poet articulates philosophical reflection, emotional intensity, and spiritual realization.
The paper argues that Tagore’s seasonal songs do not merely celebrate natural beauty but transform the cyclical rhythms of nature into a profound aesthetic and emotional experience. The songs of summer and monsoon thus stand as significant expressions of Tagore’s artistic maturity, revealing the depth of his nature-consciousness and his unique synthesis of music, poetry, and life philosophy.
Key Words
Rabindranath Tagore, Seasonal Songs, Summer Songs, Monsoon Songs, Nature Consciousness, Aesthetics, Memory and Longing, Movement and Freedom
প্রকৃতির রবীন্দ্রনাথ : গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুর গান
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনার সার্বত্রিক প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ঋতুসংগীতগুলিতে। ঋতুবৈচিত্র্যের সমগ্রতার সঙ্গে কবি সংলগ্ন হয়েছিলেন নিভৃত সাধনার মাধ্যমে। নিসর্গের ঋতুলীলার সঙ্গে আপন সত্তাকে একেবারে শৈশব থেকেই যে এক সুরে বাঁধতে পেরেছিলেন এমন নয়, দীর্ঘায়ত জমিদারির কাজে রবীন্দ্রনাথকে যেতে হয় শিলাইদহ, পতিসর। এই প্রথম পদ্মাপারের নিসর্গকে ভালো করে দেখবার ও চেনবার অবকাশ হল তাঁর। এখানেই ছয়ঋতুর সঙ্গে তাঁর নিভৃত সত্তার মিলনসাধনার পালা শুরু- যার রসগ্রাহী প্রকাশ দেখি ‘ছিন্নপত্র’র বেশ কিছু চিঠিতে।
৪০ বছর বয়সে এক ভিন্নতর সৃষ্টির সংকল্প নিয়ে কবি চলে এলেন শান্তিনিকেতনের প্রান্তরে। তাঁরই একান্ত প্রয়াসে স্থাপিত হল শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম- ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে। শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির সঙ্গে পদ্মাপারের প্রকৃতির ভিন্নতা অনেকখানি। এখানে প্রতিটি ঋতুই স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ। স্বভাবতই নৈসর্গিক আশ্রমবাস– নানা ঋতুর সঙ্গে কবির অন্তরের যোগসাধনের পথটিকে সহজ করে দিয়েছিল। হয়তো এজন্যেই আগের পর্বে, অর্থাৎ ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত, যত গান তিনি লিখেছেন তার মধ্যে প্রকৃত ঋতুসংগীত ছিল সংখ্যায় অত্যন্ত অল্প। ওই সময়পর্বে কবি বসন্তের গান লিখেছিলেন ৩টি, বর্ষার ৭টি এবং শরতের মাত্র ১টি- এই মোট ১১টি (রবীন্দ্রসঙ্গীত/শান্তিদেব ঘোষ/বিশ্বভারতী)। এছাড়া আশ্বিন-১৩৩২ (১৮৯৫)এ লেখা ‘বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে’ (‘বিশ্বরাজালয়ে বিশ্ববীণা বাজিছে) গানে বসন্ত, বর্ষা এবং শরৎ ঋতুর সমাহার লক্ষণীয়।
পরবর্তী ৪০ বছরের আশ্রমিকজীবনে কবি অজস্র ঋতুর গান লিখেছেন। সেখানেও ফিরে ফিরে এসেছে বর্ষা, বসন্ত ও শরৎ। ১৩১৫ সনে (১৯০৮) লিখছেন ‘শারদোৎসব’ নাটক। হয়তো পদ্মাপারের জল, স্থল, আকাশ তাঁর চিত্তে রসের যে উৎসার অনাবৃত করে দিয়েছিল তারই প্রতিচ্ছায়া পড়ল ‘শারদোৎসব’ নাটকের দৃশ্যে- বেতসিনীর ধারে… কাশের বনে…।
১৩২৮ এ কবি ৬০ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। শুরু হল তাঁর জীবনের শেষ দুটি দশক। শান্তিদেব ঘোষ এই সময়পর্ব সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন,”ঋতুর গানের দিক থেকে এই সময়টি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শান্তিনিকেতনে তাঁর এই ২০ বছর ব্যাপী সাধনার প্রকৃত পরিচয় এই পর্বেই উন্মোচিত হল, অথবা একথাও বলা যায় যে, এখন থেকেই তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার সার্থক পরিণতি দেখা দিল।”
(রবীন্দ্রসঙ্গীত /শান্তিদেব ঘোষ/ বিশ্বভারতী)
এ পর্বেই কবি রচনা করলেন গ্রীষ্ম এবং হেমন্তের গান। এর আগে এ দুটি ঋতু তাঁর সৃজনে ধরা দেয় নি। এই প্রথম তারা পেল প্রবেশের ছাড়পত্র। আবার এই পর্বেই নতুন ভাবনা থেকে শীতের গানও রচিত হল। এখন থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে কবির সত্তাপরিচয়ের গভীরতা ধরা পড়লো গানে গানে। এই শেষ দুই দশকে যত ঋতুর গান কবি রচনা করেছেন সংখ্যার দিক থেকেও তা আগের পর্বের রচনার চেয়ে বেশি।
ঋতুসঙ্গীতে কবির প্রাণচৈতন্যের অবগাঢ় বিস্তার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কবির সকল গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছেন, “প্রকৃতির সৌন্দর্যলীলার রসমাধুর্য উপভোগ করে তার সঙ্গে এমন নিবিড় আত্মীয়তার সম্বন্ধ স্থাপন এবং তার রহস্যলোকের দ্বার উদ্ঘাটন আর কোনো কবি করেছেন কিনা জানিনে। প্রত্যেক কিশলয়ের অব্যক্ত কাকলিতে, প্রতি কুসুমের বর্ণগন্ধময় আত্মনিবেদনে, প্রতি ঋতুসমাগম ও অবসানের মিলনবিরহের বেদনায় কবির মন আনন্দে আকুল ও বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।”
(১২৫ তম রবীন্দ্রজয়ন্তীতে এইচ.এম.ভি-গানের সুরের ধারা- রেকর্ডের তৃতীয় খণ্ড অ্যালবামে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ শীর্ষক রচনা/দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)
বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিটি ঋতুর যে নাট্যোৎসব এই শ্যামল বঙ্গভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে, একমাত্র একালের কবি রবীন্দ্রনাথই সেই পালার যবনিকা সরিয়ে ধরেছেন। তাঁর গানে সমগ্র বঙ্গপ্রকৃতির চিরন্তন মর্মবাণীই যেন বেজে উঠেছে। আমরা গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু থেকে নির্বাচিত কয়েকটি গান বিশ্লেষণ করে ঋতুর গানে রবীন্দ্রনাথের অলোকসামান্য নান্দনিকতায় আলোকপাত করব।
গ্ৰীষ্ম :
১৩২৯ বৈশাখে লেখা ‘প্রবাহিনী’র ১২৬ সংখ্যক ঋতুচক্রের ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’ গানটি গ্রীষ্ম পর্যায়ে স্মৃতি-স্বপ্ন-বিজড়িত প্রেমের অনুভবে গাঢ়তা পেয়েছে। গ্রীষ্ম পর্যায়ের গানে সাধারণত যে রুদ্রভৈরবের চিত্রকল্প কবির প্রিয়, এখানে তা’ অনুপস্থিত। গানের স্থায়ীতে বৈশাখী প্রভাতের বর্ণনা আছে। প্রেমস্মৃতিচারণার সুখাবেশে এই গানটি আলিপ্ত। কবিপুরুষের রোম্যান্টিক হৃদয়ানুভূতি এখানে ফুটে উঠেছে। গানটিতে ভোরের সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কবি এখানে কোন প্রভাতী সুর প্রয়োগ করেননি। রাত্রিবেলার রাগ জয়জয়ন্তী, খাম্বাজে তাঁর শিল্পীমনে গড়ে উঠেছে এমন এক কোমল মধুর সুর, যা প্রেমস্মৃতির স্বপ্নাবেশে জড়িত। গানের শুরুতে বৈশাখী প্রভাতের মৃদুমন্দ হাওয়া কবি পুরুষের পরিচিত পদশব্দের ছন্দ বয়ে এনেছে। আমাদের মনে পড়ে যায় প্রেম পর্যায়ের ১১ সংখ্যক গানটির কথা-
‘আকাশে আজ কোন চরণের আসা-যাওয়া…..’
আলোচ্য গানের অন্তরায় স্বপ্নশেষের বাতায়নের প্রসঙ্গ। এই স্বপ্নশেষের বাতায়নে ভেসে আসে বকুলমালার গন্ধ। বকুলমালা প্রেমেরই অনুষঙ্গ বহন করছে। হয়তো সে মালা মিলনেরই। আধোঘুমের প্রান্ত স্পর্শ করে আছে। স্বপ্ন, জাগরণ, আবিষ্টতা, কল্পনা সমস্তই একাকার হয়ে আছে এ গানে। বকুলমালার গন্ধ ইন্দ্রিয়ঘনত্বের আবেশ নিয়ে আসে। এরপর আসে এলোচুলের কোমল স্পর্শের কথা। সেখানেও ইন্দ্রিয়ময়তার অনুভব। গানের শেষে ভোরের হাওয়ায় দোদুল চাঁপাবনের চিত্রকল্পটি নিসর্গের দৃশ্যময়তা আনে। আর সেই চাঁপাবনের দোলন কবির বুকের গভীরে সঞ্চারিত হয়ে যায়। কবিপুরুষের হৃদয় কেঁপে ওঠে ভুলে যাওয়া অতীতের আর এক মধুর স্মৃতিতে। সম্পূর্ণ গানটি জুড়ে স্মৃতিমগ্ন আবিষ্টতা। গ্রীষ্মদিনের পটভূমিতে কালবৈশাখী ঝড়ের আশ্বাস চিহ্নিত হয়েছে ২০ আশ্বিন ১৩৩৩, ৬৫ বছর বয়সে লেখা ‘মধ্যদিনে যাবে গান বন্ধ করে পাখি’ গানটিতে। এই গানে রুদ্র গ্রীষ্মের দুঃসহ দহনের প্রেক্ষায় কালবৈশাখীর আগমন চিহ্নিত হয়েছে।
গানটি ‘নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’য় ‘মাধুরীর ধ্যান’ শিরোনামে চিহ্নিত। অবশ্য ঋতুরঙ্গশালায় গানের পঙ্ ক্তিবিন্যাস ভিন্নতর। বাণীতেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। সেখানে ‘প্রান্তরপ্রান্তে’র স্থানে আছে ‘শান্ত প্রান্তরের কোণে’; ‘ধ্যানমগন আঁখি’র পরিবর্তে ‘মধুরের ধ্যানআবেশে স্বপ্নময় আঁখি’। গানটি তপোমগ্ন রুদ্রভৈরবের চিত্র দিয়ে শুরু হয়নি। কিন্তু নিদাঘমধ্যাহ্নের প্রেক্ষাপট রয়েছে। মূর্ছাতুর বনানীতে পাখির গান স্তব্ধ। সেই রৌদ্রদগ্ধ নিস্তব্ধ ক্ষণে বেজে ওঠে রাখালের বেণু। আকাশের প্রান্তে মেঘের গম্ভীর ডম্বরু বাজছে। বিদ্যুৎছন্দে আসছে কালবৈশাখী। এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ অগ্নিদগ্ধ মধ্যদিন বাঁধা পড়ল চঞ্চল প্রকৃতির হাম্বীর রাগে! এ গানের দ্বিপ্রহর মন্থর, অলস। কিন্তু তপোমগ্ন ভৈরবের রুদ্রভীষণতা নিয়ে তপ্ত, প্রদীপ্ত। রাখালের বাঁশির গান মধ্যাহ্নকে এক ভিন্নতর মগ্নতা দিয়েছে। অবশ্য গানের অন্তরায় এসেছে সেই রুদ্রভৈরবের চিত্রকল্প। কিন্তু তার সাধনা ভীষণের নয়।
প্রান্তরের প্রান্তে উপবিষ্ট থেকে সেই বেনুরব শোনে রুদ্র। মাধুর্যের স্বপ্নাভাসে তার দুটি নয়ন ধ্যানমগ্ন। অর্থাৎ রুদ্রের ধ্যানমূর্তির নিভৃতে রয়েছে মাধুর্যের স্বপ্নকল্পনা। জেগে উঠেছে বৈরাগী ধ্যানীর বিরহ– সৌন্দর্যবিরহ। আসলে কবির ‘নটরাজে’র রূপকল্পনার একদিকে রয়েছে ‘নিঃশেষবিত্ত’ ‘নীরব নগ্ন’ ‘ধ্যাননিমগ্ন’ রূপ– অন্যদিকে রয়েছে সুন্দরের আভাস। ‘ব্যঞ্জনা’ কবিতায় যেমন আছে–
“রৌদ্রদগ্ধ তপস্যার মৌনস্তব্ধ অলক্ষ্য আড়ালে
স্বপ্নে রচা অর্চনের থালে
অর্ঘ্যমালা সাঙ্গ হয় সংগোপনে সুন্দরের লাগি।”(ব্যঞ্জনা)
এই গানে মহাদেবের তপোভঙ্গের প্রতিমাটি অলক্ষ্যে আভাসিত হয়েছে।
“এখানেও ধ্যানমগ্ন রুদ্রের তপোভঙ্গের জন্য পঞ্চশরের আবির্ভাব আছে। গানটির ‘রাখালই’ তার মোহন বাঁশির গানে রুদ্রের ধ্যান ভঙ্গ করে।”
(রবীন্দ্রসঙ্গীতবীক্ষা : কথা ও সুর/ ড. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী /জিজ্ঞাসা/ প্রথম সংস্করণ/ পৃষ্ঠা ১৭০)
গানের সঞ্চারীতে সমস্ত আকাশ অকস্মাৎ তৃষাতপ্ত বিরহের অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসে ভরে গেল। সেই বিরহই ক্রমশ দূর আকাশপ্রান্তে গম্ভীর ডম্বরুধ্বনিতে বিদ্যুৎছন্দে আসন্ন বৈশাখী ঝড়ে পরিণত হল। এখানে বিদ্যুৎছন্দে বৈশাখী ঝঞ্ঝার আগমন জীবনের গতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বৈশাখী ঝড় যেন জড়ত্বনাশা গতি, মুক্তি ও উন্মাদনার দ্যোতক।
বর্ষা : রবীন্দ্র-কবিজীবনে বর্ষা ঋতুর প্রভাব সবচেয়ে অমোঘ, সার্বত্রিক এবং সংবেদী। কবি রচিত ১১৫ টি বর্ষার গান এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ৭৮ টি বর্ষা অনুষঙ্গের গান হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। রবীন্দ্ররচিত বর্ষার গানগুলিকে বিভিন্ন ভাব ও বিষয় অনুষঙ্গে বিন্যস্ত করে তার কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন, ক) বর্ষাসমাগমে নিসর্গ ও মানবচিত্তের প্রত্যাশা আহ্বান ও আনন্দোল্লাস খ) বর্ষাঋতুর স্নিগ্ধ কোমল শান্তরূপ গ) বিরহীর প্রতীক্ষার অনুভব ঘ) স্মৃতিজাগানিয়া বিরহবেদনা ঙ) শূন্যতা ব্যর্থতা ও একাকিত্বের বেদনা চ) বর্ষাপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে নিসর্গ ও মানবের চিরায়ত সম্পর্কের উন্মোচন ছ) গতি ও মুক্তির প্রতীকরূপে বর্ষাঋতু জ) প্রত্যাখ্যাত প্রেমের বেদনা
(ক) কয়েকটি বর্ষার গানে ধরা পড়েছে প্রত্যাশার আশ্চর্য অনুভব। সে গানগুলিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে আহ্বান, বোধন ও মুক্ত প্রাণের উল্লাস। যেমন ১৩৪৪ সালে প্রকাশিত ৭৬ বছর বয়সে লেখা এই গানটি ‘এসো শ্যামল সুন্দর…’ ১৯৩৭ সালে বর্ষামঙ্গলের মহড়ার সময়ে রচিত। এটি সেতারের গৎ ভাঙা গান।
ধরণী তৃষ্ণার্ত তাপিত বিরহার্ত। ধরণীর সঙ্গে গগনের প্রত্যাসন্ন মিলনের শ্যামল স্বপ্নটি এ গানে উৎসবের পটভূমিতে বর্ণময় হয়ে উঠেছে। বিরাহার্তা বসুন্ধরা তমালবীথিকায় বকুল মালা গেঁথে প্রতীক্ষারত। বর্ষা এখানে প্রেমিকপুরুষ রূপে কল্পিত। বিদ্যুৎ আর বজ্রঘোষণ রবে সে অভ্যর্থিত। সেই বজ্রধ্বনি মিলনমন্দিরার মতোই ধ্বনিত হবে। গানের আভোগের শেষ দুটি পংক্তিতে কঙ্কন, কিঙ্কিনী, মঞ্জীরধ্বনির মধ্য দিয়ে নৃত্যোন্মাদনার প্রতিমা আভাসিত হয়েছে। তাতে লেগেছে লোকায়ত উৎসবের সুর। নবীন বর্ষার আগমন এখানে উল্লাস উৎসব ও আনন্দের বার্তা বহন করে এনেছে।
বর্ষার প্রত্যাশা আর আগমন আনন্দ উল্লাসের পরিব্যপ্ত উৎসবমুখরতা ধরা পড়েছে ‘নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’র একটি গানে গানটি এ পালায়, ‘ওই কি এলে আকাশপারে’ গান দ্বারা খণ্ডিত। গীতবিতানে অবশ্য গানটি স্বতন্ত্রভাবে মুদ্রিত। পংক্তিবিন্যাসে ভিন্ন, তবে বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই। গানটি রচিত হয়েছিল ১৩৩৩এ। কবির ৬৫ বছর বয়সে।
‘তপের তাপের বাঁধন কাটুক রসের বর্ষণে…’গানটি সম্পর্কে ড. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন, “বস্তুত গ্রীষ্মের প্রচন্ড তপস্যার শাসরুদ্ধ গাম্ভীর্যের সাধনফলই বর্ষার স্নিগ্ধতা। তাই বর্ষার করুণ স্পর্শকে কবি এই গানটিতে আহ্বান করেছেন।” (রবীন্দ্রসঙ্গীতবীক্ষা : কথা ও সুর/ ড. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী)
এ গানের স্থায়ীতে গ্রীষ্মের শুষ্ক কঠিন অগ্নিময় সাধনার বিপ্রতীপে প্রিয় শ্যামল বর্ষার রসবর্ষণের প্রত্যাশা ধ্বনিত হয়েছে। কবি নিখিলমানবের অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছেন বর্ষার করুণ স্নিগ্ধ স্পর্শ। অন্তরায় কবির চোখে দেখা নিসর্গচিত্রটি হল অবিরাম বর্ষণে ঘনান্ধকার বনাঞ্চলে ফুটে ওঠা অজস্র স্বর্ণবর্ণ কদম ফুলের হর্ষ। সঞ্চারীতে ধরণী আর গগনের মধুর বেদনাভরা মিলনস্বপ্নটি পৃথিবী চেয়ে চেয়ে দেখবে এমন প্রত্যাশা রয়েছে। আভোগে আবার বর্ষার নয়নভোলানো রূপের প্রসঙ্গ এলো। চোখ জুড়ানো বর্ষামেঘের আকাশঢাকা ঘনকালোছায়া সঞ্চারিত হল।
গানের শেষে এলো ভাবময় একটি অনুষঙ্গ। বর্ষার এই গহনরূপটি উন্মোচিত করে দেবে মানবের অন্তর্দৃষ্টি। কেবল বাইরের নৈসর্গিক রূপবর্ষা নয়, বরং, পরম এক দর্শনে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে বর্ষার অন্তঃস্বরূপ। বিদ্যুতের মতোই দ্যুতিময় হয়ে উঠবে হৃদয়াকাশ। কিছুটা ইন্দ্রিয়াতীত চেতনার প্রসঙ্গ এলো গানের শেষে।
(খ) বর্ষা ঋতুর শ্রান্তিহারী শান্ত স্নিগ্ধ কোমল রূপটি কয়েকটি গানে অভিনব স্বাদুতা সঞ্চার করেছে। যেমন ২২ অগ্রহায়ন ১৩৩৪ প্রকাশিত কবির ৬৬ বছর বয়সে লেখা এই গানটি ‘নমো নমো নমো করুণাঘন….’ গানটির শিরোনাম নটরাজ ঋতুরঙ্গশালায় ‘বর্ষার প্রবেশ’। এই গানটিতে বর্ষার আবির্ভাব করুণাঘন বরদাত্রীরূপে। “মেঘের ঘনিমা এই করুণাঘন বর্ষার নয়নের অমৃতাঞ্জন রূপে চিহ্নিত, বর্ষাজলধারা তার সুধারসবর্ষণরূপে নন্দিত। বর্ষাকে সুধারসরূপে কল্পনা একইসঙ্গে বর্ষার ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা এবং তার নান্দনিকতাকে ব্যঞ্জিত করে।”
(ঋতুসঙ্গীতে রবীন্দ্রকবিমানস / ড.অপূর্ব বিশ্বাস /দেজ পাবলিশিং/ আশ্বিন ১৪০৩ /পৃষ্ঠা ৩৭)
কৃষিপ্রধান বাংলায় বর্ষার যে লোকায়ত রূপ, শস্যমুগ্ধ আশ্বাস- তাকেই কবি অভিনন্দিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঋতু মানুষের অন্তরে যে অনন্ত সৌন্দর্য এবং রসঘন সংবেদনা নিয়ে আসে, তার অর্জনও জীবনের মস্ত বড় সম্পদ। বর্ষাস্নিগ্ধ নিখিল বিশ্বের আকন্ঠ ধন্যতার উচ্চারণ যেন কবিকণ্ঠে শুনতে পাই আমরা। শ্যামকান্তিময়ী স্নিগ্ধ সজল বর্ষার শ্রান্তিহরা রূপের অভিবন্দনাই এ গানে প্রামুখ্য পেয়েছে।
(গ) বর্ষার বহিরঙ্গ বর্ণনার চেয়ে অন্তরঙ্গ দিকটি কখনো কখনো মুখ্য হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানে। প্রথম জীবনে লেখা ভানুসিংহের পদাবলীর গানেও বর্ষাকে সংবেদনাময় রূপেই দেখি। তবু ৪৮ বছর বয়সে লেখা বর্ষার গানগুলিতে প্রেমচেতনা পেয়েছে ভিন্নতর গাঢ়তা। “যখন তার ব্যক্তিগত জীবনে বেদনা হয়েছে স্তূপীকৃত, যখন আঘাত এবং প্রতিকূলতা একটা প্রাকৃতিক রূপকের আকার ধারণ করেছে, তখনই তিনি সব থেকে সংবেদী ভাষায় বর্ষাকে করে তুললেন তাঁর আত্মদর্শনের উপায়।” (আলো আঁধারের সেতু : রবীন্দ্র চিত্রকল্প/ সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় /দেজ / প্রথম সংস্করণ)
এই সংবেদনাময় প্রেমআর্তি কবির শেষ দুই দশকের গানেও আরো নিবিড়তর রসরূপ নিয়ে ধরা দিয়েছে, এর মধ্যে বিরহীর প্রতীক্ষাই গভীর সংবেদনা পেয়েছে। ‘প্রতীক্ষা’র একটি গান রচিত হয় ১ আগস্ট ১৯৩৯, কবির বয়স যখন ৭৮।
‘এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি…’ এই গান সম্পর্কে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য জানিয়েছেন আচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার। ১৯৩৯ এ বর্ষামঙ্গলের জন্য তখন কবির কাছে নিত্য নতুন গানের ফরমায়েশ করছেন তিনি। একদিন বেহাগসিদ্ধ কবিকে দিয়ে ইমনের সুরে বর্ষার গান লিখিয়ে নেবার জন্য একটি কাগজের টুকরোয় ‘ইমন’ লিখে কবির টেবিলে রেখে এলেন। কবি ছদ্ম ক্রোধ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত লিখলেন। শৈলজারঞ্জন বলেন, “পেলামও- এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি- গানটি।” (যাত্রাপথের আনন্দ গান/ শৈলজারঞ্জন মজুমদার /আনন্দ/ প্রথম সংস্করণ)
এর ঠিক পাঁচ মাস পরে ১৯৪০ এর ১০জানুয়ারি এই গানটিকে কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন কবি।
‘সানাই’এর সেই কবিতার শিরোনাম ‘আহবান’। তার স্তবকবিন্যাসও গানের থেকে ভিন্নতর-‘জ্বেলে দিয়ে যাও সন্ধ্যাপ্রদীপ বিজন ঘরের কোণে, নামিল শ্রাবণ সন্ধ্যা, কালো ছায়া ঘনাইল বনে বনে।….’
অবশ্য কবিতা হিসেবে গীতবিতানের গানটি যে বেশি সার্থক, ‘আলো আঁধারের সেতু: রবীন্দ্রচিত্রকল্প’ বইতে সে কথা বলেছেন সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতায় প্রথম পংক্তিতে যে প্রদীপটি জ্বালতে বলা হয়েছে তা সন্ধ্যাপ্রদীপ। গানে এ তথ্যটি অনাবশ্যক বলে বর্জিত। বরং সন্ধ্যাটি যে শ্রাবণসন্ধ্যা, সে কথাই অধিক প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। কবিতায় হৃদয়ের ‘পরশপ্রতীক্ষা’র কথাটি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এখানে প্রতীক্ষা কেবল ‘নিভৃত’ এই নির্ভার বিশ্লেষণ নিয়েই গোটা অস্তিত্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। যূথীমালার গন্ধ আর নীলবসনের অঞ্চলছায়ার রোমাঞ্চ কিছুটা বৈষ্ণব অনুষঙ্গকে মনে করিয়ে দেয়।
সঞ্চারীতে হারিয়ে যাওয়া বাঁশি, সুরহারা প্রতীক্ষা… দীনতার এক মগ্ন রসাবেদন নিয়ে আসে, যা কবিতায় নেই। কবিতার বাতায়নতলের তথ্যটিও অনাবশ্যকবোধে পরিত্যক্ত হয়েছে। বিরহী প্রতীক্ষমানের কম্পিত বক্ষের স্পর্শ সজল হাওয়ায় হাওয়ায় যেভাবে সঞ্চারিত হয়ে যায় তাতে গানটি কবিতা হিসেবে অধিকতর সার্থকতা পায়। তবে কবিতার এই চিত্রকল্পটি আরো নান্দনিক।
‘কম্পিত এই মোর বক্ষের ব্যথা
অলকে তোমার আনে কি চঞ্চলতা
বকুলবনের মুখরিত সমীরণে।’– এর নির্যাসটুকু গানে ধরে দেওয়া হয়েছে একটি মাত্র পংক্তিতে
‘কম্পিত বক্ষের পরশ মেলে কি সজল সমীরণে।’
আসলে কবিতার কিছুটা দীর্ঘায়ত বাণী এই স্বল্পপরিসর গানে নির্মেদ লাবণ্যময় গভীরতা পেয়েছে।
(ঘ) পরিণত পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানে সর্বদা প্রতীক্ষা নয়, সেখানে দেখতে পাবো স্মৃতিবেদনার মালা গাঁথা গানগুলি মুখ্যত স্মৃতিবাহিনী। এই পর্যায়ে স্মৃতিজাগানিয়া বর্ষার গানগুলিতে বিরহের এমন মগ্ন ছবি আঁকা হয়েছে যার সমতুল্য উদাহরণ অন্য পর্যায়ের গানে নেই।
এমনই এক স্মৃতিভারাতুর বিরহগাথার প্রকাশকাল ১৩৪৪।
‘আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে…’
এই গানের স্থায়ীতেই স্মৃতির বেদনা। হারিয়ে যাওয়া দিনের অবগাঢ় স্মৃতি। শ্রাবণের মেঘাবৃত আকাশে যেন তারই ছায়া।
গানের অন্তরায় অতীতের যে স্মৃতির প্রসঙ্গ এসেছে তার সুর মধুর মিলনের নয়। বরং বিচ্ছেদের। সমাপ্তির। বেদনার। প্রেমের যে রাগিনী মিলনের সংরক্ত অনুভব থেকে অতল বিরহে নেমে গেছে.. তার জন্যই হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে। অশান্ত পুবন বাতাসে যেন সেই বিচ্ছেদেরই প্রকম্পিত দীর্ঘশ্বাস।
সঞ্চারীতে এসে পেলাম মিলন দিনের মধুময় স্মৃতি। নিবিড় সুখ আর মান-অভিমানের মধুরিমায় জড়ানো সেই প্রেমের সংরাগ আকুল করে তোলে প্রেমিকসত্তাকে। স্মৃতিচারণায় আমরা পেলাম একটি আশ্চর্য ভাবপ্রতিমা। দুই তারে সেখানে জীবনবীণা তন্ত্রীবদ্ধ। দুটি তার যেন জীবনের আনন্দ-বেদনা দুঃখ-সুখ এবং যুগ্মপ্রেমেরই প্রতীক।
আভোগে বেজে উঠেছে ছিন্নতন্ত্রীর বেদনা, বিচ্ছেদ আর বিষণ্ণতার হাহাকার। মনে পড়ে যায় প্রেম পর্যায়ের আরেকটি গানের পংক্তি।
‘ছিন্ন যবে হল তার ফেলে গেলে ধুলি পরে
নীরব তাহারি গান আমি তাই জানি তোমারি দান
ফেরে সে ফাল্গুন হাওয়ায় হাওয়ায় সুরহারা মূর্ছনাতে।।’
(ঙ) রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি বর্ষার গানে আমরা পাব শূন্যতার ব্যর্থতার একাকিত্বের বেদনা ও ট্রাজেডি। এখানে রোম্যান্টিক বিষাদের কথা বলা হয়নি। বর্ষা এখানে নৈসর্গিকও ততখানি নয়, যতটা দুর্যোগ সংকট বিপন্নতা ও অচরিতার্থতার প্রতীক। রবীন্দ্রজীবনের উপান্তে
২৬ আগস্ট ১৯৩৮ এ একটি গানে মানবভাগ্যের ট্রাজিক উপলব্ধির আশ্চর্য প্রকাশ দেখতে পাই–
‘যায় দিন শ্রাবণদিন যায়….’
এর সামান্য পাঠভেদ পাওয়া যায় ১৩৪৬ এ। শেষ পংক্তিতে ‘সিক্তমালতীগন্ধে’র পরিবর্তে আছে ‘মালতীমঞ্জরীগন্ধে’।
গানের স্থায়ীতে আমরা অনুভব করি সেই শঙ্কা, যা কোনো বস্তু বা ঘটনার জন্য নয়। এক শূন্যতার বোধ আমাদের চেপে ধরে। আসন্ন শ্রাবণরাত্রির পটভূমিকায় বিরহী কবিপুরুষ অনুভব করতে পারে তার মিলনপ্রত্যাশা ব্যর্থ। মায়াবীসন্ধ্যার ছলনা ছাড়া আর কিছু নয়। সে সম্ভবত বুঝতে পারছে যার জন্য এই প্রতীক্ষা, সে অনাগতই শুধু নয়, অবাস্তব ছলনা। এই মিলনপ্রতীক্ষা আসলে তারই সংরক্ত হৃদয়ের কাল্পনিকতা। গানের পঞ্চম চরণ আমাদের রিক্ততার প্রান্তে নিয়ে যায়..!
‘ব্যাকুলিছে শূন্যেরে কোন্ প্রশ্নে …’
এখানে শূন্যকে প্রশ্নে ব্যাকুল করে তোলার মধ্য দিয়েই ট্রাজেডি ঘনিয়ে এসেছে।
ধীমান ভাবুক আবু সঈদ আইয়ুব এইভাবে গানটিকে ব্যাখ্যা করেছেন, “ব্যাকুলিছে ক্রিয়ার প্রয়োগ এখানে অভিনব, অপ্রত্যাশিত এবং সেই কারণে এত মর্মস্পর্শী।….. নির্জন ঘরে প্রতীক্ষমানা হতভাগিনীর হয়ে প্রদীপের কম্পমান শিখা প্রশ্ন করছে সে কি আসবে না, সে কি বুঝবে না আমার ব্যথা ? কিন্তু রাত্রিও জানে- প্রশ্নটি কত অর্থহীন। এমন কেউ কোথাও নেই যার কাছে প্রশ্ন পৌঁছতে পারে। সাড়া পাওয়া তো অনেক দূরের কথা। প্রশ্ন শূন্যেই হারিয়ে যাবে। শূন্যকে ব্যাকুল করার চেয়ে বৃথা এবং নিষ্করুণ আর কোন্ চেষ্টা হতে পারে।”(পান্থজনের সখা / আবু সয়ীদ আইয়ুব /দেজ /পৃষ্ঠা ২০-২১।)
এ গানে নিবিড় তমিস্রবিলুপ্ত আশারই বেদনা ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। ভিতর এবং বাহিরের সমস্ত পথচিহ্ন মুছে গেছে। গানের শেষ পংক্তিতে একটা বিভ্রম জাগে। বৃষ্টির ছন্দ এবং ভেজামালতীর গন্ধ যেন কিছুটা রোম্যান্টিক বিপ্রতীপতা নিয়ে আসে। হয়তো তাতেই শূন্যতা, বিষাদ এবং হতাশাই আরো গাঢ়তর রূপে প্রতীয়মান।
(চ) রবীন্দ্রনাথের কিছু বর্ষার গানে প্রকৃতি ও মানবের জন্ম-জন্মান্তরীন সম্পর্কের ইতিবৃত্তটি ধরা পড়েছে। কালহীন অতীতের সঙ্গে সাম্প্রতিকের ছিন্নসূত্রটিকে কবি বর্ষার মধ্য দিয়ে অনুভব করতে চেয়েছেন। শিলাইদহ থেকে ৯ ডিসেম্বর ১৮৯২ তে লেখা একটি চিঠিতে কবি লিখেছেন, “ এই পৃথিবীটি আমার অনেক দিনের এবং অনেক জন্মকার ভালোবাসার লোকের মত আমার কাছে চিরকাল নতুন…..। যখন ঘনঘটা করে মেঘ উঠত তখন তার ঘনশ্যাম ছায়া আমার সমস্ত পল্লবকে একটি পরিচিত করতলের মতো স্পর্শ করত।”
(ছিন্নপত্র /বিশ্বভারতী/ ১৯৭৫ /পৃষ্ঠা ১৪৩-১৪৪)
এই চিরন্তন প্রকৃতিলীনতার প্রসঙ্গে উল্লেখিত হতে পারে ১৩ শ্রাবণ ১৩৩৬ এ লেখা একটি গান।
‘কোন্ পুরাতন প্রাণের টানে…’
গানটি প্রসঙ্গে ড প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী বলেছেন, “বর্ষার উদ্দীপন মানবের আদি উৎসের সঙ্গে সংযোগকে মনে করিয়ে দেয়।”
(রবীন্দ্রসঙ্গীতবীক্ষা : কথা ও সুর /ড. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী /জিজ্ঞাসা /প্রথম সংস্করণ।)
মাটির টানে ফিরে চলার উদ্দীপ্ত এক আহ্বান আছে গানটিতে। প্রাণের টান কেবল সত্তাপরিচয়বাহী নয়, জন্ম-জন্মান্তরীন সম্পর্কও তাকে নিবিড়তা দিয়েছে। পুরনো প্রাণের টান তাই আমাদের নিয়ে যায় বর্ষণফুল্ল মাটির দিকে। যুগ-যুগান্তরের সমস্ত অনুভব দিয়েই যেন কবি বর্ষাকে গ্রহণ করেছেন।
অন্তরায় আমাদের চোখ ডুবে গেছে প্রান্তরজোড়া নবীন সবুজ ঘাসে। ভাবনা পুবন হাওয়ায় ভেসে চলেছে যুগান্তরের দিকে। মল্লারের সুর যুগান্তরের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়। শ্রাবণের গানে যেন কবিপুরুষ অতিক্রম করে যান বর্তমানের সীমানা।
গানের সঞ্চারীতে যে ‘দোলা’র প্রসঙ্গ আছে তা কিছুটা যেন বসন্তের গন্ধবাহী। আমরা একটা প্রেমের গানে পেয়েছি,
‘লাগিল দোল জলে স্থলে, জাগিল দোল বনে বনে’
উল্লাস আর উচ্ছ্বাসের বাধাবন্ধহীন আনন্দ নিসর্গ থেকে মানুষের দেহে মনেও সঞ্চারিত হয়ে পড়েছে। ধানের ক্ষেতের অঙ্কুরে চিরায়ত আনন্দের বাণী সুর ও ছন্দ হয়ে ধরা দিয়েছে।
(ছ) রবীন্দ্রনাথের ৬০/ ৬২ বছরে রচিত গানগুলি বিষয়মহিমায় ভিন্নতর তাৎপর্য পেল। চিত্রকল্পনির্মাণে এল নতুন ধারা। বসন্তের গানের মতোই গতিশীল কালের ইমেজ এই পর্যায়ের বর্ষার গানে যুক্ত হল। এই প্রসঙ্গে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “ষাট-বাষট্টি বছর বয়সের গানগুলিতে কিন্তু গতির ছবি ফুটে উঠল।….. আটচল্লিশ থেকে বাহান্ন এই পাঁচ বছরে যেখানে গানগুলি ছিল অন্তর্গূঢ়, গানে-বাঁধা পালায় সে হয়ে উঠল বহতা দ্বান্দ্বিক সমগ্রতার একটা অংশ।”
(আলো-আঁধারের সেতু : রবীন্দ্র চিত্রকল্প/ সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় /দেজ /প্রথম সংস্করণ)
বিশেষ করে মনে রাখবো, এ পর্বেই, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘শেষবর্ষণ’ (১৯২৬),’ নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’ (১৯২৬), ‘শ্রাবণগাথা’ (১৯৩৪) ইত্যাদি পালানাট্য, ঋতুনাট্য।
নাট্যযোজনাসূত্রে গানগুলি পেল ভিন্ন দৃষ্টিকোণ।
প্রতীকে এবং রূপকে বর্ষা তখন বসন্তের মতোই হয়ে উঠল এমন এক গতিময় শক্তি, যা চিরাচরিত স্থিতাবস্থাকে ভাঙতে ভাঙতে কেবল এগিয়ে চলে।
বর্ষাকে গতি এবং মুক্তিচেতনার প্রতীকরূপে গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষাটি ৭৮ বছর বয়সে লেখা কার্তিক ১৩৪৪, এই গানটিতে নিবিড় হয়ে ধরা দিয়েছে-
‘মন মোর মেঘের সঙ্গী…’
এই গানটি সম্পর্কেও মজার তথ্য জানিয়েছেন আচার্য শৈলজারঞ্জন। বর্ষার দিনে তিনি কবিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলেন, “কি মেঘের ঘটা, কি বাতাস বইছে। মনে হচ্ছে যেন শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে যাবে….।”
উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “গানটান আমি লিখতে পারব না”। কিন্তু বিকেলবেলায় কবি তাকে ডাকলেন।
‘মন মোর মেঘের সঙ্গী
উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে…..’ গানটি লিখেছেন।
“কিছু না বলে গানটি গলায় তুলে স্বরলিপি করে নিলাম।”(যাত্রাপথের আনন্দগান /শৈলজারঞ্জন মজুমদার/ আনন্দ /প্রথম সংস্করণ)
মুক্তির যে চেতনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল ‘পথিকমেঘের দল জোটে ওই শ্রাবণগগনঅঙ্গনে’ গানে, তা আরো বিস্তারিত হয়েছে এই গানটিতে। সেই দুঃসাহসিক অভিযানের আবেগ এই গানে আশ্চর্য মুক্তিতে সম্পূর্ণতা পেয়েছে। মুক্তির আকাশে পাখা মেলার শব্দ এ গানে ধ্বনিত।
কান পেতে যেন বলাকাপাঁতির শব্দ শুনি
‘ক্বচিত ক্বচিত চকিত তড়িতআলোকে’।
‘ ক্ষুব্ধ শাখার আন্দোলনে’ কথাগুলির সুর আন্দোলিত বৃক্ষশাখাকেই যেন চোখের সামনে নিয়ে আসে।
শ্রাবণবর্ষণের রিমঝিম ধারাসঙ্গীতে ঘন মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মন উড়ে চলে দিকে দিগন্তে। হংসবলাকার উধাও উড়ে চলার ছন্দে ছন্দেও ভেসে চলে মন। সঙ্গে বিদ্যুতের চকিত চমক, বজ্রপাতের শব্দ, যা রুদ্র এক আনন্দকেই প্রতিভাসিত করে। চরাচরব্যাপী প্রত্যাসন্ন প্রলয়ের আহ্বান ধ্বনিত হয়। গতির অবিশ্রান্ত আবেগ, মুক্তির অজানা আনন্দ গানটিকে উত্তীর্ণ করে দিয়েছে ভিন্ন এক নান্দনিকতায়।
(জ) বর্ষার কিছু গানে গভীর হয়ে বেজে উঠেছে প্রত্যাখ্যানের বেদনা, যেখানে ছিল প্রেমেরই মগ্ন আহ্বান।
বর্ষামঙ্গল উৎসবের জন্য লেখা ভাদ্র ১৩৪৬, কবির ৭৮ বছর বয়সের রচনা ‘এসেছিনু দ্বারে তব শ্রাবণরাতে..’
গানে বেজে উঠেছে প্রত্যাখ্যানের বিষাদ।
আচার্য শৈলজারঞ্জন জানিয়েছেন ১৯৩৯ এর বর্ষামঙ্গলের জন্য কবি অনেকগুলি গান লিখেছিলেন। তার মধ্যে এটি অন্যতম।
পার্থ বসু গানটিকে বলেছেন “দলছাড়া এক গান।” বলেছেন, “তিমিরাবৃত বর্ষারাতের মত এখনও সে আচ্ছন্ন, যে তার সম্পূর্ণ অর্থ খুঁজে পাইনা সেরকমই রহস্যময়। সেরকম অনালোকিত। অস্বচ্ছ।”
(দলছাড়া এক গান / পার্থ বসু / রবিতীর্থ বার্ষিক উৎসব ১৯৮৭ স্মারক পুস্তিকা /সুচিত্রা মিত্র সম্পাদিত)
বর্ষার গানে যে ধরনের চিত্রকল্প বা প্রতীক থাকে, তাও আছে গানটিতে।
স্থায়ীতে আছে শ্রাবণরাতে প্রেমাস্পদ দয়িতার দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এমন চিত্রকল্প অন্য গানেও আছে।
‘দূর হতে আমি দেখেছি তোমার ওই বাতায়ন তলে
নিভৃতে প্রদীপ জ্বলে
আমার এ আঁখি উৎসুক পাখি ঝড়ের অন্ধকারে।।’
কিন্তু অন্তরায় প্রেমাস্পদ অন্ধকারে দেখলেন প্রেমিকার গহন অন্তরে কৃষ্ণছায়া। বিমুখ তার মুখ।
তাকেই সঞ্চারীতে বলা হল ‘কৃপণা’। কারণ, দেবার মতো হয়তো সবই ছিল তার ভাণ্ডারে। ছিল লাবণ্য, সৌন্দর্য, মাধুর্য। তারই জন্য প্রার্থী হয়ে পথে বেরিয়েছিলেন প্রেমিক। কিন্তু শূন্য হাতেই তাঁকে ফিরতে হল প্রত্যাখানের বিষাদ নিয়ে। তবে কি প্রেমিকেরই দেওয়া কোনো আকস্মিক আঘাতে বিদীর্ণ তাঁর প্রেয়সী?
প্রেমিক জানেন না তার উত্তর।
‘সানাই’ কাব্যে (১৯৪০) গানের ভিন্ন কাব্যরূপ পাই।
‘এসেছিনু দ্বারে ঘনবর্ষণরাতে
প্রদীপ নিবালে কেন অঞ্চলাঘাতে।’ (কৃপণা)
“এ কি প্রত্যাখ্যানের বেদনা ? এ কি প্রত্যাঘাতের প্রতীক ! অন্য বর্ষার গানের মত এখানে বিরহ, যন্ত্রণার স্মৃতি দীপ্ত হয়ে ধরা দেয়না। এখানে শুধু কালো ছায়া, বিমুখ মুখ, দুঃখের সাথী বড় মর্মান্তিকভাবে এল। আটাত্তর বছর বয়সী কবির কাছে মেঘাচ্ছন্ন নিশীথের বর্ষণ তাহলে কি আর উজ্জ্বলন্ত প্রতিমা আনেনা ? নাকি বর্ষাঋতুর রূপকার অন্তিম পর্বে এসে চেয়েছেন মেঘমুক্ত দিনের দাক্ষিণ্য ।”
(ঋতুসঙ্গীতে রবীন্দ্রকবিমানস/ ড. অপূর্ব বিশ্বাস /দেজ পাবলিশিং /আশ্বিন ১৪০৩ /পৃষ্ঠা ৭০)
এ গানে আমাদের চিরচেনা রোম্যান্টিক বর্ষা কিছুটা আহত হয়েছে। গানটির রহস্য এজন্যই অনিঃশেষ, আর সেই কারণেই কালোত্তীর্ণ ।
রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের বর্ষার গানে এভাবেই আমরা খুঁজে পেতে পারি বিষয়গত বিন্যাসের নানাস্তরীয় মহিমা– যা অনন্য। ড. অরুণ কুমার বসু মন্তব্য করেছেন এই বিষয়গত বিশ্লেষণেও সম্পূর্ণ হয়ে ধরা দেয় না বর্ষার গানের অনিঃশেষ সৌন্দর্য ও মহিমা।
“বর্ষাসঙ্গীতগুলির মধ্যে কবির সুদীর্ঘ কবিজীবনের যে বেদনা ও পুলক, দীর্ঘশ্বাস ও উল্লাস, তত্ত্ব ও কল্পনা স্তরে স্তরে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, বস্তুত নির্দিষ্ট শ্রেণীতে তার পরিমাপ করা যায় না”।
(বাংলা কাব্য সঙ্গীত ও রবীন্দ্র সংগীত / ড.অরুণ কুমার বসু/ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় /প্রথম সংস্করণ / পৃষ্ঠা ৫৮৪)
তথ্যসূত্র
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। গীতবিতান। কলকাতা: বিশ্বভারতী, বিভিন্ন সংস্করণ।
- ঘোষ, শান্তিদেব। রবীন্দ্রসঙ্গীত। কলকাতা: বিশ্বভারতী, প্রথম সংস্করণ।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ছিন্নপত্র। কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৯৭৫।
- ঠাকুর, দিনেন্দ্রনাথ। “রবীন্দ্রসঙ্গীত।” এইচ. এম. ভি. গানের সুরের ধারা, তৃতীয় খণ্ড, ১২৫তম রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত অ্যালবাম, কলকাতা।
- চক্রবর্তী, প্রফুল্ল কুমার। রবীন্দ্রসঙ্গীতবীক্ষা : কথা ও সুর। কলকাতা: জিজ্ঞাসা, প্রথম সংস্করণ।
- বিশ্বাস, অপূর্ব। ঋতুসঙ্গীতে রবীন্দ্রকবিমানস। কলকাতা: দেজ পাবলিশিং, আশ্বিন ১৪০৩।
- বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ। আলো-আঁধারের সেতু : রবীন্দ্র চিত্রকল্প। কলকাতা: দেজ পাবলিশিং, প্রথম সংস্করণ।
- মজুমদার, শৈলজারঞ্জন। যাত্রাপথের আনন্দ গান। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, প্রথম সংস্করণ।
- আইয়ুব, আবু সয়ীদ। পান্থজনের সখা। কলকাতা: দেজ পাবলিশিং।
- বসু, অরুণ কুমার। বাংলা কাব্যসঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীত। কলকাতা: রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সংস্করণ।
- বসু, পার্থ। “দলছাড়া এক গান।” রবিতীর্থ বার্ষিক উৎসব স্মারক পুস্তিকা, সম্পা. সুচিত্রা মিত্র, ১৯৮৭।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। সানাই। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। শ্রাবণগাথা। কলকাতা: বিশ্বভারতী।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। শেষবর্ষণ। কলকাতা: বিশ্বভারতী।