September 23, 2019

সভ্যতার সংকট ও মানবতার প্রত্যয় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে মানুষ ও আধুনিক বিশ্ব

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য, বেঙ্গল মিউজিক কলেজ

অ্যাবস্ট্রাক্ট

এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভ্যতা-ভাবনা ও মানবতাবোধকে ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধকেন্দ্রিক আলোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সভ্যতাকে কেবল প্রযুক্তি, শাসনব্যবস্থা বা বাহ্যিক উন্নতির মানদণ্ডে বিচার করেননি; বরং মানবিক মূল্যবোধ, হৃদয়বত্তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকেই সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রথম পর্যায়ে ইউরোপীয় সভ্যতার আইন, শৃঙ্খলা ও মুক্তবুদ্ধির প্রতি তাঁর গভীর আস্থা গড়ে উঠলেও, ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণমূলক ও মানবতাবিরোধী রূপ প্রত্যক্ষ করে সেই আস্থা ক্রমে ভেঙে পড়ে।

বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ইংরেজ শাসনের ‘Law and Order’-এর দ্বিচারিতা, মানবপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ ও নৈতিক অধঃপতন, যা রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সভ্যতার এক গভীর সংকটের সূচনা করে। বিশ্বযুদ্ধকালীন ইউরোপে যান্ত্রিকতা, ক্ষমতাদর্প ও আগ্রাসনের উত্থান তাঁর কাছে মানবতার পরাজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবু রবীন্দ্রনাথ চূড়ান্ত নিরাশায় থেমে যান না। প্রাচ্য দর্শনের ধারণক্ষমতা, সহনশীলতা ও মানবিক চেতনায় তিনি নতুন সভ্যতার সম্ভাবনা খুঁজে পান।

এই প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছে, কীভাবে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী ভাবনার সঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লি চ্যাপলিন ও জন লেননের চিন্তার সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ মানুষের প্রতি বিশ্বাস, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং মানবিক সভ্যতার পুনর্গঠনের এক আশাবাদী দিগন্ত উন্মোচন করেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সূচক–শব্দ (Keywords)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভ্যতার সঙ্কট, মানবতাবাদ, ঔপনিবেশিকতা, ইউরোপীয় সভ্যতা, প্রাচ্য দর্শন, নৈতিকতা।

মানবিক মূল্যবোধ সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন কথাটি রবীন্দ্রমননে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছে চিরকালের জন্য। মানবতার বিকাশে, হৃদয়বত্তার দাক্ষিণ্যে সভ্যতার পরিচয়। তিনি বলেন, “বিচিত্রকে মিলিত করিবার শক্তি সভ্যতার লক্ষণ।”[1](আত্মশক্তি। ভারতবর্ষীয় সমাজ)।

ভারতে সভ্যতাবিস্তারের শুরুর কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করে নেন প্রথমেই যে – আমাদের “যে জগতের মধ্যে বাস সেটা সংকীর্ণ এবং অতি পরিচিত।”[2] (কালান্তর।কালান্তর)।

বলছেন, ” একদিন চন্ডীমণ্ডপে আমাদের আখড়া বসত, আলাপ জমত পাড়াপড়শিদের জুটিয়ে, আলোচনার বিষয় ছিল গ্রামের সীমার মধ্যেই বদ্ধ। …….রাগদ্বেষে, গল্পে-গুজবে, তাসে-পাশায় এবং তার সঙ্গে ঘন্টা-তিন-চার পরিমাণে দিবানিদ্রা মিশিয়ে দিনটা যেত কেটে। …….কঠিন সংস্কারের ইঁট পাথর দিয়ে বিশেষ সংসারের নির্মাণকার্য সমাধা হয়ে গিয়েছিল”।[3] (কালান্তর। কালান্তর)।

ইতিহাসের ধারা বেয়ে শক-হুন-দল পাঠান-মোগল ভারতের দেহে  মিলেছে মিশেছে।  তবু, রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “বাহির থেকে হিন্দুস্থানে এসে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করেনি। ….ঘর দখল করে বসল, বদ্ধ করে দিলে বাহিরের দিকে দরজা।”[4] (কালান্তর।কালান্তর।)

তারপর ইংরেজের ভারতে আগমন–  “কেবল মানুষ রূপে নয়, নব্য য়ুরোপের চিত্ত-প্রতীক রূপে।”[5] (কালান্তর। কালান্তর)।

ইংরেজ জাতি শিক্ষায়, আচরণে, রাষ্ট্রনৈতিক দক্ষতায় অভিভূত করল দেশের জ্ঞানীগুণীবর্গকে। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে, বলছেন রবীন্দ্রনাথ, “আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে উদ্ঘাটিত হল একটি মহৎ সাহিত্যের উচ্চশিখর থেকে ভারতের এই আগন্তুকের চরিত্রপরিচয়।”[6] (সভ্যতার সংকট। কালান্তর)।

রবীন্দ্রনাথ আস্থা রেখেছিলেন উদ্যোগী, কর্মবীর, সুশিক্ষিত এই মুক্তমনা জাতির প্রতি। ইংরেজ জাতির মধ্যে সুপণ্ডিত মনীষীদের পরিচয়ও তিনি পেয়েছিলেন। তাঁদের নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, মুক্ত মনের প্রসার – তাঁর মনকেও আলোড়িত, আলোকিত করে তুলেছিল। মনে হয়েছিল সভ্যতার রূপ এমনই হওয়ার কথা– সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যা মানুষের মনকে, মননকে উজ্জীবিত করবে, প্রসারিত করবে। পরিশীলিত সেই মনন জাতির উন্নতির সহায়ক হবে। এই আশার বা আস্থার পক্ষে প্রভূত যুক্তিও ছিল।

১৭ বছর বয়সে যখন রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছুদিনের মতো ইংলন্ডে গেলেন, তখন ইংরেজদের কর্মবিধি ও জ্ঞানের পরিধি দেখে “আন্তরিক শ্রদ্ধা নিয়ে ইংরেজকে হৃদয়ের উচ্চাসনে”[7] বসিয়েছিলেন। সেখানে মানুষজন দেখেছেন। পার্লামেন্ট দেখেছেন। পার্লামেন্টের বক্তৃতা নিয়মিত শুনেছেন। তাদের নীতি-নিষ্ঠতা প্রত্যক্ষ করেছেন। কীভাবে তাদের সভ্যতা তৈরী হয়েছে তা’ হৃদয়ঙ্গম করেছেন। আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির আশাও সেখান থেকে উৎসারিত হয়েছে। তিনি বলছেন যে ইউরোপ আমাদের শিখিয়েছে Law and Order-এর ধারণা,– অর্থাৎ, আইনের চোখে সবাই সমান– এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় রবীন্দ্রনাথ দেখেছেনও এই Law and Order-এর যথাযথ প্রয়োগ। আমাদের দেশের ধর্মান্ধতা, জাতের ভেদবিচার– এর বিপ্রতীপে যে মহৎ ভাবনার প্রয়োগ তা’ রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। ইংরেজদের স্বভাবের এই অগ্রগতি, তাদের সত্যনিষ্ঠা, সত্যের সন্ধান ও সম্মান সেটাই সেখানকার মানুষের এত বড় উন্নতির কারণ বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে ক্রমশ তিনি অনুভব করলেন ইংরেজ জাতির প্রতি তাঁর এই যে জানার বোধ, তা’ পর্যাপ্ত নয়, এমনকি, ক্রমশ তা’ অত্যাচারের আকার নিতে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত নিয়েছেও। মনে হয়, শহর কলকাতার বাইরে যখন তিনি গ্রাম-জীবনে পা রাখলেন, উদার প্রকৃতি ও প্রকৃতির কোলে মানুষকে, মানব-জীবনপ্রবাহকে দেখলেন, বাংলা তথা ভারতকে জানতে শুরু করলেন হাতে-কলমে, হয়তো তখন থেকেই তাঁর ভাবনার বদল হলো। তিনি দেখলেন ইংরেজরা ভারতের জন্য উন্নতি সাধনের যে পন্থা নিয়েছে তা থেকে কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের, কিছু শিক্ষিতজনের উপকার হতে পারে। আপামর দেশবাসীর কাছে সে উপকার বা উন্নয়ন কিছুই পৌঁছোচ্ছে না- তাই শুধু নয়-দেশবাসী অত্যাচারিত হচ্ছে। লুঠতরাজ চলছে। দেশের সম্পদ লুটে নিয়ে নিজেরা ভোগ দখল করছে। দেশের মানুষকে দিয়ে পরিশ্রমের ফসল ফলিয়ে নিজের ঘরে তুলছে। ইংরেজদের Law and Order, তাদের সত্যনিষ্ঠা এ দেশে কিছুই প্রযোজ্য হচ্ছে না। অপমানিতের জীবন যাপন করছে এ দেশের মানুষ। তাদের মধ্যে কোনো শিক্ষার জায়গা নেই, সমবায়ের ভাবনা নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। বাঁচার জন্য জরুরী কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। একেবারেই পরিত্যক্ত হয়ে সমাজের এক কোণে তারা পড়ে রয়েছে। শোষণ চলছে তাদের ওপর। প্রবল শোষণ। তাদেরই কাঁচামাল নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়ে সেই দিয়েই লাভজনক কিছ তৈরী হচ্ছে– যে লভ্যাংশ এদেশের মানুষের কাছে আসছেই না‌!

ইংরেজদের দুর্দান্ত শাসকপ্রকৃতির এই যে ভয়াল রূপ ক্রমশ দেখা গেল, যা আসলে উন্নয়নবিরোধী তো বটেই, অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয় মানুষকে, বিচারের নামে প্রহসন চলে– সম্পূর্ণ যা তাদের নীতিবিরুদ্ধ– এই আক্রমক চেহারা দেখে রবীন্দ্রনাথের আস্থা ভেঙ্গে গেল। তাঁকে বলতে হল- ” য়ুরোপের বাইরে য়ুরোপীয় সভ্যতার মশালটি আলো দেখাবার জন্যে নয়, আগুন লাগাবার জন্যে।”[8] (সভ্যতার সঙ্কট।কালান্তর।)

এই বেদনা নিরন্তর তাঁকে পীড়া দিয়েছে। নানা লেখায় নানাভাবে তার উল্লেখ তিনি করেছেন। লিখছেন,

“পশ্চিমে হেনকালে পথে কাঁটা বিছিয়ে

সভ্যতা দেখা দিল দাঁত তার খিঁচিয়ে।

কলবল সম্বল সিভিলাইজেশনের,

তার সবচেয়ে কাজ মানুষকে পেষণের।”[9](ধ্বংস।গল্পস্বল্প।)

‘কালান্তরে’র প্রবন্ধগুলি এই মর্মান্তিক বেদনা ও তার প্রতিবাদের প্রতিকারের বার্তাবহ।

৮০ বছর বয়সে উপনীত হয়ে জীবনের শেষতম জন্মদিনে তিনি রচনা করলেন ‘Crisis in Civilization’ – ‘সভ্যতার সঙ্কট’।মানবতার স্খলনে, ন্যায়বোধের পতনে মর্মাহত ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ বোধ করি পরাহত সমগ্র মানবজাতির দায় নিজে বহন করে ক্ষুরধার, মানবিক এবং চরম সত্যনিষ্ঠ মন্ত্রবাণী উচ্চারণ করলেন এই প্রবন্ধে। সারা জীবনের অভিজ্ঞতা, অনুভব ও উপলব্ধির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যে ইউরোপকে আজ তিনি দেখতে পাচ্ছেন– সে তাঁর চেনা ইউরোপ নয়। ইউরোপের যা কিছু সম্পদ- সে সব তার শাসকপ্রবৃত্তির কাছে পরাভূত হয়েছে। এবার বিশ্বযুদ্ধ-কালে যে ইউরোপকে তিনি প্রত্যক্ষ করছেন, তাতে সমস্ত শুভ ধারণা নির্বাপিত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, কারিগরীতে যতই সুসভ্য হোক তারা- সভ্যতার মূল লক্ষ্য মানুষের অগ্রগতি-নির্ভর। তাই সফল শক্তিশালী এই জাতি যখন তার মনুষ্যত্বটুকু হারিয়ে ফেলল, তখন ক্রমশ তার অগ্রগতির লক্ষ্যটাই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে দাঁড়ালো।

বলছেন ইউরোপের ‘নখদন্তবিকাশ’ এবং তার বিভীষিকার কথা। বলছেন ‘মানবপীড়নের পাশ্চাত্য মহামারী’  এই সভ্য জাতির ভিতর থেকেই উঠে আসছে। তখন এই সভ্যতাকেই তিনি যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন- সমগ্র সভ্যতাই আজ সঙ্কটের মুখে।

যুদ্ধকালীন ইউরোপ তাদের পুরো সংস্কৃতিটাকেই সারা পৃথিবীর মানুষের উপর অত্যাচারের একটা যন্ত্রে পরিণত করেছে। যান্ত্রিকতা গ্রাস করেছে মনুষ্যত্বকে। এই ইউরোপে সত্যনিষ্ঠা নেই। নেই বাগ্মীতা। নেই Lawband Order আছে শুধু দম্ভ আর অহংকারের আস্ফালন। তাই এই পাশ্চাত্য জাতিটির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা আর বজায় রাখা যাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের মনের মধ্যে, আজন্মলালিত, ইংরেজদের প্রতি সেই শ্রদ্ধাবোধ জীবনের একেবারে শেষ পর্বে এসে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সভ্যতাভিমানের ‘জীর্ণতা এবং কলঙ্ক’- এটাই বড় করে দেখা দিচ্ছে। এই মনুষ্যত্বের অভাবে পাশ্চাত্য এই জাতিটি যবে থেকে নিষ্ঠুর, অত্যাচারী হয়ে উঠে তার নখদন্ত বিকাশ করল-  তখন জাতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং পূর্ণ বিশ্বাসটুকু একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল। মানবিকতার পরাভব নিঃস্ব করে দিল রবীন্দ্রনাথের মতো শুভচিন্তকের মনকে। সভ্যতার সঙ্কট– এই বিশ্বাস দেউলিয়া হবার সঙ্কট।

তবু তিনি বড় ইংরেজ ও ছোট ইংরেজের কথা বলেন। তাঁর স্মৃতিতে মহৎ শুভাকাঙ্ক্ষী মানবিক ইংরেজ মনীষীদের কথা রয়ে যাবে। তাঁরা আলোকপ্রাপ্ত। উদ্দীপিত করে চলেন মানবজাতিকে‌। তাঁদেরকেই রবীন্দ্রনাথ বড় ইংরেজ বলেন। যথাযথভাবেই দীনবন্ধু এণ্ড্রুজের মতো মনীষীর উল্লেখ করেন। তাঁকে যথার্থ ইংরেজ বলেন। কিন্তু ‘ইতিহাসের অকিঞ্চিতকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ’ গড়ে তুলেছে যে ক্ষমতাদর্পী মনুষ্যত্বহীন ছোট ইংরেজ–  তাদের প্রতি তাঁর অভিসম্পাত ও ধিক্কার বর্ষিত হয়।

যেকোনো শুভচিন্তক মানুষই অস্তিবাদী হন। সদর্থক ভাবনা ভাবেন ও বলেন। রবীন্দ্রনাথও তাই নিরাশা ও হতাশার কথা বলেই শেষ করেন না।

তিনি মনে করেন- পাশ্চাত্যের পুরো সভ্যতাটাই দেউলিয়া হয়ে গেছে। তবে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ও আমাদের সংস্কৃতির কিছু ফারাক তো আছে। যদিও আমরা ওদের মতো ‘যন্ত্রে’ তেমন অধিকারী বা সফল নই, বিজ্ঞানও তেমনভাবে রপ্ত করতে পারিনি– কিন্তু আমাদের প্রাচ্য দেশের দর্শন যুগান্তকারী।

প্রাচ্যসভ্যতায় এবং দর্শনে ধারণক্ষমতা, গ্রহণীয়তার গুণ অপরিসীম। সে রাখতে জানে। মানিয়ে নিতে জানে। পশ্চিম সমস্ত কিছুকে গ্রাস করতে চায়। আগ্রাসন তার স্বভাব। এই দুই স্বভাবের সমন্বয় যদি হয়– তবেই সভ্যতার আদর্শকে আমরা আবার খুঁজে পাবো।

রবীন্দ্রনাথ ঘোষনা করছেন, এই অন্বেষণ শুরু হবে পূর্বদেশ থেকেই। তিনি বলছেন, “মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি।”[10](সভ্যতার সঙ্কট।কালান্তর।)    আরো বলছেন,” মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।”[11](সভ্যতার সঙ্কট।কালান্তর।)    

সে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার জন্য তিনি আশা রাখেন- “পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত” থেকেই পরিত্রাণকর্তা জন্ম নেবেন। পূর্ব দেশের এই “দারিদ্রলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে” পরিত্রাণকর্তার জন্ম হবে। সভ্যতার দৈববাণী সেই শোনাবে। মানুষকে চরম আশ্বাসের বার্তা দেবে– এই পূর্ব দিগন্ত থেকেই। রবীন্দ্রনাথের এই আশ্বাসবাণীর মধ্যে আমরা মহামতি যীশুর ছবি দেখে নিই, যেমন দেখি ‘শিশুতীর্থ’তে। ভারত তথা প্রাচ্য দেশ বস্তুগতভাবে নিশ্চয়ই খুবই দরিদ্র, কিন্তু নৈতিকতা, হৃদয়বত্তা ও মানবিকতায় সে ধনী-  একথা বিশ্বাস করেন রবীন্দ্রনাথ।

“হে ভারত, তব শিক্ষা দিয়েছে যে ধন,

বাহিরে তাহার অতি অল্প আয়োজন,

দেখিতে দীনের মতো, অন্তরে বিস্তার

তাহার ঐশ্বর্য যত।”[12]( নৈবেদ্য- ৯৫)।

আর সেই কারণেই অপরাজিত যে মানুষ- তার জয়যাত্রা এইখান থেকেই শুরু হবে। কারণ সত্য ও মঙ্গলের জয় অনিবার্য। অধর্মের পরাজয় নিশ্চিত। শ্লোকটির ব্যবহার তাই অমোঘ-

“অধর্মেনৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশ্যতি।

  ততঃ সপত্নান্ জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি।।”[13]

অধর্মের দ্বারা মানুষ উন্নতি করতে পারে, আত্মসুখ পেতে পারে, শত্রুকে জয়ও করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমূলে তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।

মানবতার জয়গান গেয়ে তাই শেষ হয় ‘সভ্যতার সঙ্কট’–

“ওই মহামানব আসে,

দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।”[14]

সভ্যতার সংকট যেমন ভারত এবং বিশ্বের সঙ্কটের প্রতি আমাদের সতর্ক করে দেয়, সারা বিশ্বের মনীষীরাও তেমন নানা সময়ে তাঁদের ভাবনা বক্তব্য সতর্কবাণী সুপরামর্শ দিয়ে যান সর্বমানবের হিতৈষনায়–  রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সঙ্গে একই তন্ত্রীকে যেন বেজে ওঠে সারস্বত সেই ঝংকার।

Albert Einstein বলেন,

“Every kind of peaceful cooperation among men is primarily based on mutual trust and only secondarily on institutions such as Courts of justice and policy…” . বলেন , “It has become appallingly obvious that our technology has exceeded our humanity.”[15]

Charles Chaplin তাঁর ‘The Great Dictator’ film-এ বলেন,

“Greed has poisoned men’s souls, has barricaded the world into hate, has goose-stepped  us into misery and bloodshed. We have developed speed, but we have shut ourselves in. Machinery that gives abundance has left us in want. Our knowledge has made us cynical. Our cleverness, hard and unkind. we think too much and feel too little. More than machinery we need humanity. More than cleverness we need kindness and gentleness. Without these qualities life will be violent and all will be lost……

Do not despair. The misery that is now upon us is but the passing of greed- the bitterness of men who fear the way of human progress. The hate of men will pass, the dictators die, and the power they took from the people will return to the people. And so long as men die, liberty will never perish…”[16]

চ্যাপলিন এবং আইনস্টাইন– এঁরা হয়তো রবীন্দ্র-সমকালের জাতক। কিন্তু বহু যুগ পরের আরেক কবির উচ্চারণে ও সুরে সুরে ঘোষিত হবে মানবতার জয়বার্তা। তিনি ইংরেজ কবি ও গীতিকার John Lennon. মানুষকে তিনি বলছেন,

“Imagine there’s no countries

It isn’t hard to do

Nothing to kill or die for

And no religion, too

Imagine all the people

livin’ life in peace…

Imagine no possessions

I wonder if you if you can

No need for greed or hunger

A brotherhood of man

Imagine all the people

Sharing all the world

You may say I am a dreamer

But I’m not the only one

I hope someday you’ll join us

And the world will live as one.”[17]

আর, আমাদের মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ অভয়-আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে গেছেন সঙ্কটোত্তীর্ণ বাস রচনার সংকল্প নিয়ে–‘উদয়শিখরে জাগে মাভৈ: মাভৈ: নবজীবনের আশ্বাসে “জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়” মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।।’[18]

তথ্যসূত্র


[1] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আত্মশক্তি, গ্রন্থ : ভারতবর্ষীয় সমাজ, কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৃ. 15।

[2] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৃ. 3।

[3] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, পূর্বোক্ত, পৃ. 6–7।

[4] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, পূর্বোক্ত, পৃ. 9।

[5] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, পূর্বোক্ত, পৃ. 11।

[6] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, গ্রন্থ : কালান্তর, কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৃ. 201।

[7] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, পূর্বোক্ত, পৃ. 203।

[8] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, পূর্বোক্ত, পৃ. 206।

[9] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ধ্বংস”, গ্রন্থ : গল্পস্বল্প, কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৃ. 87।

[10] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, পূর্বোক্ত, পৃ. 195–210।
(কালান্তরের সামগ্রিক সভ্যতা-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে)

[11] Rabindranath Tagore, Crisis in Civilization, Calcutta: Visva-Bharati, 1941, pp. 1–8.

[12] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, গ্রন্থ : কালান্তর, পৃ. 209।

[13] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সঙ্কট”, পূর্বোক্ত, পৃ. 210।

[14] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নৈবেদ্য, কবিতা নং ৯৫, কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৃ. 112।

[15] Albert Einstein, Ideas and Opinions, New York: Crown Publishers, 1954, p. 38.

[16] Charles Chaplin, The Great Dictator, United Artists, Motion Picture, 1940. (Final Speech sequence)

[17] John Lennon, “Imagine”, Album: Imagine, Apple Records, 1971.
(Lyrics excerpt)

[18] C. F. Andrews, Mahatma Gandhi: His Own Story, London: George Allen & Unwin, 1930, pp. 112–115. (দীনবন্ধু এণ্ড্রুজ প্রসঙ্গে)