January 1, 2026

Rabindra Dance-Drama Production: Chandalika — The Aspiration for Liberation from the Crisis of Class, Culture, and Human Existence- Koyel Mukherjee

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

Abstract:
Art functions not only as a source of aesthetic pleasure but also as a powerful medium of social awakening and ethical reflection. Rabindranath Tagore’s Chandalika, originally written as a prose drama in 1933 and later transformed into a dance-drama in 1938, emerges as a profound artistic response to the crises of caste discrimination, social exclusion, and inner human conflict. Written against the backdrop of Mahatma Gandhi’s Harijan movement, Chandalika draws upon a Buddhist legend to challenge the legitimacy of untouchability and to affirm the universality of human dignity.

This paper examines Chandalika as a Rabindra dance-drama production that negotiates multiple layers of crisis—social, psychological, and spiritual. On the surface, the narrative critiques the oppressive caste structure that marginalizes the Chandal woman Prakriti; at a deeper level, it explores the conflict between desire and renunciation, illusion (maya) and realization, body and spirit. Through the compassionate act of Ananda and his declaration—“That human am I, and that human are you”—Tagore articulates a vision of humanism that transcends caste, religion, and gender.

The study further traces the performance history and reinterpretations of Chandalika in post-Tagorean times, highlighting how different choreographers and directors have reimagined the work to address contemporary concerns such as Dalit identity, womanhood, and inner psychological crisis. Special attention is given to the multicultural and composite nature of Rabindra dance, where diverse classical dance forms, musical idioms, visual aesthetics, and symbolic stagecraft converge to create a unique expressive language. Ultimately, Chandalika is interpreted as a “drama of liberation”—a call for both social equality and inner emancipation, asserting that true social harmony is impossible without individual moral and spiritual awakening.


Key Words:
Rabindra Dance-Drama, Chandalika, Tagore, Caste and Untouchability, Humanism, Social Crisis, Inner Crisis, Multiculturalism, Dalit Identity, Woman Identity

রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য প্রযোজনা : ‘চণ্ডালিকা’শ্রেণী, সংস্কৃতি, মানবতার অস্তিত্ব সংকট থেকে মুক্তির অভিলাষ

কোয়েল মুখার্জী, রবীন্দ্রনৃত্যশিল্পী ও গবেষক, সংগীত ভবন, বিশ্বভারতী

শিল্প, আনন্দ ও শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। শিল্পের মাধ্যমে শুধু দৈনন্দিন জীবনের কথা নয় সমাজ-জাগরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠে। তাই রবীন্দ্রনাথ সমাজে একের পর এক বার্তা দিতে নাট্য রচনা করেছেন।

এই আলোচনার বিষয় রবীন্দ্রনাথের রচনা ‘চণ্ডালিকা’। গদ্যনাট্য চণ্ডালিকা রচনার সময়কালটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি দেখব ১৯৩৩ সাল অর্থাৎ ভারতবর্ষে তখন মহাত্মা গান্ধী “হরিজন যাত্রা”নামে দেশব্যাপী একটি সফর শুরু করেন।  এই সফরের লক্ষ্য ছিল অস্পৃশ্যতা এবং হিন্দু সমাজের মধ্যে বৈষম্য দূর করা, ঐক্য ও সামাজিক সংহতি প্রচার করা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ‘হরিজন’ শব্দবন্ধে তথাকথিত অস্পৃশ্য বা অবর্ণ হিন্দুদের সমষ্টিগতভাবে নামকরণ করেছিলেন, ‘হরিজন’ অর্থাৎ সবার মধ্যে হরি বাস করে।

‘Gandhi’s strategy was to stress that untouchability had no sanction in Hinduism and Hindu scriptures and to encourage Hindus to change their opinion on depressed classes by patient means. He wanted classes to receive the same access to schools, temples, wells, etc so they could feel just as respected in society as others.’ (Gandhi’s Harijan Sevak. https://prinseps.com/research/harijan-sevak-gandhis-weekly-newsletter/ )

গুয়াহাটির সারানিয়া আশ্রমে হরিজনদের সাথে গান্ধীজী। চিত্রঋণ- দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন

ইয়ং ইন্ডিয়া, ১২ মার্চ, ১৯২৫-এ প্রকাশিত মহাত্মা গান্ধী বক্তৃতা থেকে,

‘অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। অস্পৃশ্যতার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। যুক্তি দ্বারা ইহা সমর্থন করা যায় না। ইহা মানুষকে সেবার অধিকার হইতে বঞ্চিত করে। জাতিভেদ ব্রাহ্মণকে শূদ্র ভাইয়ের সেবা করিতে নিষেধ করে না। যে ব্রাহ্মণ নিজকে শ্রেষ্ঠ ভাবিবে এবং অন্যকে অবজ্ঞা করিবার জন্যই তাহার জন্ম এরূপ মনে করিবে, সে ব্রাহ্মণ নহে’ (হক আনা, আনারুল. মহাত্মা গান্ধীর হরিজন আন্দোলন (ভারত বিচিত্রা). পৃষ্ঠা- ৪২)।

একই প্রেক্ষিতে এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন ‘চণ্ডালিকা’ গদ্যনাট্য। ১৮৯৬ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত ‘The Sanskrit Buddhist literature of Nepal’ গ্রন্থ থেকে বৌদ্ধকাহিনী অবলম্বনে তিনি রচনা করলেন ‘চণ্ডালিকা’ গদ্যনাট্য এবং পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে এই গদ্যনাট্যকে নবরূপ দান করলেন নৃত্যনাট্যের আঙ্গিকে। চণ্ডালকন্যা প্রকৃতির অপমান অন্ধকারের জীবনে বৌদ্ধভিক্ষু আনন্দ আনলেন উত্তরণের আলো। মঞ্চে আনন্দকে প্রকৃতির জলদানের দৃশ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ‘যে মানব আমি সেই মানব তুমি কন্যা’ প্রতিষ্ঠা পেল।

বৈষম্য, ভেদাভেদ চিরকালের মতোই একবিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ এক সংকট। চণ্ডালিকার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এই বৈষম্য দূর করেছেন। মানুষের মধ্যে মানবতা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানবসমাজে চেতনাকে সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যে চেতনা মানুষে মানুষে ঐক্য স্থাপন করতে পারে।

চণ্ডালিকা প্রকৃতপক্ষেই মুক্তির নাটক। এই ‘মুক্তি’ অর্থে সংকট থেকে মুক্ত হওয়া। দুইরকম crisis বা সংকট থেকে মুক্তির হদিশ দেয় চণ্ডালিকা। আপাতভাবে জাতপাতের কাঠামো আছে, কিন্তু গভীরে রয়েছে প্রকৃতি, পুরুষ ও মায়ার দ্বন্দ্ব। জাতিভেদ প্রথার সামাজিক অবক্ষয় থেকে চণ্ডালকণ্যা প্রকৃতি চরিত্রের মুক্তি ঘটে। অন্যদিকে মানবকন্যা প্রকৃতির ভুল পদ্ধতিতে আনন্দকে পাবার আকাঙ্ক্ষা সত্য উপলব্ধির মাধ্যমে মানসিক অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়। দেহলালসার কাছে আত্মসমর্পণ করেও পরে সে তার থেকে মুক্তি পেয়েছে।

অর্থাৎ ব্যাক্তিবিশেষে মানসিক উত্তরণ না ঘটলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামাজিক সাম্য রক্ষা সম্ভব‌ নয়। আনন্দের ‘যে মানব আমি সেই মানব তুমি কন্যা’—এর গভীর অর্থ প্রকৃতিও প্রথমে বোঝেনি। সে নিজের মর্যাদালাভে আনন্দিত হয়েছিল মাত্র। আনন্দের মানবতার বাণীর মাহাত্ম্য সে বোঝেনি। তার মন ছিল মিথ্যার অন্ধকারে আবদ্ধ। যে মিথ্যার লোভ দিয়ে সে আনন্দকে পেতে চেয়েছিল যাদুবিদ্যার মধ্যে হলেও। 

‘পাষাণী’, ‘নিষ্ঠুর’, ‘কঠিন’ হয়ে মায়ের কাছে তার ‘ক্ষুধার্ত প্রেম’কেই সে কামনা করেছে বার বার, যে প্রেমের ‘নাই দয়া, তার নাই ভয়, নাই লজ্জা।’ অবহেলিত চণ্ডালকণ্যাকে অপমানের অন্ধকার থেকে যিনি মুক্তির মন্ত্র দিয়েছেন সেই‌ বীরকেই সে বাঁধতে চেয়েছে, মা কে বলেছে,‘বাঁধব তাঁরে মায়াবাঁধনে,’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ. গীতবিতান অখণ্ড। পৃষ্ঠা-৭২৭-৭২৮)

অন্যদিকে “আনন্দের যে দ্বন্দ্ব সে চণ্ডালিকার চেয়ে কিছু কম নয়। একদিকে তার সুগভীর জ্ঞানের সাধনা, একদিকে তার দেহের কামনা। এই বস্তুজগতের আকর্ষণ জ্ঞানীকেও টেনে আনলে মাটির পৃথিবীতে—কিন্তু অবশেষে মানুষই জিতল।” (দেবী, প্রতিমা. নৃত্য। পৃষ্ঠা-৩৭)

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে লেখা চণ্ডালিকার পরবর্তী সময়ে নৃত্যনাট্যের দল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন, মঞ্চস্থ করেছেন। যার অন্তর্নিহিত অর্থটি মানুষকে বারে বারে উদ্বুদ্ধ করেছে।

শান্তিনিকেতনে চণ্ডালিকার নৃত্যনাট্যাভিনয়ে নন্দিতা দেবী এবং মৃণালিনী স্বামীনাথন। চিত্রঋণ: রবীন্দ্রভবন ফটো আর্কাইভ।

চৈত্র, ১৩৪৬ (1939) ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়,

‘শান্তিনিকেতনে গান্ধীজী চণ্ডালিকার অভিনয় দেখিয়া অশ্রু বিসর্জন করিয়াছিলেন। এই নাট্যটি করুণ ও মর্মস্পর্শী এবং ইহার দ্বারা হৃদয় নিম্নস্তর হইতে আধ্যাত্মিক উচ্চস্তরে উন্নীত হয়। সকল মানুষের মধ্যে যে সাধারণ মানবত্ব রহিয়াছে, ইহা হইতে তাহা উপলব্ধ হয়।’ (বসু, সোমেন্দ্রনাথ. সাময়িক পত্রে রবীন্দ্র প্রসঙ্গ: প্রবাসী। পৃষ্ঠা-৩৫৩)

বারে বারে এই সাম্প্রদায়িক জটিলতা সমাজকে অস্থির করে রেখেছে। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে বহু নৃত্যশিল্পী বা নৃত্যনির্দেশক চণ্ডালিকার মর্মকথাটিকে ভিত্তি করে নানা রকম প্রযোজনা তৈরি করেছেন। এরকম বিশেষ কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়।

১৯৬১ সালে কুচিপুড়ি আর্ট একাডেমী চেন্নাই পদ্মবিভূষণ গুরু ভেম্পতি চিন্না সত্যমের নির্দেশনায় কুচিপুড়ি নৃত্যের উপর ‘চণ্ডালিকা’র কাহিনী অবলম্বনে ‘Chandalika’ প্রযোজনা করে। স্ক্রিপ্ট, সংগীত, ভাষা, সুর, নৃত্য আঙ্গিক সম্পূর্ণতই পৃথক। (Kuchipudi Art Academy Chennai- Chandalika, https://youtu.be/-S4i8muLYgU?si=nosS_IDTForUCAFq )

প্রকৃতি ও মায়া রূপে রঞ্জাবতী ও মঞ্জুশ্রী। চিত্রঋণ-রিমেম্বারিং মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, নর্তকী।

১৯৮৪ সালে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার তাঁর অভিনব নৃত্য আঙ্গিক তথা নবনৃত্যের মাধ্যমে ‘তোমার মাটির কন্যা’ প্রযোজনাটি মঞ্চস্থ করেন। একই ভাবে কাহিনীটি অপরিবর্তিত রাখলেও শিল্পী প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজস্ব আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। এখানে শিল্পীর নিবেদনে ‘Dalit Identities’-এর থেকেও ‘Woman Identities’ এবং ‘Nature Identities’ প্রাধান্য পেয়েছে।

“As a dancer today, I am happy to draw my inspiration from Tagore’s concept of dance….” (Bandopadhay, Sruti. Rabindranritya The dance idiom created by Tagore. Page- 255)

অনুরূপ ধারণায় রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অধ্যাপিকা আলপনা রায়ের গবেষণাগত নির্মাণ ছিল ২০১৯ সালের ‘মানবকন্যা’ প্রযোজনা। যেখানে তিনি একই মঞ্চে তিন রকম সংকটকে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথের ৩টি নাট্যের মধ্যে দিয়ে। শাপমোচনে Crisis of Psychological issues, ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গাদা’য় Crisis of Woman Identities, এবং ‘নৃত্যনাট্য চণ্ডালিকা’য় Crisis of Dalit Identities প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনৃত্যের মাধ্যমে।

এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য করতে হয় ড. অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে, ‘প্রকৃতির- ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষজুড়ে’ গানটি শান্তিনিকেতনের চণ্ডালিকা-প্রযোজনায় ব্যবহার করা হয় না। কেননা প্রকৃতির এই গান এই নাট্যকাহিনিকে ভিন্নতর মাত্রা দিতে পারে,…হয়তো গানটিতে প্রকৃতির সোশ্যাল ক্রাইসিস-এর থেকে ইনার ক্রাইসিস বড়ো হয়ে উঠলে আনন্দের প্রাপ্তি-আকাঙ্ক্ষা আরও দৃঢ় হবে— যা নাট্যবস্তুর অস্পৃশ্যতা ইত্যাদির লক্ষ্যকে গৌণ করে সমালোচনার সূত্রগুলিকে প্রাধান্য দেবে। এই আশঙ্কায় এই গান বর্জিত হয়েছে প্রযোজনা-অভিনয়ের সময়।’ (মুখোপাধ্যায়, অমর্ত্য. রবীন্দ্রনৃত্য. পৃষ্ঠা – ১২৭)

চক্ষে আমার তৃষ্ণা, প্রকৃতি চরিত্রে কোয়েল মুখোপাধ্যায়, ‘মানবকন্যা’, সপ্তক শান্তিনিকেতন। চিত্র- তরুণ বোস।

কিন্তু ‘মানবকন্যা’-য় যখন ‘প্রকৃতি’ চরিত্রে নৃত্যাভিনয় করেছি এই গানটি কিন্তু সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ এখানে অধ্যাপিকা রায় ‘Social Crisis’-এর পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়েছেন একজন মানবী/রমণীর ‘Inner Crisis’-কেও। ‘মানবকন্যা’য় নৃত্যাভিনয়ের নির্দেশনা করেছেন অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়। এটি কলকাতা রবীন্দ্রতীর্থে। তাই সেখানে এই গানটি সংযোজিত হয়েছিল। কিন্তু মূল স্ক্রিপ্টে নেই বলে পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের প্রযোজনায় এই গানটি ছিল না।

Sangeet Natak Academy awardee বিশিষ্ট নাট্যনির্দেশক ঊষা গাঙ্গুলির নির্দেশনায় ‘রঙ্গকর্মী’ নাট্যদলের নিবেদন হিন্দি ভাষায় চণ্ডালিকা অন্যমাত্রা এনেছে। (Chandalika Hindi Play, https://youtu.be/m7tldtztmjg?si=P0xGVjG9Z4NplkNx )

অর্থাৎ বার বার নানান সময়ে এই গল্প বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়েছে অভিন্ন এই সামাজিক সমস্যাকে তুলে ধরার তাগিদে।

শান্তিনিকেতনে প্রযোজনাগুলি রবীন্দ্রনৃত্যের যে বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করে তা অনেকখানি এরকম—

‘এই অনির্বচনীয় অথচ অমোঘ দ্বন্দ্বকেও তার আনুপূর্বিক চারিত্র আবেদনে প্রত্যক্ষও যদি করতে হয়, তাহলেও ভাষার বদলে চাই সুর-কেবল স্বরের নয়, শরীরেরও। আর সেই চাহিদা যেখানে সর্বায়তনে সমঞ্জস প্রকাশ পেয়েছে সেখানেই রবীন্দ্রনৃত্যনাট্যের সফল শিল্পোত্তরণ।’ (চৌধুরী, ভূদেব. রবীন্দ্র ভাবনা। পৃষ্ঠা-৪০)

রবীন্দ্রনৃত্য যা Multiculturalism এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, মিশ্র শিল্প বা composit artform। শিল্পই এই চণ্ডালিকা যখন রবীন্দ্রনৃত্যের প্রযোজনার একটি বিষয় হয় তখন একাধিক সংস্কৃতির সম্মিলিত সহাবস্থান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতিমা দেবী লিখছেন—

‘অনেকেই জানেন বোধ হয়, শান্তিনিকেতনের নৃত্য কোনো বিশেষ বিধিবদ্ধ সর্বাঙ্গীণ প্রাচীন নৃত্যকলার আঙ্গিককে অনুসরণ করে না। মিশ্র সুরের মতো মিশ্র তাল ও ভঙ্গির যোগে বর্তমান নৃত্যকলা সংগঠিত হয়ে থাকে। এই মিশ্রণ যত সহজভাবে হয়, দেখা গেছে নাচের বৈচিত্র্য ও প্রকাশ ততই পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।’ (দেবী, প্রতিমা. নৃত্য। পৃষ্ঠা-৩৪)

চরিত্রের নৃত্যগঠনে তিনি লিখছেন—

‘দক্ষিণী নাচের-বিচিত্র তাল ও ভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে সুর সেখানে একটি অভিনব প্রহেলিকার রচনা করছে।…দক্ষিণী আঙ্গিকে তৈরি চণ্ডালিকাকেও দক্ষিণী নৃত্যের মধ্যে চেনা যাবে না, সংমিশ্রণের এমনি গুণ। এ যেন রাসায়নিক মিশ্রণ।’ (দেবী, প্রতিমা. নৃত্য। পৃষ্ঠা-৩৪)

এছাড়াও দেখা যায় চরিত্রের ভাব অনুযায়ী সংগীতে রাগের মেলামেশা—

‘যেখানে অবসাদক্লান্ত মন, পূরবী এল তার আমেজ নিয়ে, যেখানে দৃঢ়তায় দর্পিত চিত্রের ঝংকার- বাউল উঠল বেজে গৌরবে। এইরূপে অধৈর্যের ঐকতানের মধ্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল বিচিত্র সুরের ব্যঞ্জনা।’ (দেবী, প্রতিমা. নৃত্য। পৃষ্ঠা-৩৬)

১৯৩৮ সাল থেকে বর্তমান সময় অবধি বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একাধিক সফল প্রযোজনা করেছে।

  1. যেখানে মণিপুরী, কথাকলি, ভারতনাট্যম, কত্থক, ক্যাণ্ডি ইত্যাদি শাস্ত্রীয় ভঙ্গি মিশিয়ে নাচ তৈরি হয়েছে চণ্ডালকন্যা চরিত্রের জন্য।
  2. সাজসজ্জা ক্ষেত্রে দেখা যায় বাংলার কাঁথাস্টিচ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, জাভানি বাটিক শিল্পের ছোঁয়াও তেমন রয়েছে।
  3. রূপসজ্জায় চরিত্র নির্মাণে সাঁওতাল রমণীর খোঁপায় ফুল-পাতার সমাহারও চোখে পড়ে।
  4. মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের আদর্শ অবলম্বন করে স্বল্প আয়োজনে প্রতীকি চিহ্ন উপস্থাপনের মাধ্যমে বৌদ্ধস্তূপ, কুঁড়েঘর, কুয়ো ইত্যাদির নির্মাণ এবং
  5. বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তবিদ্যায় নানা রকম আলোর কৌশলে যথাযথ দৃশ্যায়ন সম্ভবপর হয়।

গ্রন্থপঞ্জি:

কুণ্ডু, ড প্রণয়কুমার. রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য. কলিকাতা ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি. ১৯৬৫।

ঘোষ, শান্তিদেব. গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য. কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স ২০১৫।

চৌধুরী, ভূদেব. রবীন্দ্র ভাবনা. কলকাতা: পুস্তক বিপণি. ১৯৮৬।

ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ. গীতবিতান অখণ্ড. কলকাতা: বিশ্বভারতী. ২০১৭।

দেবী, প্রতিমা. নৃত্য. কলকাতা: বিশ্বভারতী. ১৯৯৩।

বসু, সোমেন্দ্রনাথ. সাময়িক পত্রে রবীন্দ্র প্রসঙ্গ: প্রবাসী. কলিকাতা: টেগোর রিসার্চ ইন্সিটিউট. ১৯৭৬।

মুখোপাধ্যায়, অমর্ত্য. রবীন্দ্রনৃত্য. কলকাতা: স্পার্ক. ২০১৯।

হক আনা, আনারুল. মহাত্মা গান্ধীর হরিজন আন্দোলন (ভারত বিচিত্রা). ঢাকা: ভারতীয় হাই কমিশন. অক্টোবর ২০১৫।

Bandopadhay, Sruti. RABINDRANRITYA The dance idiom created by Tagore. Haryana: Subhi Publication. 2019.

Chakraverty, Bishweshwar. TAGORE THE DRAMATIST A Critical Study Vol.4. Delhi: B.R. Publishing Corporation. 2000.