January 1, 2026

কোমল গান্ধার : নিহিত আন্দোলন-অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

বিশিষ্ট সরোদ বাদক, অভিনেতা ও লেখক

আমি ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটি দেখি বেশ বড় বয়সে। নব্বইয়ের দশকে কোনো এক সকালে প্রিয়া সিনেমা হলে। ছবিটি দেখাবার আয়োজন করেছিল ঋত্বিক বাবুর ছেলে ঋতবান অর্থাৎ বাবু। বাবু এবং বাবুর বোন ঋত্বিক বাবুর ছোট মেয়ে সুস্মিতা আমার বন্ধু ছিল। ছবিটি দেখেছিলাম হাতে গোনা কয়েকজন মিলে। যার মধ্যে ঋত্বিক-বাবু স্ত্রী সুরমা দেবী, বড় মেয়ে সংহতি এবং আমার দাদা বন্ধু কবি ও প্রাবন্ধিক অঞ্জন সেন ছিলেন। ছবি দেখার আগেই অঞ্জনদা বলেছিলেন ছবিটি মন দিয়ে দেখ কারণ ছবিটির সঙ্গীত নিয়ে তোমায় একটা লেখা দিতে হবে আমার পত্রিকা ‘গাঙ্গেয় পত্রের’ জন্য। ছবিটি মন দিয়ে দেখেছিলাম কিন্তু নানা কারণে লেখাটা লিখে উঠতে পারিনি। আজ দীর্ঘ ৩৫ বছর বাদে সেই লেখা লিখতে হচ্ছে আরেক দাদা বন্ধু যিনি আবার আমার আবাসনের আবাসিক সেই গৌতম চক্রবর্তীর অনুরোধে যিনি আবার সিনেগিল্ড বালির’ একজন সদস্য।

ঋত্বিক বাবু তাঁর প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২) করার প্রায় দশ বছর পরে ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটি তৈরি করেন (১৯৬১) সালে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘কোমল গান্ধার’ কবিতার নামে ছবিটির নামকরণ করেন ঋত্বিকবাবু। ঋত্বিকবাবু একদা বামপন্থী গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বহুদিন হরেই ভেবেছিলেন থিয়েটার জীবনের সুখ, দুঃখ, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে কোনও কাজ করবেন তিনি। ‘কোমল গান্ধার ছবির মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন। তাই ‘কোমল গান্ধার’ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন:

তাই ‘কোমল গান্ধারের’ মূল সুর হচ্ছে মিলনের। স্তরের ওপর স্তর দিয়ে রূপকের ওপর রূপক এলিয়ে, বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো যদি কোথাও সেই জীবনসত্যটিকে ছুঁতে পারি সেই চেষ্টাই করেছিলাম।” তারপর তিনি আবার লিখেছেন:

‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার মনে মনে’ রবি ঠাকুর বলে গেছেন। এবার দেখে নেওয়া যাক রবীন্দ্রনাথ কি লিখেছিলেন।

“নাম রেখেছি কোমল গান্ধার,

মনে মনে।

যদি তার কানে যেত অবাক হয়ে থাকত বসে,

বলত হেসে মানে কী।

মানে একটু যায় না বোঝা, সে মানেটাই খাঁটি।”

কবিতাটি শেষ করেছেন:

“চলায় বলায় সব কাজেতেই ভৈরবী দেয় তান-

কেন যে তার পাইনে কিনারা।”

কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে যেটা বেরিয়ে আসে সেটা হলো কেউ কিছু একটা গাইছে। অথবা চারপাশের ধ্বনির যে আবহ তাতেও ভৈরবীর তানের আভাস আছে। এই সর্বব্যাপী স্বর চার পাসেই যেন আন্দোলিত এবং ঠিক সেই কারণেই সুরটি অনেকখানি অগোচর রয়ে যায়। এক কথায় যা সারাক্ষণই সব কিছুতেই আছে তাকে নিতে বুঝতে না পারার রহস্য। এ যেন বা অনাহত স্বর ওমকারের নামান্তর ‘কোমল গান্ধার’। এই প্রসঙ্গে ঋত্বিকবাবু ‘কোমল গান্ধার প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে লিখেছেন।

“রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ, দীনমলিন নাটা আন্দোলন ও দলাদলির প্রায় বাস্তবানুগ চিত্রায়ন ও তৎসমান্তরাল কৌতুকাবহ প্রেমাখ্যান এ সমস্তই পরিকল্পিত ও সন্নিবেশিত হয়েছে মূল পরিকল্পনা অনুসারে-রূপকগুলিকে সমৃদ্ধ করবার উদ্দেশ্যে একটি বাস্তবধৃত, বহু বিষয় সমন্বিত জটিল নক্সা (pattern) প্রস্তুত করাই ছিল অভিপ্রেত।” দেশভাগকে অনুভব করেও না করা, একপ্রকার অসাড় হয়ে যাওয়া। দুরূহ তো সারাক্ষণই যা আমি হয়তো বানাচ্ছি কিন্তু কি বললাম বুঝতে পারছি বা বুঝতে পারছি না। এটা যেন শ্রোতার অনুভব যে সে ঠিক বুঝতে পারছে কিন্তু যেখান থেকে স্বরটা উদ্ভব হচ্ছে সেটা ঠিক সচেতন নয়। দেশভাগ তো আন্দোলন। যা উঠছে তা তো আন্দোলন। রূপক অর্থে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই যে নিজের কাছেই দুর্জেয়। তাই নাম কোমল গান্ধার।

এই ছায়াছবিতে ব্যবহৃত সঙ্গীতের রূপটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সিনেমাটিতে গীত রচনা করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী এবং বিজন ভট্টাচার্য্য। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের রচনাও এই ছবিতে স্থান পেয়েছে। লোক সঙ্গীত ও গায়নে এবং গণসঙ্গীতের গায়নে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অবদান অনবদ্য। আবহসঙ্গীতে বাহাদুর খানের সারোদ বাদন এবং সহকারী সঙ্গীত পরিচালক মন্টু ঘোষের অবদান অনস্বীকার্য। সর্বোপরি এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র রবীন্দ্র ও গণনাট্য সঙ্গীতকে যে ভাবে ব্যবহার করেছেন তা অতুলনীয়। এই প্রসঙ্গে ঋত্বিকবাবু বলেছেন:

“আমার ছবির মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দান করেছে- সংগীতের দিক থেকে- সেটা হল ‘কোমল গান্ধার’। এতে বাংলার মানে দু বাংলার লোকসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীত এবং ইউরোপের উচ্চাঙ্গ সংগীত ব্যবহার করেছিলেন আমার সংগীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। এবং সেটা অত্যন্ত মরমীভাবে। ও ছবি চোখ বুজেও আমি দেখতে পারি। এত ভালো সংগীত তিনি করেছিলেন।”

এই ছবির সঙ্গীত বলতে গান ও আবহসঙ্গীত আছে মোটামুটিভাবে বাহাত্তরটি দৃশ্যে। গানের প্রয়োগের ব্যাপারে ঋত্বিকবাবু জানিয়েছেন:

“কোমল গান্ধার। এখানে আমার সমস্যা কাহিনীর তিন স্তরের বিবরণ। আমি অনসূয়ার দ্বিধা বিভক্ত মন, বাংলার গণনাট্য আন্দোলনের দ্বিধাগ্রস্ত নেতৃত্ব এবং দ্বিধা বিভক্ত বাংলাদেশের মর্মবেদনা, তিনটিকেই একত্রে টানতে চেয়েছিলাম। শব্দের দিক থেকে বহুশত শতাব্দীর সুরকথাকে মিলিয়ে ছবির ওপরে নতুন দ্যোতনা অভিনিবিষ্ট করতে চেষ্টা করেছিলাম। Archetypally, এদের বিরোধী হচ্ছে বিবাহ, মিলন। ‘আমের তলার ঝামুর ঝুমর কলা তলায় বিয়া। আইলেনগো সোন্দরীর জামাই মটুক মাথায় দিয়া মিস্ত্রী বানাইছে পীড়ি চাইর কোনা তুলিয়া। ব্রাহ্মণে চিত্রাইছে পীড়ি মধ্যে সোনা দিয়া। আজই হইব সীতার বিয়া।’

এই গানগুলির ব্যবহারের পিছনে একটা চিন্তার্থ ছিল তা হচ্ছে মিলনের ভাবখানি যা অবশ্যম্ভাবী।… আমার ‘কোমল গান্ধারের’ মূল সুর ছিল দুই বাংলার মিলনের, তাই অনবরত বেজেছে বিভিন্ন প্রাচীন বিবাহের সুর, চরম বিরহের দৃশ্যেও সেই একাত্মীকরণের সুর বেজে চলেছে।”

ছবির শুরুতেই নামলিপি ওঠার সময় যে প্রারম্ভিক সঙ্গীত সেখানে সেতার, সারেঙ্গী, তবলাতরঙ্গ, শাঁখ, উলুধ্বনি, ফাঁসির তালতন্ত্রের সঙ্গে এক অসাধারণ Orchestration বা বৃন্দবাদন শ্রুতিগ্রাহ্য। সমগ্র যন্ত্রানুসঙ্গ সঙ্গীতটি প্রথমে নাটকীয় ঢঙে পরে সেটা পর্যবসিত হয় গ্রামবাংলার লোকজ বিয়ের গানে ‘আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর/কলাতলায় বিয়া/আইলেম গো সোন্দরীর জামাই/মটুক মাথায় দিয়া।”

গানটি ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে। এমনকি ছবির শেষ দৃশ্যেও এই গানের রেশ মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। এ ছবির প্রধান প্রবক্তা বা প্রধান চরিত্র অনুসূয়া যখন ভূশুর প্রতি আকর্ষিত হয়ে তার বাড়ি আসে এবং তৃপ্তর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে থাকে তখন পেছনে। হালকা লয়ে সরোদে যে রাগটি বেজেছে সেটি হলো কেদারিনী। বেশ বিরল রাগ। কেদার রাগে অবরোহনে তীব্র ঋষভের জায়গায় কোমল ঋষভ যা একটা দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।

যেহেতু ছবিটি ষাটের দশকের গণনাট্য আন্দোলনকে মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে তাই ব্যবহৃত থিয়েটারের গানগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন মহড়ার দৃশ্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সংপ্রদায়ের গাওয়া ‘এসো মুক্ত করো/মুক্ত করো অন্ধকারের এই ‘দ্বার’ একটি অসামান্য সংযোজন। মুক্ত মঞ্চে চড়ুইভাতে করার একটি দৃশ্যে অনসূয়া যখন ব্যাস্ত ভৃগুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় নদীর মনোরম দৃশ্য

দেখাতে তখন সমবেত উলুধ্বনির সঙ্গে সেই বিয়ের গান একটা রোমান্টিক অর্থাৎ ভাবপ্রবণ উপাদানটির একটি পুনর্জাগরণ ঘটে।

পদ্মার তীরে চড়ুইভাতির দৃশ্যে সঙ্গীত পরিচালক নৌকা বাওয়ার গান, ভাটিয়ালি গান ব্যবহার করেছেন।

থিয়েটারের সদস্যরা যখন দুদলে ভাগ হয়ে বাইচ প্রতিযোগিতায় নামছে তখন দুই নাট্যকর্মীকে পদ্মার তীরে বসে গান গাইতে দেখা যায়। রণেন রায়চৌধুরীর কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গান- ‘এপার পদ্মা ওপার পদ্মা/মাঝে জাগনার চর/তার পরে বসে আছে/শিব সদাগর’। এই গান পদ্মার বুকে এক স্বর্গীয় আনন্দের উদ্বোলন সৃষ্টি করেছে। এ গান ছবির বাড়তি সম্পদ।

কলকাতা থেকে ঢাকা যাওয়ার অসমাপ্ত রেললাইনের ওপর পদ্মার দিকে মুখ করে যখন ভৃগু ও অনসূয়া তাদের ফেলা আসা দিন নিয়ে আলোচনা করে তখন আবার ঐ বিয়ের গান ঐ দুজনের সম্পর্কটি আরো ভালো করে রাঙিয়ে তোলে। আবার এই গানটিই শোনায় অনেকটা আর্তনাদের মতন যখন অনসূয়া তার দুঃখ কষ্টের কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়ে।

শহর কলকাতার দৃশ্যে বেজে উঠেছে কীর্তনের সুর। ইট-কাঠ-পাথরের শহুরে আবরণের ভেতরে ফুটে ওঠা মধ্যবিত্ততাকে উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরে এই কীর্তন। ভৃগু ও অনসূয়া যখন নদীর ধারে ঘুরে বেড়ায় সহজ ভাবে তখন নেপথ্যে বাঁশিতে বাজানো রাখালিয়া বা মেঠো সুর দৃশ্যটির সহজাত বাচনভঙ্গিকে জীবন্ত করে তুলেছে।

দুটি রবীন্দ্র সঙ্গীতের ব্যবহার এই ছবির চোখে পড়ার মতন বিষয়। কার্শিয়ং এর অসাধারণ সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্যে মোহিত হয়ে আবেগপ্রবণ নাট্য কর্মী ঋষির গলায় উদাত্ত স্বরে শোনা যায় “আকাশ ভরা সূর্য তারা/বিশ্ব ভরা প্রাণ” জর্জ বিশ্বাসের গলায় এই গানটি আজও বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে ঢেউ তোলে। গানটির সঙ্গে খুব মোলায়েম করে ব্যবহার করা হয়েছে তানপুরা ও নীচু স্কেলে বাঁধা সেতার

যা একটা অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। থিয়েটারের দলবল যখন থিয়েটার শেষে বনাঞ্চলে সবাই মিলে ঘুরতে যায় অনুসূয়ার কণ্ঠে গীতা ঘটকের গাওয়া, ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাঅই গেছে বনে ‘গানটি থিয়েটারের দলবলের মতন দর্শকদের মনে দোলা দিয়ে যায়। গানটির শেষে সরোদ ও জলতরঙ্গের ব্যবহার এক আশ্চর্য্যরকম মন ছোঁয়া আবহ তৈরি করে।

রবীন্দ্র সঙ্গীতের পাশাপাশি গণনাট্য সঙ্গীত এই ছবিতে এক বিশেষ স্থান গ্রহণ করেছে। থিয়েটার কেন্দ্রিক ছবি হওয়ার কারণে বহুবার মহড়ার দৃশ্য প্রতীয়মান হয়ে উঠেছে। ঘুরে ফিরে ফলে গণনাট্য সঙ্গীতও বহুবার ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে বহু দৃশ্যে। যেমন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গলায় এবং সমবেত ভাবে গাওয়া ‘হেইয়ো/বল মা ভৈঃ মা ভৈঃ’ গানটি বা থিয়েটার জগতের দুঃখ, কষ্ট, অভাব ও প্রতারণার সাক্ষ্যকে প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে দলের সক্রিয় নাট্যকর্মী জবা ব্যাথিত হৃদয়ে গাওয়া ‘পথ যতই হবে বন্ধুর’র ব্যবহার যথার্থ হয়েছে।

আমরা জানি ঋত্বিক বাবু সরোদ শিখেছিলেন বাহাদুর খানের কাছে ফলে সরোদের প্রতি তাঁর একটা দুর্বলতা ছিল। তাই যখনই সুযোগ পেয়েছেন কোমল গান্ধার ছবিতে ঘুরে ফিরে পরিমিতির সঙ্গে সরোদকে ব্যবহার করেছেন। আবার এই সরোদের পরিপূরক হিসাবে স্থান পেয়েছে বাঁশি। অনসূয়ার কলকাতা ত্যাগের ভাবনা এবং দলীয় রাজনীতির শিকার হয়ে যখন ভৃগুর থিয়েটার দল ত্যাগের দৃশ্যে করুণ সুরে সরোদ ও বাঁশির আবহ দর্শকদের মনেও বিষাদের আবহ সৃষ্টি করে।

ছবির একটি দৃশ্যে যখন সবাই দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের লেখা ও সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যাদু কণ্ঠে অবাক পৃথিবী/অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি/ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি গানটি একটি মায়ামোহময় আবহ তৈরি করে।

‘কোমল গান্ধার’ কবিতার শেষ লাইনে ধ্রুবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “চলায় বলায় সব কাজেতেই ভৈরবী দেয় তান”- সেই কথাকে মাথায় রেখে পরিচালক বাহাদুর খানের বাজানো এক অসামান্য ভৈরবী ব্যবহার করেছেন যেখানে কোমল ঋষভ ও কোমল গান্ধারের আন্দোলন মর্মস্পর্শী।

শ্যামাসঙ্গীত গানের শ্রোতারা হন সাধারণত ভক্ত স্থানীয় বা পরিণত বয়স মানুষজন। অত্যন্ত বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গীত পরিচালক যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়া হালকাভাবে শ্যামাসঙ্গীত ব্যবহার করেছেন।

ছবির শেষে অনিবার্যভাবে একটি ইসলামি গান “সুরে আছেন- সুলেমান/সুরে আসমান/ওই নাম জপো বান্দা/আল্লা কালাম/লাইলাহা ইল্লাল্লাহ/মহম্মদ তার নাম” এবং বাউল অঙ্গের গান ” আমি কী ছলে জল আনতে গেলাম/সোনার গৌরী দেখতে পেলাম” গান দুটি যেমন আমাদের অনুপ্রাণিত করে তেমনি অদ্ভুত এক সাঙ্গীতিক রেশের মধ্যে দিয়ে ছবিটি শেষ হয়। বিয়োগান্ত নয় মিলনান্তক ভঙ্গিতে।

এই লেখাটি লেখবার জন্য যেদিন Youtube-এ দেখতে বসি সেদিন ছিল ৩১ মার্চ, ২০২৫, আর কোমলগান্ধার ছবিটি মুক্তি পায় ৩১ মার্চ ১৯৬১ সালে। নেহাতই কাকতালীয় ঘটনা। কিন্তু তথ্যটি জানার পর শরীরে একটা শিহরণ জেগেছিল। এও জেনেছি ‘কোমলগান্ধার’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার ঠিক দুমাস ‘উল্টোরথ’ পরে পত্রিকার মাঘ ১৮৮২ শকাব্দ (জানুয়ারী ১৯৬১) সংখ্যায় ঋত্বিকবাবু ‘কোমল গান্ধার’ নামেই একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখেছিলেন। 

পরিশেষে বলি ঋত্বিক বাবু সেই অর্থে সুরকার ছিলেন না। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে গভীরভাবে বোঝা ও । ছবিতে প্রয়োজন মতন প্রয়োগের কারণে তিনি হয়তো সরোদ শিখেছিলেন। তবে সঙ্গীতের প্রায় সব শাখাতেই যে তাঁর গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে সাবলীল বিচরণ ছিল ” তার নমুনা আমরা তাঁর বিভিন্ন ছবিতে পাই। রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে তিনি বলেছেন- “রবীন্দ্রনাথ সবকিছুই তাঁর গানে বলে দিয়েছেন, আমার নতুন করে বলার কিছু নেই।” তাও তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিও ও সুচারুভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন তাঁর বিভিন্ন ছবিতে। অন্যদিকে ঋত্বিকবাবুর সমগ্র মনন জুড়ে ছিল তাঁর র ছেলেবেলার বাংলা যার মাটির গন্ধ জীবনের শেষ দিন । অবধি তিনি ভুলতে পারেননি আর সেই মাটির গান এর লোকসঙ্গীত যা তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত এই দক্ষতার সঙ্গে তাঁর ছবিতে। ‘কোমলগান্ধার’ ছবিতে সে এগুলির ব্যবহার উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে।

এই ঋণস্বীকার

শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু ঋত্বিককুমার ঘটক।