November 1, 2023

Enhancing Cultural Resonance: A Comprehensive Abstract on Music Education in Chittagong

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

SWARNAMAY CHAKRABORTY

Abstract:

This abstract delves into the landscape of music education in Chittagong, Bangladesh, exploring its significance, challenges, and evolving paradigms. Chittagong, a city rich in cultural diversity and historical significance, has witnessed a growing interest in music education as a means of preserving and promoting its unique musical heritage.

The study begins by contextualizing the importance of music education in fostering cultural identity and community cohesion. It examines the role of music in Chittagong’s cultural fabric, encompassing traditional folk music, classical genres, and contemporary expressions. The paper explores how music education acts as a catalyst for cultural preservation and the transmission of traditional knowledge from one generation to the next.

Challenges faced by music education in Chittagong are discussed, including resource limitations, the need for qualified instructors, and the integration of technology. The study also addresses socio-economic factors that may hinder access to music education, emphasizing the importance of inclusivity and outreach programs to ensure broader participation in musical learning.

The abstract further explores the evolving paradigms of music education in Chittagong, considering the incorporation of technology, innovative pedagogical approaches, and collaborations with local artists and cultural institutions. It highlights successful initiatives that have contributed to the revitalization of music education in the region, fostering a dynamic and inclusive environment for aspiring musicians.

The paper concludes by advocating for continued research and investment in music education in Chittagong, stressing its pivotal role in cultural sustainability and community development. It calls for a multi-stakeholder approach, involving educational institutions, government bodies, cultural organizations, and the community at large, to ensure the holistic development of music education in Chittagong.

সঙ্গীত চর্চায় চট্টগ্রাম

স্বর্ণময় চক্রবর্তী, পিএইচ. ডি. গবেষক, সঙ্গীত ভবন, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

ভূমিকা: সংস্কৃতির একটি অন্যতম শাখা সঙ্গীত। মানবজাতির আদি অবস্থা থেকেই যার যাত্রারম্ভ। সেদিক থেকে বলা যায়, সংস্কৃতি চর্চায়, নন্দনকলা চর্চায় অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে আদি বিষয় সঙ্গীত। এই কারণেই চট্টগ্রামেও সঙ্গীতের পদযাত্রা সেই আদি থেকেই। তবে পরিশিলীত সঙ্গীতের চর্চা  বিষয়টিকেই এখানে তুলে ধরবার চেষ্টা হয়েছে।

বিস্তৃতি: কবে থেকে যুগবিবর্তনে পরিশিলীত সঙ্গীতের ছোঁয়া এই অঞ্চলেও লেগেছিল তার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য প্রমাণ উপস্থাপন সম্ভব না হলেও চর্যাপদেই প্রথম রাগ সঙ্গীতের উল্লেখ পাই। যানা যায়, চর্যাপদ রচনাকারীদের কয়েকজন চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। সেখানে বিভিন্ন রাগের এবং তালের উল্লেখ  দেখতে পাই। ফলে এই চর্যাপদ আমাদের জানতে সাহায্য করে যে চর্যাপদ রচিত হওয়ার পূর্বেও রাগ সঙ্গীতের চর্চা এখানে ছিল। তবে লোকজীবনের গান যাকে আমরা লোকসঙ্গীত হিসাবে জানি, সেই লোকসঙ্গীতের সাথে চট্টগ্রামের সখ্যতা তারও বহু পূর্ব থেকে। বলা যায়, চট্টগ্রামে জনবসতির শুরু থেকেই। যার ফলে আমরা পেয়েছি গাজির গান[i], হালদা ফাটা গান[ii], হঁ-লা, হাইল্যা সাইর, পাইন্যা সাইর, পালাগান, ফুলপাট গান, কীর্তন, কবিগান, জারিগান, ইসলামি গান, মাইজভাণ্ডারির[iii] গান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের লোকসঙ্গীতও তার স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। চট্টগ্রামের লোকসঙ্গীতের মধ্যে শুধুমাত্র মাইঝভাণ্ডারি গানের কথাও যদি বলি, এটি এখন বাংলাদেশের মধ্যে একটি জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত। শ্যাম-শেফালী জুটির আঞ্চলিক গান দেশ পেরিয়ে বিদেশেও বহুল সমাদৃত।

আমাদের সাঙ্গীতিক প্রকাশ শুধুমাত্র আনন্দদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই সঙ্গীত জনসমাজের দুর্দিনেও ত্রাতা হিসাবে, ভরসাস্থল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে বারবার। যার উদাহরণ পাই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে, পাকিস্থানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, প্রগতিশীল আন্দোলনে, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও।

এখানে উল্লেখ্য, ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় কবি নজরুলের চট্টগ্রামে আগমন সাহিত্যাঙ্গনের আহ্বানে ঘটলেও দুজনের সাঙ্গীতিক পরশ-লাভে ধন্য হয়েছে চট্টগ্রামের সঙ্গীতাঙ্গন। নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, প্রেরণা লাভ করেছেন চট্টগ্রামের শিল্পী সমাজ। এছাড়া ইংরেজ আমলে জমিদারদের আভিজাত্যের অংশ ছিল কালোয়াতি গানের পৃষ্ঠপোষকতা করা। সেই সূত্রে চট্টগ্রামে বেশ কিছু জমিদারের দরবার বা বৈঠকখানায় রাগ সঙ্গীতের চর্চা হয়েছিল।

উনিশ শতকের শেষ দিকে আনোয়ারা থানার পরৈকোরা নিবাসী জমিদার প্রশন্নকুমার রায়ের[iv] বৈঠকখানায় নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরের আয়োজন হত। এতে স্থায়ী যন্ত্রী ছিলেন প্রখ্যাত পাখোয়াজ বাদক সখারাম। তবলাবাদক ও জমিদার সারদা লালার ভাঙঘুটনাস্ত (বর্তমানে জয়নগর) বৈঠকখানায় নাচ-গানের আসর বসত। এতে উপমহাদেশখ্যাত জর্দনবাঈ, গওহরজান বাঈ প্রমুখ গুণী শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন। এছাড়া ডাবুয়ার জমিদার ধর পরিবারেও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জলসা বসত।

উনিশ শতকের চট্টগ্রামের সঙ্গীত গুণীদের মধ্যে কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে জমিদার প্রসন্নকুমার রায়ের পুত্র জমিদার দীনেশ রায়, কানুনগোপাড়ার হরেন্দ্র লাল দত্ত, আনোয়ারার ব্রজেন্দ্র দত্ত, ডেঙ্গাপাড়ার যোগেন্দ্র লাল দত্ত, ধলঘাটের বঙ্কিম দস্তিদার, সূর্যদাস, ধোরলার ত্রিপুরা চৌধুরী ও দুর্গাকিঙ্কর চৌধুরী, নোয়াপাড়ার যোগেশ গুহ, মনীন্দ্র রায়, ভাটিখাইনের রবীন্দ্র চৌধুরী, সারোয়াতলীর দীনেশ সেন, সুরবেরী ঠাকুর প্রমুখ। উনিশ শতকের শেষার্ধে রাঙ্গুনিয়ার জগৎ ঠাকুর ধ্রুপদ চর্চার পুনঃপ্রবর্ত্তন করেন। তিনি বিষ্ণুপুরের ধ্রæপদিয়াদের কাছেই তালিম প্রাপ্ত ছিলেন।

সর্বোপরি আমরা দেখতে পাই, যে পরিশীলিত সঙ্গীত তথা মার্গ সঙ্গীতের চর্চা একসময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক চট্টগ্রামে শুরু হয়েছিল, সেটির ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে সঙ্গীতাচার্য সুরেন্দ্র লাল দাস (ঠাকুর্দা) আর্য সঙ্গীত সমিতির মাধ্যমে। রাজা-বাদশার দরবারের সঙ্গীতকে সাধারনের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। যাতে সাধারন ঘরের ছেলে মেয়েরাও সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ লাভ করে। পূর্ব বাংলার প্রথম সঙ্গীত বিদ্যালয় এটি। সঙ্গীত বিদ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন তিনি তাঁর সহযোগী সঙ্গীতজ্ঞদের সাথে নিয়ে। ক্রমে এই প্রতিষ্ঠানটি সমগ্র ভারতবর্ষে একটি সাঙ্গীতিক আশ্রম হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল। যার প্রমাণ আমরা পাই সুরস¤্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কথায়। তিনি বলতেন, ‘মাইহারের রাজ-দরবারে গান বাজনা করতে করতে যখন হাঁফিয়ে উঠি তখন একটু শান্তির পরশ পাবার আশায় চট্টগ্রামে চলে আসি বন্ধু সুরেন দাসের আশ্রমে’। এ সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুরেন্দ্রলাল যাঁদের সহযোগী হিসাবে পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছোট ভাই ধীরেন্দ্র লাল দাস, সালামত আলী দেওয়ান, গঙ্গাপদ আচার্য, শ্রীপদ আচার্য, জ্যোতিন কানুনগো, হরিপ্রসন্ন দাস, জীবন দাস, নির্মল চৌধুরী, যতীন্দ্রনাথ দত্ত, সিদ্ধেশ্বর দাশগুপ্ত, হরি ভট্টাচার্য, বিমল দত্ত, ধীরেন সেন, বিভু চৌধুরী, প্রিয়গোপাল গুপ্ত, সুবোধ রায়, অনিল গুহ, প্রিয়দারঞ্জন সেনগুপ্ত, কুমুদ বন্ধু সেন, হরি সরকার, কিশোরী সাহা, বিজয় দত্ত, জ্যোতিন মল্লিক, সুরেন্দ্রলালের পুত্র আদিত্য দাস, প্রবীর দাশগুপ্ত, বিনোদ চক্রবর্তী, অজিত রায়, ননী মিত্র, কালিশংকর দাস, আবু নঈম, দেবব্রত ভট্টাচার্য প্রমুখ।

সুরেন্দ্রলালের গড়া সঙ্গীত বিদ্যাপীঠ দেখার জন্য ভারত বিখ্যাত সঙ্গীত গুণীরা আসতেন। সর্বোপরি আর্য সঙ্গীত বিদ্যাপীঠের আয়োজনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনে বিখ্যাত সঙ্গীত গুণীরা সানন্দে অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি এই সম্মেলনে সঙ্গীত পরিবেশন করে ভারতবর্ষব্যাপী সুনাম অর্জন করেছেন এমন শিল্পীর তালিকাও কম নয়। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর নাম। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার পর তাঁর সুনাম ভারতবর্ষব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর্য সঙ্গীত আয়োজিত সম্মেলনগুলোতে সঙ্গীত পরিবেশনকারীদের মধ্যে উস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, সঙ্গীতাচার্য রাধিকা মোহন মৈত্র, সঙ্গীতাচার্য বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, এ টি কানন, নৃত্যাচার্য উদয় শংকর, পণ্ডিত  রবি শংকর, পণ্ডিত প্রসুন বন্দোপাধ্যায়, বিদুষী মীরা বন্দোপাধ্যায়, বিদুষী দিপালী নাগ প্রমুখ।

সেই যে শুরু হল সেই ধারাবাহিকতায় আরো সঙ্গীত বিদ্যালয় পেয়েছি। দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান হল সঙ্গীত পরিষদ ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে। সঙ্গীতজ্ঞ গঙ্গাপদ আচার্য, শ্রীপদ আচার্য, জমিদার ক্ষিরোদচন্দ্র রায়কে নিয়ে এটি গঠন করেন। এরপর আরো প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়। এরমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান রয়ে যায় আবার কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরীও হয়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে, দেশ বিভাগের ফলে চট্টগ্রাম তখনকার সঙ্গীত গুণীদের অনেককেই হারালো। তাঁরা চলে গেলেন পশ্চিম বাংলায়। যার ফলে চট্টগ্রামের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতাঙ্গনের অপুরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এরপর পাকিস্থানী আমলে কয়েকজন গুণী অক্লান্ত শ্রমে সঙ্গীতাঙ্গনে ভারসাম্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য উস্তাদ ফজলুল হক। এই সময় তিনি আর্য সঙ্গীত বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। এছাড়াও উস্তাদ বেলায়েত হোসেন এবং সঙ্গীত পরিষদের সৌরিন্দ্র লাল দাশগুপ্ত, চুনীলাল সেন, চিটাগাং মউিজিক ক্লাবের জগদানন্দ বড়–য়া, সঙ্গীত ভবনের প্রিয়দারঞ্জন সেনগুপ্ত, প্রাচ্য ছন্দ গীতিকার অনিল মিত্র, আলাউদ্দিন ললিতকলা কেন্দ্রের রুনু বিশ্বাস শুদ্ধ সঙ্গীত প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিলেন।

পাকিস্থান আমলের শেষদিকে চট্টগ্রামের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতাঙ্গন পুনরায় প্রাণ ফিরে পেল উস্তাদ নীরদ বরন বড়–য়ার কলকাতা থেকে সঙ্গীত শিক্ষা শেষে চট্টগ্রামে ফেরার পর। চট্টগ্রামে তখনকার সময়ের সাংস্কৃতিক অভিভাবক ডা. কামাল এ খানের সহায়তায় উস্তাদ নীরদ বরন বড়–য়া আর্য সঙ্গীত বিদ্যাপীঠের মাধ্যমে নতুন করে চট্টগ্রামের সঙ্গীতাঙ্গনকে প্রাণিত করেন, উজ্জীবিত করেন। তিনি পাকিস্থান আমলের শেষ দিকে শুরু করেন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অর্থাৎ আমৃত্যু সঙ্গীত শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন। উস্তাদ নীরদ বরন বড়ুয়া আর্য সঙ্গীত সমিতিতে[v] দীর্ঘ পঁচিশ বছর যাবত অধ্যক্ষ পদে থেকে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য যে, আজকে যাঁরা শাস্ত্রীয় অথবা লঘু সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, শিক্ষক রয়েছেন তাঁদের মধ্যে প্রায় সবাই উস্তাদ নীরদ বরন বড়ুয়ার  শিষ্য-শিষ্যা। আর্য সঙ্গীত সমিতি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি তাঁর বাসভবনে গড়ে তোলেন সুর সপ্তক সঙ্গীত বিদ্যাপীঠ নামে নতুন একটি সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি বড় আকারের তিনটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনেরও সফল আয়োজন করেন। তাঁর সমসাময়িক আরো গুণীজনেরা চট্টগ্রামে আসেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য উস্তাদ মনোরঞ্জন বড়ুয়া। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তানসেন সঙ্গীত বিদ্যালয়।

এদিকে সঙ্গীতজ্ঞ জগদানন্দ বড়–য়া প্রতিষ্ঠা করেন সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় বেশিরভাগ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা ধ্রুপদ পরিষদ। এই পরিষদের উদ্যোগেও কয়েকটি সঙ্গীত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। তবে আয়োজনগুলো অনিয়মিত হওয়ায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার্থী, শিল্পীদের অনুষ্ঠান করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই বিষয়টির কথা ভেবেই ১৯৯৮ সালে স্বর্ণময় চক্রবর্ত্তী প্রতিষ্ঠা করেন সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদ বাংলাদেশ নামে সংস্থাটি। এই সংস্থা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করবার লক্ষ্যে দ্বিমাসিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়াও বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, সেমিনারসহ উপযুক্ত শ্রোতা-দর্শক তৈরীর উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পবর্, এছাড়া সমগ্র বাংলাদেশ থেকে শিল্পীদেরকে নিয়ে বাৎসরিক জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলন এর আয়োজন করে আসছে প্রতিষ্ঠার বছর থেকে যা এখনো পর্যন্ত চলমান রয়েছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিষয়ক দেশের একমাত্র নিয়মিত প্রকাশনা সুরশৃঙ্গার সদারঙ্গের প্রতি বাৎসরিক সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত হয়ে থাকে। এতে বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়। ক্রমে দেশের শিল্পীদের পাশাপাশি পার্শবর্তী রাস্ট্র ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য রাস্ট্র থেকেও শিল্পীদের অংশগ্রহণের ফলে এই সম্মেলনটি জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিকতায় রূপ লাভ করেছে। এই সংস্থার অফিস চট্টগ্রামে হলেও এর কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গোটা দেশজুড়ে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় সঙ্গীত প্রশিক্ষন কর্মশালা এবং শেষে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। দেশে সঙ্গীতের প্রচার প্রসারে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আযোজিত হয় গোল-টেবিল আলোচনা। সদারঙ্গের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সঙ্গীত বিভাগ[vi]। কাজগুলো করতে গিয়েই ভাবনায় আসে, এক সময়কার সংস্কৃতি বান্ধব গ্রাম বাংলা বর্তমানে সংস্কৃতি শূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলার নামে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে কর্মমুখী শিক্ষার নামে রোবট তৈরীর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রাইভেট ক্লাস, স্পেশাল ক্লাস, কোচিং ক্লাস নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় সুকুমার বৃত্তি তৈরী হওয়ার যে বিষয়গুলো রয়েছে আমাদের, তার সাথে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক তৈরী হওয়ার যাবতীয় পথও রূদ্ধ হয়েছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে নতুন প্রজন্মকে উদ্ধারের আশায় সদারঙ্গ আর একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে ২০০৩ সাল থেকে। সেটি হল দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে সংগীত শিক্ষাকে বাধ্যাতামূলক বিষয় হিসাবে অন্তর্ভূক্তির আন্দোলন। এতে করে নতুন প্রজন্ম অন্ততপক্ষে সঙ্গীত মনস্ক হয়ে গড়ে উঠবার সুযোগ লাভ করবে। অত্যন্ত আশার কথা, বর্তমান সরকার তার গত মেয়াদেই এই বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়। এবং প্রত্যেকটি ক্লাসের জন্য আলাদা আলাদা সঙ্গীতের পাঠক্রম অনুযায়ী বই এর ব্যবস্থা করা হয়। বিষয়টিকে কার্যকরি করবার লক্ষ্যে প্রথমবারে প্রায় আড়াই হাজার সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যাঁদের সঙ্গীত সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে তাঁদেরকে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে সঙ্গীতের ক্লাস শুরু করা হয়েছে।

আমরা জানি টোল প্রথা ছিল একসময়। গুরুগৃহে শিক্ষা গ্রহণ ছিল এক সময়কার বিষয়। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থাটিকে সর্বসাধারণে নিয়ে আসার জন্য কি করা হলো ! রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নিল তবেই আজকে আমরা শিক্ষিতজন থেকে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পেয়েছি। এই বিষয়টির এখানে অবতারণা করবার কারণ এই, উন্নত বিশ্বে সুন্দর মনের মানুষ গড়বার জন্য সঙ্গীত বিষয়টাকে সাধারণ শিক্ষার সাথে অঙ্গীভূত করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্যান্য বিষয়ের সাথে সঙ্গীতের যে কোন একটি শাখাকেও বেছে নিতে হয়। এছাড়া শুধুমাত্র সঙ্গীত নিয়ে পড়ালেখার ব্যবস্থা এবং তা থেকে বেরিয়ে জীবনধারণের ব্যবস্থা কি হবে তার ব্যবস্থাতো রয়েছেই। এই অবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এখনো সেই ভাবনার কাছাকাছিও নেই।

তবু শত প্রতিকুলতার মাঝেও সঙ্গীতচর্চা থেমে নেই। তার কারণ, সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ, ভালোবাসা মানুষের সহজাত। এছাড়া চট্টগ্রামের আরো একটি বিষয় রয়েছে উল্লেখ করবার মতো। সেটি হল গণসঙ্গীত। বেশ কয়েকটি সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে গণসঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রেখেছে।

উপসংহার: সবশেষে উল্লেখ করতে চাই, আমরা আশাবাদী। একদিন এই বিষয়টি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অনুধাবন করবেন নিশ্চয়ই। ব্যক্তিচিন্তা এক সময় সামষ্টিক চিন্তায় রূপ নেবে। সেই চিন্তার প্রতিফলন ঘঠবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। আমরা পাব সঙ্গীতময় তথা কল্যাণময় একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ। যাতে আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে সুন্দর মনের পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে।

   তথ্যসূত্র        


[i] https://bn.wikipedia.org/wiki/গাজীর_গান   

[ii] https://bn.wikisource.org/wiki/পাতা:পুর্ব্ববঙ্গ_গীতিকা_(চতুর্থ_খণ্ড)_-_দীনেশচন্দ্র_সেন.pdf/৫৬৩  

[iii] https://bn.banglapedia.org/index.php/মাইজভান্ডারি_গান

[iv] https://bn.wikipedia.org/wiki/প্রসন্ন_কুমার_জমিদার_বাড়ি

[v] https://www.facebook.com/283504935358030/posts/687444671630719/

[vi] https://dainikazadi.net/সদারঙ্গের-পথ-চলা/

সহযোগী গ্রন্থ

  1. হাজার বছরের চট্টগ্রাম, বিশেষ সংখ্যা, দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম।
    2. পূববাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, অজয় সিংহ রায়, কলকাতা।
    3. আরোহ-অবরোহ, উস্তাদ নীরদ বরন বড়–য়া, চট্টগ্রাম।