May 1, 2023

Impact of Social Media on the Music Industry

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

Mehfuz Al Fahad, Lecturer, Department of Music, University of Dhaka

Abstract:

The emergence of social media and digital streaming platforms has revolutionized the music industry in profound ways. YouTube and Spotify, for instance, have become the preferred channels for music consumption and promotion, enabling artists to reach a global audience. YouTube offers music videos, live performances, and other interactive content that fans can engage with, thus reducing the need for promotional videos. It has also created a new revenue stream for artists through subscriptions. Spotify, meanwhile, boasts an extensive music library that allows users to listen to music on demand, create personalized playlists, and discover new music through algorithm-based recommendations. This platform has disrupted the traditional album sales model, with FM radio stations no longer the primary means of promoting new albums. Social media platforms like Facebook, Twitter, and Instagram have also become essential tools for sharing and disseminating music to a wider audience. While these platforms have opened up new possibilities for artists to connect with their fans and build a devoted following, they have also raised concerns over copyright laws, artist earnings, and mental health. It is therefore crucial to examine the impact of social media on music and the challenges it poses for artists, fans, and the music industry as a whole.

সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব

মেহফুজ আল ফাহাদ, প্রভাষক, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়­

সারসংক্ষেপ

সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল সংগীত স্ট্রিমিং পরিষেবাসমূহ সংগীত শিল্পকে যেমন প্রভাবিত করেছে একইসাথে প্রভূত রূপান্তর ঘটিয়েছে সংগীত শ্রবণ অভিজ্ঞতার। বিশেষত, ইউটিউব এবং স্পটিফাইয়ের ব্যবহার সংগীত শ্রবণ এবং বিপণনের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। ইউটিউব, শিল্পীদের তাদের সংগীতশৈলীর ভিডিও, সরাসরি মঞ্চ বা বিভিন্ন মিডিয়ায় পরিবেশনা এবং তাঁদের পরিবেশনার নেপথ্যের বিষয়বস্তুকে বিশ্বব্যাপী দর্শক-শ্রোতার নিকট পৌঁছাতে সক্ষম। এই প্লাটফর্মটি শুধু শিল্পীর প্রচারই নয় বরং সংযুক্ত ভিডিও সমূহে প্রচারিত বিজ্ঞাপন এবং শিল্পীর নিজস্ব চ্যানেলে প্রদত্ত সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে শিল্পীর রাজস্ব আয়ের নতুন একটি ধারা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, স্পটিফাইয়ের বিশেষত্ব সংগীতের বিস্তৃত লাইব্রেরি, যার ফলে শ্রোতারা খুব সহজেই চাহিদামাফিক সংগীত শুনতে পারছেন। এটি বিশাল ক্যাটালগ ছাড়াও ব্যক্তিগত প্লে-লিস্ট এবং শ্রোতার ব্যক্তিগত পছন্দকে শ্রবণ ভিত্তিক অ্যালগরিদমে সাজিয়ে স্বাদ এবং বৈচিত্র্য দিতে সক্ষম যা শ্রোতার গান শোনার অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিচ্ছে। শঙ্কার দিক হলো স্পটিফাই প্রথাগত অ্যালবাম বিক্রির হার ছাড়াও এফএম রেডিওগুলোতে শিল্পীর প্রচার হারকে সীমিত করেছে এবং শিল্পীর প্রকাশের জন্য এ্যালবামের প্রচার করেছে অনলাইন স্ট্রিমিং নির্ভর। এর বিপণন প্রক্রিয়াও প্রশ্নাতীত নয়। এছাড়াও রয়েছে ইন্সটাগ্রাম, ফেইসবুক ও টুইটার যা সংগীতকে বহুজনের মধ্যে শেয়ার বা ছড়িয়ে দেয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। শ্রোতারা এই সকল মাধ্যম ব্যবহার করে যেমন শ্রবণ অভিজ্ঞতাকে নতুন রূপ দিচ্ছেন একই সাথে শিল্পীও নিজে সরাসরি শ্রোতাদের সাথে জড়িত থেকে তাদের মতামতকে উপলব্ধির আওতায় এনে নিজ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারছেন। সামগ্রিকভাবে এই প্ল্যাটফর্মসমূহ শুধু সংগীত শ্রবণ অভিজ্ঞতার ভাগাভাগিই নয় বিপণন ব্যবস্থাতেও মাধ্যমগত পরিবর্তন এনেছে। সংগীতশিল্পে এই প্ল্যাটফর্মগুলির প্রভাব বহুমুখী হলেও প্রকাশ সরল নয় বরং অনেকাংশেই জটিল। প্ল্যাটফর্মগুলি বৃহত্তর শ্রোতার নিকট শিল্পীদের পৌঁছে দেয়া এবং শিল্পী ও অনুরাগীদের যোগাযোগের নতুন সেতুবন্ধ স্থাপন করলেও কপিরাইট আইন লঙ্ঘন, শিল্পীর উপার্জন এবং অবিচ্ছিন্ন প্রকাশ ও জনরুচির চাপে শিল্পীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে নিরন্তর উদ্বেগ তৈরি করেই যাচ্ছে। প্রবন্ধে সংগীতের উপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব ও সংকটের দান্দ্বিকতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শুধু তাই নয় আলোচ্য পরিধির চলমান সংকট উত্তরণ পরবর্তী সম্ভাবনার অন্বেষণ এই গবেষণা প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

 
সাংকেতিক শব্দগুচ্ছ – সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন স্ট্রিমিং পরিষেবা, অনলাইন বিপণন, সংগীত শিল্প। 

গবেষণা প্রশ্ন

সংগীত শিল্পের উপর উপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব কেমন?

সংগীত শিল্পের বিকাশে সামাজিক মাধ্যমের উপকার ও অপকারসমূহ

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যম সংগীতের বিকাশকে কতটা প্রভাবিত করছে।

সামাজিক মাধ্যমের উত্থান মানুষে মানুষে যোগাযোগের পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের সাথে সাথে সংগীত শ্রবণ এবং এর গ্রহণের পরিভাষা বদলে দিয়েছে।  ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যমসমূহ যে কোনো শৈলীর শিল্পীর সাথে তাদের অনুরাগীর যোগাযোগের একটি সরাসরি পন্থা তৈরি করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। পূর্বে শিল্পী ও শ্রোতার যেই সংশ্লিষ্টতা ছিলোনা তার ধারণা বদলে নতুন মাত্রার যোগাযোগ স্থাপন করে দিয়েছে এই মাধ্যম সমূহ। এটি শিল্পীদের জন্য তাদের শৈলীর প্রচার করার পাশাপাশি নিজ শৈলীর বিপণন ও প্রসারের  নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করেছে।

সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক শিল্প গবেষক বিষয়টিকে গেম-চেঞ্জার হিসেবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন। (Moreno, J. E, 2019, p. 20) রেকর্ড কোম্পানির প্রতিযোগিতা এবং বিপণনের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম একটি সাম্যাবস্থা তৈরি করতে পেরেছে। প্রকাশউন্মুখ শিল্পীরা যে কোনো বড় রেকর্ড লেবেলের সাহায্য ছাড়াই স্থানিক এবং বৈশ্বিক উপস্থিতি লাভ করতে পারছেন বেশ সহজেই। কিছুদিন আগেও যেটি ছিলো কষ্টসাধ্য একটি কাজ। এই উপস্থিতিই আবার তাঁদের পরবর্তীতে যে কোনো রেকর্ড কোম্পানি বা লেবেলের গোচরে আনতে সাহায্য করছে।  নিকট অতীতেই শিল্পীরা বৃহত্তর শ্রোতা গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে জাতীয় বা বেসরকারি পর্যায়ের রেডিও এবং টেলিভিশনের মতো মূলধারার ঐতিহ্যবাহী মিডিয়াগুলোর উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে, সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতি বরং শিল্পীদের নিজস্ব শৈলীর প্রসার, প্রচার ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অধিক নিয়মিত অথচ সহজ এবং সাবলীল পন্থা প্রদান করছে।  সামাজিক মাধ্যম শিল্পীদের বহুল চর্চিত শব্দ স্বকীয় ‘ব্র্যান্ড’ তৈরি করার পদ্ধতিগুলোকে সহজ এবং উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সংগীত শৈলীর বাইরে আরও ব্যক্তিগত গল্প এবং একটি গান তৈরির পিছনের গল্পগুলোকে একত্রিত করে ভিডিও নির্মাণ করে তার ভিডিও সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করার মাধ্যমে শিল্পীরা শ্রোতা-দর্শকের সাথে আরও নিবিড় এবং সরাসরি যোগাযযোগে যেতে পারছেন। টেয়লর এবং প্যাট্রিক তাঁদের The effect of social media on the music industry: A study of artists and fans প্রবন্ধে বলেছেন, সামাজিক মাধ্যম শিল্পীদের তাঁদের ভক্তদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি তাঁদের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করে সংগীত প্রচারের ধারা বদলে দিয়েছে। এতে তাঁদের আয় যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে জনপ্রিয়তাও বেড়েছে বহুগুণে। (Taylor et al., 2019, p. 12) এই যোগাযোগ শুধু সংগীত শৈলীর প্রচারেই কাজে লাগছে না বরং শিল্পী এই যোগাযোগের ক্ষেত্র ধরে নিজ কনসার্ট বা পরিবেশনের টিকিট বিক্রিও করতে পারছেন। এক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে শিল্পীদের নিজস্ব অনুরাগী গোষ্ঠীগুলো সেই তথ্য বা ভিডিওগুলোকে বহুবার শেয়ার করে শিল্পীর বিপণনের মাধ্যমও তৈরি করে দিচ্ছে। এই কার্যকলাপগুলো শিল্পীর স্বকীয় ব্র্যান্ড যেমন তৈরি করছে একই সাথে ভক্ত শ্রোতার মধ্যে অনুগত গোষ্ঠীও তৈরি করছে। তবে সেই গোষ্ঠী কতখানি অনুরাগের বশবর্তী হয়ে তৈরি বা কতখানি স্তাবকতা দোষে দুষ্ট সেই প্রশ্নও তোলা যায়।  

আরও একটি ব্যাপারে সামাজিক মাধ্যম এই শিল্পকে প্রভাবিত করেছে এবং তা হল সংগীতের গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে। অতীতে, শিল্পীদের সাধনা দিয়ে নিজ সুকুমারবৃত্তিকে শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে নিজেদের পৌঁছে দিতে হতো। আজ এই দায়িত্ব পালন করছে ফেসবুক, সাউন্ডক্লাউড, ব্যান্ডক্যাম্প এবং ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো।   এই মাধ্যমে শিল্পী বা শিল্পভাবনা যুক্ত নন এমন যে কেউ তাদের সংগীত শৈলী নিজস্ব প্রোফাইল বা চ্যানেলে আপলোড করতে পারেন এবং একেবারে বিনাখরচে আর্থিক সমর্থন আদায় করে নিতে পারেন শ্রোতাগোষ্ঠীদের নিকট হতে। এতে শিল্পীর আর্থিক প্রসারও আগের চেয়ে সহজ হয়ে উঠেছে।   

সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের সকল প্রভাব অবশ্যই ইতিবাচক নয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে এটি সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকট তৈরি করেছে। যেমন প্রতিনয়ত অনলাইন উপস্থিতির চাপ, সামাজিক মাধ্যমে পরিহাসের শিকার হওয়ার বিষয়গুলো শিল্পীর মনোজগতে চাপ তৈরি করছে ফলে আমাদের শিল্পক্ষেত্রে শিল্পীদের পদচারণা থেমে যাচ্ছে শুরুতেই। অবস্থানগত এই অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা প্রভাব ফেলছে সমকালিন সংগীতেও। গবেষনাপত্রে পরবর্তীতে এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে এবং এই আলোচনা আরও নিবিড় ভাবে পরিচালিত করতে পারে ভবিষ্যৎ গবেষণাকাজকেও।  

সংগীতের উপর সামাজিক মাধ্যমসমূহের প্রভাব

সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা উপাদানের মতই সংগীত জগতেও বিশেষ প্রভাব রাখছে। সংগীতশিল্পী এবং শ্রোতা বা অনুরাগীদের মিথস্ক্রিয়ায় সংগীতের ধরণ, প্রকাশভঙ্গী, বিপণন, বিতরণ এবং ভোক্তা পর্যায়ের গ্রহণের ধারণা পর্যন্ত পরিবর্তীত হয়েছে। অর্থাৎ সংগীত যা অতীতে ছিলো সাধনার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য এক বিমূর্ত শিল্প যা একই সাথে শিল্পীর সাথে শিল্পকে আত্মীভূত করে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে এখন তা অনেকাংশেই পণ্য। এখনও সংগীতে সাধনা আছে অবশ্যই। একই +সাথে আছে বিমূর্ততার ধারণা। কিন্তু প্রচলিত ধ্যান ধারণার অনেকাংশই ভেঙে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের চাওয়ার বাইরের অলঙ্ঘনীয় আধুনিকতাও এতে যুক্ত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শিল্প মাধ্যম হিসেবে সংগীতকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে সেই বিষয়গুলো উল্লিখিত হলোঃ

প্রচার এবং বিপণন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংগীত শিল্পীদের জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে যেখানে তাঁরা বিশ্বব্যাপী তাঁদের শ্রোতাদের কাছে তাঁদের সংগীত মুক্তভাবে প্রচার ও বিপণন করতে সক্ষম। সংগীত  শিল্পীরা চাইলেই ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং ইউটিউবের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলিকে ব্যবহার করে সরাসরি তাঁদের ভক্ত, শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেন এবং নিজের অনুরাগীদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নিয়মিত নিজের কর্মকান্ড সম্পর্কে জানাতে পারেন।

রাজস্ব উৎপাদন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার শিল্পীদের সামনে রাজস্ব আয়ের একটি বড় দুয়ারকে উন্মোচন করেছে। সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে শিল্পীরা মধ্যসত্বভোগী গোষ্ঠীর প্রভাব এড়িয়ে সরাসরি নিজ শৈলীর বিক্রয়মূল্যকে গ্রহণ করতে পারছে। এই যে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ এবং তার প্রাপ্তি সমস্ত প্রক্রিয়াই ঘটছে শিল্পীর একক তত্ত্বাবধানে। এ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করছে YouTube এবং Spotify-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলি। এই মঞ্চগুলোকে ব্যবহার করে শিল্পীরা কোনো রেকর্ড কোম্পানীর সাথে চুক্তি ব্যতিরেকেই নিজ শিল্পের শিল্প রাজস্বকে হাতে পাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করছে অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে শ্রোতাদের শ্রবণ অভ্যাসের উপর। উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়, ২০২১ সালে, সংগীত শিল্পের রাজস্বের ৮৫% ছিল স্ট্রিমিং নির্ভর। ৯% রাজস্ব আয় এসেছিলো সিডি বিক্রি থেকে। ২০২১ সালে সংগীত শিল্পের বাকি ৬% আয় অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে যেমন  টিভি, ফিল্ম এবং বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত সংগীতের একত্রীকৃত স্বত্ব এবং সরাসরি পরিবেশনা ও এফএম রেডিও প্রচার থেকে। IFPI-এর ২০২২ গ্লোবাল মিউজিক রিপোর্ট অনুসারে, সংগীত শিল্পের আয়ের ৩% একত্রীকৃত স্বত্ব এবং অবশিষ্ট ১% অন্যান্য উৎস থেকে যেমন লাইসেন্সিং এবং সদস্যতা পরিষেবা থেকে এসেছে। ৮৯% এসেছে অনলাইন স্ট্রিমিং থেকে এবং ৮% সরাসরি সিডি বিক্রি থেকে অর্জিত হয়েছে। (https://www.ifpi.org/our-industry/industry-data/) YouTube এবং TikTok-এর মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো সংগীতের অর্থ উপার্জনগত ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, অনেক শিল্পী এই মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁদের সংগীত প্রচার করতে এবং অনুরাগীদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছেন। 

শিল্পীদের আবিষ্কারযোগ্যতা সামাজিক মাধ্যমসমূহ নতুন প্রতিভার অন্বেষণকে সহজ করে তুলেছে। সাউন্ডক্লাউড, ব্যান্ডক্যাম্প এবং ইউটিউব কিংবা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলি শিল্পীদের তাঁদের সংগীতকে আরও বড় কিংবা বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর সাথে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এতে করে প্রতিভাবান শিল্পী, উদীয়মান প্রতিভা সকলেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুকে স্পর্শ করে নিজ শৈলীর প্রকাশ ঘটাতে পারছেন। এই প্রক্রিয়া বিভিন্ন পেশাদার রেকর্ড কোম্পানীগুলোর প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমকে বেগবান করেছে একই সাথে তাদের প্রক্রিয়াতে প্রকাশিত মানসম্পন্ন প্রতিভার অবস্থানের পিছনে জনচাহিদার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

 ডেটা এবং বিশ্লেষণ– সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সংগীত শিল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা এবং বিশ্লেষণ প্রদান করছে। সংগীতের শেয়ারিং, স্ট্রিমিং এবং হ্যাশট্যাগের ব্যবহার সংগীত শিল্পের প্রকাশকে যেমন উন্মুক্ত করেছে একই সাথে জনরুচির পরিচায়কও হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্ট্রিমিং মঞ্চগুলো। এই মঞ্চ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এলগরিদম তৈরি করছে। এই এলগরিদম ঠিক করে দিচ্ছে কোন সময় কোন গানটি বা সংগীত শৈলীটি সময়কে প্রতিনিধিত্ব করবে। যেমন কেউ যদি ইউটিউব বা ফেসবুকের ভিডিও রিলসে গিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীত, প্রকৃতি, রান্না, রসনা বিলাস এই ধরণের ভিডিওগুলো নিয়মিত দেখেন এই পরিষেবাসমূহ মেশিন লার্নিং এর মাধ্যমে এই তথ্যকে ধারণ করে সেই ব্যক্তির পরবর্তী ব্যবহারের সময় কাজে লাগাবে। এই সমস্ত তথ্য রেকর্ড লেবেল কোম্পানী, সংস্থাগুলোর কর্মী এবং প্রচারকারীদের শিল্পীদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের শৈলী চরিত্র বা সংগীত প্রবণতাকে সনাক্ত করতে এবং এর পরবর্তী বিপণন এবং প্রচার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিক্স প্রদান করছে।  যেমন এই গবেষণাপত্রটি তৈরি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে মোট ৩০ জন মানুষের উপর একটি জরিপ চালানো হয়। কাজেই বিভিন্ন বয়সের মানুষের সম্মিলনে এই মতামত তৈরি হয়েছে।  জরিপের প্রশ্ন ছিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ (ফেসবুক, টুইটার, টিকটক) কে কীভাবে বা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন? জরিপে প্রাপ্ত মতামত টেবিল ১ এ দেখানো হলো-

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণশতাংশ
অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ৩৩.৩৩%
গান শোনা বা ভিডিও দেখা২০%
শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য১০.১%
ব্যক্তিগত ছবি ও খবর পোস্ট করা৯%
বিনোদনমূলক বিষয়বস্তু খুঁজে পেতে৭.২%
নিজের গাওয়া গান ও ভিডিও আপলোড৮%
পোল বা জরিপ৪.৮%
নিজস্ব মতামত শেয়ার করতে৩.২%
খেলাধুলা ও বিশ্বপরিস্থিতির খবরাখবর জানতে৪.৩৭%
টেবিল ১- সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণসমূহ

টেবিল ১-এ দেখা যাচ্ছে অন্যদের সাথে যোগাযোগের জন্য বা খুদে বার্তা আদান প্রদানের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন ৩৩.৩৩% মানুষ। ২০% মানুষ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন গান শোনা বা ভিডিও দেখার কাজে এবং নিজের গাওয়া গান বা ভিডিও আপলোডে অর্থাৎ নিজস্ব শৈলীর প্রচারে ব্যবহার করছেন ৮% মানুষ। মোট ২৮% মানুষ সংগীত বা এইসম্পর্কীয় কাজে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করছেন। বাকি শতাংশের মানুষেরা খেলাধুলা, রাজনীতি বা বিশ্বপরিস্থিতির খবর জানতে বা বিনোদনমূলক কাজে বা পোল বা জরিপে অংশগ্রহণ করতে এই মাধ্যমসমূহকে ব্যবহার করেন।

সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি সামাজিক মাধ্যমসমূহ সংগীতের উপর মোটাদাগে বেশকিছু প্রভাব রেখে চলেছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এই প্রভাব বিস্তার লাভ করছে আরও দ্রুত। সংগীত শিল্পীরা তাঁদের কর্মজীবনকে নিজ চাহিদামাফিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন এবং সুনিপুণ ও অর্থপূর্ণ উপায়ে নিজেদের শিল্পশৈলীর বিপণন ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এবং শ্রোতা ও অনুরাগীদের সাথে সরাসরি সংযোগ রক্ষা করতে পারছেন।

সামাজিক মাধ্যমসমূহের উপকারিতা ও অপকারিতা- সংগীত শিল্প

সামাজিক মাধ্যম সংগীত শিল্প প্রাঙ্গণে বিপ্লব সংঘটিত করেছে। শিল্পীদের একটি বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি ভক্ত-অনুরাগীদের সাথে জড়িত থাকার জন্য একক সময়ে একটি মঞ্চ প্রদান করছে। কিন্তু সকল প্রযুক্তি ধারার মতো সামাজিক মাধ্যম সমূহও শুধু ভালো দিকগুলোতে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর ব্যবহারজনিত অনাবধানতা একে ফ্রাঙ্কেন্সটাইনে পরিণত করতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমের গুণাবলী- সংগীত শিল্প

প্রকাশের বর্ধিত পরিসর– সামাজিক মাধ্যমের মঞ্চগুলো ঐতিহ্যবাহী বা পেশাদার রেকর্ড লেবেল বা ব্যয়বহুল বিপণন এবং প্রচার ছাড়াই শিল্পীদের শ্রোতা দর্শকদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে। যা প্রচার আকাঙ্ক্ষী শিল্পীদর জন্য বহুল আকাঙ্ক্ষিত। সামাজিক মাধ্যমে শিল্পীরা বিশ্বজুড়ে তাঁদের ভক্তদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেন, তাঁদের সংগীতশৈলী ছড়িয়ে দিতে পারেন এবং বহুল চর্চিত নিজস্ব ‘ব্র্যান্ডের’ বা নিজ মত ও রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেন।

ভক্ত বা অনুরাগীর প্রত্যক্ষ সংযোগ- সামাজিক মাধ্যমসমূহে ‘রিয়েল টাইম’ শব্দটি বহুল চর্চিত তথা ব্যবহৃত। এর অর্থ একক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান। অর্থাৎ শিল্পী একই সময়ে মঞ্চে কিংবা নিজ পরিসরে সংগীত পরিবেশন করছেন ওই একই সময়ে তিনি শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া-অনুভূতি জানতে পারছেন এবং তাদের অনুভূতির সাথে নিজ মন্তব্যে যুক্তও হতে পারছেন। সামাজিক মাধ্যম শিল্পীদের ‘রিয়েল টাইমে’ অনুরাগীদের  সাথে যোগাযোগ করতে, মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করছে। এই সুবিধা দর্শক শ্রোতার চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা এখন গানের পিছনের গল্প কিংবা দৃশ্যায়নের পিছনের গল্পও জানতে চান। কোনও একটি গান তৈরির পিছনের একান্ত গল্পও এখন সামাজিক মাধ্যমে শিল্পী কলা-কুশলীরা প্রচার করছেন। এতে করে শিল্পীর একক শৈলীর সামগ্রিকতা বাড়ছে, শিল্পীর একান্ত ভক্ত গোষ্ঠী বা ফ্যান ‘বেইজ’ তৈরি হয়ে সামগ্রিক সংগীত শিল্পে সমর্থন বাড়ছে।  

মিথস্ক্রিয়া – সামাজিক মাধ্যম শিল্পীদের জন্য অন্যান্য সঙ্গীত শিল্পী, প্রযোজক এবং গীতিকারদের সাথে পারষ্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। শিল্পীরা সামাজিক মাধ্যমে শিল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাতে পারেন এবং তাঁদের মত ও ধ্যান ধারণার বিনিময় করতে পারেন। ফলে সংগীতের নতুন নতুন প্রকাশভঙ্গী তৈরি হয়।

বিশ্লেষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি – সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলি শিল্পী অনুরাগী জনসংখ্যা, তাঁর প্রতি আগ্রহ এবং একজন শিল্পীর ভক্ত গোষ্ঠী বা ‘ফ্যান বেইজ’সম্পর্কে মূল্যবান বিশ্লেষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। এই তথ্যগুলি শিল্পীদের তাদের শ্রোতাদের সাথে আরও ভালভাবে সংযোগ করতে তাদের নিজস্ব শৈলী, পছন্দ এবং বিপণন কৌশলগুলিকে উপযোগী করতে সাহায্য করতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতি- সংগীত শিল্প

অ্যালবাম বিক্রি হ্রাস– ইন্টারনেট ভিত্তিক সংগীত ‘স্ট্রিমিং’ পরিষেবার উত্থানের সাথে সাথেই ভক্ত শ্রোতারা আর অ্যালবাম কিনছেন না, বরং তারা কাঙ্খিত শিল্পীর গান শুনতে ও দেখতে ইউটিউব, স্পটিফাইয়ের মতো মঞ্চসমূহের দ্বারস্থ হচ্ছেন ফলে শিল্পীদের অ্যালবাম বিক্রি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পরেছে শিল্পীর উপার্জনে। অনলাইন স্ট্রিমিং পরিসেবা আসাতে বিপণনের নতুন ধারণাতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে শিল্পীদের যা অনেকের জন্যই বড় রকমের আর্থিক ক্ষতি বয়ে এনেছে। এই ক্ষতির প্রবাহ লাগছে শিল্পীর কনসার্ট, ট্যুর এবং ব্র্যান্ড অংশীদারিত্ব হতে প্রাপ্ত অর্থেও।

অত্যধিক বাজার সম্পৃক্ততা – বর্তমানে অনেক শিল্পী তাদের সংগীত শৈলী প্রচারের জন্য সামাজিক মাধ্যম সমূহকে বেছে নিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, গণরুচির আদলে তৈরি বিপণন সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে  নতুন এবং উদীয়মান শিল্পীদের পক্ষে স্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ানো কঠিন। এছাড়া প্রতিনিয়ত জনপ্রিয়তার চাপে শিল্পী তাঁর স্বকীয়তাকে হারিয়ে সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীর পছন্দ অনুসারে পরিবেশন করতে থাকেন। সেখানে গিয়ে শিল্পের বিনোদন ব্যতীত অন্য রূপ বা অর্থ আর প্রকাশ হয় না। ক্ষতি হয় শিল্পের এবং শিল্পীর। নর্থ এবং হারগ্রিভস (2018) এর মতে সামাজিক মাধ্যমে নিরন্তর উপস্থিতি নতুন প্রতিভাবান শিল্পীদের স্থিতিশীল হয়ে কাজ করতে দেয় না। এতে তার নিজস্ব শিল্পভাবনার অবনতি  ঘটে এবং সেই শিল্পী একসময় হারিয়ে যায়।

অনলাইন হয়রানি– সামাজিক মাধ্যমে বড় হুমকি হয়ে আছে অনলাইন হয়রানি। শিল্পীরা যেহেতু একই সাথে প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করছেন এবং সেই প্রতিক্রিয়া অনুসারে নিজেদের চালিত করেন বা নিজস্ব শৈলীকে জনপ্রিয়তার ছাঁচে গড়ছেন তাই তাঁরা শ্রোতা দর্শকের সাথে আরও বড় পরিসরে মিশতে পারছেন। যখনই গুণবাচক হতে সংখ্যাবাচক হয়ে উঠছে জনপ্রিয়তার বিবেচনা তখনই আস্তে আস্তে নানা মানসিকতার মানুষ মুক্ত সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে শিল্পীকে। কাজেই তাঁকে তাঁর প্রতি পদক্ষেপের জন্য আলোচনা সমালোচনার মুখোমুখী হতে হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে শিল্পী যেহেতু শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তাই প্রায়শই তিনি নানারূপ কাজের জন্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ভক্ত অনুরাগীদের কাছ থেকে ট্রল, সমালোচনা। ফলে শিল্পী মানসিক পীড়ন ও অবসাদে ভুগছেন। তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহারটি শ্রোতারা করলেও সেই সুযোগ শিল্পীই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন কি না এই আলোচনাও আসতে পারে।   

জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে নিয়মিত অনলাইন উপস্থিতি– সামাজিক মাধ্যম জনপ্রিয়তা রক্ষার স্বার্থে শিল্পীদের একটি অবিচ্ছিন্ন অনলাইন উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য চাপ তৈরি করে। এতে করে শিল্পী তাঁর চারপাশে মেকি পরিবেশের বাইরে বেরোতে পারেন না। মরটনের (2019) মতে একজন শিল্পীকে নিরন্তর প্রয়াসের মধ্যে থাকতে হয় নিজের উৎকর্ষ সাধনের জন্য এবং শিল্প রচনায় নতুনত্ব আনার জন্য। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের এলগরিদম ভিত্তিক জনপ্রিয়তা সেই সুযোগটি দিতে চায় না (“Frontiersin,2019) নিয়মিত বা অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি না থাকলে শ্রোতারা মুখ সরিয়ে নিতে পারে শঙ্কায় শিল্পী নিজের জনপ্রিয়তার গন্ডিতে আটকে থেকে জনরুচির প্রাধান্য দিতে থাকেন। এতে করে নিজের সুকুমারবৃত্তির মৃত্যু হয়। ফলস্বরূপ তাঁর কাজের গুণ ও মান হ্রাস পায়।   

প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সংগীত শিল্প এদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সময়ের সাথে নানা সংকট উত্তরণ করে বহু সময় ধরে উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়েছে। এই উন্নয়নে সমকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সামাজিক মাধ্যমসমূহ। অতীতে, সংগীত জগতে অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী এবং রেকর্ড লেবেলের আধিপত্য ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের উত্থানের সাথে সাথে, প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠাপ্রার্থী সকল শিল্পী নিজ শৈলী প্রদর্শন করতে এবং বৃহত্তর ভোক্তা শ্রেণীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি নতুন মঞ্চ খুঁজে পেয়েছে।

বাংলাদেশের সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের প্রধান সুবিধা হল এটি বৈশ্বিক মঞ্চের মতো স্থানীয় পর্যায়েও  সংগীতশিল্পীদের জন্য সীমিত অর্থে একটি স্বাধীন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক একক মঞ্চ প্রদান করে যার মাধ্যমে শিল্পীরা স্থানিক ভোক্তা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। একটি সম্পূর্ণ গান বা কম্পোজিশন তৈরি, প্রচার এবং বিপণন সর্বোপরি একে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য রেকর্ড কোম্পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এর ফলে অতীতের সংগীত তৈরি, প্রচার ও বিপণন কেন্দ্রিক ব্যয় এবং সময়সাপেক্ষতা হ্রাস পেয়েছে বহুগুণে। এইসকল রেকর্ড কোম্পানির বদলে ইউটিউব, ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যমসমূহ কোনও মধ্যবর্তী গোষ্ঠী বা ব্যক্তি ছাড়াই সংগীতশিল্পীদের তাদের সংগীত শৈলী প্রচার করতে এবং ভোক্তার সাথে সরাসরি জড়িত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশের সংগীত জগত একটি বড় সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তা হল পাইরেসি। সামাজিক মাধ্যমসমূহের বেশ কিছু চ্যানেল বা পেজ ব্যবহারকারী শিল্পীর অনুমতি ছাড়াই সংগীতকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রচার করছে। এতে শিল্পীর আর্থিকদিক এবং রেকর্ড কোম্পানিগুলোর বিপণনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যা শিল্পী এবং রেকর্ড লেবেলের জন্য উল্লেখযোগ্যহারে রাজস্ব ক্ষতির কারণ। শক্ত কোনো আইন এবং এর প্রয়োগ না থাকায় এই অপরাধ প্রবণতা থেকে বের হচ্ছে না অপরাধীরা কাজেই সম্পূর্ণ শিল্প একটি অচলায়তনে ঢুকে পড়ছে।

সামাজিক মাধ্যম যে সংগীত শিল্পের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে তা এই মাধ্যমসমূহের উপকারিতা ও অপকারিতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। সামাজিক মাধ্যম শিল্পীর জন্য সুবিধা এবং অসুবিধা উভয় পথই উন্মুক্ত করে দেয়। একদিকে, এটি নবীন ও প্রবীন শিল্পীদের জন্য তাদের শৈলী প্রদর্শন করে বিশালসংখ্যক দর্শক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে এবং প্রথাগত সংগীত বিপণন ব্যবস্থাকে ভেঙে স্বাধীন একটি পথ নির্মান করেছে (Lim,Werner,2014, p.06) অন্যদিকে শিল্পীদের মানসিক চাপ, উদ্বিগ্নতা, অনলাইন হয়রানি সহ নিরন্তর উপস্থিতির চাপে ফেলে তাঁদের প্রতিভাকে নিঃশেষ করছে। এই সবকিছুই সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব। মরিনো’র মতে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে শিল্পী এবং কলাকুশলীবৃন্দ কৌশলী আচরণ করলেই এর ক্ষতিকর দিকগুলোকে প্রশমিত করে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। (Moreno, J. E. (2019) এই গবেষণাপত্র খুব ক্ষুদ্রার্থে একটি প্রয়াস যেই প্রয়াসে সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলো। কিন্তু এই বিষয়ে নিরন্তর অধ্যাবসায়, অনুধাবন এবং পরবর্তী নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে সংগীত শিল্পে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে বীক্ষণ করা যেতে পারে। তাহলেই এক অভাবনীয় পন্থায় নতুন যুগে সংগীতের মুক্তি সম্ভব।

সহায়ক গ্রন্থাবলী

১। Moreno, J. E. (2019). The rise of social media and its impact on the music

   industry. International Journal of Humanities, Art and Social Studies

   (IJHAS), 4(2), 20-26.

২। Lim, J., & Werner, A. (2014). Music in the digital age: The emergence of

   digital music and its impact on the music industry. International Journal of

   Business and Social Science, 5(10), 15-23.

৩। Taylor, M., Petric, K., & Taillon, D. (2019). The effect of social media on the

   music industry: A study of artists and fans. International Journal of

   Humanities, Art and Social Studies (IJHAS), 4(2), 11-19.

৪। North, A. C., & Hargreaves, D. J. (2018). The social and applied psychology

    of music. Oxford University Press.

৫। Moreno, J. E. (2019). The rise of social media and its impact on the music

    industry. International Journal of Humanities, Art and Social Studies

    (IJHAS), 4(2), 20-26.

৬। Morton, K. (2019). Music, social media, and mental health: A review.

    Frontiers in Psychology, 10, 2682. https://www.frontiersin.org/articles/

৭। IFPI. (n.d.). Industry data. Retrieved April 3, 2023, from