সংগীত-ভাবুক রবীন্দ্রনাথ : ‘সঙ্গীতচিন্তা’র আলোয়-ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য

Abstract

This paper examines Rabindranath Tagore’s philosophy of music in the light of his essays and letters, particularly those collected in Sangit-Chinta. It traces the evolution of Tagore’s musical thought from his early belief that music serves primarily as a vehicle for expressing poetic emotion to his mature understanding of the autonomous aesthetic power of melody. Through a close reading of his essays such as Sangeet o Bhab, Bangla Shabda o Chhanda, Gan Sambandhe, Sangeeter Mukti, and Amader Sangeet, along with selected letters, the study highlights the dynamic interplay between word (bani) and melody (sur) in his creative vision. The paper demonstrates how Tagore ultimately rejected the hierarchical opposition between poetry and music and instead articulated a philosophy of their organic unity. In his later years, this synthesis of lyric and tune became central to his artistic practice, embodying a distinctly Bengali cultural identity. The study argues that Tagore’s mature songs represent not merely musical compositions but a profound aesthetic realization in which poetic language and melodic structure achieve a unified, transcendental expression.


Keywords

Rabindranath Tagore; Sangit-Chinta; Bengali music aesthetics; Word and melody; Bani and Sur; Philosophy of music; Rabindra Sangeet; Cultural identity; Musical evolution; Aesthetic synthesis.

কবি অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের সংগীত সাধনার ফলশ্রুতিকে গানের গান অভিধায় চিহ্নিত করেছেন। আমরা জানি, গানকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত সৃষ্টিশীল জীবনের রূপকতায় বারবার বর্ণনা করেছেন। কৈশোর থেকে প্রাণের সন্ধ্যা ও রাত্রি পর্যন্ত কবির দীর্ঘ পথ চলার কাহিনী গানের বাঁশিতে বেজেছে, গানের কথার আলোয় জ্বলেছে। কবি নিজেও বিশ্বাস করতেন গানই তাঁর বাণীর প্রতীক যা অবিরাম সুরে ছন্দে ধ্বনিত হয়েছে। ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, “গান আমার প্রাণের সঙ্গে পৃথিবীর সেতু।”[1] (ছিন্নপত্র/ বিশ্বভারতী)

গান তাঁর প্রত্যয় ও প্রত্যাশা। গীতসাধনার মধ্য দিয়ে তিনি তপস্যা করেন চিরমনুষ্যত্বের, চিরসত্যের, চিরপ্রেম ও সৌন্দর্যের। রবীন্দ্র-সংগীতচিন্তার একটি প্রধান সূত্র হল গানের চোখে ভুবনকে দেখলে তাকে সত্য করে চেনা যায়। এই যে গানের চোখে বিশ্বভুবনকে দেখা, কবি জানতেন, তা’ অনাদিকালের সত্য। কেননা, মানুষের এই দেখবার চোখ তৈরী হয়েছে মর্ত্যলোকের আদিকাল থেকে। রবীন্দ্র-সংগীতসাধনাতেও যে মন্ত্রটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে তাকে কবি অমিয় চক্রবর্তী বলছেন জন্ম মৃত্যু পার হয়ে এই অসীম বিশ্বসৃষ্টিকে জানবার জন্য অভিযাত্রা।

রবীন্দ্রনাথ নিজের অন্তর্লীন বীণার তন্ত্রীকে গান শোনবার ও শোনাবার কাজে লাগিয়েছেন। কৈশোর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কখনো বলেছেন- গান তাঁর শেষ পারানির কড়ি; সমস্ত জীবনের সুখ-দুঃখকে গানের সুরে গেঁথে নেবেন। জীবনের কাছে তাঁর একমাত্র প্রার্থনা- মৃত্যু হতে যেন জেগে ওঠেন গানের নতুন সুরলোকে। আবার এ কথাও বলেছেন- এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার মুহূর্তে হাওয়ায় হাওয়ায় জড়িয়ে থাকুক হৃদয়ের রঙ, গানে গানেই প্রাণের বাঁধন কাটিয়ে দেখা দিক মুক্তি।

রবীন্দ্রনাথের সংগীত চেতনার বৈচিত্র্য আমাদের মননকে অনুভব ও ভাবনার এমন একটা জগতে নিয়ে আসে যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় পরিবেশের পার্থক্যে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি গান অভিনবত্বের বিশিষ্ট। অর্থাৎ, একই গান প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে নতুনতর উজ্জ্বলতায় দেখা দেয়। আবার এই গানগুলিকে পর্যায়ক্রমে সাজালে রাগরাগিণীর অনন্যস্বরূপও কথার সঙ্গে গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে।

‘সঙ্গীতচিন্তা’ গ্রন্থে আমরা এই ইঙ্গিত পেয়েছি-  যার ওপরে গুরুত্ব দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, ধূর্জটিপ্রসাদ, অতুলপ্রসাদ, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দিলীপ কুমার রায় প্রমুখ সংগীতরসজ্ঞ পণ্ডিতবর্গ। রবীন্দ্রনাথের গানে কোনোখানে কথা ও সংগীতে মাধুরীর ছেদ নেই। দূয়ের মিলনেই সমগ্র গানের স্বকীয়তা। কিন্তু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কবি নিজে চাইতেন সুরের সঙ্গে সঙ্গে কাব্যের দিক থেকেও গানের বিচার। যাঁরা গানের বিচারে শুধু সুরকেই প্রাধান্য দিতে চান, কথা চিত্রকে উপেক্ষা করেন, সংগীতভাবুক রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সঙ্গে একমত নন। তিনি বারবার জানাতে চেয়েছেন শুধু কথার ভাব অনুসারেই গানগুলিকে ভাগ করলে সৃজনলোকের বহু বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়। কবির কাছে সমস্ত রূপলোকই তাঁর সংগীত।

কে একজন বেঁধে দিয়েছেন ধ্রুবপদ। সেই বিশ্বতানে জীবনকে মেলানোই, রবীন্দ্রনাথের মতে, সংগীতসাধকের কৃত্য। আকাশের নীলের সঙ্গে হোক মনের মিল, জীবনের উদয়াস্ত ভরে উঠুক নিত্যকালের সঙ্গীতে। কবি যে গান শোনাবেন-  সে গানের সুরের ধারা পাষাণ ভেঙে বয়ে যায়, বিশ্বভুবনের তারায় তারায় ছেয়ে থাকে, সুরের তরঙ্গ সৃষ্টির স্তরে স্তরে অনুরণিত হয়। কবি বলছেন- এই অনুরণন শুধু সুরের নয়, কথারও। কেননা, শেষ বিচারে একটি গানও প্রাথমিক রূপনির্মাণে একটি কবিতাই। আবার এ কথাও তো সত্য, কথা ভিন্ন কবিতার শরীর নির্মিত হতে পারে না। আর এই শরীর নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ যেসব কথা যুগিয়েছেন- তার গভীরে শুধু অর্থ নয়, এক প্রকার ব্যঞ্জনাও নিহিত ছিল।

প্রথমদিকের গান রচনায় কবি মুখ্যত হৃদয়ভাবপ্রকাশে মনোনিবেশ করেছেন এবং সংগীতকে তিনি গ্রহণ করেছেন বাণীর অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশের শ্রেষ্ঠ উপায় রূপে। মানুষ যখন কথা বলে তখন তাতে এমনিতেই সুরের কিছুটা ওঠানামা থাকে যা ভাব প্রকাশের সাহায্য করে। গানে এই সুরকে আরো সচেতন ভাবে ব্যবহার করে, আরও পরিশীলিত প্রয়োগে পূর্ণতররূপে প্রকাশ করা যায় এবং এইটিই সুরের একমাত্র কাজ বলে সে সময়ে তিনি মনে করেন। এই অবস্থান কবির বিশ বছর বয়স থেকে এক দশকেরও বেশি কাল অবধি, অর্থাৎ, ৩১ বছর বয়স পর্যন্ত ছিল। ২০ বছর বয়সে তিনি ‘সংগীত ও ভাব’-এ (১২৮৮) বলছেন, “সংগীত মনোভাব প্রকাশের শ্রেষ্ঠতম উপায়মাত্র।”[2]

আবার ৩১ বছর বয়সে ‘বাংলা শব্দ ও ছন্দ'(১২৯৮) বলছেন, “গীত সুরের সাহায্যে প্রত্যেক কথাটিকে মনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট করিয়া দেয়। কথায় যে অভাব আছে সুর তাহা পূর্ণ করে।”[3]

আমরা লক্ষ্য করি যে কবির এই বক্তব্যে বাণীর প্রাধান্য গুরুত্ব পেয়েছিল এবং সুরের নিজস্ব ভাবরস সৃষ্টির ক্ষমতার তেমন কোনো স্বীকৃতি ছিল না। কিন্তু বিবর্তনের পথ পেয়ে ৫১ বছর বয়সে কবি আবার মত পরিবর্তন করেন। তখন তিনি বলছেন, “যে মতটিকে তখন এত স্পর্ধার সঙ্গে ব্যক্ত করিয়াছিলাম সে মতটি যে সত্য নয়, সে কথা আজ স্বীকার করিব। গীতকলার নিজেরই একটি বিশেষ প্রকৃতি ও বিশেষ কাজ আছে। গানে যখন কথা থাকে তখন কথার উচিৎ হয় না সেই সুযোগে গানকে ছাড়াইয়া যাওয়া, সেখানে সে গানেরই বাহনমাত্র। গান নিজের ঐশ্বর্যেই বড়, কাব্যের দাসত্ব সে কেন করিতে যাইবে ? বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানেই গানের আরম্ভ। যেখানে অনির্বচনীয় সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যাহা বলিতে পারেনা গান তাহাই বলে। এইজন্য গানের কথাগুলিতেও কথার উপদ্রব যতই কম থাকে ততই ভালো।”[4]

(গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ: ১৩১৯ খ্রীষ্টাব্দ)

সুরের মধ্যে দিয়ে অসীমের স্পন্দনের সঙ্গে মিলনের পথে কবি এখানে সুরকেই বাণীর উপরে স্থান দিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সংগীতদর্শনের পরিণতি এখানেই সম্পূর্ণ নয়। রবীন্দ্রনাথের গান যে কাব্যধনে ঋদ্ধ, সেই কাব্য নিজের মহিমা প্রতিষ্ঠিত না করে পারে না। তাছাড়া কবি-সুরকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ বাঙালী-ঐতিহ্যেরই শ্রেষ্ঠ ফসল ছিলেন- যে ঐতিহ্যে সুরকার ও কবি সম্মিলিত সত্তা হিসেবে বারে বারে প্রকাশিত হয়েছে। এই বাঙালীসত্তাকেই রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত নিজের মধ্যে পূর্ণভাবে আবিষ্কার করেন। তাঁর সংগীতভাবনায় বাণী ও সুরের মিলনের পূর্ণতায় অভিব্যক্ত হয় সংগীত-সংস্কৃতিতে বাঙালীর জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ। কবি এই প্রসঙ্গে ‘সঙ্গীতের মুক্তি’ প্রবন্ধে বলেন, “চৈতন্যের আবির্ভাবে বাংলাদেশে বৈষ্ণব ধর্ম যে হিল্লোল তুলিয়াছিল সে একটা শাস্ত্রছাড়া ব্যাপার। তাহাতে মানুষের মুক্তি পাওয়া চিত্ত ভক্তিরসের আবেগে আত্মপ্রকাশ করিতে ব্যাকুল হইল‌ সেই অবস্থায় মানুষ কেবল স্থাবরভাবে ভোগ করে না। সচলভাবে সৃষ্টি করে। এইজন্য সেদিন কাব্যে ও সঙ্গীতে বাঙালী আত্মপ্রকাশ করিতে বসিল।”[5]

এই বাঙালি আত্মপ্রকাশের চেতনায় আবার কবির সংগীতভাবনায় বিবর্তন এল। তিনি পুনরায় গানে বাণীর মর্যাদাকে নবরূপে অভিষিক্ত করলেন এবং আবার নতুনভাবে কথা ও সুরের মিলনতত্ত্ব প্রচার করলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর নিজের সংগীতে এই মিলনকে রূপ দেওয়াই তাঁর প্রধান সাধনা বলে সংকল্প করলেন।

৬০ বছর বয়সে কবি ‘আমাদের সঙ্গীত’ প্রবন্ধে, (১৩২৮ বঙ্গাব্দে) বলছেন, “বাংলাদেশে হৃদয়ভাবের স্বাভাবিক প্রকাশ সাহিত্যে। ‘গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি’- সে দেখতে পাচ্ছে সাহিত্যের মধুচক্র থেকে। বাণীর প্রতি বাঙালির অন্তরের টান; এইজন্যেই ভারতের মধ্যে এই প্রদেশেই বাণীর সাধনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। কিন্তু একা বাণীর মধ্যে তো মানুষের প্রকাশের পূর্ণতা হয় নারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  এই জন্য বাংলাদেশে সংগীতের স্বতন্ত্র পঙ্ ক্তি নয়, বাণীর পাশেই তার আসন। ………. আমার বিশ্বাস হয় বাংলাদেশে কাব্যের সহযোগে সঙ্গীতের যে বিশুদ্ধ বিকাশ হচ্ছে সে একটি অপরূপ জিনিস হয়ে উঠবে। তাতে রাগরাগিণীর প্রথাগত বিশুদ্ধতা থাকবে না, যেমন কীর্তনে তা নেই; অর্থাৎ গানের জাত রক্ষা হবে না, নিয়মের স্খলন হতে থাকবে, কেননা তাকে বাণীর দাবি মেনে চলতে হবে। কিন্তু এমনতর পরিণয়ে পরস্পরের মন যোগাবার জন্য উভয় পক্ষেরই নিজের জিদ কিছু না কিছু ছাড়লে মিলন সুন্দর হয় না। এই জন্য গানে বাণীকেও সুরের খাতিরে কিছু আপস করতে হয়,তাকে সুরের উপযোগী হতে হয়। যাইহোক, বাংলাদেশে এই এক জাতের কাব্যকলা ক্রমশ ব্যাপক হয়ে উঠবে বলে আমি মনে করি। অন্তত আমার নিজের কবিত্বের ইতিহাসে দেখতে পাই- গানরচনা, অর্থাৎ সংগীতের সঙ্গে বাণীর মিলন-সাধনই এখন আমার প্রধান সাধনা হয়ে উঠেছে।”

এরপরে এ প্রশ্নের কবির আর কোন সংশয় দ্বিধা ছিল না। জীবনের শেষ দুই দশকে কবির সংগীতচিন্তায় বারেবারেই বাঙালীর সৃজনশীল আত্মপ্রকাশের গৌরব অভিব্যক্ত হয়েছে। “গান সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশ আপনার গান আপনি গেয়েছে, কথাশিল্পের ও সুরশিল্পের মিলনে একটি অপরূপ শক্তি রূপ নিতে চাচ্ছে” এবং “….যে বাঙালী একদিন এই কীর্তনের মধ্যে, লোকসংগীতের মধ্যে বিশেষত্ব প্রকাশ করেছে সে আরো কিছু নতুন দেবে।” এই প্রেরণা কবিকে তাঁর নিজের সংগীতসৃষ্টির কাজে প্রাণিত করে যায়। তখন তিনি স্পষ্ট উপলব্ধি করেন বাঙালীর অন্তরে সুর ও কথা “পরস্পরকে চায়, সেই চাওয়ার মধ্যে যে প্রবল শক্তি আছে সেই শক্তিতেই সৃষ্টির প্রবর্তনা।”[6] “বাংলাদেশে আজ নতুন যুগের যখন ডাক পড়ল তখন সে হিন্দুস্তানী অন্তঃপুরে প্রাচীরের আড়ালে কূল রক্ষা করতে পারবে না- তখন সে জটিলতার শাসন উপেক্ষা করে যুগলমিলনের পথে সার্থকতা লাভ করবে। এ নিয়ে নিন্দে জাগবে, কিন্তু লজ্জা করলে চলবে না।”[7]

এ মিলনে অবশ্য কবি ছোটো-বড়র প্রশ্ন তোলেন না। শুধু বলেন,” কাউকেই বাদ দিতে পারিনে।”

অবশ্য একেবারে শেষ বয়সে এই ছোটো-বড়র প্রশ্নের একটি চূড়ান্ত দার্শনিক মীমাংসা কবি দিয়ে যান

৮ অক্টোবর ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত একটি পত্রে

” গানে কথা ও সুরের স্থান নিয়ে কিছুদিন তর্ক চলছে। আমি ওস্তাদ নই, আমার সহজ বুদ্ধিতে এই মনে হয় এ বিষয়টার তর্কের নয়; এ সৃষ্টির অধিকারগত, অর্থাৎ লীলার।…. সকলের ওপরওয়ালা হচ্ছে সৃষ্টির আনন্দ। সেই আনন্দ যখন রূপ নেয় তখন সেই রূপেই তার সত্যতার প্রমাণ হয়, আইনকর্তার দন্ডবিধিতে নয়…..। কথা ও সুরের মিলে যদি সম্পূর্ণ সৃষ্টি থাকে তবে সেটা হয়েছে বলেই তাদের আদর, সেই হওয়ার গৌরবেই সৃষ্টির গৌরব।….. এই পথে কথার ধারা একলা যাত্রা করে, সুরের ধারাও নিজের শাখা ধরে চলে, আবার সুর ও কথার স্রোত মিলেও যায়….. এদের মধ্যে যাঁরা কম্যুনাল বিচ্ছেদ প্রচার করেন (তাঁদের) নিরস্ত হতে অনুরোধ করি।…..

কথাও সুরকে বেগ দেয়, সুরও কথাকে বেগ দেয়, উভয়ের মধ্যে আদানপ্রদানের স্বাভাবিক সম্পর্ক আছে; রসসৃষ্টিতে এদের পরিণয়কে হেয় করতে হবে- আমার মতো মুক্তিকামী এটা সইতে পারে না।”[8]

এই ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ষাটোত্তীর্ণ, পরিণত বয়সের গানে কথা ও সুর উভয়ের অদ্বয় মিলনের যে ফসল ফলিয়েছেনরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  তার নান্দনিকতা বলে শেষ করার নয়।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের সাংগীতিকতা বিবর্তনের বহুমাত্রিক রূপরেখা ছুঁয়ে শেষ দুই দশকে সুর ও বাণীর পার্বতী-পরমেশ্বর মিলনের সার্থক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেখানে উভয়ের যুগল স্পন্দনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়েও ইন্দ্রিয়াতীত, অখণ্ড রসসৃষ্টিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই উপান্তজীবনের এই সংগীতসম্ভারেই রবীন্দ্রনাথকে আমরা শ্রেষ্ঠ গীতিকার রূপে আবিষ্কার করতে পারি।

আমাদের বাংলা আধুনিক গানে এই সামগ্রিক চেতনা নেই। কেবলমাত্র কলাবোধের দ্বারাই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব। শিল্পী পারেন, স্রষ্টা পারেন। কিন্তু, যখন শিল্পীর পরিমিতিবোধের অভাব ঘটে, তখন সার্থক সৃষ্টি না হয়ে অনাসৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ সেদিক থেকে সার্থক এবং পরিপূর্ণ স্রষ্টা। তাঁর উপান্তজীবনপর্বের গানে রীতিবদ্ধতা ভেঙে ফেলার মধ্যে দিয়ে বার বার তিনি সমগ্রের একটি আভাসকেই তুলে আনতে চান তাঁর এক একটি ক্ষুদ্রাবয়ব গানে। আর সেখানেই সংগীতকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন অবদান।

সংগীত সম্পর্কে তাঁর অনন্ত ঋদ্ধির প্রকাশ পাই তরুণ বয়সে ইন্দিরা দেবীকে লেখা একটি চিঠির বক্তব্যের সারাৎসারে।

শিলাইদহ থেকে তিনি লিখছেন, “সংগীতের মতো এমন আশ্চর্য ইন্দ্রজালবিদ্যা জগতে আর কিছুই নেই……..।[9]

গান প্রভৃতি কতকগুলি জিনিস আছে যা মানুষকে এই কথা বলে যে ‘তোমরা জগতের সকল জিনিসকে যতই পরিষ্কার বুদ্ধিগম্য করতে চেষ্টা কর-না কেন এর আসল জিনিসটাই অনির্বচনীয়’ এবং তারই সঙ্গে আমাদের মর্মের মর্মান্তিক যোগ-  তারই জন্যে আমাদের এত দুঃখ, এত সুখ, এত ব্যাকুলতা।”[10]

(ইন্দিরা দেবী কে লিখিত চিঠি / ২০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫ / শিলাইদহ থেকে। ছিন্নপত্র/ বিশ্বভারতী)।

তথ্যসূত্র


  1. [1] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্র, বিশ্বভারতী, ইন্দিরা দেবীকে লিখিত পত্র।
  1. [2] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা, সংগীত ভাব”, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ।
  1. [3] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,বাংলা শব্দ ছন্দ”, ১২৯৮ বঙ্গাব্দ।
  1. [4] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,, “গান সম্বন্ধে”, ১৩১৯ খ্রীষ্টাব্দ।
  1. [5] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  “সঙ্গীতের মুক্তি
  1. [6] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা, আমাদের সঙ্গীত”, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ।
  1. [7] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  সংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ (উত্তরকালীন রচনা)
  1. [8] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা, একই প্রবন্ধ/সংগীতচিন্তাপর্ব।
  1. [9] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত পত্র, অক্টোবর ১৯৩৭।
  1. [10] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গীত চিন্তা,  ইন্দিরা দেবীকে লিখিত পত্র, ২০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫, ছিন্নপত্র, বিশ্বভারতী।