ড স্বপ্নদীপা গান্ধী
সারসংক্ষেপ :
বর্ধমান প্রাচীন ঐতিহাসিক জেলা, যার ধর্ম , সাহিত্যচর্চা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, বাণিজ্য রীতি ইত্যাদি নানান দিকে সমৃদ্ধ। ১৮ শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বর্ধমানের সংগীত চর্চার ইতিহাসে শাক্ত ও বৈষ্ণব সংগীত থেকে শুরু করে লোকসংগীত রচনা করারও সূত্র পাওয়া গেছে এই সংগীত ঐতিহ্য বর্ধমানের সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
সূচক শব্দ :
বর্ধমান জেলা, সংগীত, সংগীত রচয়িতা, সমাজ
ভুমিকা:
বর্ধমান জেলা পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাচীন ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল, যার ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই জেলার নাম ও ঐতিহ্য জৈন, হিন্দু ও আর্য সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গঠিত। শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস, শাক্ত সাধনা, নদীবাণিজ্য ও বৈষ্ণব চর্চার কেন্দ্রস্থল হওয়ায় কালনা, কাটোয়া, মঙ্গলকোট প্রভৃতি স্থানগুলি ধর্ম ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বহন করে। মধ্যযুগ থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত এই অঞ্চলে বাংলা সাহিত্যের বহু খ্যাতিমান কবি ও লেখক জন্মগ্রহণ করেন, যাঁদের মধ্যে মালাধর বসু, কমলাকান্ত, দাশরথী রায় উল্লেখযোগ্য। সংগীতের ক্ষেত্রেও বর্ধমান ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ—রঘুনাথ রায়ের খেয়াল গান থেকে শুরু করে লোকজ বোলান গান সবই এখানকার ঐতিহ্যের অংশ। উচ্চাঙ্গ সংগীত ও লোকসংগীতের অপূর্ব মিশ্রণে বর্ধমান এক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র হিসেবে বাঙালি মননে চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছে।
বর্ধমানের ইতিহাস শুরু খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সন তথা মেসোলিথিক বা প্রস্তর যুগের অন্তিম সময় । মহাভারতে সেই অর্থে বর্ধমানের কোন পরিচয় না পাওয়া গেলেও মারকন্ডেও পুরান , স্কন্ধ পুরান ,বৃহৎসংহিতা , প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ধমান জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রন্থাবলী থেকে জানা যায় , অজয় নদীর দক্ষিণে শিলাবতীর উত্তরে গঙ্গার পশ্চিমে এবং দারিকেশির পূর্বে একটি অতি সুন্দর সাধারণ ভোগ্য ভূ – ভাগের কথা বলা হয়েছে এই ভূভাগের নাম বর্ধমান এই ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে দামোদর নদ প্রবাহিত পূর্ব পশ্চিমে আরো বেশ কিছু নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ধমানের উল্লেখ আছে
সেই সময় বর্ধমানের সীমানা :
সেই সময় বীরভূমের দাক্ষিণ্যাংশ মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি আর বর্ধমান জেলার মধ্য অংশ জুড়ে ছিল এর সীমানা
বর্ধমানের কিছু প্রসিদ্ধ স্থান :
কাটোয়া
১৫১১ খ্রিস্টাব্দ কেশব ভারতীর নিকট শ্রীচৈতন্যদেব সন্ন্যাস দীক্ষা গ্রহণ করায় কাটোয়া পঞ্চ বৈষ্ণব তীর্থের মধ্যে অন্যতম তীর্থরূপে পরিগণিত হয় । এরপর বহু সাধক ও সাহিত্যিকদের বাসস্থান হয়ে উঠেছিল কাটোয়া । এবং এই অঞ্চলের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
অম্বিকা কালনা
বর্ধমান জেলার পূর্বাংশে অবস্থিত কালনা মহকুমার সদর শহর অম্বিকা কালনা । একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু স্থান । পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকে এই স্থানটি আমবুয়া বা অম্বুয় মুলুক নামে উল্লিখিত হয়েছে । । নগরদেবী মহিষ্মর্দিনীর নামানুসারে দুর্গার পরিবর্তে অম্বিকা শব্দ টি প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয় ।
কুলীন গ্রাম
হাওড়া বর্ধমান কর্ড লাইনের জো গ্রাম এর নিকটবর্তী একটি প্রসিদ্ধ অঞ্চল হল কুলীন গ্রাম
বর্ধমান এর এই কুলিন গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুপ্রসিদ্ধ লেখক মালাধর বসুর নাম ।
তিনি “শ্রীকৃষ্ণবিজয়” রচনার জন্য গৌরেশ্বরের কাছ থেকে ” গুনরাজখান” উপাধি পান ।
বর্ধমানের সংস্কৃতি চর্চা :
বর্ধিষ্ণু ও সমৃদ্ধ অঞ্চল এই বর্ধমানে বহু প্রাচীন কাল থেকেই সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ধারা অব্যাহত।
ষোড়শ শতাব্দী তথা চৈতন্য যুগের বেশ কিছু মনীষীদের জন্মস্থান হল এই বর্ধমান জেলা। এদের মধ্যে গোবিন্দদাস ,বৃন্দাবন দাস ,কৃষ্ণ দাস কবিরাজ , মালাধর বসু ,জ্ঞানদাস, রঘুনাথ শিরোমনি ,
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী , প্রমুখ নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য । এরা সাহিত্য , ব্যাকরণ ,দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিজ
পাণ্ডিত্যের পরিচয় রেখে গেছেন । পরবর্তীকালেও বর্ধমান জেলায় বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে ।
সপ্তদশ শতকের ম নীষীরা :
কেতোকাচাঁদ খ্যামানন্দ ইনি সপ্তদশ শতাব্দীতে মনসামঙ্গল রচনা করেছিলেন
তার রচিত মনসামঙ্গল তৎকালীন সময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
অষ্টাদশ শতকের মনীষীরা
রামকমল কবিভূষণ :
ইনি মহারাজ তেজচন্দ্রের জীবনী অবলম্বন করে সংস্কৃত নাটক রচনা করেছিলেন । (১ )
রূপমঞ্জুরি :
রূপ মঞ্জুরী নামে এক মহিলা পন্ডিতের উল্লেখ পাওয়া যায়
যার নিজস্ব চতুষ্পাঠি ছিল । তিনি সারা জীবন অধ্যাপনার কার্যে ব্রুতি ছিলেন
উনিশ শতকের মনীষীরা :
অলংকার শাস্ত্রী পন্ডিত কৃষ্ণমোহন বিদ্যাভূষণ সংস্কৃত গ্রন্থকার রাধাকান্ত বাচস্পতি আউসগ্রাম নিবাসী হটি তর্কালঙ্কার তার নিজস্ব টোল, চতুষ্পাঠি ছিল ,
বিখ্যাত লেখক দুর্গাদাস লাহিড়ী যিনি বেদের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার জন্মস্থান ও হলো বর্ধমানের পূর্বস্থলী থানার চক বামন গড়িয়া।
বিখ্যাত সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি “বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস” রচনা করেছিলেন তার জন্মস্থান কাটোয়ায়।
বর্ধমানের সংগীত শিল্পীদের প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি রঘুনাথ রায় ।
রঘুনাথ রায়
বাংলায় চারতুকের খেয়ালের রচয়িতা রঘুনাথ রায় (১৭৫০ – ১৮৩৬ ) । রঘুনাথ রায়ের জন্মস্থান হল এই বর্ধমানের পূর্বস্থলীর নিকটবর্তী চুপি গ্রাম ।
রঘুনাথ রায় খেয়াল গায়ক অপেক্ষা চারতুক বা কলির বাংলা গান রচয়িতা হিসেবে অধিক জনপ্রিয় হয়েছিলেন। অনুমান করা যায় যে তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন কেননা উচ্চাঙ্গ সংগীতের পাঠ না থাকলে বাংলা চার তুকের গান রচনা করা সহজসাধ্য নয়। রঘুনাথ কে বাংলা খেয়াল গানের রচয়িতা বলে উল্লেখ করেছেন স্বনামধন্য কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় (২ ) ।
তার রচনা আর বিষয়বস্তুতে শাক্ত ও বৈষ্ণব দুটি ধারাই লক্ষ্য করা যায় এমন যুগোপত সমন্বয় বাংলায় বিরল বললেই চলে ।
রঘুনাথ রায়ের সংগীত শিক্ষা হয়েছিল তার পিতা ও তার বড় ভাইয়ের কাছে তিনি তার পিতার মতোই বর্ধমান রাজচন্দ্রের দেওয়ান ছিলেন। তার সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ দেখে বর্ধমান রাজ তাকে একাধিক পশ্চিমা ওস্তাদের কাছে সংগীত শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। দুর্গাদাস লাহিড়ীর সম্পাদিত “বাঙালির গান “গ্রন্থে রঘুনাথ রায়ের ৯৯ টি বাংলা গান সংকলিত হয়েছে । তিনি তার গানের ভনিতায় অকিঞ্চন ব্যবহার করতেন বলে তাকে অকিঞ্চন রঘুনাথ রায় বলা হত । তার রচিত গানের দুটি উদাহরণ দেওয়া হলো …
রাগ : বেহাগ
তাল: একতালা
ওকি হেরি গো জলদবরণ পীত বসনে সখি
তড়িত তো মিলন শ্যামল মৃদু মৃদু হাসি বাজাইছে বাঁশি
কি বা না চাইছে নয়নও খঞ্জন
কহে অকিঞ্চলে শ্রী রাধার ভাবজ্ঞানে
তুমি শ্যামের শ্যাম তোমার অঙ্গের ভুষণ
তুমি আর নটবর , নাহি ভেদ পরস্পর গোকুলে সকলে জানে হে গোপন ।।
রাগ: ইমন কল্যাণ
তাল : একতালা
হর উরোপরে কেবিহরে ললনা , তিমীর বরনা দিকবসনা
করেকরবাল বালশশী শোভে শিরে
লোলরসনা অতি বিস্তৃত বদনা
অসংখ্য দনুযদল সমূলে বিনাশ হলো
শনিত হিল্লোলে মহি প্রায় যে মগনা
মম হৃদি পদ্মাসনে বিশ্রাম লহ শ্যামা
অকিঞ্চন দীনের এই একান্ত কামনা ।।
।
সাধক কমলাকান্ত
বাঙালির ধর্মচর্চায় শক্তি পূজা বা মাতৃ পূজার এক বিশিষ্ট স্থান রয়েছে বহু মাতৃসাধক সাধনার অঙ্গ হিসাবে রচনা করেছেন এবং গেয়েছেন মাতৃসঙ্গীত যা শাক্তপদাবলী নামে সাহিত্যে স্থান লাভ করেছে।
সাধারণ্যে যেগুলি উমা সংগীত , শ্যামাসঙ্গীত নামে প্রচলিত । যাদের রচিত শ্যামা সংগীত এখনো বাঙালির হৃদয়ে ভরিয়ে রেখেছে তাদের মধ্যে রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য ,রামদুলাল নন্দী, দাশরথি রায় , ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের অবদান অনস্বীকার্য ।
এদের মধ্যে সাধক কমলাকান্ত ছিলেন বর্ধমান জেলার মানুষ । তিনি শতাধিক ভক্তিগীতি রচনা করেছিলেন আগমনী ও বিজয়া পদে তিনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তার জন্ম ১৭৬৯ সালে বর্ধমানের অম্বিকা কালনায় তার মামার বাড়িতে। কমলাকান্তের কালি ভক্তির কথা অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে এবং তার রচিত শ্যামা সংগীত জন সমাদর লাভ করে। বর্ধমান রাজ তেজচাঁদ মহতাব সঙ্গীতপ্রেমী ছিলেন ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে কালনার রাজদরবারে আয়োজিত এক জলসায় কমলাকান্ত সংগীত পরিবেশন করেছিলেন যেগুলির মধ্যে ছিল “আদর করে হ্রদে রাখো আদরিনী শ্যামা মাকে” ( ৪) । পরবর্তী বর্ধমান রাজ মহতাব চাঁদ ( রাজত্বকাল ১৮৩২ – ১৮৭৯ ) তার উদ্যোগে কমলাকান্ত রচিত গীতি সমূহের সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম প্রকাশনায় শিব , কৃষ্ণ , চৈতন্য সম্পর্কিত ২৪ টি, উমা সম্পর্কিত ৩২ টি , শ্যামা সংগীত ২১৩ টি সর্বসাকুল্যে ২৬৯ টি কাব্যগীতি মুদ্রিত হয়েছিল । তার গানের একটি উদাহরণ দেওয়া হলো…….
আনন্দময়ী মাগো
আনন্দময়ী মাগো
সদানন্দে হাসো তুমি,
আলোয় কভু দাও না ধরা
আঁধারে মা আসো তুমি।
বাহিরে তোমায় দেখে
বজ্রপ্রাণা সবাই কহে,
নামেই তুমি মা ভয়ংকরী
প্রাণে স্নেহের গঙ্গা বহে,
অ-শিবেরে দমন করে মা
জীবের দুঃখ নাশো তুমি।
এই যে দেহ কে বলে মা
অষ্টধাতু দিয়ে গড়া,
এ পরণে জানি মাগো
তোমার নামের মন্ত্র ভরা,
আনন্দসায়র মাঝে মা
হৃদকমলে ভাসো তুমি।
দাশরথী রায়
দাশরথী রায় (১৮০৬ – ১৮৫৭) ছিলেন উনি শতকের একজন বিশিষ্ট কবি ও পাঁচালিকার তার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার বাঁধমুড়া গ্রামে, গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি তার মামার কাছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শেখেন ১৮৩৬ সালে নিজস্ব আখড়া গঠন করেন ও পাঁচালী রচনায় মনোনিবেশ করেন দাশরথি রায়ের পাঁচালীতে যমক ও অনুপ্রাস অলংকার এর ব্যবহার দেখা যায় তিনি রামায়ণ-মহাভারত শ্রীমদ্ভাগবত হরিবংশ , ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ, রাধা তন্ত্র , চৈতন্য চরিতামৃত ইত্যাদি ধর্মীয় কাহিনী পাঁচালীর ছন্দে রচনা করেছেন এছাড়া বিধবা বিবাহ ও সমকালীন সামাজিক ঘটনাবলিও তার পাঁচালীর বিষয়বস্তু ছিল। তার রচিত পাঁচালী বিভিন্ন খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে ” দাশরথী রায়ের পাঁচালী”” তার এই বইটা ১৮৪০ পৃষ্ঠার একটি বিরাট সংস্করণ যা বর্তমানে ইন্টারনেট আর্কাইভ এ পাওয়া যায়।
দাশরথি রায়ের সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। তার পাঁচালী গুলি গ্রাম বাংলার বিভিন্ন স্থানে খুব অল্প হলেও এখনো শোনা যায়, যা তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের প্রমাণ। তার রচিত কিছু গানের উদাহরণ দেয়া হলো
রাধার দর্পচূর্ণ:
রাগ : খাম্বাজ
তাল : কাওয়ালি।
যার অনন্ত গুণ বেদেতে বর্ণন
দেন অনন্ত শিরেতে চরণ
অনন্ত রূপেতে শিরে ধরণী ধারণ
না পায় অন্ত প্রজাপতি সুরকান্ত
উমাকান্ত ভ্রান্ত ভেবে ও চরণ
যার মায়াতে মোহিত সনকাদি তপবন
হই মহিত মহিতে করে ভ্রমণ
রাধার দর্প হরিবারে মায়া-ময় মায়া করে
করেছেন অপূর্ব পুরী মুকুতা কারণ ।।
বোলান গান
প্রায় দু থেকে আড়াইশো বছর পুরনো বাংলার লোকসংগীত এর একটি ধারা হল বোলান। এই গীতধারা মুর্শিদাবাদ, নদীয়া , বর্ধমানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রচলিত ছিল , যা ক্রমশ ই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
‘ বোলান ” কথাটির আভিধানিক অর্থ সম্ভাষণ বা প্রবচন * ।
মতান্তরে “বুলা বা ভ্রমণ ” থেকেও বোলান গানের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন একদল লোক গবেষক।
বর্ধমান মহারাজার আনুকুল্যে বর্ধমানের বিভিন্ন স্থানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলায় তুর্কি আক্রমণের পর থেকেই শিবের গাজন উপলক্ষে বোলান গাওয়া হয় । বোলান গান মূলত তিন প্রকার
১. দাড় বোলান বা ডাক বোলান
২. পাতা বোলান পোড়ো বোলান বা শ্মশান বোলান
৩. ছল বোলান
দাড় বোলান
এই জাতীয় বোলান শিল্পীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ,ঘুরে ঘুরে , নিজে নিজে গান পরিবেশন করেন বলেই তাকে দাঁড় বোলান বলা হয় । সামাজিক ও পৌরাণিক দুই ধরনের বিষয় নিয়ে এই ধরনের গান রচনা করা হয়। এই বোলান এ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হাত ঢোল , নাল , ফ্লুট ,কর্ণাট বাজানো হয়। এই বোলানের শুরুতে একজন বিষয়বস্তুটি বর্ণনা করে দেন একে “বই বলা” বলে। গুরু বন্দনা দিয়ে গান শুরু হয়। প্রথম সারিতে দু – তিনজন গায়ক থাকেন যাদের মূল গায়ক বা মুন্দুরী বলা হয় । আর পেছনের শাড়িতে ৮ – ১০ জন দুয়ারী থাকেন। মূল গায়ক একটি অংশ গাইবার পর দুয়ারীরা সেটি আবার পুনরাবৃত্তি করে। এইভাবে দু-তিন কলির একটি দাঁড় বোলান ৪৫ মিনিট থেকে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পরিবেশন করা হয়। বোলান শেষে পাঁচালী গাওয়ার রীতি আছে যাকে চলিত ভাষায় “রং পাঁচালী ” বলা হয়। একটি উদাহরন দেওয়া হলো ।
ধুয়ো: ফিরকি কোথায় যাই ভেবে তো পাইনা
লাজে মরি দেখে কান্ডকারখানা
১ । হিন্দু : পন্ডিত ব্যক্তি আমি ব্রাহ্মণ সন্তান
মুসলমান : আমি হলাম একজন খাস মুসলমান
হিন্দুমান: হিন্দুর হিন্দু আমি মুসলমানের মান হিন্দু মান নিয়েছি আমার নামখানা
২. হিন্দু : মুসলমান জাতটা যে বদেরধারী
মুসলমান : শয়তান শালা তোমরা টিকিধারী
হিন্দুমান : মিছে করছো তোমরা মারামারি টিকি দাড়ি রেখে ঢং করো না
৩. হিন্দু : মীরজাফরের জাত যে জানি তোরা
মুসলমান : জগত সেট রায় দুর্লভ বল তো কারা
হিন্দুমান : সবাই মিলে করছিস দেশটা ছাড়া পরিণাম কি হবে ভেবে দেখেছিস না
৪ . হিন্দু : মসজিদ যত আছে করব সারা
মুসলমান : রাখতে পারবি নাকি মন্দির তোরা
হিন্দুমান : ভুলের ফাঁদেতে পা দিসনা তোরা ধর্মে আঘাত দিয়ে ধর্ম হয় না
৫. হিন্দু : পুরো ঘাটা আমার বেদ আর পুরান
মুসলমান : বাকি নাই পড়তে মোর কেতাব কোরান
হিন্দু মান : মানুষের কল্যাণ সর্বস্বাস্থ্যের বিধান মূর্খ কেন তোরা সেটা বুঝিস না
৬. হিন্দু : ঠ্যাঙাবো তোকে যে আচ্ছা করে
মুসলমান : ঘুরিয়ে দেব এবার চেতন ধরে
হিন্দুমান : মরছিস তোরা মারামারি করে ফায়দা তুলেছে কারা ভেবে দেখছিস না।
৭. হিন্দু : অন্তর্যামী কৃষ্ণ হন ভগবান
মুসলমান : মোহাম্মদ রাসুল আল্লাহ মেহেরবান
হিন্দু মান : একই ঈশ্বরের হয় আলাদা নাম মসজিদের রামকৃষ্ণ তাই করেন সাধনা
৮. হিন্দু : গঙ্গাচান করতে হয় তোদের ছোলে
মুসলমান : ছাওয়া মাড়াই না তোদের কাফের বলে
হিন্দু মান : যবন হরিদাস যে দীক্ষা নিলে চৈতন্যদেব তাকে করেননি ঘৃণা
৯. হিন্দু : পাঁচালী গানেতে স্বপন বলে
মুসলমান : বজ্জাতিরা যাদের জুয়া খেলে
হিন্দু মান : উপরে তাদের মূলে চুলে ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ করো না।
১০. হিন্দু : পাঁচালী এইখানে সাঙ্গ করি
মুসলমান : বেশি ভালো নয় গো বাড়াবাড়ি
হিন্দু মান : গোসাই গ্রামে হয় যে মোদের বাড়ি দিয়ে গেলাম তাদের ঠিকানা
পাতাবোলান
দাড়বোলানের আঙ্গিকে এই বোলানটি গীত হয়। এর বিষয়বস্তু মূলত পৌরাণিক । অনুমান করা যায় পৌরাণিক শব্দটি থেকে
পোড়ো বোলান শব্দটি এসেছে। লক্ষণের শক্তিশেল , সীতা হরণ , হরিশচন্দ্রের শ্মশান মিলন, রাবণ বধ , স্বর্গের পারিজাত হরণ ,অন্ধ মনির সিন্ধু বধ , রাজা দুষ্মন্ত কথা এই জাতীয় বিষয়বস্তু অবলম্বন করে এই গান বাধা হয়। মূলত পুরুষ শিল্পীরাই সমবেতভাবে সংগীত পরিবেশন করেন। চরিত্র অনুযায়ী তারা পোশাক পরেন মুখ আঁকেন ।এই বোলানে আসর পেতে গীত পরিবেশন করা হয় বলে অনেকে একে পাতা বোলান ও বলে। বোলান গাইবার সময় কুশীলবদের হাতে মরার মাথা ( খুলি) , ত্রিশূল, তলোয়ার, আরো কিছু অস্ত্রশস্ত্র থাকে । শিল্পীরা কোমরে, পায়ে ঘুঙুর পরিধান করেন , পালার শেষের দিকে গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন তারা। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সমগ্র পালাতে ঢাক বাজে ।
ছল বোলান
এই ধারাটি একসময় বহুল প্রচলিত থাকলেও এখন এটি প্রায় লুপ্ত । এই আঙ্গিকটি শিশু শিল্পীদের দ্বারা গীত হয়। পৌরাণিক ও সামাজিক দুই ধরনের বিষয় নিয়ে গান রচনা হয়, এবং বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢাকের চল আছে ।
মূলত কৃষক , ক্ষেতমজুর শ্রেণীর মানুষরাই এই গানের শিল্পী হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজনের দিনে সন্ধ্যেবেলা থেকে পাশাপাশি গ্রামগুলোতে শুরু হয় বোলান গান । সারা রাত ধরে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে পালাচলে পরের দিন দুপুর অবধি। আধুনিকতার চাপে বোলান গানে হিন্দি এবং আধুনিক বাংলা গানের সুরের মিশ্রণ ঘটলেও আগে বোলান গান শোনা যেত গ্রাম বাংলার মেঠোসুর । লোক সংগীত সমাজের দর্পণ বলা যায় পণপ্রথা বধূ নির্যাতন ধর্মের নামে ভেদাভেদের মত সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি খরা বন্যা মহামারী ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেউ কেন্দ্র করে গান বাধা হয়। এমনকি কারগিলের যুদ্ধ করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনের প্রসঙ্গেও বোলান গান বাধা হয়েছে।
যুগে যুগে নারী
১। গণপতি গজাননে ডাকি সাদরে
সর্বদেবের আগে পূজি ঠাকুর তোমারে ।
আসর মাঝে এস নেমে কর কৃপায় নিজ গুনে
ভক্তি, অর্ঘ্য ছাড়া নাই কিছু সনে,
ডাকি তাই ওগো বারে বারে ।।
২। বাগবাদিনী বীণাপাণি তুমি সুরধনী
কন্ঠে বসে বলাও মাগো সুমধুর বানী
দাও মাগো পদছায়া অধমজনে করো দয়া
এটাই হবে পরম পাওয়া দেখা দেয় জননী
মা …… ওগো মা …… ।।
৩ । বন্দনার গান অল্পে সারি গেয়ে যাবো বিষয় ধরি
দশের চরণ শিরে ধরি আশীষ দেবেন গো মাথায়
সবাই মিলে গেয়ে যাবো যেমন বলবে গলায় ।।
৪। মাতৃরূপিনি শক্তিরুপিনী ভক্তিরূপিনি নারী
আ ………. আ……….. আ……….. আ…………
সত্যযুগের মহীয়সী সত্যনারায়নী
দুর্বাসার অভিশাপে আসলেন মর্তভূমি।।
৫। দানের দক্ষিণার তরে স্ত্রী পুত্র বিক্রি হয়
শৈবা নারীর করুন কথা জানি গো সবাই
ফুল তুলিতে গিয়ে রহির সর্প দংশন হল
মরা ছেলে কোলে নিয়ে কি করে বল
শ্মশানে নিয়ে গেলে মুনি জল ছিটায়
শৈবার ত্যাগে রবিতাস্য প্রাণ ফিরে পায় ।।
৬ । রামঘরণী সীতা দেবী ক্রেতা যুগে উদয় হল
সীতাহরণ করতে এসে লঙ্কার রাবণ ধ্বংস হলো
৭ । কৃষ্ণের শক্তি রাধারানী দাপরের আয়ান ঘরণী
পাগলিনি রাই কলঙ্কিনী বলে বিনোদিনী ।।
৮। জাতের বেড়া ভাঙতে গোরাঙ্গ
কলিতে এলেন এই মহাকাজে
বিষ্ণুপ্রিয়া গো, পাশে দাঁড়ালেন ।।
২
১। সতী বেহুলার কথা জানি গো সবাই
মৃত স্বামীর প্রাণ ফিরে পেতে তার কঠিন লড়াই
পচা গলা স্বামীর পাশে গাঙ্গুরের জল ভাসে
দেবতাদের এনে বসে স্বামীর জীবন যে বাঁচায়।।
২। সত্যবানের কথা আমরা সকলেতে জানি
কাঠ কাটতে বনে গিয়ে গেল জীবন হানি
দাও স্বামীর জীবন ফিরে যমের পিছু নাহি ছাড়ে
সাবিত্রীকে একবরে শত পুত্রের জননী।।
মা ……………… মা ………………..
৩। দুর্গে দুর্গতিনাশিনী মাগো অসুরদলনী
মহিষাসুর মর্দিনী মাগো শক্তি স্বরূপীনি
স্বর্গলোকের অধিকারে অসুরকুলের লড়াই
সেই অসুরদের বিনাশ করে দেবী দুর্গা হয় ।।
৪। বিদ্যাসাগর দয়ার সাগর হয়েছিলেন জানি
ভগবতী দেবীর মতো পেয়ে যে জননী
আ…………….. আ……………………
গরীব দুঃখীর দুঃখে কাতর ছিলেন তিনি সদাই
এমন মা তো এই জগতে পাওয়া বড় দায়
আসল দেবী তাহার কাছে তাহার মা জননী ।।
৫ । ঘরে ঘরে বিরাজ করে কত লক্ষী নারী ভাই
কত নারী চোখের জলে দিন যে কাটায়
দশভূজার মত তারা সংসারের হাল ধরে
স্বামী পুত্র কন্যার জন্য জীবন পাত করে
বঞ্চনার স্বীকার তবু এ নারীরা হায় ।।
৬। মাদার টেরিজার কথা ভুলতে কি আমরা পারি সুস্থ রোগীর সেবাই দিলে সব কিছুকে উজাড় করি।।
৭। প্রীতিলতা মাতঙ্গিনী স্বাধীনতার নারী সেনানি
স্বপন লিখে এই বোলান খানি তৃপ্তি হয়নি।।
৮। বই বলায় গো দেবেন মালখানা।
চন্দন দাস ঢোল বাজায় গোসাই হয় ঠিকানা।।
রচনা : স্বপন রায়
রচনাকাল : ১৪৩০ (২০২৪) । (৬)
নৌকাবিলাস
এসো মা গো বীণাপাণি বলাও তুমি মধুর বাণী
মা এসো মা করি মা করি সাধনা
অধমের আঁধারে মাগো করো করুণা
তোমার চরণ ছাড়া মাগো কিছু চাহিনা
মা এসো মা …. মিটাও বাসনা
২
জ্বালো গো মা জ্ঞানের আলো , গেলো যে মা বেলা যে গেলো
আমরা অধম ছেলে , কোলে নাও গো মা তুলে পুদিব মাগো চরণ মোরা শত দলে
কেমনে হবে মাগো সাধন ,
জ্বালো মা তুমি ….. গেলো ..
৩
গাহিব আজ এখানে শুনুন জ্ঞানী জনে
ভাবে আর ভাষাতে ভরা মোদের গানে
নৌকাবিলাস বিষয় হবে গো অভিনয়
ধৈর্য্য ধরে শুনুন শুনুন সবে মহাশয়
গানে আছে গো রসে ভরা
মধু পাবে যে ভ্রমরা
বলে যাবো যে যতনে
গাহিবো… ….. গানে
৪
কিশোরী যত সখি গনে, সুখেতে মাঝে বৃন্দাবনে
আশা করে সখীরা সাজায় যে পশরা
যাবো বলে মথুরা , দুগ্ধ ছানা সব কেমনে
চাকিয়া রেখেছে যতনে
কিশোরী…… বৃন্দাবনে….
৫
হেলে দুলে চলে তারা , পিছু ফিরে চাহেনা
গীদের যে ধরেনা, কোনো বাধা মানেনা
কোনো বাধা মানেনা
হেলে ……… চাহেনা
আছে দুগ্ধ ছানা হবে বেচা কেনা
হবে বেচা কেনা ….
৬
ও সখীরা যায় , যায় ঘাটে
ও রাধা , যায় সাথে
কোথায় আছে মাঝি ভরা ডাকিছে সবাই
ভাঙ্গা তরী তনয় মাঝি , তখন দেখা দেয়
মাঝি কয় যে তুকানে
পারি দেবো কেমনে
ও সখীরা যায় ……. সাথে …… (৭)
সম্প্রীতি
১। এসো মা তুমি বসো হৃদয় মাঝারে
কাতর স্বরে তাই ডাকি মাগো বারে বারে
জ্বালো মাগো জ্ঞানের আলো
ঘোচাও মাগো আধার কালো
শ্রীচরণ তলে ঠাই দিও মোরে
নিবেদন তব মুখ রেখো এ আসরে ।।
২। এসো মা গো মহামায়া এসো হরজায়া
মায়ার মায়া বুঝতে পারি দাও হে পদ ছায়া
জগত জননী তুমি শক্তিরূপে সনাতনী
গুণ আশ্রয় গুণময়ী করো মাগো দয়া ।।
৩। দেব দেবী আছেন যত মোরা চরণে শির করি নত
তব পদে মতি মোদের মাগো থাকে যেন গো
সদাই রইল প্রণাম গুরুজনে দেবেন আশীষ মাথায়
ভাই ভগ্নি দ্বারা সুতে শুভেচ্ছা যে জানাই ।।
৪। বন্দনার গান শেষ করিলাম
সংক্ষেপে যা হল
মিটলো না সাধভক্তি অগাধ
আরো বলার ছিল।।
আ …. আ … আ…….. আ….
সম্প্রীতি হয় বোলান খানি গাইবো এই আসরে
শুনবেন সবে ধৈর্য ধরে একটু দয়া করে
মার্জনা করিবেন যেন এই নিবেদন রইল ।।
৫ । ভারতবাসী বলতে মোদের গর্ভে বুকটা উঠে ফুলে
জন্ম যেন হয় বারেবার মরণ যেন তোমার কোলে।।
৬। হিন্দু বৌদ্ধ জৈন খৃষ্টান শিখ পাঞ্জাবি আর
মুসলমান দেশের জয়গান গাইয়া উচ্চস্বরে মোরা এক সুরে
৭। নানান ভাষা নানান মত গো নানান পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান ।।
২
১। একি অপরূপ সাজে সেজে আছো ভারত মা
বেশভূষা কেড়ে উলঙ্গ করো না
পাহাড়-পর্বত নদী নালা মন্দির মসজিদ
শিল্পকলা বৌদ্ধমঠ গির্জাতে যায় শোনা।
সকল ধর্মের সেথা চলে উপাসনা।।
২। বলে গেছেন বাংলার কবি কাজী নজরুল
এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
মসজিদের রামকৃষ্ণ দেখলেন যে কালীকৃষ্ণ
তিনি তো বোঝালেন মোদের এক ই ঈশ্বর
মা… ওগো মা … মা ওগো মা..
৩
মথুরায় শ্যাম চিকন কালা , ব্রজোধামে করেন লাল
মদিনাতে খেলেন রসূল , জানি জানি গো ইমান খেলা
চড়ান ধেনু ব্রজের রাখাল, মেষ পালে আরব দুলাল
দুই অবতার মানব হিতে মেলালেন গো …
৪
বেদ আর পুরান কেতাব কোরান
সার কথা যা বলে
একই কথা আছে লেখা
যীশু খ্রীষ্টের বাইবেলে
আ……. আ………..
বুদ্ধদেবের ত্রিপিটকে আছে সৎ চিন্তার কথা
গুরু নানকের গ্রন্থ সাহেব মানুষের মঙ্গল গাঁথা
মিলন বানী দোহা খানি কবির যেটা লিখেছিলেন
৫
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নদীয়াতে হলেন উদয়
তার কাছেতে নিলেন দীক্ষা যবন হরিদাস যে তথায়
৬
রামানন্দ আর মীরাবাঈ
শিখিয়েছেন জানি সদাই
সমান সবাই কিবা হিন্দু মুসলমান
নামদেব তাই গান
৭
লালন ফকির শেখালেন গো মোদের গানে গানে
গর কথা জাতের কেমন রূপ , দেখিনা নয়নে
৩
খেলছে জুয়া জাতের নামে এই জালিয়াতি সহেনা আর প্রাণে
ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ হলে দেশ যাবে রসাতলে
জাতির উত্থান হয় ঐক্যের বলে একথা বলেন জ্ঞানীগুণী মহাজনে
২
কিশোর মান্না লতার গান , যায়না যেমন ভোলা
মহম্মদ রফিকের কন্ঠে মন করে উতলা
কাজী অনুরুদ্ধের গিটার তবলা বাজনা আল্লারাক্ষার
মন মাতালো সানাই সুরে জানি গো বিসমিল্লা
লা…… লালা …. লা…….
৫
ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করতে দেশের স্বাধীনতা পেতে,
কত প্রাণ হলো বলি , ওগো তার ঠিকানা নাই
তখন তো ছিল না জানি জাতেরকোন বালাই
চালিয়েছিল একই সাথে কি নিদারুণ লড়াই
অসুখ করলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়
জীবন দিলে মুসলিম ডাক্তার জাত কি চলে যায়
আ …………. আ……….
থাকবে নাকো জাত টা লেখা রক্তের বোতলে
জান ফিরে পায় সেই রক্তে গ্রুপে মিলিলে
নেয়না হিসাব রক্ত দাতা কার শরীরে যায়
স্বপন বলে দেশটা সবার রক্ষা কর সবাই মিলে
বিভেদ লাগিয়ে দিচ্ছে যারা খেদাও তাদের দলে দলে
কাজল কুমার বইটা বলায় , বোলানে তার নেশা বেজায়
দেবেন গলায় গাঁথা ফুলের মালা
সাঙ্গ পালা গো
ফুর্তি করে ঢোল বাজায় গো পরেশ দাস সলে
গোসাই মোদের হয় বাড়ি গো
জানাই তাহা বলে (৮)
দু আড়াইশো বছরের পুরনো এই গীত রীতি বোলানেও সময়ের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে এসেছে বিবর্তন। আগে পৌরাণিক পালার ব্যবহার বেশি হলেও এখন তা ক্রমশ কমে আসছে। যাত্রা পালার মতো দর্শকদের মনোরঞ্জনের স্বার্থে এতে সামাজিক পালাই বেশি গাওয়া হয়। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে যে আগে যেখানে মহিলাদের চরিত্রে পুরুষরাই অভিনয় করতেন এখন সেখানেই মহিলারা অভিনয় এসেছেন।
বোলান গান হারিয়ে যাবার এক অন্যতম কারণ হলো প্রাচীন পালাকারদের রচনা ঠিকভাবে লিপিবদ্ধ না হওয়া। বোলান শিল্পীদের দান সংরক্ষণের অভাবে আজ লুপ্ত প্রায় এমন কি পালাকারদের গুরু শিষ্য পরম্পরার কোন ইতিহাস সেই ভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না এছাড়া এ যুগের গ্রামীণ লোকশিল্পীরা তাদের রচনা সংরক্ষণ করে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেননা বলে গানগুলি সংকলনের দিকে তারা ততটা গুরুত্ব দেননা
বলা বাহুল্য পুরনো গান হারিয়ে যাবার এটা একটা কারণ আবার একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে বোলান শিল্পীরা সেই অর্থে কোন রাজা বা জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন না মূলত কৃষক শ্রেণীর মানুষেরাই বোলান গানের শিল্পী হতেন সেকালে বছরে একবারই ধান চাষ হতো ফলে বাকি অবসর সময়টা তারা মনের আনন্দে গান বাঁধতেন ।
কিন্তু এখন মানুষের অবসর সময় সংক্ষিপ্ত হয়ে আসার দরুন নতুন গান বাঁধবার সময় কমে গেছে বোলান সমবেত লোকগানের একটি ধারা বলা চলে। প্রগতির গতির চাপে গ্রামাঞ্চলের মানুষও কর্মব্যস্ত একসঙ্গে আনন্দ সহযোগে সৃজনশীল কাজে ব্রতী হওয়ার মতো মানসিকতা এখনকার শিল্পীদের মধ্যে নেই
আঠারো উনিশ শতকে সাধক কমলাকান্ত বা পাঁচালিকার দাশুরায় , দেওয়ান রঘুনাথ রায়ের মত একান্ত নিভৃতে সাধনার দৃষ্টান্ত আজ বিরল এমনকি বোলান গানে প্রাচীন পদকর্তাদের মত কথা ও সুর সংযোজন একালে আর চোখে পড়ে না। সেকালের সংগীত চর্চার সঙ্গে একালের পার্থক্য এখানেই। সাধনা নিষ্ঠা ধৈর্য ও সময়ের অভাবে আর রঘুনাথ কমলাকান্ত দাশরথী রায়ের জন্ম হয়নি।
কালের গতিতে তাদের অমর সৃষ্টি আজ ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে ভাবি প্রজন্মের দায়িত্ব বর্তায় আমাদের হারিয়ে যাওয়া সংগীত সংস্কৃতির ধারা কে পুনরুদ্ধার করা।
তথ্যসূত্র :
১. সেন অনুকূলচন্দ্র ও চৌধুরী নারায়ণ , বর্ধন পরিচিতি, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ, পৃষ্ঠা : ২৫৪
২. মুখোপাধ্যায় দিলীপকুমার, বাঙালির রাগসংগীত চর্চা , ফার্মা কে এল, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা : ৬৭
৩. লাহিড়ী দুর্গাদাস ,বাঙালির গান , বঙ্গবাসী ইলেকট্রো মেশিন প্রেস , ১৯০৫ , পৃষ্ঠা: ১২৫ -১৩৮
৪. চট্টোপাধ্যায় উদয় ,”সাধক কবি কমলাকান্ত, পরবাস পত্রিকা ,সংখ্যা : ৭২ ,২০১৮ সেপ্টেম্বর
৫. রায় দাশরথী , দাশরথি রায়ের পাঁচালী , রাধার দর্পচূর্ণ, বঙ্গবাসী স্টিম মেশিন প্রেস , ১৯০১ , পৃষ্ঠা : ২২৫
৬. স্বপন রায়ের একান্ত ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার , ২৬/১২/২০২৫
৭. তদেব ………………….
৮. তদেব…………………..