গানের রবীন্দ্রনাথ: বিবর্তনের ধারায় – ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য
Abstract
This paper explores the concept of poetic sensibility and romantic imagination through the theoretical formulations of William Wordsworth and its resonances in Bengali literary thought, particularly in the works of Rabindranath Tagore. Wordsworth’s seminal ideas expressed in Lyrical Ballads—especially his definition of the poet as “a man speaking to men”—redefine poetic creativity as an intensified form of human sensibility and emotional responsiveness. The study further examines critical interpretations of Romantic imagination by scholars such as Andrew Welsh and Herbert Read, highlighting notions of depth, emotional overflow, and “Romantic Extravagance.”
In parallel, the paper analyses Tagore’s reflective prose and lyrical expressions to demonstrate how Romantic ideals are reinterpreted within the Bengali cultural and philosophical milieu. Through textual comparison and critical reflection, the study reveals a shared emphasis on heightened perception, emotional authenticity, and the transcendental dimension of poetic experience. Ultimately, it argues that Romantic poetic consciousness is not confined to a historical movement but represents a universal aesthetic and psychological condition that bridges Western and Indian literary traditions.
Key Words
Romanticism; Poetic Sensibility; Imagination; Emotional Overflow; William Wordsworth; Rabindranath Tagore; Romantic Extravagance; Bengali Literary Thought; Comparative Aesthetics; Lyric Consciousness.
ওয়র্ডসওয়র্থ Lyrical Ballads-এর মুখবন্ধে লিখেছিলেন গীতধর্মিতা এবং রোম্যান্টিক প্রবণতার মধ্যে গুঢ় গভীর সম্বন্ধ আছে। তিনি নিজে একই সঙ্গে গীতধর্মী ও রোম্যান্টিক। তিনি আবার এ কথাও বলেছেন, গীতধর্মী কবি যে ভাষায় কবিতা অথবা গান রচনা করেন সে ভাষাও তাঁর একার নয় সব মানুষের ভাষা। তাঁর নিজের কথাই উদ্ধৃত করছি। “…..a poet is a man speaking to men..”।
(Lyrical Ballads. William Wordsworth)
কিন্তু ওয়র্ডসওয়র্থ নিজে তাঁর কবিতায় গানে মানুষের ভাষার কাছাকাছি এসেছেন জীবনের অন্তিম পর্বে। প্রথম পর্বগুলিতে, তাঁরই স্বীকৃতি অনুসারে, তিনি রোম্যান্টিক আবেগের উচ্ছ্বাসে মেঘখণ্ডের মতো আকাশে আকাশে ভেসেছেন মাত্র। রোম্যান্টিক লিরিক কবিদের ক্ষেত্রে একথা বোধ করি সত্য– অন্তত, সৃষ্টির প্রথম পর্বগুলিতে তো বটেই। কেউ কেউ এই আবেগের উচ্ছ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে জীবন ও জগতের কাছাকাছি এসে তাঁদের গানে ও সুরে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারেন, কেউ কেউ পারেন না। প্রসঙ্গত আবার ওয়র্ডসওয়র্থের কথা বলি। একজন গীতিকবি মাটির কাছাকাছি এসেও “….is more sensitive and more imaginative than most men”
(Lyrical Ballads. William Wordsworth),
এবং এখানেই তিনি স্বমহিমায় স্বতন্ত্র।
ওয়র্ডসওয়র্থ এই স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছেন জীবনের শেষ দশ বছরে। এই দশ বছরের, তাঁর কবিতা ও গান, গভীর মনোনিবেশে পড়লে বোঝা যায় কবির ব্যবহৃত প্রত্যেকটি শব্দ অতি পরিচিত, অতি সাধারণ। একটিও নতুন শব্দ তিনি সৃষ্টি করেননি। অথচ প্রত্যেকটি শব্দ যে কি গভীর অর্থবহ! তা সাধারণের চেতনা ও কল্পনাকে বহু দূরে ছাড়িয়ে যায়। পরিণত বয়সে রচিত তাঁর রুথ (Ruth) কবিতাটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘রুথ’ কবিতার যে যে অংশে ক্যারোলিন মার্বল সুর দিয়েছিলেন- সেগুলি সম্পর্কে অ্যান্ড্রু ওয়েলস্ ‘Roots of Lyric’ গ্রন্থে বলেছেন- শব্দগুলি বিচিত্র রঙে ডানা মেলে কেমন পাখির মতো শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল। আশ্চর্য! একটি শব্দও আমাদের অজানা নয়। অচেনা নয়। তিনি লিখেছেন,
“… You get in beyond your depth, and beyond his depth.” কথার গভীরে গভীরতম ভাবকে বহন করার বিস্ময়কর ক্ষমতা অর্জনই, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ওয়র্ডসওয়র্থ এবং রবীন্দ্রনাথের মতো মহান গীতিকবিদের অনুধ্যানের বিষয়।
কিন্তু এই গভীর ধ্যানমগ্নতা এই দুই মহাকবির ক্ষেত্রেই এসেছে জীবনের শেষ পর্বে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে বলা যায়, তাঁর জীবনের প্রথম প্রায় চার দশকে যেমন কবিতায়, তেমনি গানে রোম্যান্টিক আতিশয্য (হার্বার্ট রীড-এর ভাষায় Romantic Extravagance)ছিল। যদিও এই রোম্যান্টিক আতিশয্য বা অমিতচারিতা কখনো পীড়াদায়ক হয়ে ওঠেনি। পীড়াদায়ক হয়নি,কারণ- কবির শব্দচয়নের বিস্ময়কর সুকৃতি। আমরা তো এ কথা জানি গীতিকবি রবীন্দ্রনাথেরও উত্তরাধিকারের ঐশ্বর্য সঞ্চিত ছিল। এই ঐশ্বর্যের উৎস বাংলা ভাষার আদি গীতিকবি ‘ভোরের পাখি’ বিহারীলাল চক্রবর্তী, স্বভাবকবি অক্ষয় চৌধুরী, প্রেম ও বিরহের কবি অক্ষয় কুমার বড়াল এবং কবির বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই চারজনের মধ্যে প্রথমজনের প্রভাব গীতিকবি রবীন্দ্রনাথের কৈশোরে ও যৌবনে সর্বাধিক। দার্শনিক কবি দ্বিজেন্দ্রনাথ ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ রচনা করে রবীন্দ্রনাথকে ভাবিয়েছেন কিন্তু রোম্যান্টিক অনুভবের শিহরণ সঞ্চারিত করতে পারেননি। আমরা যদি এই চার দশকে রবীন্দ্রনাথের গানের বিচার-বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, অধিকাংশ গানেই কথা ও ছবি, চিত্রকল্প ও ভাবকল্প রোম্যান্টিক অনুপ্রেরণায় যতটা উচ্ছ্বসিত, ততটা উদ্দীপিত নয়। অর্থাৎ আলোকায়ন স্পষ্ট নয়। অনেক সময় অন্ধকার যেন গায়ে লেগে আছে। গীতিকবি বিহারীলাল ভাবের অপরিমেয় ঐশ্বর্য নিয়েও প্রথম রোম্যান্টিক ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেক-এর মতো এই ঐশ্বর্যকে সত্যার্থে কোন শিল্পরূপ দিতে পারেননি। ফলত, তাঁর গভীর ভাবও লঘু চপল শব্দপ্রয়োগে লঘুতর হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এমন বিপর্যয় ঘটেনি। তার কারণ এক ধরনের পরিমিতিবোধ রবীন্দ্রনাথ আয়ত্ত করেছিলেন ইংরেজি রোম্যান্টিক কাব্য এবং তারও আগের ইওরোপের সুদীর্ঘ রেনেসাঁস পর্বের চিত্রশিল্পের মনোযোগী অনুশীলনে। স্মরণ করা উচিৎ ,লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় চিত্রকর ছিলেন। তাছাড়া আরও একটি কথা স্মরণীয়। একটি সাংগীতিক ঐতিহ্যও রবীন্দ্রনাথকে বালক বয়সে পরিপুষ্ট করেছে। ঠাকুরবাড়ির বিস্তৃত আঙিনা যেমন মুখরিত হয়েছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সহ পরিবারের সদস্যদের কন্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতের বিচিত্র সুরে, তেমনি এখানে সমবেত হয়েছেন সেকালের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞরা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন যদুভট্ট, বিষ্ণু চক্রবর্তী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, মৌলাবক্স প্রমুখ গুণীবর্গ।
সব মিলিয়ে তাঁর এই পরিমিতিবোধ বিবর্তনের স্রোতে যে পরিণতিতে এসেছে, তাকে বলি প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞাসমৃদ্ধ কবি রবীন্দ্রনাথ, শেষ পর্বের, তাঁর যে কোনো সৃষ্টিতে এবং আমাদের আলোচ্য যে গান, সেখানেও শিল্পের বোধ করি চূড়ান্তে উত্তীর্ণ হয়েছেন। হয়তো এরপরে উত্তরণের আর জায়গাই থাকে না। রবীন্দ্রনাথের প্রজ্ঞানির্মিত এই চূড়ান্ত সার্থকতার মূল্যায়ণে আমরা পাব তাঁর জীবনের শেষ কুড়ি বছরের গানের সাধনা ও সিদ্ধির পরিচয়।
মূল্যায়ণের এই প্রসঙ্গে কবির সাংগীতিক চেতনার বিবর্তনের রূপরেখাটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রকাব্যের সঙ্গে যাঁদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, রবীন্দ্রসংগীতের পরিণতি ঘটেছিল রবীন্দ্রকাব্যের বেশ কিছু আগে। এর কারণ মনে হয়, আমাদের দেশে সংগীতে যে ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্য ছিল, কাব্যে তা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের শৈশবে জোড়াসাঁকোর আসর মুখর হয়েছিল একাধিক বিখ্যাত গায়কের কন্ঠে (মৌলাবক্স, যদুভট্ট, বিষ্ণু চক্রবর্তী, রাধিকাপ্রসাদ প্রমুখ)। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ উচ্চাঙ্গসংগীতের একজন মনোযোগী ছাত্র ছিলেন। তিনি রাগরাগিণী পিয়ানোতে বাজাতেন এবং সুরের মিশ্রণ ও বিস্তার নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা করতেন। রবীন্দ্রনাথকে বালক বয়স থেকেই সেই সব পরীক্ষায় সহায়তা করতে হত উপযুক্ত কথা যোগান দিয়ে। বলা বাহুল্য, বাড়ির আবহাওয়ায় ছিল সংযত স্বাধীনতা ও সুগম্ভীর শুদ্ধ ভাব… যেটির ধ্রুপদের অনুকূল। তাই উচ্চাঙ্গসংগীতের মধ্যে ধ্রুপদের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ। একথাও বলা চলে যে- গানের ভুবনে রবীন্দ্রনাথের জন্ম এবং বড় হয়ে ওঠা। কিন্তু তখনকার দিনে অগ্রজ এমন কোনো কবি ছিলেন না, যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রাণমন হরণ করতে পেরেছিলেন। মধুসূদন এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা, তাঁর কাব্যরচনার পরিপ্রেক্ষিত বা ক্ষেত্র একেবারে স্বতন্ত্র। বিহারীলালের প্রভাব নগণ্য না হলেও তিনি রবীন্দ্রনাথকে দীর্ঘস্থায়ী উজ্জ্বল কোনো দিগন্তে উত্তীর্ণ করে দিতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলায় দ্বিজেন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’। আশ্চর্য এর কবিত্ব ও মৌলিকত্ব। কিন্তু ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ও রবীন্দ্রনাথকে খুব বেশি উদ্দীপিত করতে পারেনি। এ রচনা তাঁকে বিস্মিত করেছিল কিন্তু প্রভাবিত করতে পারেনি। কবি রবীন্দ্রনাথকে তাঁর পথ তৈরি করে নিতে হয়েছে তাঁর নিজেরই চেষ্টায়। এই জন্যেই একেবারে প্রথম বয়সের গানগুলিতেও আমরা বিস্ময়কর সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, যার তুলনায়, নিছক কবিতা হিসেবে এই রচনাগুলি খুব উল্লেখযোগ্য নয়। ‘সরোজিনী’ নাটকের চূড়ান্ত মুহূর্তে (ক্লাইম্যাক্স) রাজপুত নারীর চিতাপ্রবেশের উপযুক্ত উদ্দীপক আবহ রচনা করতে বসে নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন গদ্যসংলাপে নিশ্চিন্ত ছিলেন, কিশোর রবি কেমন করে যেন বুঝেছিলেন মৌহূর্তিক ওই নাটকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাধারণ গদ্যসংলাপের বাইরে নতুন কিছুকে আনতে হবে। তাই গদ্যে বক্তৃতা নয়, এই আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে অপরিহার্য ভূমিকা নেবে ছন্দ, সুর। তাই বাড়িতে যখন নাটকের প্রুফ দেখা হচ্ছে তখন গদ্যসংলাপের বিকল্প হিসেবে স্বতোৎসারিত ভাবে লিখে ফেললেন–
“জ্বল্ জ্বল্ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ
পরান সঁপিবে বিধবা বালা-“
বিশ্ববরেণ্য মহান সংগীতকারের প্রথম গানটির জন্ম হল
( সন ১২৮২ অগ্রহায়ণ), কবির বয়স তখন ১৪ বছর। গানের সাংগীতিক উৎকর্ষের বিচারে না গিয়েও আমরা বলতে পারি- এই গানটি রাগসংগীতের ঐতিহ্য-অনুসারী রচনা।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা যেতে পারে একাধিক রবীন্দ্রসংগীত-বিশেষজ্ঞ বিদগ্ধ ব্যক্তির কাছে শোনা গেছে যে আদিপর্বের রবীন্দ্রসংগীত ধ্রুপদী প্রভাবে আচ্ছন্ন। এ কথার যাথার্থ্য মেনে নিলেও সেটাই চূড়ান্ত সত্য কিনা বিবেচনাসাপেক্ষ। রবীন্দ্রসংগীতে ধ্রুপদী প্রভাব দিয়ে তর্ক উঠতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এ কথা উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু এই প্রভাব রবীন্দ্রসংগীতে কতটা বিস্তৃত হয়েছে রবীন্দ্র-সংগীতভাবনার বিশ্লেষণে তা বিচার্য। প্রথম বয়সের গানগুলির মধ্যে, বিশেষ করে ব্রহ্মসংগীতগুলি, ধ্রুপদী ঢঙ্ এর। কিন্তু অন্য গানগুলি? যাদের সংখ্যা কম নয়? ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে’, ‘নীরব রজনী দেখ মগ্ন জোছনায়’ ইত্যাদি গান– ধ্রুপদী প্রভাব কি সেখানে খুব বেশি আছে? ঠাকুরবাড়ির গানের আসর একদিন নিশ্চয়ই সরগরম হয়েছিল সেরা ধ্রুপদীয়াদের গানে। আর এই গানের গাম্ভীর্য অতি সহজে সঞ্চারিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অগ্রজদের রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতে। মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মসঙ্গীত রচনায় অন্তত তাঁদেরই অনুসরণ করেছিলেন।
কিন্তু এ হল বিরাট ও বিচিত্র ঠাকুরবাড়ির একটিমাত্র দৃশ্য। বাংলার যুগবিবর্তনের ইতিহাসে এই ঠাকুরবাড়ি ছিল প্রধান মঞ্চ। আর এই মঞ্চের অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিরাজ করতেন মহর্ষিদেব। বাংলাদেশের ধ্রুপদী গানের প্রবর্তনে রামমোহনের দান স্মরণীয়। রামমোহন-শিষ্য মহর্ষি যে ধ্রুপদী ঐতিহ্যের ধারক হবেন- তা তো স্বাভাবিক! কিন্তু বাংলাদেশের নতুন যুগের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, শিল্প ও সংগীত শুধু কি ধ্রুপদী মার্গেই অগ্রসর হয়েছিল? সেদিন উন্মুখ বাঙালীমনের দরজা খুলে গিয়েছিল। আর এই খোলা দরজা দিয়ে ঢুকেছিল ভারতীয় এবং বিদেশী সাহিত্য, শিল্প, সংগীতের বিচিত্র প্রবাহ। আরেকটি দৃশ্যের কথা মনে করা যাক। এই ঠাকুরবাড়িতেই অগ্রজেরা দিচ্ছেন নাটকের অভিনয় মহড়া, বালক রবীন্দ্রনাথের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। দূর থেকে তার কানে আসছে দু’চারটে গানের পদ। যেমন-
“ও কথা আর বোলোনা, আর বোলোনা
বলছ, বঁধু কিসের ঝোঁকে…..” ইত্যাদি ।
এ হলো ওই মঞ্চেরই আরেকটি দৃশ্য। এখানে মহর্ষি নেই। ধ্রুপদ নেই। তরুণ রবীন্দ্রনাথের উন্মুখ মনে এই অন্য প্রভাবও অস্বীকার করবার মতো নয়। তাছাড়া সেইসময়কার সাংগীতিক ক্ষেত্র টপ্পায় ঠুমরিতে বাউলে কীর্তনে নানাভাবে বিকশিত হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ উদারচিত্তে এই সবেরই নির্যাসটুকু গ্রহণ করেছিলেন।
এর কিছু পরের কথা। জোড়াসাঁকোর এক অলস দুপুর।আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। ‘জীবনস্মৃতি’তে কবি লিখছেন,
“একদিন মধ্যাহ্নে খুব মেঘ করিয়াছে। সেই মেঘলা দিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটা স্লেট লইয়া লিখিলাম “গহন-কুসুমকুঞ্জ-মাঝে”…..”–
(জীবনস্মৃতি/ বিশ্বভারতী)।
আমরা পেলাম ভানুসিংহের পদাবলী। মৈথিলী কবি বিদ্যাপতি, ব্রজবুলির পদকার গোবিন্দদাসের উত্তরসূরী বাঙালি পদকর্তা ভানুসিংহ ঠাকুর মাতলেন নতুন এই সৃষ্টির খেলায়। বাণীপ্রধান এই পদগুলি যদিও রাগাশ্রয়ী সুরেই বিন্যস্ত, তবুও রাধার ব্যাকুলতা প্রকাশে কীর্তনাঙ্গের ছাঁদ ব্যবহৃত হয়েছে, গানের মূল চলনে। ছন্দ-বৈচিত্র্যে উজ্জ্বল ‘শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা’ মল্লারের আধারে রচিত। ‘বজাও রে মোহন বাঁশি’কে পিলু-ঠুমরী চলনে নিবদ্ধ বন্দিশ বলাও হয়তো বাহুল্য হবে না।
এরপর রচিত হতে থাকলো একের পর এক গান। তাদের সকলেরই মূল ঐক্য ধরা রইল সুরের আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যে। কালোয়াতি গায়কীর প্রভাব এই গানগুলিতে খুবই বেশি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষানবিশির কাল এখন উত্তীর্ণ। আর তিনি সুরে কথা বসাচ্ছেন না। এখন তিনি কবি,- এবং সুরের প্রযোজকমাত্র। অবশ্য এরই মধ্যে কবি পাশ্চাত্যের সংগীতসম্পদ আহরণ করে রচনা করেছেন অপেরাধর্মী কালমৃগয়া, বাল্মিকীপ্রতিভা এবং পাশ্চাত্য সুরআশ্রয়ী কিছু গান। লিখছেন মায়ার খেলা। ভেঙে যাচ্ছে তাঁর গানে কালোয়াতি চলনের একরৈখিক প্রবণতা।
চিরাচরিত প্রথাকে নির্বিচারে দীর্ঘদিন মেনে চলার পক্ষপাতি তিনি ছিলেন না। ঐতিহ্যের অনুসারী হওয়ার পাশাপাশি নতুন ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন বারেবারেই। কিন্তু সে সময়ের অব্যবহিত পূর্বে নিধুবাবুর টপ্পা, বাউল, কীর্তনগানের প্রচলন সত্ত্বেও যেহেতু জনচিত্তের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রিত হতো আখড়াই, হাফ-আখড়াই বা বাইজি গানে, তাই সুস্থ সংস্কৃতির প্রভাব আনতে ক্লাসিক্যাল গান ছাড়া মুক্তির পথ ছিল না। রাগসংগীতকে আশ্রয় করেই তিনি তাই ব্যতিক্রমের পথ খুঁজেছেন। বিষয়টিকে বিশদ করা যেতে পারে।
এই সময়পর্বের একটি গান
‘সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি’ ( সন ১২৯৩, বয়স ২৫)
রাগিনী- ইমনকল্যাণ, তাল তেওড়া
হিন্দুস্থানী গানের ওস্তাদরা বলেন ইমনকল্যাণের রূপটি এখানে শুদ্ধ। অতএব গানটি ভালো। এখানে শুদ্ধতার অর্থ পুনরাবৃত্তি। যথাযোগ্যতার বিচার গৌণ। যদিও স্বীকার করতে হয় সে যুগে বেশিরভাগ গানেই সুর ছিল কবিতার উপযুক্ত। তবু যেন মনে হয়, কথা ও ভাবের উপযোগী না হলেও সুরটা যদি সেকালের সংগীতশ্রোতার মনে কোনো বিখ্যাত হিন্দুস্থানী বন্দিশ বা রাগবিস্তার স্মরণ করাতে সমর্থ হত, যদি সুরটা হুবহু তার নকল হত, তাহলেই শ্রোতা সন্তুষ্ট হতেন।
অতএব বাণী ও ভাবের উপযোগিতা দিয়ে এ যুগের গানকে যাচাই করা যায় না। অথচ উপযোগিতাই সংগীতরচনা ও রচয়িতার মূল্য নির্ধারণ করবে। রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনায় উপযোগিতার অর্থ কথা ও সুরের মধ্যে যে সম্বন্ধ আছে তাকে স্বীকার করা, তার প্রকৃতি উদঘাটিত করা এবং সেই প্রকৃতির রূপ দেওয়া তাছাড়া, কবিতার মূলভাবটির সঙ্গে আমাদের সংস্কারগত রাগিণীর মূল ভাবের মিলনসাধনকেও উপযোগিতা বলা যায়।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন। ধরা যাক, একটি কবিতায় মেঘলা দিনের বর্ণনা। তার মধ্যে মেঘ বিজলী ময়ূর গরজন ঘনঘটা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর কথা রয়েছে। আমাদের সংস্কারে মল্লারের সঙ্গে বর্ষার যোগ আছে। অতএব কবিতাটির প্রকৃষ্ট মিলন হবে মল্লারের সঙ্গেই। কিন্তু কবি বলছেন এই প্রকার মিলনসাধনের কোনো সাংগীতিক মূল্য নেই। কথা ও সুরের মধ্যে সম্বন্ধকে যথাযথ প্রকাশ করতে হলে তাদের মধ্যে গোটাকয়েক সন্ধিশর্ত থাকা চাই। সন্ধির শর্ত তৈরি করবার সময় মনে রাখতে হবে বাংলা কবিতার ভাষা,অর্থ ও ছন্দকে। বাংলাদেশের প্রচলিত গায়নপদ্ধতিকে। সন্ধি কখনও একতরফা বিধান নয়। পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদানেই তার বৈশিষ্ট্য। ওই যুগের রবীন্দ্রসংগীতে রাগরাগিণীর বিশুদ্ধ প্রয়োগ-প্রকরণ, তার রক্ষণশীলতা ও সংস্কার (Conservation and Convention) এবং বিদেশী সংগীতের হারমনিক্সের ব্যবহারকে পরিহার করা হল। ধ্রুপদী রীতির আলাপ বাঁট প্রভৃতি লয়কারী বর্জিত হল কাব্য সুষমা বিঘ্নিত হবার আশঙ্কায়। পরিবর্তে পাওয়া গেল সুরের মিশ্রণজাত নব সৃজন এবং বিষয়ের বৈচিত্র্য।
রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন এ বিষয়ে যে বাংলা ভাষার Breath Group ধ্রুপদী অলংকারের নিতান্তই অনুকূল। কিন্তু খেয়ালের প্রতিকূল। মীড় ও গমক স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের বিরামের উপযোগী। তাই আজীবন তিনি ধ্রুপদী বনেদের সৌকর্যকেই মুখ্যত অনুসরণ করলেন। এই ধ্রুপদী রীতির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গানে আর এক উপাদান যুক্ত হল লোকজ সুরের আশ্রয়ে ও পরিমিত প্রয়োগে।
রবীন্দ্র সংগীতের দীর্ঘায়ত সৃজন প্রক্রিয়ায় গভীর এবং অনতিক্রম্য প্রভাব রেখে গিয়েছে পদ্মা নদী এবং পদ্মাপারের জীবন ও প্রকৃতি। ৩০ বছর বয়সে পারিবারিক জমিদারি তদারকের ভার নিয়ে তাঁকে চলে আসতে হয়েছিল বাংলার শ্যামল মাটির কোলে। কখনো পদ্মার বুকে বোটে, কখনো পদ্মাপারে তাঁর দিনরাত্রি তখন ভরে উঠেছিল একই সঙ্গে নির্জন সজনের নিত্যসঙ্গমে। শিলাইদহ পতিসর শাহজাদপুরে প্রায় একটানা দশ বারো বছর কেটেছে কবির। এই প্রথম নিসর্গকে খুব কাছ থেকে ভালো করে চিনে নেবার অবকাশ হলো তাঁর। সেই সঙ্গে বাংলা গানের আবহমান লোকজ রীতির সঙ্গে তাঁর নব পরিচয় ঘটতে থাকলো। বাংলার কীর্তন বাউল ভাটিয়ালি সারি জারি গানের সহজ অথচ গভীর বাণী সুর ও ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কবি।
বাংলার এই লোকায়ত গানের প্রভাব আমরা সার্থকভাবে প্রতিবিম্বিত হতে দেখি রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গীতিগুচ্ছে। পল্লীবাংলার শান্ত ও শান্তিপ্রিয় লোকসাধারণকে স্বদেশচৈতন্যে উদ্দীপ্ত করবার জন্য আবহমান লোকসুরই হয়ে উঠেছিল শ্রেষ্ঠ উদ্দীপক।
কেবল স্বদেশ পর্যায়ের গানে নয়, কবির জীবনব্যাপী সংগীতরচনায় লোকায়ত বাউল কীর্তনের সুর নানা অনুষঙ্গে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে সদর্থকভাবে।
মধ্যবয়সে ‘গীতাঞ্জলি’র গভীরস্পর্শী কবিতায় যখন তিনি সুরযোজনা করেছেন, তখনও বাউল-কীর্তনের সুর অন্ত্যজ হয়ে থাকেনি, ভাবের নিবিড়তায় তাকে গ্রহণ করেছেন কবি। অবশ্য সংখ্যার বিচারে ‘গীতাঞ্জলি’তে লোকজ সুরের গান স্বল্প। সেখানে রাগাশ্রয়ী গানের প্রভাবই প্রামুখ্য পেয়েছে।
পরবর্তী অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথের সাংগীতিক চেতনা আরো বিবর্তিত ও পরিণত হয়েছে কথা ও সুরের যৌগ রসায়নে। শান্তিনিকেতনের উদার নিসর্গ, আশ্রমিক শান্তি ও সুস্থিতি, বিশ্বসংস্কৃতির ঢেউ, বিশ্বনাগরিকতার চেতনা, আত্মবোধের বিস্তার ও ব্যাপ্তি, ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্মিলিত বোধ কবির সমস্ত সৃজনকে যেমন বৈচিত্র্য, গাঢ়তা ও সমগ্রতা দিয়েছে, তার সংগীতকেও নিয়ে গেছে পরিণতির তীর্থযাত্রায়, সম্পূর্ণতার দিকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, বিদেশি সংগীত, প্রাদেশিক ভাঙা গানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং লোকসংগীত এই সমস্ত সাংগীতিক উপকরণ ও প্রভাবকে আত্মীকরণ করে কবির স্বতন্ত্র অথচ পরিপূর্ণ শৈল্পিক এক গীতিপ্রকরণ মেলে ধরলেন, যা বাঙালীর সাংগীতিক অভিজ্ঞানে এর আগে ছিল না। কথা ও সুরের মায়াময় যুগ্মতার রহস্যে ভরে উঠল অন্ত্যপর্বের রবীন্দ্র নাথের গান। এখন সুর এলো কেবল বাণীর সারথি হয়ে নয়, অবিভাজ্য দোসর হয়ে; যা প্রায় পরস্পরে প্রবিষ্ট ও সঞ্চরণশীল। এদের একের থেকে অপরকে সরিয়ে নিলে সৃজন অসম্পূর্ণ ও বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে।
বর্ষার গান–
বন্ধু রহো রহো সাথে
আজি এ সঘন শ্রাবণপ্রাতে–
এই গানের ভৈরবীর সুরটি বড়, নাকি টপ্পার অলঙ্করণগুলি প্রধান, অথবা কেবল বাণীরূপটি মুখ্য.. এমন প্রশ্ন আর আমাদের মনে আসে না। কাব্যরূপে প্রকাশিত এ গানটির একাকিত্বের বেদনা আমাদের মগ্ন করে। ভৈরবীর সজল স্পর্শে টপ্পার নিটোল দানায় গুমরে ওঠা কান্না আর বর্ষাবিষন্ন প্রাতের আবহটি যখন ইন্দ্রিয়ঘনত্ব পেয়ে যায়, তখনই সংগীতের পরিপূর্ণ অন্তঃস্বভাবকে খুঁজে পাই আমরা। বাণী ও সুরের এই অর্ধনারীশ্বরমূর্তি, এই আশ্চর্য সঙ্গতি রবীন্দ্রজীবনের শেষ পর্বের গানের বৈশিষ্ট্য।
গানের নির্মাণকে এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের জীবনের সেই প্রথম পর্বের গান ও আজকের এই শেষ পর্বের গানের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়ে গেছে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এই পার্থক্যের কারণগুলি বিশদে আলোচনা করা যেতে পারে।
এই পার্থক্য প্রধানত সুরের সৃষ্টিতে বা সুরের বৈচিত্রে নয়। রবীন্দ্রসংগীত-বিশেষজ্ঞের কাছে এই সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট যে- ভাব, ভাবনা ও কথায় নিঃসন্দেহে এই মৌলিক পার্থক্য ধরা পড়ে।
কবির প্রথম পর্বের গানে প্রেম- নারী ও ঈশ্বরের প্রতি। নিসর্গরূপমুগ্ধতা অনেকটাই আবেগাশ্রয়ী, প্রথাগতভাবে যাকে বলা হয়, প্রাচীন রোম্যান্টিকতা (Old Romanticism)। এই পর্বের গানে দেখা যায় প্রাচীন কবি-সংগীত এবং এই জাতীয় ধ্রুপদীসংগীতের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর এসে পড়েছে। প্রেম ও প্রকৃতির সম্বন্ধ রচনাতেও রবীন্দ্রনাথ এই পর্বে কোন অভিনব পথে বিচরণ করেননি। বরং, যে ঐতিহ্যের কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি, সেই ধারাতেই তিনি তাঁর গানগুলিকে অভিসিঞ্চিত করেছেন। প্রথম পর্বে তিনি যে সব গীতিনাট্য ও নাটকে গান রচনা করেছেন (কালমৃগয়া, বাল্মিকীপ্রতিভা, মায়ার খেলা, রাজা ও রাণী, বিসর্জন ইত্যাদি) সেই গানগুলিও এই ঐতিহ্যই বহন করছে।
বিখ্যাত গীতিকার ও কবি অজয় ভট্টাচার্য ‘সাহিত্যম্’ প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রবিচিত্রা’ পত্রিকার ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ প্রবন্ধে একটি নতুন দিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের গানে কিশোরস্বভাবসুলভ বিষাদাচ্ছন্ন অভিমান ব্যক্ত হয়েছে। হয়তো ঠাকুরবাড়ির পরিমণ্ডলের মধ্যেই বিচিত্র সম্পর্কের টানাপড়েনে এই অভিমানের জন্ম। অধিকাংশ গানেই দেখা যাবে এক রকমের বিষাদ কবিকে মগ্ন ও আচ্ছন্ন করে রাখছে, খাঁটি অর্থে দুঃখবিলাস নয়। কিন্তু দুঃখসংলগ্নতায় আবেগের বিস্তারে তিনি যেন পরিতৃপ্ত হচ্ছেন। ২১ বছর বয়সে লেখা ‘কালমৃগয়া’ গীতিনাট্যের, বাইশ বছর বয়সে লেখা ‘নলিনী’ নাট্যের এবং ২৭ বছর বয়সে লেখা গীতিনাট্য ‘মায়ার খেলা’র গানগুলি মুখ্যত রোম্যান্টিক বিষাদময়তার ( Romantic melancholy) পরিচয়বাহী। এসব গানে ব্যর্থ প্রেমের হাহাকার এবং শূন্যতার রোম্যান্টিক অনুষঙ্গ প্রকাশিত। সেইসঙ্গে আনন্দ এবং আবেগের আতিশয্যও লক্ষণীয়।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আমরা জানি এই বিষাদের জগত থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে বাইরে নিয়ে এসেছেন এর কতকগুলি অভিঘাত জনিত প্রতিক্রিয়ার কথা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।
(ক) রবীন্দ্রনাথের এই পরিবর্তিত অধ্যায়ে সমকালীন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয় যে ঘটনাগুলি রবীন্দ্রনাথকে গৃহ কোণের বিষাদের ছায়া থেকে বৃহত্তর জগতে পথে রাজপথে বেরিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে।
প্রথমত, এই সময়ে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে যে বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়, রবীন্দ্রনাথ তাতে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় অংশ নিতে বাধ্য হন। এই বাদানুবাদে রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রও ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শনে’ মহর্ষির ব্রাহ্মভাবনাকে সনাতন হিন্দুধর্মের বিরোধী বলে মনে করে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ ‘সাধনা’ ও ‘ভারতী’ এই দুটি পত্রিকায় শুধু প্রবন্ধ নিবন্ধই লেখেন নি, কিছু ব্রহ্মসঙ্গীতও রচনা করেছেন। ফলশ্রুতি, রবীন্দ্রনাথের চেতনায় এবং তাঁর গান রচনাতেও ভিন্ন রকমের একটা দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রায় সমকালেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, রাখীবন্ধন-উৎসব, স্বাদেশিকতার উদ্বোধন ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা রবীন্দ্রনাথকে প্রদীপ্ত করে দিয়েছে। এইসব ঘটনার অভিঘাতে তিনি যেসব গান রচনা করেছেন, সেগুলি প্রধানত স্বদেশভাবনায় আপ্লুত।
(খ) রবীন্দ্রনাথ এমনই একজন কবি, যাকে স্বদেশের সমাজ ও ধর্ম এমনকি জাতীয়তাবাদী আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। সত্যদ্রষ্টা কবিকে বোধহয় এভাবে ধরে রাখা যায়ও না। তিনি সত্যকে দেখতে চাইলেন বিশ্বমানবের প্রেক্ষাপটে। তাঁর ইওরোপ ও জাপান ভ্রমণ; প্রথম বিশ্বযুদ্ধ,– পৃথিবীর দেশে দেশে অনুন্নত, অসহায়, বঞ্চিত মানুষের অভ্যুত্থান– কবির দুই চোখের দৃষ্টিকে এমন ভাবে প্রসারিত করে দিয়েছে যে তিনি ক্রমান্বয়ে স্থিতপ্রজ্ঞ দার্শনিক হয়ে উঠছেন। আমরা দেখেছি, স্বাদেশিকতার পর্বেও রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গানে প্রাত্যহিক মানবজীবনের হাসি-কান্না ব্যথা-বেদনা সুরে ছন্দে রূপায়িত হতে পারেনি। তিনি তাঁর এই অক্ষমতার কথা বলেছেন ‘জন্মদিনে’ কাব্যের ১০ সংখ্যক কবিতা ‘ঐকতান’-এ, জীবনের গোধূলি বেলায়।
“মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে;
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।
জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে, কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পশরা।
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা–
আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।।”
(গ) বস্তুত রবীন্দ্রনাথের শেষ বিশ পঁচিশ বছরের গানে আগের মতই প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, আছে আনন্দলোকে অভিসারী রোম্যান্টিক আকুতিও। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেছে সুরের সহজতায় এবং কথা ও চিত্ররূপের বিস্ময়কর সরলতায়। এরও প্রেরণা রবীন্দ্রনাথের গভীর মানববোধ ও বিশ্ববোধ। আমরা জানি, ভাষার গভীরে ভাব এবং ভাবের গভীরে ভাষাই হচ্ছে সংগীতের জীবন্ত মূর্তি- এবং জীবনের এই শেষ ২০ বছরের একটি পর একটি গানের কথা ভাবলে প্রথম ও মধ্য পর্বের গানের সঙ্গে কথা, রূপকল্প, শব্দচয়নের স্বতোৎসার যে আমূল বদলে গেছে এ কথা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না। এ প্রসঙ্গে আমরা দুটি পর্বের দুটি গানকে বুঝে নেবার চেষ্টা করব।
শিথিল বিস্তার এই গানে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিল এইসব কথা ‘আনো গন্ধমদভরে অলস সমীরণ’.. ‘আনো আনো আনন্দছন্দের হিন্দোলা’…’আনো আনো উদ্দীপ্ত প্রাণের বেদনা’…’এসো থরথরকম্পিত মর্মরমুখরিত নবপল্লবপুলকিত /ফুলআকুল মালতিমল্লিবিতানে সুখছায়ে মধুবায়ে’।
এই আবেগ-বিহ্বল রোমান্টিক আতিশয্য, এই অতিকথন রবীন্দ্রনাথের উপান্তজীবনের গানে পাবনা। বরং, পাব এক সংহতির নৈপুণ্য, শব্দ ও চিত্রকল্পের ধ্রুপদী ভাস্কর্য। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি ৭৭ বছর বয়সে লেখা বসন্ত অনুষঙ্গের ‘আজি দক্ষিণ-পবনে দোলা লাগিল’ গানটির কথা। এখানেও আছে দক্ষিণপবনের দোলা, ‘দিকললনার মঞ্জীরধ্বনি’ ইত্যাদি রোম্যান্টিক অনুষঙ্গ । কিন্তু তার প্রতিস্থাপনায় কবি আশ্চর্য সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। চার তুকে নিবদ্ধ গানটি বাসন্তী উৎসবের দৃশ্য প্রতিমা এবং শ্রাব্য প্রতিমাগুলিকে স্থাপত্যের মতোই নির্মাণ করে নিয়েছে। তাই এ গানে পরিণত রোম্যান্টিকতার সঙ্গে সংলগ্ন হয়েছে ধ্রুপদী সংহতি।
সঞ্চারীতে তাই পেলাম মাধবীলতার ভাষাহীন ব্যাকুলতা যেন পাতায় পাতায় কলরবের ছন্দে আভাসিত প্রলাপেরই রূপান্তর–
“মাধবীলতায় ভাষাহারা ব্যাকুলতা
পল্লবে পল্লবে প্রলপিত কলরবে।”
এখানে পেলাম কবিতার এক আত্মনির্ভরতা। বাসন্তিক অনুষঙ্গ গুলি পরিণত ঘন প্রতিমায় অসামান্য হয়ে উঠেছে। উত্তর পর্বের এই গানে দিব্যতার সঙ্গে আছে অন্তর্দীপ্তি।
(ঘ) দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথ যে সত্যের উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তা কিন্তু কোন অধিবিদ্যার জগত নয় অথবা কোন অলৌকিক অতীন্দ্রিয় ভাবলো কো নয়। এই উপলব্ধি একান্তভাবেই। মানুষ ও মানুষের জীবন সম্বন্ধীয়। এখানে প্রেম ও মানুষের উজাও মানুষের প্রকৃতি ও মানবসভাবে অন্তর লিন দার্শনিক কাঠিন্যকে তিনি যে কত সহজে সুরে ছন্দে মুক্তি দিতে পারেন শেষ ২০ বছরের গানে তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং এই হৃদয়গ্রাহিতা ও মননগ্রাহিতাই আমাদের বিচারে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের সঙ্গে শেষ পর্বের গানের প্রকৃতিগত মৌলিক পার্থক্য।
আর এই সমস্ত ভাবনা অনুভব বিশ্লেষণ ও মন্তব্য যে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের উপান্তজীবনপর্বের গানের অনতিসাধারণ শিল্পমহিমার দিকেই বিসর্পিত হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় থাকে না। বিশ্বপ্রকৃতির মতো চিরায়ত এ গান। কোনো তাত্ত্বিক ও পণ্ডিতি সাংগীতিক ব্যাকরণ নয়, জীবনের মর্মমূল থেকে এ গান ধ্বনিত হতে থাকে। সীমা-অসীমের দ্বন্দ্ব ও মিলন, রূপ-অরূপের বিপ্রতীপতা ও সমাহার, জীবনকে গভীর করে ভালোবাসা, মাটির পৃথিবীর প্রতি নিবিড় মমত্ববোধ….. এই নিয়েই কবির গানের ভুবন।
তথ্যসূত্র
১. William Wordsworth, Preface to Lyrical Ballads (1802 edition), in: Lyrical Ballads, London. উদ্ধৃতি: “a poet is a man speaking to men.”
২. William Wordsworth, Preface to Lyrical Ballads (1802 edition), in: Lyrical Ballads, London. উদ্ধৃতি: “is more sensitive and more imaginative than most men.”
৩. Andrew Welsh, Roots of Lyric: Primitive Poetry and Modern Poetics, Princeton University Press, 1978. উদ্ধৃতি: “You get in beyond your depth, and beyond his depth.”
৪. Herbert Read, The True Voice of Feeling: Studies in English Romantic Poetry, London: Faber & Faber, 1953. পরিভাষা: Romantic Extravagance.
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “জীবনস্মৃতি”, রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী সংস্করণ। উদ্ধৃতি: “একদিন মধ্যাহ্নে খুব মেঘ করিয়াছে… ‘গহন-কুসুমকুঞ্জ-মাঝে’…”
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ঐকতান”, কাব্যগ্রন্থ জন্মদিনে, রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী। উদ্ধৃত অংশ:
“মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে…”
৭. অজয় ভট্টাচার্য, “রবীন্দ্রসঙ্গীত”, প্রবন্ধ, পত্রিকা রবীন্দ্রবিচিত্রা, প্রকাশক: সাহিত্যসভা (তারিখ প্রাসঙ্গিক সংস্করণ অনুসারে)।