অচল ছিল,সচল হয়ে ছুটেছে ওই জগৎ-জয়ে : ব্রহ্মবিদ্যালয় থেকে বিশ্বভারতী
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য, বেঙ্গল মিউজিক কলেজ
বোলপুরের জনমানবহীন নিঃঝুম এলাকা ভুবনডাঙা আজ বিশ্বভারতী নাম নিয়ে বিশ্বের মেলাক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। সকল ধর্ম ও জাতিনির্বিশেষে মানবতার চিহ্নবাহী মানবজাতি শিক্ষা, বুদ্ধি ও ভালোবাসার আলোয় সে মেলাক্ষেত্রকে ভরিয়ে তুলেছে, যার কেন্দ্রে বিরাজ করছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।
ভুবনডাঙার ওই প্রান্তরকে শান্তিনিকেতন নাম দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন ১৮৬৩ সাল। নির্জন সেই প্রান্তরস্থিত পাশাপাশি দুটি প্রকাণ্ড সপ্তপর্ণী বা ছাতিম গাছের ছায়ায় এসে একবার তিনি বিশ্রাম করেছিলেন। দশ দিক খোলা ওই প্রকাণ্ড ভূমিতে এমন নির্জনে দুটি গাছ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল নির্জন সাধনার এটি এক উপযুক্ত স্থান। সেই ছাতিমতলাতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন এক আশ্রয়ক্ষেত্র, আশ্রম, যার নাম তিনি দিলেন ‘শান্তিনিকেতন’।
বীরভূমের রুক্ষ কাঁকুরে লাল মাটি। বৃষ্টি নেই। খরাপ্রবণ। চাষবাসহীন উষর অঞ্চল। বাসযোগ্য ভূমি নির্মাণ করতে তিনি অন্য জায়গা থেকে মাটি আনিয়ে শান্তিনিকেতনকে ফলবতী করতে শুরু করলেন। ফলবান বৃক্ষ রোপণ করলেন। ফুলের গাছও বেড়ে উঠল। ক্রমে সেখানে অন্য পাখি আসে, ছায়া হয়, আনন্দ বিরাজ করে।
ছাতিম তলায় মহর্ষির তপস্যাক্ষেত্র। সেখানে শ্বেতপাথরের বেদীতে লেখা হলো:
তিনি আমার প্রাণের আরাম
মনের আনন্দ
আত্মার শান্তি ।।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এখানে থাকতে শুরু করলেন দেবেন্দ্রনাথ। একটি মন্দিরগৃহ নির্মাণ করলেন অভিনব রূপে। মার্বেলের মেঝে, রঙিন কাঁচের দেয়াল। ছাদটি প্যাগোডা স্টাইলে। প্রতিটি দেয়াল আসলে দরজা। দরজাগুলি খুলে দিলেই সব দিক খোলা। মন্দিরবেদীতে কোন দেবমূর্তি নেই। কারণ, পৌত্তলিক পূজায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী। তাঁর ঈশ্বরের কোন মূর্তি হয় না। শুধু মন্ত্র আর গানে তাঁকে মনে করে ধ্যান ও আরাধনা করতে হয়। এই উপাসনাক্ষেত্র শান্তিনিকেতনে আজও বিরাজমান। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাদিবস ২৩শে ডিসেম্বর বুধবার। ওই দিনটি মহর্ষির দীক্ষা-দিবস। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে এই ৭ই পৌষের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি গ্রন্থাগার ও একটি বিদ্যালয় স্থাপনের ভাবনাও মহর্ষির মনে ছিল। আর শুরু করেন একটি মেলা, গ্রাম ও শহরের মিলন ও বিনিময় আদান-প্রদান হবে যেখানে, মিলনক্ষেত্র তৈরি হবে। সেই মেলা ‘পৌষ-মেলা’ নাম নিয়ে আজও জগদ্বিখ্যাত। মহর্ষিদেবের এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ
সময়পর্বের বিচারে রবীন্দ্রনাথের জীবনের তিনটি ভৌগোলিক পর্যায় আছে।
জন্মের পর থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানত কলকাতায় থেকেছেন।
১৮৯১ থেকে ১৯০০ কাটিয়েছেন বর্তমান বাংলাদেশের শিলাইদহ অঞ্চলে।
১৯০১ সাল থেকে শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু হয় এবং আমৃত্যু এই শান্তিনিকেতন কে কেন্দ্র করেই বয়ে চলে তাঁর জীবনধারা।
শান্তিনিকেতনে এসে ১৯০১ সালে স্থাপন করলেন বিদ্যালয়— নাম হল ব্রহ্মবিদ্যালয় বা ব্রহ্মচর্যাশ্রম। ভাইপো বলেন্দ্রনাথ এই বিদ্যালয় তৈরীর ভাবনা আগেই ভেবেছিলেন, কিন্তু ১৮৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। ভাবনা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এবার রবীন্দ্রনাথ এই কাজে ব্যপৃত হলেন। বিদ্যালয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন অভিনব এক ধারণাকে ফলপ্রসূ করলেন তিনি। প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগে আর্যঋষির রীতি অনুযায়ী ছাত্ররা যেমন গুরুগৃহে থেকে পাঠ নিতেন, অনেকটা সেরকম একটি ব্যবস্থা তিনি করতে চেয়েছিলেন। মূলত, এই চাওয়া ছিল মহর্ষির অন্তরের বাসনা। রবীন্দ্রনাথ তার রূপদান করলেন। মাত্র পাঁচ জন ছাত্রকে নিয়ে শুরু হল এই ব্রহ্মবিদ্যালয়। এই প্রথম পাঁচজন ছাত্রের মধ্যে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম।
পাঠ্যপুস্তক নির্বাচন থেকে ছাত্র পড়ানো— সব দায়িত্বই রবীন্দ্রনাথ নিজে নিয়েছিলেন। ক্রমে নানা পর্বে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে থাকলেন বহু মানুষ। ছাত্র-শিক্ষক সকলের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন গুরুদেব।
বিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্যটি শুরু হল প্রকৃতিনির্ভর পঠনপাঠনের মাধ্যমে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীকক্ষ নেই। খোলা মাঠে গাছতলায় প্রকৃতির কোলে শিক্ষালাভ। বইয়ের পাতায় পড়া সীমাবদ্ধ থাকে না। চোখের সামনে যা কিছু দেখাশোনা চলে তাকে বুঝে ওঠা– উপলব্ধি করা– এই হলো প্রকৃত শিক্ষা। পাঠ্য বিষয়কে নতুন ধাঁচে তৈরি করা হলো। সংগীত, নাটক, অঙ্কন, মূর্তি গড়া, নৃত্য, খেলাধুলো… এই সব কিছুই শিক্ষার অঙ্গ হয়ে উঠলো। কবি নিজেই ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের খেলার সাথী। তিনিই পড়াতেন। খাওয়াদাওয়ার ভার ছিল কবি পত্নী মৃণালিনী দেবীর উপরে। নিজের হাতে রেঁধে দিনের পর দিন সকলকে খাইয়েছেন তিনি। বিদ্যালয় শুরুর এই প্রথম দিকে তাঁদের ছিল অপরিমেয় অর্থকষ্টের জীবন, কিন্তু সে কষ্ট গায়ে লাগেনি শেষ পর্যন্ত। আনন্দিত চিত্তে এই কষ্টের ভার মাথায় তুলে নিয়েছেন তাঁরা সকলে মিলে। বিদ্যালয়ের ভাবনা এগিয়ে চলেছে ক্রমশ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মধ্যেই আশ্রম-মাতা মৃণালিনী দেবী পরলোকগমন করেন।
কালের নিয়মে বিদ্যালয় ক্রমশ পল্লবিত বিকশিত হতে থাকে।
প্রাচীন ভারতে আর্যঋষিদের আশ্রমের ভাব ধরে এই ব্রহ্মচর্যাশ্রম গড়ে উঠলো। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, মুখ হাত ধুয়ে, নিজের শোবার স্থান পরিষ্কার করতে হতো। তারপর খোলা জায়গায় ব্যায়াম করে এসে একা কিছুক্ষণ ধ্যান করতে হতো। এরপর বেদমন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সমবেত উপাসনা। ছাত্ররা জুতো ছাতা ব্যবহার করত না। নিজের হাতে সব নিজস্ব কাজ ও পরের জন্য কাজ করতো। আনন্দ ও খেলাধুলার মধ্যে দিয়ে কখন যে তাদের পড়াশোনা তৈরি হতে থাকতো শিক্ষক মশাইদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মেলামেশা-গল্প-কাজের মধ্যে দিয়ে, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার!
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন গান, আশ্রমসংগীত। সেই গান তারা মুখে মুখে গেয়ে ফিরত,
“আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন”
(আশ্রম সংগীত। গীতবিতান)
বিদ্যালয়ের এই ছাত্রদল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে লাগলো। দেশ-বিদেশ থেকে এখানে নতুন ছেলেমেয়েরা আসতে শুরু করল। কবি তাঁর আরো কাজের মধ্যে ভেবে নিলেন এই শিশুদের পরিণতির ভাবনা।
উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও হবে এবার শান্তিনিকেতনে।
প্রতিষ্ঠিত হলো বিশ্বভারতী— ১৯১৮ সালে।
তার ভিত্তি স্থাপিত হলো ১৯১৯ সালের জুলাই মাস থেকে। আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেল।
বিদ্যার যে বিপুল বৈচিত্র্য, তার একটি বিশ্বজনীন কেন্দ্র তৈরি করা— এই ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাবনা এবং উদ্দেশ্য। ভারতের স্বভাবেই নানান ধর্ম ও নানান সংস্কৃতিকে একাকার করে নেবার প্রবণতা আছে। তাই তিনি বলেন,
“দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
যাবে না ফিরে,
এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।”
(ভারততীর্থ: গীতাঞ্জলি/ হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগোরে ধীরে : গীতবিতান)
তখনকার কয়েকটি বক্তৃতায় বিশ্বভারতীর আদর্শ সম্পর্কে তাঁর যে ভাবনা, তার প্রকাশ হয়েছে। ‘The Centre of Indian Culture’ নামক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইংরেজি বক্তৃতায় বলছেন ভারতের সংস্কৃতির মধ্যে কিভাবে আধুনিক পৃথিবীর সমস্ত শিক্ষা চিন্তার এক ভারতীয় বিকল্প পাওয়া যায় সেই চেতনাকে আশ্রয় করেই বিশ্বভারতীর ধারণা।
ভারতবর্ষের মধ্যে সমন্বয়ের যে ক্ষমতা আছে সারা পৃথিবীর জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্যে তার অভাব আছে— পৃথিবীর নানা স্থানে ঘুরে এ কথা বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সব জাতি যদি তাদের মনের আলোর শিক্ষাটুকু জ্বালিয়ে ধরে, তবেই আলোকিত হবে জ্ঞানের প্রদীপ।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ৮ই পৌষ শান্তিনিকেতনের আশ্রমকুঞ্জে বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। বিশিষ্ট দার্শনিক আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল সভাপতিত্ব করেন। বিশ্বভারতী পরিষদ গঠিত হয়। বিশ্বভারতীর সংবিধান রচিত হয়। দেশের পণ্ডিতবর্গ বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ,আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন– সহ অন্যান্য গুণীজন। ছোটখাটো সেই বিদ্যালয়টি এবার বিশ্বভারতীর রূপ ধরে বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হলো। নানা বিভাগ গড়ে উঠলো। ব্রহ্মবিদ্যালয়টির নতুন নাম হলো পাঠভবন (বিদ্যালয় বিভাগ), বিদ্যাভবন (সাহিত্য বিভাগ ও গবেষণা), শিক্ষা ভবন (কলেজ ও বিজ্ঞান চর্চা), কলাভবন (চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বিভাগ) প্রভৃতি। সংগীতভবন ও কলাভবনের ক্লাস প্রথম শুরু হয়। ক্রমে ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি নানা বিষয় এখানে চর্চিত হতে থাকে।
শতবর্ষ পার করে আজও বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা, শিক্ষাদর্শন, শিক্ষাদর্শ বিস্তারে ব্রতী রয়েছে এবং পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে চলেছে শিক্ষার আলো। সেই শিশুবিভাগ থেকে শুরু করে গবেষণাস্তরের ছাত্র-ছাত্রীগণ, অধ্যাপকবৃন্দ, জ্ঞানপিপাসু মানুষজন– সকলেই আনন্দের বিচ্ছুরণের মধ্যে দিয়ে, মুক্তির মধ্যে দিয়ে, সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে দিয়ে, প্রকৃতির সান্নিধ্যের মধ্যে দিয়ে জীবনবোধের পাঠ নিতে ব্যাপৃত থাকেন।
রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনার আনন্দিত সমর্থনে ইউনেস্কো (UNESCO) আজ বিশ্বভারতীকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র’ বলে মর্যাদা দিয়েছে। ২০২৩ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো এই ঘোষণা করে।
আজ বিশ্বভারতী ভারতের ৪১তম World Heritage Site। বিশ্ব-ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র।
আমাদের শ্রদ্ধা বিশ্বভারতীর প্রতি।
আমাদের বিনম্র প্রণাম বিশ্বভারতীর রূপকার শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি।