স্মৃতির সরণী বেয়ে : পণ্ডিত শ্যামল বোস ও শঙ্কর ঘোষ

ভবানীশঙ্কর দাশগুপ্ত

Abstract

This memoir-based article traces personal and intergenerational memories of some of the most distinguished tabla and pakhawaj maestros of twentieth-century Indian classical music. While percussion accompaniment has always been indispensable to vocal and instrumental performance, the social status of percussionists historically remained secondary within the traditional hierarchy of Hindustani music. Through intimate recollections, the author reflects on the artistic personalities, stylistic nuances, and moral integrity of maestros such as Ustad Ahmed Jan Thirakwa, Pandit Shyamal Bose, Pandit Shankar Ghosh, and others. The narrative situates these artists within both familial and pedagogical lineages, highlighting their contributions to elevating the status of tabla accompaniment to that of a respected solo and collaborative art form. By intertwining memory, anecdote, and performance history, the article offers valuable insight into the cultural ethos, guru–shishya tradition, and evolving aesthetics of twentieth-century Hindustani percussion practice.

 

Keywords

Hindustani Classical Music; Tabla; Pakhawaj; Guru–Shishya Tradition; Musical Memory; Accompaniment Tradition; Twentieth-Century Indian Music; Performance History; Musical Lineage; Cultural Heritage.

 

স্মৃতির সরণী বেয়ে

ভবানীশঙ্কর দাশগুপ্ত

তালবাদ্য (অর্থাৎ তবলা, পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ ইত্যাদি) ছাড়া যে কোনো কণ্ঠসঙ্গীত বা যন্ত্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয় না—এ কথা সকলেই জানেন। অথচ মধ্যযুগীয় রাজা-বাদশাদের আমলে সঙ্গীতসমাজে তালবাদ্য শিল্পীদের স্থান ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো। প্রধান গায়ক বা বাদক যে আসনে বসতেন, তালবাদ্য শিল্পীদের বসানো হতো তার চেয়ে নিচু আসনে এবং তাঁদের বলা হতো ‘সঙ্গতকার’।

প্রাচীন সংস্কৃত সঙ্গীতগ্রন্থগুলিতে তালশাস্ত্র ও রাগ-রাগিণীর ব্যাকরণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তালশাস্ত্রে যে কঠিন বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলি রয়েছে, তা নিয়ে সে যুগের সঙ্গীতশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরা নিয়মিত অধ্যয়ন ও গবেষণা করতেন। কিন্তু মোগল বাদশাদের আমল থেকে (অর্থাৎ তানসেনের পরবর্তী যুগ থেকে) কেন যে তালবাদ্য শিল্পীদের সামাজিক মর্যাদা কমিয়ে দেওয়া হলো, তার কোনো ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সম্ভবত শাস্ত্রীয় গায়ক ও বাদকরা (অর্থাৎ ধ্রুপদগায়ক, খেয়ালগায়ক, বীনকার, সরোদিয়া ও সেতারিয়া) নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তা করেছিলেন।

কিন্তু বিগত দিনের গায়িকা ও নর্তকীদের মতো কয়েকজন তালবাদ্য শিল্পীও এই সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে সংগ্রাম করে একক শিল্পীরূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এঁদের জন্যই পরবর্তীকালে সঙ্গতকাররাও সঙ্গীতসমাজে যোগ্য মর্যাদা লাভ করেন। এঁরা হলেন—পণ্ডিত শম্ভুপ্রসাদ (পাখোয়াজ), ওস্তাদ আহমেদ জান থেরাকুয়া, ওস্তাদ হাবিবুদ্দিন খাঁ এবং পণ্ডিত কণ্ঠে মহারাজ (তবলা)।

কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, এঁদের মধ্যে ওস্তাদ আহমেদ জান থেরাকুয়া সাহেব ছাড়া কাউকেই আমি চাক্ষুষ দেখার সুযোগ পাইনি। কারণ, এঁরা যখন সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পী, তখন আমার ঠাকুরদা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। আহমেদ জান থেরাকুয়া সাহেবকে একবারই দেখেছিলাম হিন্দি হাইস্কুলে একটি প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠানে। তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি এবং তাঁর বয়স ৮৬ বছর (আমার ঠাকুরদার চেয়ে তিনি প্রায় ১৫-১৬ বছরের বড় ছিলেন)।

তবে যাঁদের সান্নিধ্যে আমি একাধিকবার আসার সুযোগ পেয়েছি, তাঁরা হলেন পাখোয়াজ শিল্পী আচার্য রাজীবলোচন দেও, তবলা শিল্পী আচার্য হীরেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলি, পণ্ডিত শ্যামল বোস ও পণ্ডিত শঙ্কর ঘোষ। রাজীবলোচন ও হীরেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলি ছিলেন আমার ঠাকুরদার বন্ধুস্থানীয়। আমার বাবা (পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত) তাঁদের ‘কাকাবাবু’ বলে ডাকতেন।

পণ্ডিত শ্যামল বোস ছিলেন বাবার কৈশোর ও যৌবনকালের নিত্যসঙ্গী। দুজনের বয়স প্রায় কাছাকাছি ছিল এবং সঙ্গীতজীবনের প্রারম্ভে বহু বছর একসঙ্গে অনুশীলন করেছিলেন। বাবা তাঁকে ‘বাজাবাবু’ বলে ডাকতেন, আমিও ডাকতাম ‘শ্যামল কাকু’।

১৯৭২ সালে কাশীপুরে থাকাকালীন এক সন্ধ্যায় বাবা গাড়ি করে আমাদের সবাইকে নিয়ে শ্যামল কাকুদের বাগবাজারের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে বাবা, শ্যামল কাকু ও গোবিন্দ কাকু (গোবিন্দ বোস, বিখ্যাত তবলা শিল্পী) প্রায় রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত গল্পগুজব করেছিলেন। শ্যামল কাকুর কথা বলার একটি অনবদ্য ভঙ্গি ছিল। বিখ্যাত তবলিয়া আজিম খাঁ সাহেব রেগে গেলে কী ভীষণ হয়ে উঠতেন, কথায় কথায় কোমর থেকে ছোরা বের করতেন—এমন নানা রোমহর্ষক কাহিনি তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শোনাতেন। আমি ও আমার ছোট ভাই অনির্বাণ নিস্পলক চোখে সব শুনেছিলাম। ঘটনাগুলি আজও আমার মনে আছে।

 

শ্যামল কাকুর সঙ্গে বাবার যে অনুষ্ঠানগুলি হয়েছিল, তার মধ্যে দুটি অনুষ্ঠান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি হয়েছিল ১৯৭৫ সালে আকাশবাণীর অখিল ভারতীয় বেতার কর্মসূচিতে। বাবা বাজিয়েছিলেন রাগ ছায়ানট ও নায়কী কানাড়া। শ্যামল কাকু নিজে হাতে তানপুরা বেঁধে দিয়েছিলেন এবং এত সুন্দর সঙ্গত করেছিলেন যে সারা ভারতবর্ষে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।

আরেকটি অনুষ্ঠান হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ব্যান্ডেল থার্মাল পাওয়ার স্টেশনে। এই অনুষ্ঠানে বাবা বাজিয়েছিলেন কাফী কানাড়া। বিলম্বিত তিনতাল গতের সময় শ্যামল কাকু এমন চমৎকার কয়েকটি টুকরা, rela ও কায়দা পরিবেশন করেছিলেন যে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের একটি গানের চরণ মনে পড়ছিল—
“এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।”

সকলেই একবাক্যে স্বীকার করতেন যে শ্যামল কাকুর তবলা-সঙ্গতে যে সুরেলা মাধুর্য ছিল, তা কেরামতুল্লা খাঁ সাহেব, আফাক হোসেন খাঁ সাহেব ও মহাপুরুষ মিশ্র ব্যতীত খুব কম শিল্পীর সঙ্গতে পাওয়া যেত। এই অমায়িক মানুষটির অকালমৃত্যুতে আমাদের সঙ্গীতজগৎ যে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সুযোগ্য পুত্র সৌরভ বোস ইতিমধ্যেই যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে সম্ভবত দিল্লিতে বসবাস করছেন। আমার বর্তমান তবলা-শিক্ষক শ্রী নিত্যানন্দ ভট্টাচার্য মহাশয়ও কিছুদিন তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

শঙ্কর কাকু (পণ্ডিত শঙ্কর ঘোষ) যখন বাবার সান্নিধ্যে আসেন, বাবা তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এস.সি. শ্রেণির ছাত্র। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র দু’বছরের মতো। ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম, ঠাকুরদা যখন উড স্ট্রিটে থাকতেন, তখন জ্ঞান দাদু (পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ) প্রায়ই শঙ্কর কাকুকে সেখানে নিয়ে আসতেন বাবার সঙ্গে রেওয়াজ করানোর জন্য। কারণ, শঙ্কর কাকু ছিলেন তাঁর সেরা ছাত্রদের অন্যতম।

আমি যখন সাউথ পয়েন্টে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি, তখনই প্রথম শঙ্কর কাকুকে দেখি—উস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের পার্ক সার্কাসের বাসভবনে। তাঁর পুত্র সুজাত খাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আমরা সেদিন সপরিবারে নিমন্ত্রিত ছিলাম। বাবা আমাকে যথারীতি শঙ্কর কাকুর কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁর পায়ে আমার মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করালেন। শঙ্কর কাকু বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাটার হাতেখড়ি দিয়েছ?”

বাবা হেসে বললেন, “ব্যাটার কিস্যু হবে বলে মনে হয় না। নখের অবস্থা দেখ—দাঁত দিয়ে কেটে সাফ করে দিয়েছে!”

তখনই বুঝলাম, ‘হাতেখড়ি’ মানে সরোদে বাজানো শেখার সূচনা। কারণ বাঁ হাতে নখ না গজালে সরোদ বাজানো যায় না।

নৈশভোজের সময় বাবা, আমি ও শঙ্কর কাকু পাশাপাশি বসে খেয়েছিলাম—এ কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। উস্তাদ ইমরাত খাঁ সাহেব (বিলায়েত খাঁ সাহেবের ছোট ভাই) নিজ হাতে পরিবেশন করেছিলেন। খেতে খেতে শঙ্কর কাকু অনর্গল রঙ্গকৌতুক করে চলেছিলেন বাবা, কাকা ও ইমরাত খাঁ সাহেবের সঙ্গে। অন্যান্য অতিথিরা হো-হো করে হাসছিলেন।

বাবার সঙ্গে শঙ্কর কাকুর যে ক’টি মঞ্চানুষ্ঠান হয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি আমার স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। প্রথমটি হয়েছিল ১৯৭৫ সালে উত্তরপাড়ার জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরিতে। দ্বিতীয়টি ১৯৭৮ সালে কালীপূজার দিন শিলিগুড়িতে আমাদের গুরুদেব শ্রীশ্রী সুদীনকুমার মিত্র মহাশয়ের আশ্রমে। আর তৃতীয়টি সম্ভবত ১৯৮৪ সালে কলাকুঞ্জে (কলামন্দিরের বেসমেন্ট হলে)।

শ্যামল কাকুর সঙ্গতে যে শান্ত, ধ্যানস্থ, ধীর-স্থির ভাব ছিল, শঙ্কর কাকুর সঙ্গতে ঠিক তেমনই ছিল এক জোরদার তৈয়ারির দাপট। বাবা যখনই কোনো বোল, বাণী বা তেহাই সরোদে তুলতেন, শঙ্কর কাকু তৎক্ষণাৎ বিপুল বিক্রমে তা তবলায় তুলে ধরতেন। শিলিগুড়ির কালীপূজার অনুষ্ঠানের পর তিনি প্রায় আধঘণ্টা ঢাক বাজিয়েছিলেন—সে দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।

মানুষ হিসেবে এই বিশ্ববিখ্যাত তবলাশিল্পী ছিলেন অত্যন্ত ঠোঁটকাটা—ইংরেজিতে যাকে বলে ‘outspoken’। কোনো অন্যায় বা দুর্বিনীত আচরণ তিনি কখনও বরদাস্ত করতেন না। ছাত্রদের যেমন স্নেহ করতেন, তেমনই কঠোর শাসনেও রাখতেন। কোনো রকম বেয়াদবি দেখলে সকলের সামনে ধমক দিতেন, যাতে তারা গুরুজনদের অসম্মান করার স্পর্ধা না দেখায়। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো রকম ছলচাতুরি করলে তিনি জনসমক্ষে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করতেন এবং তাদের মুখোশ খুলে দিতেন। ভয়ে কারও কাছে নত মস্তকে আত্মসমর্পণ করতেন না।

সেইজন্যই বাবা মাঝে মাঝে বলতেন, “শঙ্করের মতো হতে পারলে আমি শুধু বাজনা বাজিয়েই বড়লোক হয়ে যেতাম; চাকরি বা মাস্টারি করার দরকার হতো না।”

বছর দুয়েক আগে কলকাতার একটি নামকরা হাসপাতালে এই বিশিষ্ট তবলা-সম্রাট এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রী বিক্রম ঘোষ (আমার অনুজপ্রতিম বুম্বা) এবং সুযোগ্য শিষ্য শ্রী তন্ময় বোস আজ সঙ্গীতগগনের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত।