January 1, 2022

ছবি ও গান :  বাংলা ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গানের ব্যবহার— ছায়াছবির শিল্পিত উত্তরণ

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য,বেঙ্গল মিউজিক কলেজ

বাংলা ছায়াছবিতে রবীন্দ্রসংগীত তথা গানের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করার আগে ছায়াছবির জন্মের বৃত্তান্ত নিয়ে কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন।

ছায়াছবির জন্ম বিদেশে, এদেশে নয়। প্রথমে ফ্রান্স। সেখানকার লুমেয়ার-পদবিধারী দুই ভাই– লুই আর অগস্ত, তারপরে বিলেতে রবার্ট ফ্রিজ- গ্রীন নামে প্রায় কাজপাগল আধপাগল এক ব্যক্তির হৈ চৈ উৎসাহে আর উদ্যোগে চলমান ছবির ভাবনার সূচনা। ক্রমশ আমেরিকা থেকে সোভিয়েত রাশিয়া পর্যন্ত সারা বিশ্বে ছবি বানানোর নেশা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম লাভ করে ছায়াছবি।

কিন্তু সে যুগে সেইসব ছবি ছিল নির্বাক। শব্দহীন। আজকের ছবিতে আমরা যেমন শব্দ শুনতে পাই, সংলাপ থেকে শুরু করে আবহসংগীত, গান, আনুষঙ্গিক আরো অনেক প্রাকৃতিক শব্দ— তখন এসব ভাবাই যেত না। এই প্রযুক্তি তখনো পর্যন্ত আবিষ্কার করা যায়নি।

ছবি নির্বাক বা শব্দহীন ছিল বটে, কিন্তু সেই কারণে অবশ্য তাকে প্রতিবন্ধী বলা যেত না। অন্ধ বা খঞ্জের মত কষ্ট করে হাতড়ে, খুঁড়িয়ে তাকে চলতে হয়নি কোনোদিন। তার যেটুকু সম্বল আছে তাই দিয়েই অসাধারণ সব সৃষ্টি হয়েছে। আর আমরা জানি, এই পর্বের সেরা ফসলটির নাম চার্লস চ্যাপলিন— আমাদের ভালোবাসায় যিনি চার্লি চ্যাপলিন।

ছায়াছবির জন্ম ১৮৯৫ সালে বিদেশে। কিন্তু অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ২৪ বছরের মধ্যেই আমাদের দেশেও চলে এলো সিনেমা— বলা বাহুল্য নির্বাক সিনেমা। যেহেতু নির্বাক, তাই সেসব ছবিতে গান ব্যবহার করার কোন প্রশ্নই ওঠেনি। যদিও সেই পর্বে বঙ্কিমচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, প্রভাতকুমার, শরৎচন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথের রচনা নিয়েও ছায়াছবির কাজ হয়েছে। ১৯৩০-এ আর ১৯৩২-এ দুটি নির্বাক ছবি তৈরি হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ডালিয়া’ আর ‘নৌকাডুবি’র কাহিনী নিয়ে।

পালাবদল ঘটল ১৯৩২ এর শেষ দিকে। নির্বাক ছবিকে পিছনে রেখে সামনে এগিয়ে এলো সবাক ছবি।

প্রথম প্রথম রবীন্দ্ররচনাকে আশ্রয় করে কিছু ছবি নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন :

১৯৩২-এ চিরকুমারসভা

১৯৩৮-এ গোরা, চোখের বালি

১৯৪৪-এ শেষরক্ষা

কিন্তু এসব ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হয়েছে কিনা, কিংবা হয়ে থাকলেও কোন্ কোন্ গান, তার কোনো লিপিবদ্ধ রেকর্ড নেই। ছবিগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে তাদের নেগেটিভ সহ। কিন্তু একটা কথা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়, ‘চিরকুমারসভা’ অথবা ‘শেষরক্ষা’র গল্প নিয়ে ছবি হবে, আর তাতে কোনো গান থাকবে না, এ প্রায় অসম্ভব। বহু বছর পরে শ্রদ্ধেয় পরিচালক শ্রী দেবকী কুমার বসু আরো একবার ‘চিরকুমারসভা’ চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন— তাতে ছিল প্রচুর গান। এর মধ্যে থেকে অন্তত একটা বা দুটো গান আগের চিরকুমারসভাতে কি একেবারেই ছিল না! যদি হয় এমন সব গান!—

 মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি

বা

ওগো তোরা কে যাবি পারে

রবীন্দ্রনাথ নিজের গান সম্পর্কে একবার যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, তাঁর সমস্ত সৃষ্টির কথা মানুষ যদি একদিন ভুলেও যায় তবুও তাঁর গানের মৃত্যু হবে না। বাঙালিকে তাঁর গান গাইতেই হবে।

এই ভবিষ্যৎবাণী আজ অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। যেদিকে কান পাতি, সেদিক থেকেই ভেসে আসে রবীন্দ্রনাথের গান। এটা ভালো কি মন্দ সে বিচার স্বতন্ত্র। (যেমন ভিড় রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের বদান্যতায় যে সমস্ত রবীন্দ্রসংগীত আমরা মাঝেমাঝে শুনি, তাতে  মানুষ গাড়ি চাপা পড়া থেকে বাঁচবে! না গান শুনবে!– তার মীমাংসা আজও হয়নি!)

১৯৩৫ সালে শ্রদ্ধেয় বীরেন্দ্রনাথ সরকার নিউ থিয়েটার্স নামে একটা কোম্পানির পত্তন করেন। ‘মুক্তি’ নামে একটি ছবি তৈরি হয় প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়ার পরিচালনায়। পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। ছবিটির বিভিন্ন সিচুয়েশনের জন্য কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতের কথা বলেন পরিচালককে শ্রী পঙ্কজ কুমার মল্লিক। পরিচালক রাজি হয়ে যান। ‘মুক্তি’ হয়ে ওঠে সাড়া জাগানো অসম্ভব ভালো একটি ছবি। পাশাপাশি গানগুলিও হয়ে ওঠে ছবির উজ্জ্বলতম দিক।

শুরু হয়ে গেল বাংলা চলচ্চিত্রের এক নতুন অধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে এক শ্রেণীর চলচ্চিত্র-ব্যবসায়ীর যে ধারণা, যে, তার আবেদন শুধু শহুরে শিক্ষিত মানুষের কাছে, এই ধারণা ভেঙে চৌচির হয়ে গেল‌।

‘মুক্তি’ ছবির গান গ্রাম শহরের প্রত্যেকের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো। তার মধ্যে কয়েকটি হলো—

আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে

তার বিদায় বেলার মালাখানি আমার গলে দোলে

আমি কান পেতে রই

দিনের শেষে ঘুমের দেশে

গুরুত্বপূর্ণ কথাটি এই যে, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানটি রবীন্দ্রসংগীত বটে, কিন্তু এর সুর রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নয়। পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছিলেন কবির অসম্ভব স্নেহধন্য। গানটিতে নিজে সুর দিয়ে সাহস’ভরে রবীন্দ্রনাথের কাছে  এনে ধরেছিলেন। অনুমোদন চেয়েছিলেন ছবিতে গানটি ব্যবহার করতে চেয়ে। কবি খুশি হয়ে অনুমোদন দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়। একটা বিশেষ মহলে রবীন্দ্রনাথের গানের সমঝদারি বরাবরই ছিল;  কিন্তু ছিল নির্দিষ্ট একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ। সেই গানকে বিদগ্ধ সমাজের পরিশীলিত ঘেরাটোপ থেকে বের করে এনে আমজনতার দরবারে পেশ করার কৃতিত্বের দাবিদার কিন্তু সিনেমাকেই দিতে হবে। সেই সঙ্গে অল ইন্ডিয়া রেডিও— আজ যাকে আমরা আকাশবাণী নামে চিনি, তার পূর্বপুরুষ। জনপ্রিয়তার নিরিখে আজ রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির মনে যে উন্নত আসন অধিকার করে বসে আছে, এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা না থাকলে তা হয়তো এত তাড়াতাড়ি সম্ভব হতো না। তার জন্যে হয়তো আরো বহু যুগ অপেক্ষা করে বসে থাকতে হত আমাদের।

আমরা স্মরণ করতে পারি, আকাশবাণীর সঙ্গীত শিক্ষার আসরের কথা। প্রত্যেক রবিবার সকালবেলায় পঙ্কজ কুমার মল্লিকের পরিচালনায় বসতো একটি মনোরম গানের আসর– রবীন্দ্রসংগীতের আসর– বা বলা ভালো রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার আসর। শিক্ষার্থীদের চোখে দেখা যেত না। শিক্ষককেও চোখে দেখা যেত না। তবে রেডিওসেটের ওপারে বসে নিজের অননুকরণীয় ভঙ্গিতে একটার পর একটা রবীন্দ্রসংগীত সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে গাইছেন, শেখাচ্ছেন, গান তোলাচ্ছেন স্বয়ং পঙ্কজ কুমার মল্লিক। একবার করে গেয়েই নয় শুধু, এক একটা লাইন বারবার করে গেয়ে;— আর রেডিওসেটের অন্য পারে তাঁর অগণিত ছাত্র-ছাত্রী এবং শ্রোতা হারমোনিয়াম আর খাতা নিয়ে বসে লিখে নিচ্ছেন– নিজেদের গলায় তুলে নিচ্ছেন গান। সংগীতশিক্ষাদানের এই অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হতে হতে শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যে শ্রোতাদের অনেকেই অন্তরের তাগিদে সংগীত শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী হিসেবে নাম লিখিয়ে ফেলেন। উত্তরকালে এঁদেরই মধ্যে থেকে অনেক শিল্পী নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। অনেকে আবার সিনেমার জন্যেও গান গেয়েছেন।

সিনেমায় ব্যবহৃত রবীন্দ্রনাথের গান সব শ্রেণীর দর্শকদের মনকে তোলপাড় করেছে, এমনকি, নিরক্ষর এবং তথাকথিত অশিক্ষিতদের মনের দরজাতেও রবীন্দ্রসংগীতকে এনে হাজির করেছে সিনেমা।

একটি গানের উল্লেখ করা যায়—

‘পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!’

বিধায়ক ভট্টাচার্যের মঞ্চসফল নাটক ‘বিশ বছর পরে’ একবার চিত্রায়িত হয়েছিল। সেই ছবির একটি গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীত বলে চেনেন না এমন অনেক মানুষ…..গান চর্চা করেন না এমন অনেক মানুষ…..  সবাই সাধ্যমত গুনগুন করে গেয়েছিলেন সেদিনের সেই গানটি–

পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!

রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে নয়, প্রাণের কথা সুর হয়ে বেরিয়ে আসছে— এমন উচ্চারণে সেই গান মানুষের মনের অন্দরে ঢুকে পড়েছিল।

‘মুক্তি’ ছবির গান-প্রসঙ্গে আসা যেতে পারে। এই ছবি মুক্তি পাবার আগেই পরিচালক প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশ চলে গিয়েছিলেন এই ভয়ে যে— না জানি এর গানগুলি লোকে পছন্দ করবে, না ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

 ‘মুক্তি’ ছবির রবীন্দ্রসংগীতগুলি যখন লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো, তখন, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো বাঙালিরও যেন স্বপ্নভঙ্গ হল। হঠাৎ জেগে উঠে তাঁদের প্রাণের গান তাঁরা খুঁজে পেলেন। যে গানকে এলিটিস্ট আখ্যা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল একদল পরিশীলিত, অভিজাত, সবজান্তার পরামর্শে; সেই গান এসে আজ অধিকার করে নিল আপামর জনচিত্ত।

আজ সময় এসেছে, যখন, শুধু এই ঘটনাটির জন্যই আমাদের শ্রদ্ধা জানানো উচিত পঙ্কজ কুমার মল্লিক, প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া আর বীরেন্দ্রনাথ সরকারকে।

প্রসঙ্গত ছায়াছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের জন্য তার পদ্ধতিটি কী হতো সেই আলোচনায় আসা যেতে পারে।

আজকাল গানের রেকর্ডিং কোন্ পদ্ধতিতে হয় তা হয়তো অনেকেরই জানা। গান রেকর্ডিং এর জন্য আলাদা স্টুডিও থাকে। সেখানে অগুন্তি মাইক্রোফোন, অজস্র ট্র্যাক, ভালো ভালো মিক্সার। কোনো গানের রেকর্ডিং চলতে চলতে দৈবাৎ যদি কোনো অংশে কোথাও খুঁৎ ধরা পড়ে, শুধুমাত্র ওই অংশটুকুকে মেরামত করে নেবার ব্যবস্থা আছে আজকাল। সেই পুরনো দিনে এই সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ছিল কল্পনারও বাইরে।

প্রাথমিক পর্যায়ে প্লে-ব্যাক পদ্ধতির সাহায্য পাওয়া যায়নি। কারণ তা আবিষ্কৃতই হয়নি। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়াতো এইরকম যে–  শুটিং চলছে– ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনেতা বা অভিনেত্রী গান গাইছেন, যে গান তাঁদের নিজেদেরই গাইতে হবে। কোনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা কোনো লতা মঙ্গেশকর তাঁদের হয়ে গেয়ে দেবেন না। আর যন্ত্র শিল্পী যাঁরা, তাঁরা ক্যামেরার পিছনে বিভিন্ন দূরত্বে দাঁড়িয়ে গানে সঙ্গত করবেন। যিনি গাইছেন তিনি যদি গাইতে গাইতে জায়গা বদল করেন তাহলে বাজনদারেরাও কোমরে তবলাডুগি বেঁধে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে অথবা বেহালা কি বাঁশি বা ক্ল্যারিনেট কি সেতার সরোদ নিয়ে স্থান পরিবর্তন করবেন। শুধু পিয়ানো বা অর্গানের মত যন্ত্রগুলো সরানো যেত না বড্ড ভারী বলে। সেগুলিকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে বসানো থাকতো। ক্যামেরা যদি ট্রলির ওপর বসিয়ে ডানদিকে কি বাঁদিকে সরানো হতো সেক্ষেত্রে যন্ত্রীদেরও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডানদিকে বা বাঁদিকে সরতে হতো। একে বলা হত ‘লাইভ রেকর্ডিং’। আদিপর্যায়ে কাননদেবী, কে এল সায়গল অথবা পাহাড়ি সান্যালদেরও এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। মাইক্রোফোন থাকতো মোটে একটি। তাতেই কন্ঠ আর যন্ত্রশিল্পীদের বাজনা একত্রে রেকর্ড করা বাধ্যতামূলক ছিল। ভাবা যায়!

এই পদ্ধতি আমূল বদলে গেল দুজন কৃতী বাঙালি টেকনিশিয়ানের উদ্ভাবনী ক্ষমতার দৌলতে। একজন হলেন নীতিন বসু অপরজন মধু শীল। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ওঁরা এমন একটা যন্ত্রের উদ্ভাবন করলেন, যার ফলে, শুটিং চলাকালীন আর শিল্পীদের গান গাওয়ার প্রয়োজন হলো না। গান ইত্যাদি আগেই রেকর্ডিং হয়ে সেলুলয়েডবদ্ধ হলো। যন্ত্রটির সঙ্গে ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে ক্যামেরা চালাবার পথ খুলে গেল। আমরা পেলাম প্লে-ব্যাক মেশিন নামে একটি অনবদ্য যন্ত্র। নিউ থিয়েটার্সের এর ‘ভাগ্যচক্র’ ছবিতে প্রথম এটি ব্যবহৃত হল এবং বিপুল সাফল্য অর্জন করল। আজ অনেক বিবর্তন, অনেক অদলবদলের মধ্যে দিয়ে ফিল্ম বানাবার পদ্ধতি আমূল বদলে গেলেও প্লে-ব্যাক পদ্ধতিটি কিন্তু সগৌরবে বিরাজ করছে।

প্লে-ব্যাক প্রথা চালু হবার পরে নিউ থিয়েটার্সের নিবেদনে ‘জীবন মরণ’ ছবিটিতে ব্যবহৃত হয়েছিল একটি রবীন্দ্রসংগীত :

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান..

সংগীত পরিচালনায় শ্রী পঙ্কজ কুমার মল্লিক। কণ্ঠদানে স্বর্ণকণ্ঠী পাঞ্জাবি যুবক শিল্পী কুন্দন লাল সায়গল।

এই গানটি নিয়ে খুব মজার একটি গল্প আছে।

গানটির রেকর্ডিং হলো। সায়গল সাহেব গাইলেন। ছায়াছবিটিও মুক্তির জন্য প্রস্তুত। কিন্তু, ছবির সঙ্গে মানানসই হবে ভেবে পঙ্কজ বাবু এমন এক কাজ করে বসলেন যা শুনে কলকাতার রবীন্দ্রসংগীতের চৌকিদারেরা একেবারে রে রে করে তেড়ে এলেন।

গানটির দ্বিতীয় অন্তরাতে (আভোগে) ছোট্ট একটি কথা পঙ্কজ বাবু পাল্টে দিলেন, যাতে ছবির সঙ্গে মানানসই হয়।

সেই কথাটি কবি পড়বে তোমার মনে

সেই কথাটি ওগো পড়বে তোমার মনে

‘কবি’র বদলে ‘ওগো’ শব্দটির ব্যবহার হল। শুরু হয়ে গেল ‘গেল গেল’ রব। গুরুদেবের গানকে বিকৃত করা হচ্ছে.. প্রাণ থাকতে তা হতে দেবেন না তাঁর গানের পাহারাদাররা… ছবিটির মুক্তি প্রায় আটকে যায় আর কি!

পঙ্কজ কুমার মল্লিকও ছাড়ার পাত্র নন। সায়গল সাহেবকে নিয়ে সোজা রওনা দিলেন শান্তিনিকেতনের পথে। গিয়ে দেখেন ওঁরা পৌঁছবার আগেই ওখানে পৌঁছে গেছেন সেই পাহারাদারেরা…। রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি বসে সায়গল সাহেব যখন সবিনয়ে নিজের আর্জি পেশ করছেন.. অমনি মিউজিক বোর্ডের সদস্যরা নাকি আর্তস্বরে চিৎকার করে ওঠেন…. না না গুরুদেব খবরদার শুনবেন না ওর কথা।….. এত বড় স্পর্ধা আপনার গানের বাণী পর্যন্ত পাল্টে দিয়েছে …..

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, যে কারণে তিনি রবীন্দ্রনাথ, এই পাঞ্জাবী যুবকটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নাকি বলেছিলেন ঠিক আছে একবার শোনাও তো কী গেয়েছ…

সায়গল সাহেব গাইলেন..…

রবীন্দ্রনাথ বললেন আবার গাও..…

দুবার শুনে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন বেশ হয়েছে…. আমি তো এতে আপত্তির কিছু দেখছি নে…

মিউজিক বোর্ডের বিদগ্ধ ভদ্রমণ্ডলীকে হতাশ করে দিয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ অনুমতি দিয়ে দিলেন।

কত ছবিতে ওঁর কত গান যে ব্যবহৃত হয়েছে…. পরশপাথরের ছোঁয়া লেগে লোহা যেমন সোনা হয়ে যায়, তেমনি করে গানের কারণেই ছবির জাত পাল্টে গেছে। আমাদের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা জীবনের প্রতিটি পর্বের প্রতিটি অনুভূতির জন্য তিনি রেখে গেছেন তাঁর অজস্র গান। ছায়াছবিতে যাঁরাই নিজেদের উপকারের জন্য সেই গান ব্যবহার করতে পেরেছেন তাঁরাই সমৃদ্ধ হয়েছেন। ছবি তৈরি করতে করতে,চিত্রনাট্য লিখতে লিখতে কত পরিচালকের কত চিত্রনাট্যকারের কতবার মনে হয় আচ্ছা আমাদের জীবনের এমন কোন মুহূর্ত কি আছে যার জন্য রবীন্দ্রনাথের গান নেই! চিত্রপরিচালক আর সংগীতপরিচালকের হাতে হাত মিলিয়েছেন মরমী অনুভবী নিবেদক, প্রোডিউসাররাও। তাঁদের কথা, তাঁদের অবদান স্মরণ না করলে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

নিউ থিয়েটার্স এবং তার কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার এই প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্বনামধন্য পরিচালকদের উৎসাহে রবীন্দ্রসংগীতের বন্যা বইয়ে দিলেন বিভিন্ন ছায়াছবিতে। ছবির তালিকাটি অসম্পূর্ণ হতে পারে, তবু তালিকা পেশ করছি ও ছবিতে ব্যবহার করা গানেরও উল্লেখ করছি।

আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে  (পরিচয়)

আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে  (পরিচয়)

আমার রাত পোহালো শারদরাতে  (সাথী)

আজ খেলা ভাঙার খেলা  (সাথী)

একটুকু ছোঁয়া লাগে  (সাথী)

আমার এই রিক্ত ডালি  (মন্ত্রমুগ্ধ)

ফুল বলে ধন্য আমি  (নার্স সিসি)

কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে  (ডাক্তার)

তোমার বাস কোথায় যে পথিক  (পরাজয়)

মরণের মুখে রেখে দূরে যাও চলে  (অধিকার)

তালিকাটি আরও দীর্ঘ হতে পারে।

আসলে ভেবে দেখবার মত উল্লেখযোগ্য একটু মজার একটা কথা হলো এই যে— এইসব গানের অসাধারণ সাফল্য সত্ত্বেও নিউ থিয়েটার্সের বাইরে বানানো ছবিগুলিতে রবীন্দ্রসংগীত কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। এই রহস্যের কারণ আজও অনাবিষ্কৃত। হতে পারে, অন্যান্য পরিচালক বা সংগীতপরিচালক হয়তো বীরেন্দ্রনাথের মত ক্ষমতাসম্পন্ন বা রুচিবান ততটা নন;  অন্য ধরনের গানের চটক তাদের মন কেড়েছিল!  কিছু কিছু প্রযোজকদের আবার বাংলার সাহিত্য অথবা সংস্কৃতির সঙ্গে তেমনভাবে ভালো পরিচয় ছিল না। এর ওপর আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অজানিত কোনো উৎস থেকে অগাধ টাকার আবির্ভাব হয়েছিল। তার কুফল ছায়াছবির রুচি-নির্মিতির উপরেও এসে পড়ে। নৈরাজ্য আর রুচিহীনতার সেই প্রবাহের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের স্থান পাবার কথা নয় অবশ্য।

বেনোজল সরে গেলে ডাঙা জেগে ওঠে। হুজুগের বেনোজল যখন সরে যেতে আরম্ভ করে ছায়াছবির জগতে, তখন হঠাৎই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতন্তভাবে উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা বাংলা ছবিকে গভীর অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে গৌরবের আসনে নতুন করে বসিয়ে দেয়। এখানেও আবার সেই নিউ থিয়েটার্স। পরিচালনা আর অভিনয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন কিছু মুখ নিয়ে আমরা একটি ছবি বানান যা শুধু বক্তব্যের দিক থেকেই বলিষ্ঠ তাই নয়, জনপ্রিয়তাতেও আকাশচুম্বী হয়ে উঠলো। ছবির নাম ‘উদয়ের পথে’। পরিচালক বিমল রায়। আর শিল্পীরা হলেন রাধামোহন ভট্টাচার্য, বিনতা রায়, দেবী মুখোপাধ্যায় আর বিশ্বনাথ ভাদুড়ি। ছবিটা কলকাতায় টানা ১০০ সপ্তাহ চলে পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দিল। ছবির বুকলেট খুলে দেখা গেল এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিনটি রবীন্দ্রসংগীত —

বসন্তে ফুল গাথল আমার জয়ের মালা

ওই মালতীলতা দোলে

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে

বিশেষ করে ‘বসন্তে ফুল গাঁথল’ গানটি মানুষের মুখে মুখে ফিরেছিল তখন।

বাংলা ছায়াছবির এক অন্ধকার যুগের অবসান ঘটালো ‘উদয়ের পথে’, তবু ইন্ডাস্ট্রিওয়ালাদের চেতনা ফিরলো না। হাজার হাজার গানের হাজার রকম সুর ও বাণী তৈরি হচ্ছে— কোনোটা জনপ্রিয় হচ্ছে– কোনোটা বা হচ্ছে না–  কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত জনপ্রিয় হলেই তাঁরা বলে উঠছেন– ওটা তো একটা ব্যতিক্রম…..

এই মানসিকতার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবু এরই মধ্যে কখনো কখনো দু একটা ব্যতিক্রমী প্রয়াস চোখে পড়ে যায়। যেমন ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে

‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে’

বাংলা ছায়াছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই পুরোধাপুরুষ তরুণ মজুমদার এবং তপন সিংহকে স্মরণ করতেই হবে। তরুণ মজুমদারের ছবির বৈশিষ্ট্যই হলো গ্রাম-শহর-নির্বিশেষে একেবারে তৃণমূল স্তরের মানুষের মনের অন্দরে তিনি পৌঁছে যান। হৃদয় মথিত করা শুদ্ধ আবেগ, যা ভালোর দিকে আমাদের নিয়ে যাবার একটা বার্তা দেয়– বুদ্ধিদীপ্ত অথচ সরল বার্তা; তেমনভাবেই ছবিতে তাঁর গানের নির্বাচন বৌদ্ধিক, এবং আরো বেশি করে হার্দিক। তরুণ মজুমদারের ছবির চরিত্রদের সবাই চিনতে পারে। তাদের সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারে‌।  শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নিরক্ষর-স্বাক্ষর-নির্বিশেষে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে যান তরুণ মজুমদার— কখনো সংলাপ দিয়ে, কখনো শুভ বার্তা দিয়ে, আবার কখনো রবীন্দ্রনাথের গানের হাত ধরে। স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত তাঁর গানের প্রয়োগ ছবিকে দেয় অনন্য এবং ভিন্নতর এক মাত্রা। গোটা ছবির থিমের সঙ্গে ঠিক ঠিক পরিবেশ অনুযায়ী, মুড অনুযায়ী তিনি গান দেন। আমাদের বারবার মনে পড়ে যায় ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির সেই অসামান্য মুহূর্তটিকে— যেখানে দেখি, নন্দিনী মালিয়া অভিনীত সেই মেয়েটির একাকীত্ব। নিঃসঙ্গতার হাহাকার। পাথুরে কাঁকুরে কঠোর প্রকৃতির মাঝখানে সে একা বসে থাকে একটা টিলার উপর। চোখের দৃষ্টি তার বহু দূরের দিকে বিছিয়ে দিয়েছে। কন্ঠে গান—

দূরে কোথায় দূরে দূরে

আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে

যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে

সেই বাঁশিটির সুরে সুরে..

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিটোল কন্ঠের বিষাদ ছেয়ে ফেলে, গ্রাস করে আমাদের মনকে। উল্লেখ করতে ইচ্ছে করে কত গানের কথা..

সখী ভাবনা কাহারে বলে    (শ্রীমান পৃথ্বীরাজ)

যৌবনসরসীনীরে    (ঠগিনী)

তুমি রবে নীরবে     (কুহেলি)

চরণ ধরিতে দিওগো আমারে    (দাদার কীর্তি)

হার মানা হার পরাব তোমার গলে  ( ভালোবাসা ভালোবাসা)

আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি    (পথভোলা) ..

রবীন্দ্রনাথের গানকে ছবিতে আর এক অন্য উপায়ে ব্যবহার করতেন তপন সিংহ। গানের চরণ বেছে বেছে ছবির সিচুয়েশনের সঙ্গে তাকে মেলানোর খেলা খেলতেন। আক্ষরিকভাবে নয়, গানের নিহিত তাৎপর্যটুকু ছবির তাৎপর্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন। তাঁর ছবির ভাবনার প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতো তাঁর গানের ব্যবহার। ‘অন্তর্ধান’ ছবির শেষ দৃশ্যের কথা মনে আসে যেখানে…..

‘অতিথি’  ছবির টাইটেল কার্ডে দেখতে পাই, শুনতেও পাই

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে…

গেয়ে চলেছেন সুচিত্রা মিত্র। ‘অতিথি’র থিম মুক্তির বার্তা। এই বার্তাই ছবির নিহিতার্থ। তাকেই গান দিয়ে প্রকাশ করছেন পরিচালক।

তাঁর ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে

কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা

‘কালামাটি’ তে

জীবন যখন শুকায়ে যায়

‘অতিথি’ তে

ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি

‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এ

শ্রাবনের গগনের গায়,

কেন যামিনী না যেতে জাগালে না

‘নির্জন সৈকতে’ ছবিতে

পথ দিয়ে কে যায় গো চলে

এইসব অনন্য গানের অনন্য ব্যবহার ও সাফল্য একটু একটু করে সন্দেহবাদীদের কোণঠাসা করে ফেলল। ছবি যখন হিট্ করে, আর সেই সঙ্গে গান, তখন আর কারো কিছু বলার বা বোঝার বাকি থাকে না বোধহয়।

এর সঙ্গেই যাঁর নাম উঠে আসে তিনি ঋত্বিক ঘটক।

রবীন্দ্রনাথের গানগুলির নতুন ভাষ্যই যেন আবিষ্কার করে দিয়েছেন ঋত্বিক ঘটক। তাঁর ছবিতে রবীন্দ্রনাথের যে গানগুলি তিনি ব্যবহার করেছেন, নতুন রূপ ধারণ করে সে গানগুলির অবয়বও আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে

আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ

কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে

জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের সংগীতপরিচালনায়, আর সুশীল মল্লিক এবং অবশ্যই দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠগুণে সে গান আজও অমর হয়ে আছে।

প্রথিতযশা পরিচালকদের মধ্যে একজন মৃণাল সেন। তাঁর ছবিতে গানের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে, আমরা জানি। তবু একটা ছবিতেই তিনি একটিমাত্র গান ব্যবহার করেছিলেন যা রবীন্দ্রসংগীত–

 অশ্রু নদীর সুদূর পারে

এরপরের অবশ্যম্ভাবী নাম শ্রদ্ধেয় সত্যজিৎ রায়।

আমরা সবাই জানি, সত্যজিৎ ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র রবীন্দ্র সংস্কৃতি ওঁর মজ্জায় মজ্জায়। তবুও রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তিনি আমাদের সামনে এক নতুন দরজা খুলে দিলেন। একদিকে যেমন ‘চারুলতা’য়

আমি চিনিগো চিনি

এত চেনা গান ব্যবহার করেছেন, আবার পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন ঢিমে লয়ের শাস্ত্রীয় সুর-আশ্রিত গান ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য়

এ পরবাসে রবে কে

‘মণিহারা’ ছবিতে

বাজে করুণ সুরে

বন্দিত চিত্রপরিচালক এবং সংগীতপরিচালকদের শুভ প্রচেষ্টায় সেই যে ভুলভাল রুচির আগল একবার ভেঙে গেল, তারপর থেকে আমাদের আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ছবির পর ছবি এসেছে রবীন্দ্রনাথের গানে ভরপুর। এমনটাও হয়েছে যে একটি ছবিতে মোট ছটি গান; ছটিই রবীন্দ্রসংগীত। ফলে ছায়াছবির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রসংগীত আর বোঝা হয়ে রইলো না, হয়ে উঠল সম্পদ। এতটাই তার বিস্তার হলো যে হিন্দি ছায়াছবির গানেও তার ছোঁয়া লেগে গেল।

যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে..

এই গানের সুর আর তালের অনুসরণে আমরা পেলাম তেরে মেরে মিলন কি য়ে রয়না..

অথবা

তোমার হলো শুরু আমার হল সারা..

এ গানের সুরে পাওয়া গেল

ছু কর্ মেরে মনকো কিয়া তুনে কেয়া ইশারা..

এইভাবে ‘খরবায়ু বয় বেগে’, ‘পথের শেষ কোথায়’ এমন আরো অনেক গানের সুরে হিন্দি সিনেমার নতুন নতুন বহু গান নতুন ভাবে পাওয়া গেল। এমনকি, অনেক গানের আবহসংগীতের সুরে লাগল রবীন্দ্রসংগীতের ছোঁয়া।

হিন্দী ভাষায় ‘শওকিন’-ছবির

যব্ ভি কোই কঙ্গনা বোলে… গানটির আবহসংগীতে বাজলো ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’ গানের সুর।

স্বীকার করতেই হবে, আরো আধুনিক যুগে এগিয়ে এসেছেন গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়…. এমন কয়েকজন ব্যতিক্রমী পরিচালক, রবীন্দ্রনাথের গান যাঁদের ছবিকে আরো প্রাঞ্জল করে তুলেছে।

ছায়াছবিতে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহারের কথা ভাবতে গেলে দেখছি এই মুহূর্তে এক মনোরম পরিস্থিতিতে স্থিত হয়েছি আমরা। কিন্তু সাবধান হওয়া দরকার— যদি চোরকাঁটা লুকিয়ে থাকে এ পথের কোথাও, সেগুলিকে উপড়ে ফেলার দায়িত্বও তো আমাদের!

যখন দেখি কোনো ছবিতে এক ক্যাবারে-নর্তকী পানপাত্র হাতে নিয়ে মনের দুঃখে গেয়ে চলেছেন

আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান…..

অথবা একটি মিউজিক ভিডিওতে একজোড়া তরুণ-তরুণী পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে খোলা মাঠে গড়াগড়ি খেতে খেতে গাইছে

তোমায় আমায় মিলন হবে বলে আলো আকাশ ভরা

তখন আশঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ থাকে বলেই মনে হয়।

টিভি সিরিয়ালগুলো তো আজকাল রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে করে নিজেদের! সেখানে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার আর গায়নপদ্ধতিতে যতই আপত্তিকর ব্যাপার থাকুক না কেন।

আরেকটি ভয়াবহ ট্রেন্ড আজকাল আবার শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গানে এক্সপেরিমেন্টেশনের নাম করে কিছু চিত্রনির্মাতা এমন এমন কাণ্ড ঘটাচ্ছেন তাদের দুঃসাহস দেখলে অবাক হতে হয়।

যেমন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে..’

ছবিতে ওই গানের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে নানা জাতীয় উল্লাসের শব্দ। গানের সুর ছন্দ যাচ্ছে বদলে।

হায় রে! এক্সপেরিমেন্টেশনের যখন এতই সাধ, তাহলে নিজেদের লেখা নিজেদের সুর দেওয়া গানে সেই এক্সপেরিমেন্ট তারা করেন না কেন! বেচারী রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত টানাটানি কেন! তিনি কী দোষ করেছেন?

এই কলুষ থেকে ছায়াছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীতকে, বা সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রসংগীতকে মুক্ত করার দায়িত্ব আমাদের। নিঃসন্দেহে আমাদেরই উচিৎ, সেই কাজে লেগে পড়া। রবীন্দ্রসংগীতে কাদা লাগানোর যে প্রয়াস শুরু হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে তা’ স্পর্শ করবে না। কিন্তু আমাদের আবেগকে, রবীন্দ্রনাথের প্রতি, তাঁর গানের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাকে, সম্মানকে, অনুরাগকে অহরহ  তা’ কালিমালিপ্ত করে দিচ্ছে। সেই কালি মুছে ফেলার জন্য আমাদের জেগে ওঠা প্রয়োজন। এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। সুস্থ রুচিবোধের প্রয়োগ প্রয়োজন। সিনেমা তথা সব ধরনের শিল্পের ক্ষেত্রে এবং সর্বক্ষেত্রে।

কৃতজ্ঞতা:  শ্রী তরুণ মজুমদার

তথ্যসূত্র:

১। বাতিল চিত্রনাট্য/ তরুণ মজুমদার/ দেজ পাবলিশিং

২। নকসীকাঁথা/ তরুণ মজুমদার/ দেজ পাবলিশিং

৩। সিনেমাপাড়া দিয়ে/ তরুণ মজুমদার/ দেজ পাবলিশিং

৪। বেঙ্গল মিউজিক কলেজ আয়োজিত ‘অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারকবক্তৃতা’: বক্তা  তরুণ মজুমদার

৫। চলচ্চিত্র আজীবন/ তপন সিংহ/ দেজ পাবলিশিং

৬। বাঙালির আপনজন তপন সিংহ/ অপূর্ব বিশ্বাস/ পত্রলেখা

৭‌‌। মৃণাল সেনের ফিল্মযাত্রা/ শিলাদিত্য সেন/ প্রতিক্ষণ

৮। সংখ্যাধিক্যের চলচ্চিত্র অসহিষ্ণুতার খতিয়ান/ শিলাদিত্য সেন/ প্রতিক্ষণ

৯। বাংলা ফিল্মের গান ও সত্যজিৎ রায়/ সুধীর চক্রবর্তী/ গাংচিল

১০। বিষয় চলচ্চিত্র/ সত্যজিৎ রায়/ আনন্দ পাবলিশার