রবীন্দ্র ভাবনায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতা : পুনশ্চ কাব্যের ‘ছেলেটা’
ড. রাজশ্রী ভট্টাচার্য
Abstract
This paper examines the dialectical interplay of tradition and modernity in Rabindranath Tagore’s late poetic vision, with special reference to the poem “Cheleta” from the collection Punashcha (1932). Written during the mature phase of his creative life, the poems of Punashcha reveal a significant shift in diction, form, and thematic orientation. Breaking away from classical metrical rigidity, Tagore adopts a flexible prose-rhythm that accommodates the raw textures of lived reality. The nameless boy in “Cheleta” emerges as a symbolic representative of marginalized existence—rooted in nature, resilient amidst deprivation, and instinctively free from social pretension. Through this character, Tagore redefines poetic aesthetics by foregrounding the ordinary, the neglected, and the socially peripheral.
The study further situates this poem within Tagore’s broader philosophical and educational ideals, particularly his emphasis on freedom, creativity, and organic communion with nature. By drawing parallels with poems from Janmadine and songs from Gitabitan, the paper argues that Tagore’s late poetry embodies a profound humility—an acknowledgment of poetic incompleteness and a longing for deeper communion with life. Thus, “Cheleta” becomes a site where tradition meets modern sensibility, and where poetic expression transcends aesthetic ornamentation to embrace experiential authenticity.
Key Words
Rabindranath Tagore; Punashcha; Cheleta; Tradition and Modernity; Prose-rhythm; Marginality; Poetic Realism; Educational Philosophy; Nature; Humanism.
জীবনের স্বর্ণসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিজীবন হয়েছিল উদ্দীপিত, উজ্জ্বলতর। যে ভাষায় তিনি কবিতা লিখেছেন, তা হয়ে উঠেছিল শুধু তাঁর একার নয়, সব মানুষের ভাষা। তাঁর কবিতার শব্দগুলির কোনোটাই আমাদের অজানা নয়, অচেনা নয়; কিন্তু সহজ কথার গভীরে গভীরতম ভাবকে বহন করেছে। বিষয় নির্বাচনেও তাঁর ঝোঁক ছিল সহজ জীবনের প্রতি; সাধারণ, সামান্য মানুষের আপাত-তুচ্ছ ভালো-মন্দ অনুভূতির প্রতি; সহজ জীবন ধারার প্রতি।
আসলে বিশ্বদর্শন-সঞ্জাত প্রজ্ঞা, বিশ্বসাহিত্যের নব নব প্রেরণা, বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, বিশ্বপ্রকৃতির রূপ-রূপান্তরের লীলা– এত কিছুর অভিঘাত অভিজ্ঞতা; আবার দেশের মাটি-জল-আকাশ-বাতাস আর শিকড়ের গভীর বিস্তারের মায়াঘেরা বন্ধন রবীন্দ্রনাথের মানসলোককে এমনভাবে আলোড়িত আন্দোলিত করেছিল যে তাঁর দেখবার আর বোঝবার দৃষ্টির অনন্ত প্রসার ঘটে গিয়েছিল। বস্তুজীবনের সাধারণ-অসাধারণ সব রকম অনুভূতি অভিজ্ঞতাই অসামান্য রূপে ধরা দিয়েছিল তাঁর সামনে। এ সবই তাঁর সৃষ্টিজীবনে বিশেষভাবে সেজে উঠেছিল। তাই একাত্তর বছর বয়সে ১৯৩২ সালের কাব্য ‘পুনশ্চ’র যে কবিতাগুলি পাই, তার ভাষার বাঁধনে দেখি রঙ ও রেখার ঝলমলে সমাহার। সামান্য কথা কত অসামান্য কথনে বলছেন তিনি— সাধারণ মেয়ে, ক্যামেলিয়া, ছেলেটা, একজন লোক, বাঁশি, প্রথম পূজা… আরো অনেক কবিতায় উঠে আসে এই অনামীদের গল্পকথা; তাদের সংগ্রাম ও আনন্দ-বেদনার শ্লোকগাথা।
অন্তমিলের শাসন ভেঙে অবারিত গদ্যছন্দে এদের কাহিনীর বিস্তার। বিষয় অভিনব, আঙ্গিকও নতুন। কবিতার চরিত্রগুলির মতোই যেন ধ্রুপদী সৌকর্যের উল্টোপথে আপন খেয়ালের বসে পথ চলা কবিতারও। এবড়োখেবড়ো, বাস্তবের ঘাত ছোঁয়ানো, ‘ মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে গাঁথা’ ( নিমন্ত্রণ। বীথিকা) কাব্যসুষমার নান্দনিক পরিশীলনের বিপ্রতীপেই ‘পুনশ্চ’র জেহাদ।
‘পুনশ্চ’র এই ছেলেটা অভিভাবকহীন। তাই শাসন নেই তার। শৃঙ্খলা নেই। সমাজবিধি জানেনা। লেখাপড়া তো জানেই না। কে দেবে শিক্ষা! সহবতও শেখেনি। ভাঙা বেড়ার ধারের আগাছার জীবন তার। *যন্ত্রহীন। এমনকি অসুস্থ হয়ে মরতে বসলেও কেউ ফিরেও তাকায় না– এতদূর অবহেলিত সে! ভালোবাসে না কেউ; কিন্তু তাকে মারতে বকতে গালমন্দ করতে কেউ ছাড়ে না। পরিবেশ প্রতিকূল; তবু অদম্য জীবনীক্তি তার। কবি তুলনা করেন আগাছার প্রতিরোধ-ক্ষমতার সঙ্গে।
“আছে আলোক বাতাস বৃষ্টি,
পোকামাকড় ধুলোবালি,
কখনো ছাগলে দেয় মুড়িয়ে,
কখনো মাড়িয়ে দেয় গোরুতে;
তবু মরতে চায় না, শক্ত হয়ে ওঠে,
ডাঁটা হয় মোটা, পাতা হয় চিকন সবুজ।”
(ছেলেটা। পুনশ্চ)
বারবার বিপদে পড়েও হার মানে না। পিছপা হয় না। মরে যাওয়ার উপক্রম হলেও বহু কষ্ট করে আবার বেঁচে ওঠে। সুস্থও হয় লড়াই করে। নির্ভীকচিত্ত সে। মনের জোর অসম্ভব বেশি। সে জানে, আয়োজন করে ডেকে বসিয়ে তাকে কেউ খেতে দেবে না। যত প্রতিকূলতাই থাকুক, নিজের গ্রাসাচ্ছাদন নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে। তাই মার খাবে- ধরা পড়বে- জেনেও চুরি করে ফল খেতে সে বাধ্য হয় এবং আশ্চর্য! জিতেও যায়! কারণ, মারের দাগের থেকে বেশি হয় তার জাম খাওয়ার সংখ্যা। তিরস্কার অপমান গায়ে সে মাখে না। আর তাই সে– মানুষের মর্যাদাও পায় না।
তার উছলে পড়া স্নেহের ভাগীদার হয় শুধু এক পথের কুকুর। আর তাকে দেখে স্নেহধারা উথলে ওঠে কেবল পুত্রহারা সব খোয়ানো এক অভাগিনী মায়ের। ছেলেটার মন কোমল হয়ে আসে কেবল এই দুই সমব্যথীর সাহচর্যে— একজন দুঃখিনী মানুষ, অপরজন– মনুষ্যেতর।
ছেলেটাকে কবি কোনো নাম দেন না। সে বিশেষ কেউ নয়। আমাদের গাঁয়ে-গঞ্জে এমন দস্যি দামাল দুঃখী ছেলের দেখা পাওয়া খুব একটা বিরল নয়। এই ছেলেটা এদের প্রতিনিধি। সমাজের প্রতিনিধি। এরাই সাধারণ। ‘ছেলেটা’ কবিতা জীবনধারার এই দ্যোতনা বহন করছে।
তার নিজস্ব জগত ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগ। সেখানে কোনো ভাবুকতা বা খেয়ালী কল্পনা নেই তার। বন-বাদাড় ঘেঁটে গোবরের গুটি, পোকামাকড় ধরে এনে ব্যাঙকে, গুবরে পোকাদের যত্ন করে খাওয়ায়। লোভ নেই তার কিছুতে। আদর করে ভালোবেসে কেউ কিছু দেয় না তাকে, তাই চুরি করে দেখে নিয়ে ছেড়ে দেয় সে ওই কাঁচ পরানো সুন্দর চোঙটা। কিন্তু মানুষ তাকে ভুল বোঝে।
উচিৎ কথা বলতে ভয় নেই তার। বলে,
“কেন লজ্জা।
বক্সিদের খোঁড়া ছেলে তো ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে ফল পাড়ে, ঝুড়ি ভরে নিয়ে যায়,
গাছের ডাল যায় ভেঙে,
ফল যায় দলে,
লজ্জা করে না?
(ছেলেটা। পুনশ্চ)
তার কল্পনা মেলে দেয় সে রূপকথায় ভর করে।
জলের উপর রোদ ঝিলমিল করে।
“তলায় পাতা ছড়িয়ে শেওলাগুলো দুলতে থাকে, মাছগুলো খেলা করে।
আরো তলায় আছে নাকি নাগকন্যা?
সোনার কাঁকই দিয়ে আঁচড়ায় লম্বা চুল,
আঁকাবাঁকা ছায়া তার জলের ঢেউয়ে”
(ছেলেটা। পুনশ্চ)
এই নির্ভীক, নির্লোভ, সৎ, কল্পনাপ্রবণ, সরল কিন্তু ছন্নছাড়া দামাল ছেলেটিকে কবি বড় ভালোবাসেন। মায়া পড়ে তাঁর। পড়ায় মন নেই বলে অম্বিকে মাস্টার যখন নালিশ জানান তাঁর কাছে— তখন কবির আশ্চর্য খেদোক্তি :
“সে ত্রুটি আমারই,
থাকত ওর নিজের জগতের কবি
তা হলে গুবরে পোকা এত স্পষ্ট হতো তার ছন্দে
ও ছাড়তে পারত না।
কোনোদিন ব্যাঙের খাঁটি কথাটি কি পেরেছি লিখতে,
আর সেই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি।”
(ছেলেটা। পুনশ্চ)
ছেলেটার নিজের জগৎ ও প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের যে ভুবন চিত্রিত হয়, তার বাস্তবতাকে খুঁজতে গিয়ে হার মানে প্রথাগত কাব্যসুষমা। তাই নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি, গুবরে পোকার ছন্দ, ব্যাঙের খাঁটি কথার মত মেঠো লব্জগুলো অনায়াসে জায়গা করে নেয় কাব্যগ্রন্থের পাতায়। কবির বিস্তারিত জীবনবোধে সামিল হয়।
আমাদের মনে পড়ে শিক্ষাব্রতী, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ কর্মযোগী রবীন্দ্রনাথকে। জীবনের সামগ্রিক বিকাশের কথায় তিনি বলেন— আনন্দময়, মুক্ত, প্রকৃতিকেন্দ্রিক হোক মানবজীবন। সেই শিক্ষায় বড় করতে চেয়েছিলেন শিশুদের। শিশুদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা বা সৃষ্টিশীল ক্ষমতার বিকাশ, খেলতে খেলতে প্রকৃতির সঙ্গে উদ্ভিদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী মিশে থাকতে পারা, সকলকে ভালবেসে আপন করে নিতে পারা, মনের প্রসারতা, উদার মুক্ত পরিবেশে অবাধ স্বাধীন মনের বিকাশ ও মুক্তি চেতনার দীক্ষা তিনি দিতে চেয়েছেন তাঁর আশ্রম-বিদ্যালয়ে; প্রতিটি শিশুমন যাতে পূর্ণ বিকশিত হতে পারে।
“মোদের যেমন খেলা তেমনি যে কাজ
জানিস নে কি ভাই।
তাই কাজকে কভু আমরা না ডরাই ।।
খেলা মোদের লড়াই করা, খেলা মোদের বাঁচা মরা,
খেলা ছাড়া কিছুই কোথাও নাই ।।”
(গীতবিতান)
কবির এই স্বপ্ন বাস্তব হয়ে উঠেছিল এ কবিতা লেখার আরো কিছুদিন আগে। ১৯০১ সাল থেকে তার সূত্রপাত হয়। তবুও মানবমনের মুক্তির খোঁজে, মানুষের আপনপরিচয় খুঁজে পাবার তাগিদে ভেবে গেছেন আজীবন। তবুও অসম্পূর্ণতার কোনো এক আক্ষেপ বোধের মধ্যে থেকে গিয়েছিল। আরো মিশে যেতে চেয়েছিলেন মানবজীবনধারার অন্তর্লীন স্রোত হয়ে। ১৯৬০সালে, জীবনের উপান্তে পৌঁছে গিয়ে, তখনো ‘জন্মদিনে’ কাব্যের ১০ সংখ্যক কবিতায় বলছেন,
”বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি!”
রবীন্দ্রনাথ এমনই একজন কবি, যাকে স্বদেশের সমাজ ও ধর্ম, জাতীয়তাবাদী আবেগের সংকীর্ণতা বেঁধে রাখতে পারেনি। বিশ্বমানবের প্রেক্ষাপটে তিনি সত্যকে দেখতে চেয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। জীবনের প্রান্তবেলায় তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ দার্শনিক। তবু তাঁর কবিসত্তা ছিল সর্বপ্লাবী। অনন্য সৃষ্টিশীলতা মুখর হয়েছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মানবজীবনের হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা কথায়-কথায়, সুরে, ছন্দে, ছবিতে-ছবিতে রূপায়িত করেছেন। তবু এক অক্ষমতার বেদনা তাঁর বুকে বেজে গেছে নিরন্তর।
‘ঐকতান’ কবিতায় তাই বলেছেন,
“মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে
জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পশরা,
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা
আমার সুরের অপূর্ণতা
আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।”
(জন্মদিনে ১০)
এই কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ‘ছেলেটা’ কবিতার শেষে।
“সে ত্রুটি আমারই,
থাকত ওর নিজের জগতের কবি
তাহলে গুবরে পোকা এত স্পষ্ট হত তার ছন্দে
ও ছাড়তে পারতো না।”
(ছেলেটা। পুনশ্চ)
ঐকতানে তাই বললেন,
“যে আছে মাটির কাছাকাছি–
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।”
(জন্মদিনে ১০)
সেই নতুন দিনের নতুন কবির হাতে তাঁর উত্তরাধিকার তুলে দিতে চেয়েছেন—
মানবতার উত্তরাধিকার। প্রেমের উত্তরাধিকার।
আলোকিত সমাজের উত্তরাধিকার।
তথ্যসূত্র
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “নিমন্ত্রণ”, বীথিকা, রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী সংস্করণ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ছেলেটা”, পুনশ্চ (১৯৩২), রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী।
- একই গ্রন্থ।
- একই গ্রন্থ।
- একই গ্রন্থ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, (শিশু/খেলা পর্যায়ভুক্ত গান), বিশ্বভারতী সংস্করণ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “জন্মদিনে” (কবিতা নং ১০), কাব্যগ্রন্থ জন্মদিনে, রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী।
- একই গ্রন্থ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ছেলেটা”, পুনশ্চ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “জন্মদিনে” (কবিতা নং ১০), জন্মদিনে।