দেবজ্যোতি মণ্ডল
সংক্ষিপ্ত ভূমিকা
গ্রামবাংলার নৈঃশব্দ্য, দারিদ্র্যের অন্তর্লীন সৌন্দর্য এবং একাকিত্বের অদৃশ্য সুর—এই গল্পে তারই অনুরণন। রমেন নামের এক যুবকের জীবনে একটি ভাঙা দরজা কেবল কাঠ-লোহার বস্তু নয়; সেটি তার স্মৃতি, তার উত্তরাধিকার, তার বন্ধুত্বের একমাত্র নির্ভর। কালবৈশাখীর ঝড় যেমন আকাশকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়, তেমনি সময়ের ঝড় মানুষের চারপাশের সম্পর্কগুলোকেও ক্ষয় করে। তবু কিছু জিনিস থাকে—যা ভাঙলেও ভেঙে পড়ে না।
গল্প
রমেন তিনদিন হলো ভাত খায়নি। রুটি খেয়েই আছে। ভাত খেলে তার গা বমি হয়, পেটব্যথা করে। এই ক’দিন সেঁকা, কালো, ফুটো-ফুটো রুটিগুলোই যেন তার প্রাণ হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে দু’টুকরো আলু, একটু ঝোল মিশিয়ে চুবিয়ে খেলে তার মনে হয়—পেটের ব্যামোটা যেন ভালো হয়ে যাচ্ছে।
তার স্টিলের থালাটা বহুদিনের পুরোনো। ছোটবেলায় তার বাবা কিনে এনেছিলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেই থালাতেই সে খায়। সন্ধ্যেবেলা এলইডি বাল্বের আলোয়, মাটির দাওয়ায় বসে। তাদের বাড়িটাও বহুদিনের—টিনের ভাঙা দরজা, দাদুর আমলের। গ্রামে এমন সুন্দর দরজা তখন খুব কম মানুষেরই ছিল।
ছোটবেলায় রমেন বিকেলের নরম আলোয় দেখত, তার করুণ-সুন্দর মা ওই ভাঙা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিঁদুর পরছেন। একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল—
—মা, দরজাটা দেখলে তোমার কষ্ট হয় না?
মা হেসে বলেছিলেন—
—না রে, কষ্ট কেন হবে? অনেক পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। তোর দাদুই তো এনে লাগিয়েছিল।
পাশের বাড়ির কাকিমা তখন মিচকি হেসেছিলেন।
আজ দুপুরে রমেন মাঠের ধারে পেয়ারা পাড়তে গিয়েছিল, সঙ্গে ছিল কেন্দুরি। পেড়ে এনে মাকে দিল। মা বললেন—
—ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে নে। আজ তোর বাবা মাংস এনেছে।
দুপুর দেড়টা। পেয়ারাগাছের সবুজ পাতায় একটা টিয়া ডাকছে। উঠোনের এক কোণে পাতনায় জলের মধ্যে কয়েকটা কাঁকড়া ভাসছে। রমেন ভাঙা দরজাটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হয়—দরজাটা যেন কাঁদছে। যেন বলছে, “আমায় আর কেউ দেখে না রে!”
আজ সে ভাত খায়—মুসুর ডাল দিয়ে মাংস মেখে। মাংসের প্রতি তার লোভ আছে, তবু মনে হয়—এই গ্রাম একদিন কালবৈশাখীর অন্ধকারে ডুবে যাবে। সব আলো মিলিয়ে যাবে। তখন সে আর এই ভাঙা দরজা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চিরন্তন বন্ধুত্বের গল্প করবে।
মা হঠাৎ বলেন—
—হারে রমেন, তোদের কলেজে যে মেয়েটা তোর সঙ্গে কথা বলছিল, সে কে রে?
রমেন একটু ভাসা-ভাসা চোখে বলে—
—ও একটা মেয়ে, মা। বাড়ি থেকে কিছু আনতে ভুলে গিয়েছিল। তাই আমার কাছে চাইছিল।
রমেন জানে, তার মা মনে-মনে সেই মেয়েটিকে বউ করে আনতে চান। একদিন সে মাকে বলেছিল—
—জানো মা, আমি যদি বিয়ে করি, আমরা দু’জনে বিকেলের শীতল ছায়ায় এই দরজাটার সঙ্গে গল্প করব। দরজাটা যতদিন বাঁচবে, ততদিন আমাদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
পাশের এক কাকিমা বলেছিলেন—
—তোমাদের যদি কোনোদিন মৃত্যু হয়, ও দরজাটাকেও সঙ্গে নিয়ে যেও!
কেউ একজন তখন মিচকি হেসেছিল।
রমেনের তেমন কোনো বন্ধু নেই। গ্রামের ছেলেরা তার সঙ্গে মিশতে চায় না। সে উষ্ণ দুপুরে চাতকপাখির মতো দাঁড়িয়ে থাকে—যদি কেউ কথা বলে! কিন্তু কেউ বলে না। তাই সে গাছের পাতার সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে, দরজার সঙ্গে সময় কাটায়।
ভাত খাওয়ার পর সে থালাটা ধুতে যায় কলতলায়। সূর্যের হলুদ আলোয় কলতলায় গাঁয়ের গন্ধ ভাসে। পাকা সানের পাশে ধুলো উড়ছে। পিচ্ছিল জায়গায় থালাটা রেখে সে হাত ধুয়ে নেয়। থালাটা অযত্নে পড়ে থাকে—আবার ধুলে তার অযত্ন কেটে যাবে। একটু খাবার আর জলে ভিজে থাকে সেটি।
হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে ওঠে। কালবৈশাখীর ঝড়। তীব্র হাওয়া, ঠান্ডা পরশে রোদ মুছে গিয়ে ফ্যাকাশে কালো রং নেমে আসে। হাওয়ায় দরজাটা দুলতে থাকে।
রমেন ছুটে গিয়ে দরজাটাকে দুই হাত আর বুক দিয়ে জড়িয়ে ধরে। ঝমঝম বৃষ্টি নামে। ঝড়ের শব্দে সে ফিসফিস করে বলে—
—চুপ থাক, আমি তো আছি তোর জন্য।
উপরে তখন মা-বাবা বৃষ্টির শব্দের মধ্যে নিজেদের মতো গল্প করছেন।
আর নিচে, ঝড়-বৃষ্টির ভেতর, রমেন আর ভাঙা দরজা—দু’জনেই দাঁড়িয়ে থাকে, এক অদ্ভুত, নিঃশব্দ বন্ধুত্বে।
প্রতীক বিশ্লেষণ
১. ভাঙা দরজা
দরজাটি কেবল একটি বস্তু নয়; এটি স্মৃতি, উত্তরাধিকার এবং অস্তিত্বের প্রতীক। দাদুর আমলের দরজা মানে পূর্বপুরুষের ইতিহাস। দরজার ভাঙন সময়ের ক্ষয়কে বোঝায়, কিন্তু তার টিকে থাকা ঐতিহ্যের স্থায়িত্বকে নির্দেশ করে। রমেনের কাছে এটি বন্ধুরূপে প্রতিভাত—যেখানে মানুষ ব্যর্থ, বস্তুই তার আশ্রয়।
২. কালবৈশাখী ঝড়
ঝড় এখানে জীবনের অনিশ্চয়তা, সামাজিক একাকিত্ব ও ভবিষ্যতের অন্ধকার আশঙ্কার প্রতীক। আলো মুছে যাওয়া মানে আশার ম্লান হয়ে যাওয়া। তবু ঝড়ের মধ্যেই রমেনের দরজাকে আঁকড়ে ধরা—তার অন্তর্লীন স্থিতধী মন ও ভালোবাসার প্রকাশ।
৩. স্টিলের থালা
শৈশব, পারিবারিক স্মৃতি ও দারিদ্র্যের ধারাবাহিকতার চিহ্ন। অযত্নে পড়ে থাকা থালাটি রমেনের নিজের জীবনের প্রতিরূপ—যাকে যত্ন দিলে আবার উজ্জ্বল হতে পারে।
৪. টিয়া পাখি ও চাতকপাখি-উপমা
টিয়া জীবনের স্বাভাবিক চলমানতা, প্রকৃতির ছন্দ; আর চাতকপাখি রমেনের আকাঙ্ক্ষা ও অপেক্ষার প্রতীক—যে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে, যেমন রমেন অপেক্ষা করে মানুষের সঙ্গের।